২১ জানুয়ারি ২০২০

জিন্নাহর নয়, গান্ধীর ভুল থেকেই...

জিন্নাহকে সব দোষে দোষী করার লোকের অভাব নেই, বিশেষত সাতচল্লিশের পরের জমিদারি হারানো কমিউনিস্টদের চোখে। কিন্তু ঘটনা হলো রামমোহন থেকে গান্ধী-নেহরুর আমল পর্যন্ত এরা সবাই ‘রাষ্ট্র গঠন’ বলতে ‘জাতি গঠন’ বুঝে, অথচ যেখানে জাতি মানে আসলে রাষ্ট্র কখনোই নয়। আবার ‘জাতি’ বলতে যদি কেবল (হিন্দু) ধর্মীয় জাতিবাদ বুঝে, অথচ জাতি ফেলে দিয়ে ব্যাপারটা হলো আসলে সবাই অভেদ নাগরিক এবং সমান নাগরিকের ভিত্তিতে বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র হলো সব কিছু সমাধান। তাহলে গান্ধীর হিন্দু ‘জাতি গঠন ধারণাকে’ অস্বীকার করে ফেলে দেয়া ছাড়া জিন্নাহর উপায় কী ছিল!

তবে ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালের বক্তৃতায় জিন্নাহ বুঝিয়ে রেখে যেতে পেরেছিলেন, তিনি ধর্মীয় স্বাদের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব এই পাকিস্তান কায়েমের লোক জিন্নাহ নন। তবু বাস্তবের পাকিস্তান জিন্নাহর স্বপ্ন হতে পারেনি সেকথাও সত্য। একালের ইমরান খান আবার অনেক কিছুই নতুন চোখে আশা করতে উসকানি দেন। কিন্তু অমিত শাহ? আগে ছিল যেগুলো গান্ধীর হিন্দু ভারতের ভুল। আজ অমিত সেই হিন্দু ভারতের কলঙ্ক হতে রওনা দিয়েছে। বৈষম্যহীনতার সমান নাগরিকই সব কিছুর সমাধান। তবু অমিত শাহরা হিন্দুর স্বার্থ কেবল হিন্দু পরিচয়ের মধ্যে এই মিথ্যা ভিত্তিহীন কথা ছড়িয়ে ভোটবাক্স ভর্তি করতে চাইছেন।

বাসায় চোর পড়লে অনেক সময় পরবর্তী সময়ে চোরকে একটা ধন্যবাদ দিয়ে চুরিতে নিরাপত্তার ফাঁকফোকরগুলোর দিকে নজর ও সংস্কার কাজ শুরু করতে যায় অনেকে। কারণ, চুরিটা না হলে নিরাপত্তার ঘাটতির দিকগুলোতে আমাদের মনোযোগ যেত না। এই বিচারে আমরাও বাংলাদেশ থেকে অমিত শাহকে আমাদের ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের ঘর সুরক্ষার কাজে নামতে পারি। কারণ তিনি আমাদের চিন্তার সীমাবদ্ধতাগুলোর দিকে নজর ফেলতে পরোক্ষে সুযোগ করে দিয়েছেন, যদিও তা আমরা কতটা কাজে লাগাতে পারব তা এখনো একেবারে নিশ্চিত নই আমরা।

ভারতের নাগরিক সংশোধনী বিল ২০১৯ পাসের পর রাষ্ট্রপতির সই নিয়ে এখন চালু হয়ে গেছে। অমিত শাহ কথা স্পষ্ট, ‘মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো’। কিন্তু অমিতবিরোধী কারো কোনো পক্ষ থেকে এর বিপক্ষে কী জবাব দেবে, এর তেমন জোরালো বয়ান দেয়া যায়নি। কেন এটা এমন, কেন?

