০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

বাবরি মসজিদের রায় এবং কিছু প্রশ্ন

-

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের গত ৯ নভেম্বর ২০১৯-এর একটি রায়ে বলা হয়েছে- বাবরি মসজিদের ২ দশমিক ৭ একর জমি হিন্দুদের দেয়া হবে রামমন্দির নির্মাণের জন্য। আর অযোধ্যায় বিকল্প কোনো স্থানে একটি মসজিদ নির্মাণের জন্য মুসলমানদের দেয়া হবে ৫ একর জমি। এই রায়কে স্বাগত জানিয়েছে শুধু সঙ্ঘ পরিবার তা কিন্তু নয়। বরং স্বাগত জানিয়েছে দেশটির অনেক সেকুলার রাজনৈতিক দলও। এসব দলের মধ্যে রয়েছে : কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজবাদী পার্টি, রাষ্ট্রীয় জনতা দল ও তেলেগু দেশম পার্টি। বলা হচ্ছে, এই রায়ের মাধ্যমে বাবরি মসজিদ নামের বিতর্কটির একটি চূড়ান্ত সমাধান টানা হলো।

কিন্তু এই রায়ের মাধ্যমে সমস্যাটির কোনো বাস্তব সমাধান তো টানা হয়ইনি, বরং এই রায় নানা উদ্বেগজনক প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে। রায়টি নিয়ে ভারতের ও ভারতের বাইরের গণমাধ্যমে চলছে নানাধর্মী আলোচনা-সমালোচনা ও বিতর্ক। অনেক বিবেকবানই বলছেন, এটি এমন একটি রায় যা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থ হয়েছে। এটি ইতিহাসে ঠাঁই পাবে নিছক একটি রায় হিসেবেই, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার কোনো উদাহরণ হিসেবে নয়। অনেকেই বলছেন, এ রায়ে ‘প্রিন্সিপল অব ফেয়ারনেস’ অর্থাৎ ‘ন্যায্যতার নীতি’ বিসর্জন দেয়া হয়েছে। এ রায়ে ইতিহাসকে অস্বীকার করে ভিত্তিহীন বিশ্বাসকেই প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা চলেছে। অথচ ইতিহাস নির্মাণের দায়িত্ব, কিংবা মহল বিশেষের বিশ্বাস প্রতিষ্ঠার কোনো দায়িত্ব আদালতের নয়। আমরা সবাই জানি, বিতর্কিত ২ দশমিক ৭ একর স্থানটিতে বাবরি মসজিদ দাঁড়িয়েছিল সেই ১৫২৮ সাল থেকে। এরপর ১৯৯২ সালে ৬ ডিসেম্বর উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠী মসজিদটিতে দল বেঁধে মিছিল করে হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়। সেই মসজিদের পুরো জায়গাটিই এখন সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে দিলেন রামমন্দির নির্মাণের জন্য।

বাবরি মসজিদ নিয়ে মামলাটি বহু দিনের পুরনো। এই মামলার সূচনা ১৩৪ বছর আগে। এর আগে এলাহাবাদ হাইকোর্টের লক্ষেèৗ বেঞ্চ ২০১০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর একটি রায় দিয়েছিলেন। রায়ে এই বেঞ্চ বলেছিলেন, বাবরি মসজিদের সাইটটি বিভক্ত করা হবে তিনটি অংশে : দু’টি অংশ যাবে হিন্দুদের পক্ষে, আর একটি অংশ যাবে মুসলমানদের পক্ষে। সুপ্রিম কোর্টে চ্যালেঞ্জ করা এই মামলার চূড়ান্ত রায়ই সম্প্রতি দেয়া হলো, যে রায়ে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বেঞ্চের রায়ের বিন্দুমাত্র প্রতিফলন নেই। এ লেখার পরবর্তী অংশে এই রায় যেসব প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে, তারই ওপর আলোকপাত করার প্রয়াস পাবো।

