২৩ জুন ২০১৮

এবার বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত আমেরিকান মুসলিম লেখককে আক্রমণ

লেখক শর্বরী জোহরা আহমেদ - ছবি : সংগৃহীত

মার্কিন টিভি সিরিজ কোয়ান্টিকোর একটি বিতর্কিত পর্বকে ঘিরে হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা সোশাল মিডিয়াতে এবার আক্রমণ করছে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত একজন আমেরিকান লেখককে। এই আক্রমণ এতটাই হিংস্র যে তারা ধর্ষণেরও হুমকি দিচ্ছে।

বিতর্কিত পর্বটির কাহিনীতে হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের একটি সন্ত্রাসী হামলার ষড়যন্ত্রের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। সেখানে প্রধান একটি চরিত্রে অভিনয় করে বলিউড সুপারস্টার প্রিয়াঙ্কা চোপড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন এবং ওই চরিত্রটিতে অভিনয় করার জন্যে পরে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।

এই কাহিনী রচনায় বাংলাদেশী আমেরিকান লেখক শর্বরী জোহরা আহমেদের কোনো ভূমিকা না থাকার পরও হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা তাকে গালিগালাজ করছে।

যেসব লেখক কোয়ান্টিকোর কাহিনী লিখে থাকেন, শর্বরী জোহরা আহমেদ সেই টিমে ছিলেন শুধু প্রথম মওসুমের জন্যে। মাত্র দুটি পর্বের কাহিনী রচনার সাথে সরাসরি জড়িত ছিলেন তিনি। তার একটি তিনি একাই লিখেছিলেন আর দ্বিতীয়টি যে দু'জন মিলে লিখেছিলেন তিনি ছিলেন তাদের একজন।

শর্বরী জোহরা আহমেদ বারবার তার টাইমলাইনে একথা উল্লেখ করার পরও, হিন্দু জাতীয়তাবাদীরা তাকে আক্রমণ করেই যাচ্ছে। অনেকেই অভিযোগ করছে যে "শান্তিকামী হিন্দুদের বিরুদ্ধে ইসলামপন্থীদের প্রচারণার তিনি অংশ নিচ্ছেন।"

টুইটারে একজন মন্তব্য করেছেন, "কোয়ান্টিকোর কাহিনী লিখতে গিয়ে আপনি যে লিখেছেন যে 'ভারতীয়রাই হামলার পরিকল্পনাকারী' - তখন কি আপনার ফ্যান্টাসি কল্পনার সীমা ছাড়িয়ে গিয়েছিল? আপনার মনের গভীরে যে পক্ষপাতিত্ব, ঘৃণা, হিন্দু-বিরোধী মনোভাব এবং ইসলামের পক্ষ নেয়ার বিষয়গুলো প্রোথিত আছে, সেকারণেই কি এরকম লিখেছেন?"

শর্বরী জোহরা আহমেদ বলেছেন, তিনি আশা করছিলেন যে যখন তারা জানতে পারবে এই পর্বটির সাথে তার কোন সম্পর্ক নেই, তখন তারা হয়তো চুপ করে যাবেন। কিন্তু সেরকম কিছু হয়নি।

তিনি বলেন, "আক্রমণের মাত্রা খুব দ্রুতই বেড়েছে। এসব এতোই হিংস্র হয়ে উঠেছে যে যারা আমাকে সমর্থন করছেন তাদেরকেও তারা সহিংসতা ও ধর্ষণের হুমকি দিচ্ছে।"

তিনি বলছেন, যারা তাকে আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে তারা তাকে ভারত-বিরোধী এবং হিন্দু-বিরোধী প্রচারণায় একজন মুসলিম এজেন্ট হিসেবে দেখছে।"

"তারা গুগলে সার্চ করে অথবা স্ক্রিনে যাদের নাম লেখা থাকে সেই তালিকা দেখে জেনে নিতে পারেন যে আসল সত্যটা কী।"