ব্যাপারটা হলো এত দিনের যে প্রচলিত ভারত, সেখানে কেউ মুসলমান হলে হিন্দুদের পক্ষ থেকে তাকে নাগরিকত্ব না দিতে চাওয়া এমনটাই কি স্বাভাবিক ছিল না? এমন লজিকই তো ভারতের সমাজে এত দিন ধরে ছড়িয়ে রাখা আছে। এটা তো অমিত শাহ হঠাৎ করে বলছেন তা তো না। সে জন্যই তিনি স্পষ্ট করে বলতে পারছেন। আর যারা শুনছেন তাদের কাছেও এটা নতুন, অনভ্যস্ত বা প্রথম মনে হচ্ছে না। তাই তেমন প্রতিরোধমূলক প্রতিক্রিয়াও নেই।

আবার আসাম, ত্রিপুরাসহ নর্থ-ইস্টে যা দাঙ্গা-হাঙ্গামা দেখছি, সেটাও বাংলাদেশের সপক্ষে নয়। অমিতের পক্ষে তো নয়ই। তাহলে? নর্থ-ইস্ট মনে করে অমিতের নতুন নাগরিকত্ব আইনের ফলে এখন নর্থ-ইস্টের লাগোয়া বাংলাদেশের সীমান্তের এপারে বাংলাদেশের হিন্দু যারা আছে, তারা এখন সদলবলে নর্থ-ইস্টের আট রাজ্যে প্রবেশ করে নাগরিকত্ব চাইবে। মূলত এর প্রবল বিরোধিতা করতেই তাদের দাঙ্গা-হাঙ্গামা। আর ত্রিপুরাটা এসব ছাড়াও বাড়তি সেখানের এক-তৃতীয়াংশ পাহাড়িরা আলাদা রাজ্য চাচ্ছে।

অমিত শাহ এই বিল আনার মাধ্যমে জেনে বা না জেনে চাপা পড়ে থাকা দেশভাগের প্রায় সব বিতর্ককে আমাদের সামনে আবার জাহির করে দিয়েছে। এর মূল কারণ নেহরু-গান্ধীর জমানা থেকেই সংবিধানে যা লেখা থাক, রাষ্ট্র নাগরিকে-নাগরিকের মধ্যে ফারাক বা বৈষম্য যে করতে পারে না। এটা যে হারাম তা তো কখনোই বাস্তবায়ন করতে গেছে তা আমরা দেখিনি। কোনো আধুনিক রিপাবলিকদের ভিত্তিমূলক যেসব মূলনীতি এ দিক থেকে ভারতের রাজনীতিতে কখনই ভারত-রাষ্ট্রকে বোঝা বা বোঝানো চেষ্টা করা হয়নি।

যেমন মোদির শাসনের চলতি এই গত ছয় বছরকেই বিচার করতে আমরা পাই- মুসলমানদের ওপর যা খুশি জোর তো করাই যায়, বৈষম্য তো করাই যায়। মোদি-অমিত চাইলেই করতে পারে। তাই কি সারা ভারতবাসী দেখে আসেনি? মুসলমানকে জোর করে জয় শ্রীরাম বলানো অথবা গরু খাওয়ানো, গরু বহন করানো ইত্যাদি অভিযোগে রাস্তায় রাস্তায় তা চেক করতে বিজেপির ভিজিলেন্স পার্টি তো বসানোই যায়, আর বসিয়ে এমন মুসলমানের খোঁজ পেলে তাকে রাস্তাতেই পিটিয়ে মেরে ফেলা যায়- এটাও কি ভারতবাসী দেখেনি?