প্রথমেই পাঠকদের জানাতে চাই, ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি অশোক কুমার গাঙ্গুলি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর এ রায় সম্পর্কে কী প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি প্রথমেই বলেছেন, ‘এই রায়ে আমি কিছুটা ডিস্টার্বড অনুভব করি। যখন আমরা আমাদের সংবিধান পেলাম, তখন আমরা এই মসজিদের বাস্তব অস্তিত্ব দেখেছি। এই মসজিদ গুঁড়িয়ে দেয়া সম্পর্কিত রায়ে পূর্ববর্তী আদালত বলেছিলেন, সেখানে ৫০০ বছরের পুরনো একটি প্রার্থনালয় ছিল। আর সেটিকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যখন আমরা সংবিধান পেলাম, তখন আইনের বদল হয়। আমরা স্বীকৃতি জানালাম ধর্মের স্বাধীনতা, ধর্মানুশীলন ও ধর্ম প্রচারের মৌলিক অধিকারের প্রতি। এই মৌলিক অধিকার যদি আমার থাকে, তাহলে আমার অধিকার রয়েছে প্রার্থনালয় সুরক্ষা করার। যেদিন এই বাবরি মসজিদ ধ্বংস করা হলো, সেদিন এই মৌলিক অধিকার ধ্বংস করা হলো।’ বিচারপতির এ কথার মাঝে স্পষ্ট আভাস মেলে, এই রায়ে ভারতীয় সংবিধান সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে। কারণ, এই সংবিধানে ধর্মীয় স্বাধীনতার স্বীকৃতি রয়েছে। স্পষ্টত এই রায়ে সে স্বীকৃতিকে অস্বীকার করা হয়েছে।

বিচারপতি অশোক কুমার গাঙ্গুলি ‘ল্যান্ডমার্ক জাজমেন্ট দ্যাট চেঞ্জড ইন্ডিয়া’ নামে একটি গুরুত্বপূর্ণ বইও লিখেছেন। অভিজ্ঞ এই বিচারপতি পশ্চিমবঙ্গ মানবাধিকার কমিশনেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোন সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিরা এই রায় ঘোষণা করলেন যে, এই বিতর্কিত ভূমির মালিক রাম লালা?

তিনি বিচারপতিদের উদ্দেশে আরো বলেন, ‘আপনারা রায়ে বলেছেন, মসজিদের নিচে একটি কাঠামো ছিল; কিন্তু আপনারা বলেননি যে- এই কাঠামো মন্দিরের, মন্দির ভেঙে এর ধ্বংসস্তূূপের ওপর মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। বরং বলেছেন, মসজিদের নিচে পাওয়া কাঠামো মন্দিরের ছিল এমন প্রমাণ নেই। তা ছাড়া প্রশ্ন হচ্ছে, ৫০০ বছর পর কোন প্রতœতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গির ওপর ভিত্তি করে আদালত কি কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে?’

তিনি উল্লেখ করেন, ‘যদি এটি মেনে নেয়া হয়ে থাকে, এই জায়গায় মুসলমানেরা নামাজ আদায় করত, তবে এই জায়গাকে মসজিদ বিবেচনা করতে হবে। অতএব এটিকে একটি মসজিদ ধরে নিয়ে, যেটি দাঁড়িয়েছিল ৫০০ বছর ধরে, আপনারা কী করে এর মালিকানার সিদ্ধান্ত নেবেন? কিসের ওপর ভিত্তি করে আপনারা এ সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন? আদালতে যারা এসেছেন, তারা যেসব দলিলপত্র এনেছেন, তার ওপর ভিত্তি করে এর মালিকানা স্বত্ব নির্ধারণ করতে পারেন। প্রতœতাত্ত্বিক রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে মালিকানা স্বত্বের সিদ্ধান্ত আদালত নিতে পারেন না।’

