২১ জানুয়ারি ২০২০

অর্থ অনর্থের মূল

-

পার্থিব জীবনে অর্থ অত্যাবশ্যকীয় বস্তু। এর প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। জীবনধারণের জন্য মানুষকে অর্থের ওপর নির্ভর করতে হয়। আমৃত্যু প্রয়োজন মেটায় বলে অর্থ ছাড়া জীবনকে অনেকেই অর্থহীন মনে করেন। প্রতিপত্তি ও সম্মান বর্তমান সমাজে অর্থের মাপকাঠিতে নির্ণীত হওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয় মাত্রায় বেড়েছে। তাই মানুষের অর্থ অর্জনের চেষ্টার কমতি নেই। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই অর্থের চাহিদা আছে। তবে জীবন চালাতে কতটুকু অর্থ দরকার সেটি তর্কসাপেক্ষ, অমীমাংসিত। আপেক্ষিকও বটে, যা মূলত জীবন-দর্শনের ওপর নির্ভরশীল। কেউ অল্পে তুষ্ট। কারো খাই খাই ভাব মেটে না। তার জীবন-দর্শন- ‘দুনিয়া টাকার বশ’। পৃথিবীতে অর্থ বা ঐশ্বর্য বেশির ভাগ মানুষের একান্ত কামনা-বাসনার বিষয়। অর্থ পেতে কমতি নেই মানুষের আরাধনার। ধনসম্পদের মোহ উপেক্ষা করতে পারেন, এমন লোকের সংখ্যা হাতেগোনা। অর্থের জন্যই মানুষ প্রতিনিয়ত জীবন-সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়। কাক্সিক্ষত অর্থের জন্য কঠোর পরিশ্রম করে।

তবে অতিরিক্ত অর্থের কোপানলে অনেকে ধ্বংস হয়ে যায়। ছেলেবেলায় পাঠ্যবইয়ে একটা ভাবসম্প্রসারণ ছিল- ‘অর্থই অনর্থের মূল’। সত্যি বলতে কী, আমরা কেউই সেই আপ্তবাক্যটি অন্তরে ধারণ করতে পারিনি। হয়তো মুখস্থ করে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে এসেছি, কিন্তু বাস্তব জীবনে প্রতিফলন ঘটেনি কখনোই। প্রাচীন ভারতের অর্থশাস্ত্রের পণ্ডিত চাণক্যের সেই কথায় আমাদের আস্থা। চাণক্যের ভাষায়- ‘অধিক জ্ঞানচর্চা দারিদ্র্য ডেকে আনে।’ তাই জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়তে আমাদের অনীহা। চাণক্যের বাক্যকে তত্ত্বীয় ভিত্তি ধরে বর্তমানে ‘সুখের লাগিয়া’ আমরা পাগলের মতো অর্থ, মানে- টাকা কামানোর পেছনে ছুটছি। বেপরোয়া গতিতে ছুটছি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে। আগপিছ না ভেবেই সবাই দৌড়াচ্ছেন টাকার পিছে। আমাদের সমাজের সবাই ওই অর্থের পেছনেই ছুটে বেড়াই, যে অর্থের কারণে সমাজে মারামারি আর হানাহানি হয়। আমাদের জীবনের সব কিছু এখনো সেই অর্থ ঘিরেই আবর্তিত। আমরা অর্থের মোহ থেকে বেরিয়ে আসতে পারিনি।