শুধু তা-ই নয়, এ নিয়ে সারা ভারতে কোথায় মামলা-বিচার কোথায় কিছু হয়নি। সর্বশেষ আবার এমন পিটিয়ে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে যদিও কিন্তু সেটা খুনের না হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যর মামলা বলে। মোদি দ্বিতীয়বারের চলতি সরকারের আনুষ্ঠানিক অবস্থান হলো, ভারতে রাস্তায় পিটিয়ে মারা লিঞ্চিংয়ের কোনো ঘটনাই ঘটেনি, সবই গুজব। আবার আরএসএস নেতা ভগত বলেছেন, পিটিয়ে মারা বা লিঞ্চিং শব্দ ব্যবহার না করতে। সারা ভারতে এভাবে এমনকি সাধারণ নাগরিককে বটেই, এক মুসলমান এমপিকে আর এক হিন্দু এমপি জয় শ্রীরাম বলাতে জোর খাটাতে, জনসমক্ষে তর্ক করতে দেখা গেছে।

মজার কথা হলো এসব নিয়ে কোনো জনস্বার্থবিষয়ক বিরোধ মামলা অথবা আদালতের স্বতঃপ্রণোদিত মামলা বলে কোনো কিছু হতে দেখা যায়নি; বরং সোস্যাল প্রাকটিস বা বয়ান হলো উল্টাটা। যেমন মমতা নাকি মুসলমানদেরকে লাই দিয়ে মাথায় তুলেছেন, তাই পশ্চিমবঙ্গে এদেরকে দাবিয়ে রাখা নাকি দরকার- এটাই ফেসবুক সোস্যাল মিডিয়ায় ডমিনেটিং পারসেপশন।

সারা দুনিয়াতে আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রের একেবারে প্রাইমারি একমতের বৈশিষ্ট্যগুলো হলো-
১. এটা অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র আর এখানে সব নাগরিক সবার অধিকার সমান।
২. নাগরিক মাত্রই রাষ্ট্র বৈষম্যহীনভাবে সকলকে সমান চোখ দেখতে ও আচরণ করতে বাধ্য। তাই এখানে রিপাবলিক রাষ্ট্রের সংশ্লিষ্ট ব্যবহৃত শব্দগুলো হয়- মানবাধিকার, সমানাধিকার, বৈষম্যহীনতা, সাম্য ইত্যাদি। কিন্তু ভারতে? না এখানে সব কিছুর ওপরে এক আজিব শব্দ আছে ‘সাম্প্রদায়িক’। (অথবা একই ধারণায় বিপরীত অর্থে ‘অসাম্প্রদায়িক’।)

প্রথমত, আধুনিক রিপাবলিক রাষ্ট্রচিন্তার সাথে সম্পর্কিত ‘সাম্প্রদায়িকতা’ বলে সংশ্লিষ্ট কোনো শব্দ-ধারণা নেই; কিন্তু ভারতে এটা আছে। আর এটা হলো মূলত হিন্দু জনগোষ্ঠীর দিক থেকে বলা শব্দ। তারা যাকে বা যে আচরণ বা রীতিকে সাম্প্রদায়িক বলে দায়ী করবে, সেটাই সাম্প্রদায়িক। সাধারণত মুসলমানদের অভিযুক্ত করতে তাদের এই সংজ্ঞা তারা ব্যবহার করে। যেমন ইসলামী চিহ্ন প্রকাশ হয়ে পড়ে (যেমন টুপি) এমন কোনো কিছু দেখিয়ে রাস্তায় চলাফেরা করা যাবে না। এটা নাকি সাম্প্রদায়িক। কিন্তু সকালে পূজা-আর্চনা করে কপালে ফোঁটা বা ড্রয়িং তিলক এঁকে কাজে বা সংসদেও যাওয়া যাবে।

সারা দুনিয়াতে সম্প্রদায় বা কমিউনিটি কথাটা খুবই ইতিবাচক। যেমন সমাজের জন্য যে কাজ করে, স্বেচ্ছাশ্রম দেয় সে সম্মানিত ‘কমিউনিটি ওয়ার্কার’। কিন্তু ভারতে কমিউনিটির রুট শব্দ কমিউন এটা ব্যবহার করা হয় নেগেটিভ অর্থে। কমিউন থেকে ‘কমিউনাল’ বলে আর এক শব্দ বের করে আনা হয়েছে যেটা ইংরেজিতে ভারতের অর্থে অর্থ করে নিয়েছে তা নেই। অথচ এটাই ভারতে সবচেয়ে ঘৃণিত ও নেতিশব্দ। সাধারণত এটা মুসলমানদের ওপর ব্যবহার করা হয়।