এই রায়ের একটি বড় ধরনের দ্বান্দ্বিক দিক হচ্ছে, কোর্ট রুল দিয়েছেন মুসলমানেরা এটুকু প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে যে, তারা ১৫২৮ সাল থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত মসজিদটি একান্তভাবেই তাদের দখলে ছিল এবং তারা তাতে নামাজ পড়ত। এর পরও কোর্টের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে- হিন্দুপক্ষও এটি দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে যে, একান্তভাবে এ স্থানটি হিন্দুদের দখলে ছিল। কিন্তু, কোথাও হিন্দুপক্ষকে আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়নি এই স্থানটির ব্যাপারে হিন্দুদের একান্ত দখলিস্বত্ব প্রমাণের জন্য। হিন্দুরা প্রার্থনা করত রামবেদীতে, যা গম্বুজওয়ালা কাঠামোর বাইরে। তা ছাড়া অষ্টাদশ শতাব্দীর ইউরোপীয় পরিব্রাজক জোজেফ টিফেনথেরারের বর্ণনায় উল্লেখ আছে, হিন্দুদের রামবেদীতে প্রার্থনা করার বিষয়টি। কিন্তু হিন্দুদের ভেতরের প্রাঙ্গণে প্রার্থনা করার পক্ষে যুক্তি প্রমাণের জন্য এটি একটি নিশ্চিত প্রমাণ নিশ্চয়ই নয়।

যেখানে আদালত বলছেন, উভয়পক্ষই বাবরি মসজিদের এই বিতর্কিত স্থানের ওপর তাদের নিরঙ্কুশ মালিকানা প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে রায়ে এই জমি হিন্দুপক্ষকে আদালত কী করে কিসের ভিত্তিতে দিয়ে দিতে পারেন? কী করে এই রায়ের মাধ্যমে পুরো বিতর্কিত জমির ওপর হিন্দুদের মালিকানাস্বত্ব ঘোষিত হতে পারে? এদিকে এই রায়ের পর এমন একটি জনধারণা ভারতীয় জনগণের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে যে, এই রায়ে মেজরিটিয়ানদের সাথে আপস করা হয়েছে। এই রায়ে মেজরিটিয়ানদের একটি কালো ছায়ার আছর রয়েছে। রয়েছে বিচারকদের ওপর হিন্দুত্ববাদী সরকারের প্রভাবও, যারা ধর্মনিরপেক্ষ ভারতকে একটি হিন্দুরাষ্ট্র বানানোর প্রয়াসে প্রয়াসী। আর কথাটি এরা এখন কোনো রাখঢাক না রেখে খোলাখুলিই বলছে।

আলোচ্য এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট এর পর্যবেক্ষণে বলেছেন, হিন্দুত্ববাদীদের হাতে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজটি ছিল একটি আইনের লঙ্ঘন। কিন্তু রায়ে কার্যত সুপ্রিম কোর্ট এই আইনবিরোধী কাজটিকেই বৈধতা দিলেন দু’টি উপায়ে : প্রথমত, এই মসজিদ যারা আইন লঙ্ঘন করে ধ্বংস করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তি ঘোষণা করা হয়নি এই রায়ে। দ্বিতীয়ত, যে হিন্দুপক্ষ আইন ভঙ্গ করে বাবরি মসজিদ ধ্বংস করল, তাদের ইচ্ছা অনুসারেই বাবরি মসজিদের স্থান হিন্দুদের মন্দিরের জন্য দিয়ে দেয়ার মাধ্যমে কার্যত আদালত আইন লঙ্ঘনকারীদেরই পুরস্কৃত করলেন। প্রশ্ন উঠেছে- আদালত এই সিদ্ধান্তটি নিলেন কিসের ভিত্তিতে? এর কী জবাব আছে, সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট বিচারকদের কাছে? আসলে আদালতের এই সিদ্ধান্ত ব্যাপকভাবে এই রায়কে বারবার প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

এই রায় প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে- এই রায়ের ৭৯৮ নম্বর অনুচ্ছদ। এই অনুচ্ছেদে আদালত উল্লেখ করেছেন : ‘১৯৪৯ সালে ২২-২৩ ডিসেম্বরের মধ্যবর্তী রাতে মুসলমানদের প্রার্থনা করা থেকে বঞ্চিত করে মসজিদটি দখলে নিয়ে সেখানে হিন্দু দেবতার মূর্তি স্থাপন করে মসজিদটি অপবিত্র করা হয়েছে। মুসলমানদের এই বের করে দেয়ার কাজটি কোনো বৈধ কর্তৃপক্ষ করেনি। কিন্তু এটি ছিল এমন একটি কাজ, যার মাধ্যমে তাদের প্রার্থনার স্থান থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। ... ... ... ভ্রান্তভাবে মুসলমানদের মসজিদ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, আর এই মসজিদ নির্মিত হয়েছিল ৪৫০ বছর আগে।’