মানুষের লোভ বলে যে প্রবল শত্রু রয়েছে, সেটিই অর্থের প্রতি মানুষকে লোভাতুর করে তোলে। অর্থলোভই বনি আদমকে মানবিকতা থেকে বিচ্যুত করে পাশবিকতার সর্বনাশা পথে ঠেলে দেয়। অর্থ যেমন মানুষের সুখ-শান্তি, মর্যাদা, প্রতিপত্তি সব কিছুর মূলে কাজ করে তেমনি হানাহানি, প্রতিহিংসা, অশান্তি তথা সব অপকর্মের মূলেও কাজ করে। অর্থের লোভেই মানুষ নীতিবর্জিত কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়। অর্থই আপনজনের ভালোবাসায় চিড় ধরায়। স্বামী-স্ত্রীর সম্পকোচ্ছেদ হয়, বন্ধুতে বন্ধুতে বিচ্ছেদ, জাতি-জাতিতে হানাহানি ও যুদ্ধবিগ্রহের সৃষ্টি করে। অর্থ মানবজীবনে অপরিহার্য হলেও এর যথাযথ ব্যবহার না হলে ব্যক্তি বা সমাজ জীবনে নেমে আসতে পারে ঘোর দুর্দিন। জাতীয় জীবনে বয়ে আনতে পারে অকল্যাণ। অর্থ উপার্জনের পথ যদি বৈধ না হয় কিংবা অন্যায় স্বার্থ হাসিলে অপব্যবহার হয়; হীনস্বার্থে যদি ব্যক্তিগত বা জাতীয় সম্পদের অপচয় করা হয় তাহলে তা সামগ্রিক জীবনে বিরাট ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। জগতের যাবতীয় অনাসৃষ্টি, অঘটন, বিশৃঙ্খলা সব কিছুর মূলেই অর্থ। এটি এমন এক উপাদান, যার নেশায় মানুষ নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতম কাজ করতে দ্বিধা করে না। অর্থের নেশায় চিন্তা-চেতনা, আচার-ব্যবহার, কাজকর্ম সব কিছুই অর্থমুখী হয়ে ওঠে। অর্থের জন্য মানুষ হেন কর্ম নেই, যা করতে কুণ্ঠা বোধ করে। অর্থের মোহে পড়ে মানুষ নীতি, চরিত্র, বিবেক বিসর্জন দেয়। এর অযাচিত বা অপব্যবহার ধ্বংসই ডেকে আনে, অর্থ হয়ে ওঠে সব অশান্তির উৎস।

ভোগবাদী দর্শনের মূল কথা- বেশি অর্থে বেশি সুখ। এমন বিশ্বাসে সমকালীন বিশ্বের মানুষ লোভী হয়ে অর্থ উপার্জনের পথে দ্রুতগামী ঘোড়ার মতো ধাবমান। আগেও যে এই প্রবণতা ছিল না তা নয়, কিন্তু ইদানীং তা তীব্রতর হয়েছে। ফলে অন্যের ওপর অত্যাচার, অনাচার আর দুর্নীতি করে; দুর্বলকে শোষণ আর ঠকিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলতে অনেকে মরিয়া। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রযন্ত্রের কোনো পক্ষ যদি একটু ‘আলগি’ মানে মদদ দেয়, তা হলে তো সোনায় সোহাগা। যে কেউ রাতারাতি হয়ে উঠতে পারে ‘ধনকুবের’। এমন অর্থলোভীর কর্মকাণ্ডই সমাজে জন্ম দেয় নানা সমস্যার। সমাজে জন্ম নেয় যত অনাসৃষ্টি। সাম্প্রতিক সময়ে জুয়া, ক্যাসিনো, মাদক আর চোরা কারবারি নামক বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে সরকারকে চালাতে হয় ‘শুদ্ধি অভিযান’।

প্রয়োজনের অতিরিক্ত টাকা কামানোর বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগ উত্তর ও দক্ষিণের ত্রিবার্ষিক সম্মেলনের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন, ‘আসলে টাকা বানানোটা একটা রোগ, এটাও একটা অসুস্থতা। একবার টাকা বানাতে থাকলে তার শুধু বানাতেই ইচ্ছে করে। তার ছেলেমেয়ে বিপথে যাবে, পড়াশোনা নষ্ট হবে, তারা মাদকাসক্ত হবে, সেটা দেখারও সময় নাই। টাকার পেছনে ছুটছে তো ছুটছেই। আর নিজের পরিবার ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে।’ ( প্রথম আলো, ১ ডিসেম্বর ২০১৯)।