আসল কথাটা হলো, ব্রিটিশ আমল থেকেই হিন্দু-জমিদারি ক্ষমতায় (এর তৎপরতা কার্যক্রমের শুরু মোটা দাগে বললে ১৮০০ সাল থেকে যেখানে তখন ১৭৯৩ সাল থেকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের জমিদারি আইন চালু করা হয়েছিল) এর যে সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য তৈরি করেছিল, তা দিয়ে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছিল সে সময়ের কোনো শব্দের কী অর্থ হবে। বিশেষ করে তাদের সাজানো সেই আধিপত্য যেন মুসলমানরা ভঙ্গ না করে সেই লক্ষ্য সাজানো সামাজিক অনুশাসন। মুসলমানরা ছিল সেই সময়ের সামাজিক স্তরভেদে নিচে ধরে নেয়া স্তরেরও সবার নিচের স্তরে বলে, এটাই মনে করানো ছিল।

মনে রাখতে হবে, মোটা দাগে ১৮০০ সাল থেকে পরের দেড় শ’ বছর ধরে এই হিন্দু জমিদারি-কেন্দ্রিক সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্য এটাই প্রজা নিয়ন্ত্রণের বয়ান ও এর সংজ্ঞার নির্ধারক ছিল। কৃষি সে সমাজের মূল অর্থনৈতিক কার্যক্রম। তাই কৃষি মালিকানা ব্যবস্থা চিরস্থায়ী জমি দেয়ার বন্দোবস্ত, যা আমরা জমিদারি বলি বুঝি আর বেশির ভাগ জমিদার ছিল হিন্দু, মানে মূল রুলিং ক্লাস। এ কারণে তাদের এটাই ছিল সব কিছুর ওপর ডমিনেটিং ফ্যাক্টর, সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের উৎপত্তি এখান থেকেই।

এই আধিপত্যেরই আবার যা কিছু অপছন্দনীয় বা যা তার নিজ ক্ষমতাকে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ করতে পারে অথবা যাকে (মুসলমান) সে আগাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়, সেসব কিছুই ‘সাম্প্রদায়িক’। মানে তার সাজানো রাজত্ব এর ভেতরে একটা ভিন্ন ‘সম্প্রদায়’ যেন যে তার সাজানো অর্ডার বিনষ্ট করতে চায়। এমন সব কিছুকে সে আগাম ‘সাম্প্রদায়িক’ বলে, এই অধিপতি শ্রেণী নিজের সম্ভাব্য শত্রুকে চিনিয়ে রাখে। অনেকটা হিন্দু-জমিদারের নিজের মতো করে তার সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের সাজানো বাগান এটা সম্ভাব্য আগামীতে যে’জন তছনছ করতে পারে, সেই হলো সাম্প্রদায়িক। এই হলো সাম্প্রদায়িকতার আসল সংজ্ঞা ও উৎপত্তি।

এ কারণে ইংরেজি ‘কমিউনাল’ শব্দটা ইংলিশ সমাজে কেবল ইতিবাচক অর্থে সমাজ-সম্প্রদায় বুঝাতে এর ব্যবহারটাই কেবল দেখতে পাবেন। বিপরীতে কেবল ভারতীয়রাই শব্দটাকে নেতিবাচক ও বিশেষ ভিন্ন অর্থে ব্যবহার করে। এই সোজা মানেটা হলো, ১৮০০ বা উনিশ শতকের শুরু থেকেই যে হিন্দু জমিদারি সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক শ্রেণী আধিপত্যের তৎপরতা শুরু হয়েছিল, এরই স্বার্থের বিরোধী যেকোনো কিছুই (সাধারণত মুসলমান) বোঝাতে ‘কমিউনাল’ শব্দ ব্যবহার শুরু হতে দেখা গেছিল।