১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর বাবরি মসজিদ ধ্বংস করে একদল উগ্রপন্থী করসেবক, যারা সেখানে গিয়েছিল মসজিদটির স্থানে একটি অস্থায়ী মন্দির নির্মাণ করতে। তখন স্বাধীনতা-উত্তর সময়ের ভারতে একটি বড় ধরনের দাঙ্গা সৃষ্টি হয়। এর ফলে দুই হাজারের মতো মানুষ মারা যায়। যার ৯৫ শতাংশই মুসলমান। এখন বিচারপতি রঞ্জন গগৈয়ের বেঞ্চ বলছেন ৬ ডিসেম্বরে বাবরি মসজিদে পরিচালিত ভ্যান্ডালিজম তথা নির্বিচার ধ্বংসোন্মাদনা ছিল অবৈধ তথা আইনবিরোধী। অথচ এই রায়ে এর জন্য দায়ীদেরই পুরস্কৃত করা হলো।

প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে এ ব্যাপারে ভারতীয় আদালত কি আইন অনুযায়ী চলবে, না মেজরিটিয়ানদের সাথে আপস করেই চলবে কিংবা বিশ্বাসবাদকেই প্রাধান্য দেবে? সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা ছিল, আদালত পুরোপুরি আইনের পথেই হাঁটুক। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ফৌজদারি ষড়যন্ত্র মামলা এখনো চলমান ভারতীয় আদালতে। আসামি এল কে আদভানি ও আরো অনেকে। এ সম্পর্কিত আদেশ এখনো আলোর মুখ দেখেনি। সুপ্রিম কোর্ট যদি মনে করেন বাবরি মসজিদ ধ্বংসের কাজটি ছিল বেআইনি, তবে এর জন্য দায়ীদের শাস্তি নিশ্চিত করার একটি দায় আছে সে আদালতের। বাবরি মসজিদের স্থানের মালিকানা প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্ট যে রায় সম্প্রতি ঘোষণা করলেন, এ প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে, ভারতের শীর্ষ আদালত কি পারবেন সে দায় নিয়ে বাবরি মসজিদ ধ্বংসকারীদের শাস্তি দিতে? সে প্রশ্নটিও এখন বড় হয়ে দেখা দিলো।

বাবরি মসজিদ ধ্বংসের দায় এড়াতে পারেন না কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী নরসিমা রাও। তিন বাবরি মসজিদ রক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। তিনি স্থানটিকে কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে তা রক্ষা করতে পারতেন। তা তিনি করেননি। অথচ বাবরি মসজিদটি একটি উপাসনালয় হওয়ায় তার সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব ছিল তা রক্ষা করার। তিনি পারতেন এই স্থানটিকে ইউনিয়ন টেরিটরি হিসেবে ঘোষণা করতে। রাজিব গান্ধীও সমভাবে দায়ী বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ব্যাপারে। তিনিই মসজিদের ভেতর মূর্তি রাখার অনুমোদন দিয়েছিলেন। মাধব গোদবলি একজন স্বরাষ্ট্র সচিব হয়েও বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর রাজিব গান্ধীকে অভিহিত করেছিলেন একজন ‘মোস্ট প্রমিন্যান্ট করসেবক’ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘রাজিব গান্ধী সব সময় হিন্দু ও মুসলমান মৌলবাদীদের খুশি করে চলতেন। তাই সুপ্রিম কোর্টের পরবর্তী এই সময়টায় রাজিব গান্ধীর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে ভারতীয় বিভিন্ন মহলে।