সম্পদের প্রতি মাত্রাতিরিক্ত আসক্তি মানুষকে পশুত্বের মোড়কে আবৃত করে। সে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্বার্থকে বাদ দিয়ে নিজ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। জগতের সব অপকর্মের পেছনে অর্থনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয় জড়িত। অর্থই মানুষকে কুপথের দিকে ধাবিত করে। শিক্ষা, সুষ্ঠু, সুন্দর, সুশৃঙ্খল ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য অর্থের প্রয়োজনীয়তা আছে বটে, তবে সেই অর্থই আবার অনাসৃষ্টি, অশান্তি ও হিংসার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অর্থসম্পদ নিয়ে আল কুরআনে বলা হয়েছে, ‘মানুষ কখনো ধনসম্পদ চাইতে ক্লান্ত বোধ করে না।’ (৪১ নম্বর সূরা; আয়াত নম্বর : ৪৯)। এর পেছনের একটি কারণ এমন হতে পারে- ক্ষণস্থায়ী দুনিয়াকে যে নিজের আশ্রয়স্থল বানিয়ে নেয়; তখন ধনসম্পদই তার একমাত্র আরাধ্য, ধ্যান-জ্ঞান। পরবর্তী জীবন অর্থাৎ পরকাল তার কাছে তুচ্ছ। ফলে টাকা কামানোর দুরারোগ্য অসুখ তাকে পেয়ে বসে। সেখানে ন্যায়-অন্যায়ের ভেদরেখা মুছে যায়। এমন চরিত্রের লোকজন দেশে বেড়ে গেলে সমাজ হয়ে ওঠে বসবাসের অনুপযোগী। দেশে-সমাজে বৈষম্য চরম মাত্রায় পৌঁছে। চেনাজানা চার পাশ হয় ভারসাম্যহীন। সেই প্রমাণ আমরা পাই সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক মইনুল ইসলামের গবেষণাপত্রে। সেখানে তিনি বলেছেন, ‘দেশের বেশির ভাগ সম্পদ মাত্র ২৫৫ ব্যক্তির হাতে কুক্ষিগত।’ এই তথ্য এ কথাই বলে, দেশে আয়বৈষম্য নজিরবিহীন। আমরা পাকিস্তান আমলে ২২ পরিবারের কথা শুনেছি। এখন সেই জায়গা দখল করেছে ২৫৫ পরিবার। বাংলাদেশে বৈষম্যহীন রাষ্ট্র-সমাজ আজো অধরা রয়ে গেছে। কিন্তু বিত্তহীন আর বিত্তবান সবাই স্বীকার করেন, সাদামাটা জীবনই সর্বোৎকৃষ্ট। তুলনারহিত। এক অনন্য জীবন। কিন্তু সাদামাটা জীবনের স্বাদ আস্বাদন করতে চাই দৃঢ় মানসিক বল। গভীর অন্তর্দৃষ্টি। অপার্থিব জ্ঞান ছাড়া যা অর্জন অসম্ভব। শান-শওকতে থাকলে এটি অর্জন করা সুদূরপরাহত।

প্রচলিত একটি প্রবাদ আছে- ‘টাকা পয়সা হাতের ময়লা।’ কিন্তু আমরা আমাদের সমাজ, দেশ সব কিছুকেই সেই ময়লা দিয়ে ঘিরে রাখি। সেই ময়লামোহ থেকে মুক্তি পাইনি কখনই, সেই ময়লার কারণেই আমাদের সমাজ এখনো এত নোংরা। কারণ, আমরা ভুলে গেছি প্রবাদ কিংবা ওই ভাবসম্প্রসারণের মর্মার্থ কী ছিল। বাংলাদেশের এই সমাজেরই কিছু ব্যক্তি আছেন, যারা আর দশ জনের চেয়ে আলাদা। যারা ছোটবেলার সেই প্রবাদ অন্তরে ধারণ করেছেন। সেসব ব্যক্তি আমাদের সমাজে বিরল হলেও একেবারে নগণ্য নয়। এটি অবশ্য আমাদের জন্য একটি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ঘটনা। এর একটি অনন্য উদাহরণ হলো দেশের বাইরে অর্থপাচারের ঘটনা।

দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচার হওয়ার তথ্য দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন-ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)। কয়েক বছর ধরে জিএফআই এ ধরনের অর্থপাচারের প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ৫৯০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে। বর্তমান বাজারদরে (৮৪ টাকা প্রতি ডলার হিসাবে) এই অর্থের পরিমাণ ৪৯ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা। আর ২০১৪ সালে দেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার পাচার হয়েছিল। বর্তমান বাজারদরে যার পরিমাণ সাড়ে ৭৬ হাজার কোটি টাকা।

যারা দেশ থেকে অর্থ পাচার করেছেন, তারা বুঝতে পেরেছেন দেশে বর্তমানে যত অনর্থ, তার পেছনে অর্থই কাজ করছে। তাই তারা সাহসে বুক বেঁধে বুদ্ধি খাটিয়ে দিনের পর দিন কাজ করেছেন কী করে এই ‘অনর্থ’-এর জঞ্জাল দেশ থেকে কমানো যায়। বিতাড়িত করা যায়। তারা দিনের পর দিন দেশ থেকে অর্থ বাইরে পাচার করেছেন। তাদের প্রচেষ্টা অবশেষে সাফল্যের মুখ দেখেছে। তারা যেভাবে দেশের সব ‘অনর্থ’ বিদেশে পাচার করে দেশকে ‘অনর্থশূন্য’ (অন্যভাবে বললে অর্থশূন্য) করে তুলছেন, তা আর কেউ পারতেন বলে মনে হয় না। তাদের এই সাফল্যের ধারা অব্যাহত থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ একেবারে অর্থশূন্য হয়ে উঠবে, তা বলাই বাহুল্য।

[email protected]


আরো সংবাদ