'দ্য ব্লাড অফ রোমিও' নামের এই পর্বটি প্রচারিত হয়েছিল ১ জুন যেখানে দেখা গেছে অ্যালেক্স পারিশ নামের প্রধান চরিত্রটি একটি সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনাকে নস্যাৎ করে দিয়েছেন। ওই এজেন্টের চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রিয়াঙ্কা চোপড়া।

কাশ্মীরের উপর এক সম্মেলনের আগে এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল এবং কাহিনীতে দেখানো হয়েছে যে আসলে কয়েকজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী এই পরিকল্পনা করেছিলেন কিন্তু তারা দোষ দিতে চেয়েছিলেন পাকিস্তানিদের।

তীব্র প্রতিক্রিয়ার পর এই থ্রিলারের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান এবিসি এবং প্রিয়াঙ্কা চোপড়া দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। এবিসি থেকে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার পক্ষে বক্তব্য দেয়া হলেও শর্বরী জোহরা আহমেদের বেলাতে তারা কিছু বলেনি।

সিরিজের স্ক্রিপ্ট লেখার সাথে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার দুঃখ প্রকাশ করায় বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এই আমেরিকান লেখক হতাশ হয়েছেন। তিনি নিজেও এর আগে কট্টর ইসলামের উত্থান এবং বাংলাদেশে হিন্দুদের উপর আক্রমণের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন।

"আমার মনে হয়েছে যে তারা (এবিসি ও চোপড়া) যারা ভয় দেখাচ্ছিল তাদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছে।"


আরো পড়ুন :
প্রিয়াঙ্কাকে পাকিস্তানে পাঠানোর দাবি, নেপথ্য কারণ

যুক্তরাষ্ট্রের একটি টিভি সিরিজের কাহিনীকে কেন্দ্র করে ক্ষোভের সৃষ্টি হলে ভারতীয় অভিনেত্রী ও বলিউড সুপারস্টার প্রিয়াঙ্কা চোপড়া তার ভক্তদের কাছে ক্ষমা চেয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছেন।

গোয়েন্দা কাহিনীর উপর ভিত্তি করে তৈরি থ্রিলার কোয়ান্টিকোর সাম্প্রতিক একটি পর্বে দেখা যায় এর প্রধান চরিত্র, যাতে প্রিয়াঙ্কা চোপড়া অভিনয় করছেন, কাশ্মীরের উপর অনুষ্ঠেয় এক সম্মেলনের আগে, কয়েকজন হিন্দু জাতীয়তাবাদীর একটি হামলা পরিকল্পনা নস্যাৎ করে দিয়েছেন।

এই কাহিনীতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন তার বহু ভারতীয় ভক্ত এবং তাকে অনলাইনে আক্রমণ করেছেন।

এর জবাবে মিস চোপড়া টুইট বার্তায় নিজেকে একজন 'গর্বিত ভারতীয়' বলে উল্লেখ করেছেন। এবং সিরিজের কাহিনীর কারণে কারো মনে আঘাত লেগে থাকলে তার জন্যে দুঃখও প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেছেন, কাউকে আঘাত করা তার কোন উদ্দেশ্য ছিল না।

'ব্লাড অফ রোমিও' বা 'রোমিওর রক্ত' নামের এই পর্বটি প্রচারিত হয় গত ১ জুন। এই পর্বে দেখা যায় যে নাটকের প্রধান চরিত্র, যিনি একজন এফবিআই গোয়েন্দা এলেক্স পারিশ, তিনি একটি সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিয়েছেন।

এই পরিকল্পনা করা হয়েছিল কাশ্মীর সম্মেলনের আগে এবং প্রিয়াঙ্কা চোপড়া যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন তিনি আবিষ্কার করেন যে আসলে পাকিস্তানিরা নয়, বরং কয়েকজন হিন্দু জাতীয়তাবাদী মিলে এই হামলার পরিকল্পনা করেছিলেন। এবং হামলার জন্যে পাকিস্তানিদের দায়ী করার জন্যে তারা আক্রমণকারীরা একটি নাটকও সাজিয়েছিল।