এর পাশাপাশি আমরা এখন রামমোহনের (১৭৭২-১৮৩৩) জমানায় যাবো। কেন রামমোহন? ভারতের প্রগতিবাদী বিশেষত সেকালের খোদ কমিউনিস্ট পার্টির চোখে রাজা রামমোহন রায় হলেন ‘বেঙ্গল রেনেসাঁ’ এর আদিগুরু। মানে যিনি ব্রিটিশদের হাত ধরে ইন্ডিয়াতে আসা ‘ইউরোপীয় রেনেসাঁ’কে সবার আগে ভারতে পরিচয় করান, এর চর্চা ও প্রয়োগ শুরু করেছিলেন, সেই আদি শুরুকর্তা। রামমোহন সুনির্দিষ্ট একাজটা শুরু করেছিলেন ১৮১৫ সালে, তার ‘আত্মীয় সভা’ নামে সামাজিক সংগাঠনিক তৎপরতায়। এর পাশাপাশি আমাদের মনে রাখতে হবে, ১৮৩৫ সালকে যখন ব্রিটিশরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তারা ‘ইন্ডিয়ান এডুকেশন অ্যাক্ট ১৮৩৫’ চালু করবে।

এটাকে এডুকেশন অ্যাক্ট বলে বুঝতে পারি অথবা এটাই হলো ব্রিটিশ ‘কলোনি প্রশাসন’ এর শুরু করার আইন বলে বুঝতে পারি। এটাই ভারতীয় নেটিভ বা স্থানীয়দেরকেই ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষায় শিক্ষিত করে কলোনি প্রশাসন সাজিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত মনে করেও পাঠ করা যেতে পারে। অর্থাৎ ইংল্যান্ড থেকে শিক্ষিত ব্রিটিশদের ব্যয়বহুল পথে তাদের এখানে এনে নেয়া হয় না। স্থানীয় নেটিভদের শিক্ষিত করে নেয়া এক প্রশাসন গড়তে হবে। আর বলাই বাহুল্য, সেটা আধুনিক শিক্ষা মানে রেনেসাঁর রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্রভাব ফেলার শুরু হয়েছিল এখান থেকেই।

রামমোহনের গুরুত্ব হলো তিনি ব্রিটিশ মাস্টারের অনুকরণে ব্রিটিশ-ভারতে, আমাদেরকে একটা আধুনিক রাষ্ট্র করতে হবে প্রথম তিনিই এমন গড়ার স্বপ্ন দেখে ও এঁকেছিলেন। আবার এতে তার করা সব ভুল বা ধারণায় ঘাটতি বা তাতে অস্পষ্টতায় বিপথে যাওয়া এমন ধারণায় সব খামতির উৎপত্তিও তিনি। যদিও আধুনিক প্রগতিবাদীরা বা পরবর্তীকালে বিশ শতকে এসে কমিউনিস্টরাও রামমোহনকে নেতা মানেন।

কিন্তু তিনি প্রথম নেতা হলেও আধিনিক রিপাবলিক ধারণার মুখ্য বৈশিষ্ট্য নাগরিক অধিকারভিত্তিক রাষ্ট্র, নাগরিক মাত্রই অধিকার সমান এক বৈষম্যহীন সাম্য এসব মৌলিক ধারণাকে তিনি আমল করতে পেরেছেন, এমন চিহ্ন দেখা যায় না। এর কারণ কী?

মূল কারণ হলো রামমোহনদের কাছে কাজটা হওয়ার কথা ছিল রাষ্ট্রগঠন। কিন্তু তারা বুঝেছিলেন ‘জাতি গঠন’ বলে। খেয়াল করলে দেখা যাবে, তারা রাষ্ট্র কথাটাই ব্যবহার করতেন না। এর বদলে ব্যাপারটাকে জাতি বলে বুঝতে চাইতেন। এই হলো প্রথম ভুল। তবে পরের ভুলটা আরো মারাত্মক। জাতি গঠন বা জাতীয়তাবাদ বলতে তারা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ বুঝতেন।

এই একই বুঝ বজায় ছিল মহাত্মা গান্ধী পর্যন্ত। অর্থাৎ আধুনিক ভারত বলতে এক ভারতীয় জাতি গঠন করা বুঝতেন। অর্থাৎ হিন্দু জাতীয়তাবাদ গড়া বুঝতেন। ঠিক এ কারণেই তাদের কাম্য রাষ্ট্র বৈষম্যহীন হলো কি না, নাগরিক মাত্রই সমান অধিকারের রাষ্ট্র হলো কি না- এটা তাদের অ্যাজেন্ডায় ছিল না।

উল্টো এটা ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের জাতি গঠন বলে আধুনিক রাষ্ট্রকে বোঝার কারণে, মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো, কথাগুলো এখনো অবলীলায় উচ্চারিত হতে পারছে।

তাহলে রামমোহন থেকে গান্ধী সবার কাছেই ভারত রাষ্ট্র মানে কোনো বৈষম্যহীন নাগরিক রাষ্ট্র নয়, এ দিক থেকে রাষ্ট্র বোঝাই হয়নি।
দ্বিতীয়ত, বাস্তবের যে ভারত রামমোহন থেকে গান্ধী এরা দেখেছিলেন এটা আবার সাম্প্রদায়িক-অসাম্প্রদায়িক বুঝের হিন্দু জমিদারের সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক আধিপত্যের রাষ্ট্র।

এ কারণে যারাই রাষ্ট্রের মধ্যে ‘অসাম্প্রদায়িকতা’ বৈশিষ্ট্য খুঁজে তাদের কাছে নাগরিক অধিকারে বৈষম্যহীনতা অর্জন কোনো কাম্য বিষয়ই নয়।

অতএব, গান্ধী-নেহরুরা যে ভারতের জন্ম দিয়ে গেছেন সেখানেই মোদি-অমিতের হিন্দুত্বের রাষ্ট্র কায়েমের উপযুক্ত জায়গা। অবলীলায় ‘মুসলিমদের কেন নাগরিকত্ব দেবো’ বলতে পারার মতো দেশ-রাষ্ট্র। নাগরিকের আকাক্সক্ষার ভেতরেও নাগরিক বৈষম্যহীনতার আকাক্সক্ষা নাই। একই কারণে সুপ্রিম কোর্টও নেই। নির্বাচন কমিশনের কাছেও নেই। সে কারণে বিজেপির মতো দলও অনুমোদন দিয়ে দেয় নির্বাচন কমিশন। অথচ যে রাজনৈতিক দলের চিন্তা বৈষম্যমূলক নাগরিক অধিকারের সেই দল তো অনুমোদন বা রেজিস্ট্রেশন পাওয়ারই কথা হয়।

কিন্তু তাই বলে কি নাগরিক বৈষম্যহীনতা করা যাবে না- এ কথা ভারতের কনস্টিটিউশনে লেখা নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু আছে কনস্টিটিউশনে লিখা থাকতে হয় তাই। এর ইমপিলিকেশন কী, কেন থাকতে হয়, গুরুত্ব কী সেসব দিক থেকে কিছুই বোঝা হয়নি। ধর্মীয় জাতিবাদী এক জাতিরাষ্ট্র গঠন এখানে হয়েছে কি না, সেটাই ছিল মূল বিবেচ্য।