ভারত ও পাকিস্তান দুটো দেশই দাবি করে কাশ্মীর তাদের অংশ এবং এই অঞ্চলকে কেন্দ্র করে ১৯৪৭ সালের পর পরমাণু শক্তিধর এই দুটি দেশ দু'বার যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে।

কোয়ান্টিকোর এই পর্বটি প্রচারিত হওয়ার পর অনলাইনে প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করা হয়। অনেকে তাকে উল্লেখ করেন ভারতের জন্যে 'অপমান', 'লজ্জা' হিসেবে আবার অনেকেই অভিযোগ করেন যে সিরিজের এই পর্বটিতে হিন্দুদের উপর শুধু নয়, এর মাধ্যমে ভারতের উপরেও আক্রমণ করা হয়েছে।

প্রতারক, দেশদ্রোহী উল্লেখ করে তাকে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়ার কথাও বলেছেন কেউ কেউ । টুইটারে একজন লিখেছেন, "প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার পাসপোর্ট বাতিল করা হোক। তাকে যেন ভারতে ঢুকতে দেয়া না হয়...আপনি হলিউডে থাকুন, পাকিস্তানিদের জুতা চাটতে থাকুন।"

আবার অনেকে প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার পক্ষেও বলেছেন। তাদের অনেকে বলেছেন, এটা শুধু টেলিভিশনের একটি নাটক যার সাথে বাস্তবের কোন সম্পর্ক নেই। "এ রকম একটি কাল্পনিক কাহিনীর জন্যে আপনি কেন ক্ষমা চাইছেন?" প্রশ্ন করেছেন একজন টুইটার ব্যবহারকারী।

দুঃখ প্রকাশের পরেও প্রিয়াঙ্কা চোপড়ার প্রতি কারো কারো ক্ষোভ একটুও কমেনি। তারা বলছে, "আপনি কাহিনীটি পড়েছেন, রিহার্স করেছেন তারপর বহুদিন ধরে এটাতে অভিনয় করেছেন। তারপরেও এরকম ভুল হয় কীভাবে?"

এর আগেও সোশাল মিডিয়াতে প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে আক্রমণ করা হয়েছে।
শুধু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই নয়, রাজধানী দিল্লিতেও এর প্রতিবাদে হিন্দু কট্টরপন্থীরা রাস্তায় বিক্ষোভ করেছে।

এই সিরিজের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এবিসি 'এরকম একটি জটিল রাজনৈতিক ইস্যুতে' কাহিনী তৈরি করার কারণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন তবে তারা এজন্যে মিস চোপরাকে আক্রমণ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেছে, এই কাহিনী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া লিখেননি, এই পর্বটি পরিচালনাও করেননি, সিরিজের কাহিনী তৈরির পেছনে তার কোনো ভূমিকাও ছিল না।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়াকে এর আগেও ভক্তদের দিক থেকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। গত বছর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাথে বৈঠকের সময় তিনি এমন একটি কাপড় পরেছিলেন যাতে তার পা দেখা যাচ্ছিল। সোশাল মিডিয়াতে তখনও তাকে এজন্যে আক্রমণ করা হয়েছিল।

এছাড়াও তিনি যে সম্প্রতি বাংলাদেশে মুসলিম রোহিঙ্গা শরণার্থীদের শিবির দেখতে গিয়েছিলেন তাতেও তার সমালোচনা করা হয়েছে।

প্রিয়াঙ্কা চোপড়া ভারতীয় সিনেমায় অভিনয়ে সাফল্য অর্জন করার পর তিনি আন্তর্জাতিক সিনেমাতেও নাম লিখিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে ৫০টিরও বেশি ভারতীয় ছবিতে অভিনয় করেছেন তিনি।


আরো সংবাদ