তাহলে তারা হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী কেন? এটা যদি কেউ দেখিয়ে প্রশ্ন তুলে তখন তারা আড়াল খুঁজে বলে কেন তারা তো অসাম্প্রদায়িক। অর্থাৎ এটা ‘অসম্প্রদায়িক’ ও ‘হিন্দু ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী’ ভারত, কাজেই কোনো অসুবিধাই নেই। আচ্ছা রামমোহনের রাষ্ট্রচিন্তা যে জাতীয়তাবাদের চিন্তা, আর সেই জাতিবাদ যে ধর্মীয় এই দাবির প্রমাণ কী? সেই প্রমাণ হলো তার ‘ব্রাহ্মধর্ম’ চালু করার তাগিদ। সারা ভারতকে এক ব্রাহ্মধর্মের অনুসারী করে এরপর ব্রাহ্মধর্মীয় জাতীয়তাবাদ ভারত কায়েম এই ছিল তার লক্ষ্য। পরবর্তী সময়ে সবাইকে ব্রাহ্ম করা বাস্তবায়ন করা যায়নি বলে গান্ধী পর্যন্ত এসে সবাই মেনে নেয় যে, ওই স্থলে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতই তাদের কাম্য।

কিন্তু এই বুঝের ভিত্তিতে ১৮৮৫ সালে এসে কংগ্রেস দল গঠন করার পরে এই প্রশ্ন জোরালো হতে থাকে যে, হিন্দু জাতীয়তাবাদ মুসলমানরা মেনে নেবে কেন? এর জবাব গান্ধীর কাছেও ছিল না। তিনি বড়জোর হিন্দু কথাটা ধর্মীয় না কালচারাল, এমন কথা বলে পাশ কাটাতে চাইলেন। এ ছাড়া উল্টা গান্ধীর নিজের বুঝের হিন্দু ধর্ম বলতে সেটা কেমন এটাকেই তিনি ‘হিন্দুইজম’ বলে প্রায় ৪২টা বক্তৃতা দিয়েছেন। অথচ গান্ধীর কাছে মুসলমানরা হিন্দুইজম কী, তা শিখতে যাবে কেন? এমনকি অনেক হিন্দুও কেন তাকেই পছন্দ করবে, এই প্রশ্ন উঠবে। এটা তো কোন সাম্যের রাজনৈতিক কাজ না। এগুলো আরো বড় প্রমাণ যে নাগরিক অধিকারের রাষ্ট্র, নাগরিক বৈষম্যহীনতার রাষ্ট্র কায়েম- এসবে গান্ধী বা নেহরুর কখনই আগ্রহ ছিল না, তারা বা তাদের ভারত এতা কখনই বুঝতেই পারেনি।

চলতি নাগরিকত্ব বিলের তর্কে জিন্নাহ এখন সবারই অভিযোগ দায়ের করার সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গা হয়ে উঠেছে। কংগ্রেস পাকিস্তানকে আলাদা হতে দিয়ে দ্বিজাতি বাস্তবায়ন হতে দিয়েছে অমিত শাহের এই ছিল অভিযোগ, এর জবাবে বলা কংগ্রেসের আইনজীবী কাপিল সিবালের বক্তব্য ছিল, আম্বেদকারের বরাতে যে, জিন্নাহ ও সাভারকার (হিন্দু মহাসভা) দু’জনই ধর্মের ভিত্তিতে হিন্দু-মুসলমান এ দুই জাতির ধারণার অনুসারী।

তাহলে জিন্নাহই কি সব কিছুর জন্য দায়ী?
প্রশ্নই ওঠে না। ওপরে রামমোহন থেকে গান্ধী পর্যন্ত সবাই রাষ্ট্র বলতে জাতি বুঝতেন। আবার জাতি বলতে ধর্মীয় জাতি বুঝতেন। এই ছিল তাদের হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত এর ধারণা।

কিন্তু এই হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত প্রসঙ্গে নিজেদের আপত্তির কারণেই ২০ বছরের মধ্যেই ১৯০৬ সালে মুসলিম লীগ গঠিত হয়ে। জিন্নাহও একই প্রশ্ন তুলে ১৯১৪ সালের দিকে কংগ্রেস ত্যাগ করে মুসলিম লিগে যোগ দেন।

কিন্তু কংগ্রেস তার ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত’ এই নীতি গ্রহণ করাতে মুসলিম লীগও যে জাতিবাদ করতে গেল, সেটা মুসলিম জাতীয়তাবাদ হয়ে যেতে বাধ্য হয়ে যায়। এ ছাড়া প্রতিযোগী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে পেরে উঠতে গিয়ে ‘মুসলমানের ভিত্তিতে আলাদা এক জাতি’ এমন কথা বেশি স্পষ্ট প্রধান করে বলতে হয়েছিল। লীগ এ বক্তব্যের পক্ষে বিস্তর সাফাই গাইলে অনেকগুলো সম্মেলন হয়েছিল, যেখানে কবি ইকবালের সাফাই বক্তব্যও আমরা দেখব।

আর বিপরীতে এসব প্রশ্নের ঠেলায় কংগ্রেস ততই ক্রমশ কৌশল গ্রহণ করে যে, তারা যে কৌশলগতভাবে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারত চায় এ কথা মুখে কোথাও স্বীকার করবে না। এর ফলে দ্বিজাতিতত্ত্ব বা ধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তাবাদ চাওয়ার সব দায় একা জিন্নাহর আর এ জন্যই অখণ্ড ভারত রাখা যায়নি- ভারতের সেই প্রপাগান্ডা সেই থেকে আজো প্রবল। একালে মানে ১৯৪৭ সালের পরে বিশেষ করে এই প্রপাগান্ডার দায় নিয়েছে কমিউনিস্টরা। যদিও তাদের ভাষ্যের প্রধান ফোকাস হলো, রাষ্ট্রের সাথে ধর্মকে মেশানো খুবই গর্হিত কাজ,কাজেই মূল পাপে পাপী হলো জিন্নাহ।

এককথায় বললে এটা অবিচার। সম্পতি পাকিস্তানের এক সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট সব তথ্য সাবুদ জড়ো করে একটা আর্টিক্যাল লিখেছেন ভারতের এক পত্রিকায়, যার বড় একটা অংশ আবার বিবিসির রিপোর্ট। যার সার কথা জিন্নাহর ১১ আগস্ট ১৯৪৭ সালে প্রথম গণপরিষদের উদ্বোধনী বক্তৃতার আগে যেখানে পাকিস্তানের যোগেন মণ্ডল সভাপতিত্ব করেন আর ওই সভা থেকেই যোগেন মণ্ডলকে প্রথম আইনমন্ত্রী বানানো হয়েছিল। সেই সভায় জিন্নাহর বক্তৃতা সেটা। বিশেষ করে নাগরিকত্ব সম্পর্কে জিন্নাহর মন্তব্য গুরুত্বপূর্ণ। এর সবচেয়ে মৌলিক অংশটা নিচে বাংলায় অনুবাদ করে দেয়া হলো :

‘আমরা একটা এমন দিন শুরু করতে যাচ্ছি- যেখানে আজ থেকে কোনো বৈষম্য, সম্প্রদায়গত ভেদাভেদ, জাত চিহ্ন বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি নিয়ে কোনো ভেদাভেদ গণ্য করা হবে না। আমরা সবাই নাগরিক এবং সমান নাগরিক- এই নাগরিক সাম্যের মৌলিক নীতিতে এক রাষ্ট্রে আমাদের দিন শুরু করতে যাচ্ছি’।

কিন্তু সবখানেই যে সমস্যাটা থাকে তা হলো, কথাটা বলা আর বাস্তবে তা বাস্তবায়ন করে দেখানো এর ফারাক সেটা পাকিস্তানের বেলাতেও আছে। কিন্তু অন্য সবার চেয়ে জিন্নাহ এই জায়গাতেই ফারাক যে তিনি জীবদ্দশাতেই বৈষম্যহীনতা বা নাগরিক সাম্যের নীতির প্রতি তার প্রবল সমর্থন তিনি উচ্চারণ করে যেতে পেরেছিলেন।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