অযোধ্যার বাবরি মসজিদটি ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর ভারতের উগ্র হিন্দত্ববাদীরা ধ্বংস করে দেয়ার আগ পর্যন্ত সেখানে অস্তিত্বশীল ছিল। এটি নিশ্চিত, সেটি নির্মিত হয়েছিল ১৫২৮ সালে। এর পরবর্তী সময়ে লর্ড রামের কাহিনী নিয়ে ‘রামায়ণ’ রচনা করেন তুলসি দাস। তুলসি কিন্তু লেখেননি এই বাবরি মসজিদটি যে স্থানটিতে ছিল, সে স্থানটিই ছিল রামের জন্মভূমি। হিন্দুইজমের আইকন হিসেবে বিবেচিত স্বামী বিবেকানন্দও এ কথা উল্লেখ করেননি। বিভিন্ন জরিপও এমনটি নির্দেশ করেনি, কিংবা উল্লেখ করেনি- গত ৫০০ বছরে কোনো হিন্দু সমাজের কোনো ব্যক্তিত্বের কাহিনী বিতর্কিত স্থানটির সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক দল খুঁজে পেল, বাবরি মসজিদ বিতর্ক রাজনৈতিক ফায়দা অর্জনের ভালো অনুষঙ্গ হতে পারে। এই প্রশ্ন এখন হিন্দু সাধু-সন্ন্যাসীরাই তুলছেন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পরপর। তারা বলছেনÑ “বাবরি মসজিদ নির্মিত হলো ১৫২৮ সালে। তখন তুলসি দাসের বয়স ছিল ১৭ বছর। তার জন্ম অযোধ্যায় ও বেড়ে ওঠেন এখানেই। আমরা যে মহাকাব্য রামায়ণকে শ্রদ্ধা করি, তাতে এই মসজিদের স্থানটিতে রামের জন্ম হয়েছে, সে কথার কোনো উল্লেখ নেই।

অথচ আদভানি যখন রাজনৈতিক দল ‘জনসঙ্ঘে’র বড় মাপের নেতা, তখন তিনি ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর দলবল নিয়ে মিছিলের নেতৃত্ব দিয়ে বাবরি মসজিদ ভেফু গুঁড়িয়ে দেন এটিকে রামের জন্মভূমি দাবি করে। দাবি করা হলো- বাবরি মসজিদ নির্মিত হয়েছে মন্দিরের ধ্বংসস্তূপের ওপর। এই জনসঙ্ঘই হচ্ছে বিজেপির সাবেক নাম। বিজেপি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ফায়দা লোটার লক্ষ্যেই বাবরি মসজিদের স্থানটি রামের জন্মভূমি এবং এখানে একটি মন্দির ছিল, সেই মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত হয়েছে বাবরি মসজিদ- এই মিথ্যা দাবি তুলে মসজিদটি ভাঙার মতো দৃষ্টতা দেখাল।” আজ আমরা ভারতীয় অনেক হিন্দুর মুখে শুনছি- রাম কোনো অবতার বা দেবতা ছিলেন না, তিনি ছিলন নিছক একজন রাজা। তাকে আজ বিজেপি পরম পূজনীয় করে তুলেছে।

বলা হচ্ছে, এই রায় দীর্ঘ দিনের একটি বিরোধের নিষ্পত্তি করল। আসলে কি তাই? সে প্রশ্নও আজ আলোচিত হচ্ছে ভারতজুড়ে। এই রায় ভবিষ্যতে ভারতের আরো অনেক মসজিদ ও অন্যান্য মুসলিম স্থাপনার বিরোধকে উসকে দেবে। দেশটিতে মসজিদগুলো সংরক্ষিত ‘প্লেসেস অব ওয়ারশিপ (স্পেশাল প্রভিশন) অ্যাক্টের আওতায়। এই আইনে বলা আছে- ধর্মীয় স্থানগুলো সেভাবেই থেকে যাবে, ঠিক যেভাবে ছিল ভারতের স্বাধীনতার দিনটিতে, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্টে। এই আইনটি প্রণীত হয় ১৯৯১ সালে, যখন রামজন্মভূমি বিরোধটি চরমে পৌঁছে; কিন্তু এই আইনটির আওতায় আনা হয়নি বাবরি মসজিদ নিয়ে বিরোধের বিষয়টি। ভারতে ধর্মীয় কাঠামোর পবিত্রতা রক্ষায় আইনি ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। বাবরি মসজিদ এর প্রমাণ।

ভারতের অন্যতম বড় মৌলবাদী হিন্দু সংগঠন ‘বিশ্ব হিন্দু পরিষদ’র ইন্টারন্যাশনাল ভাইস-প্রেসিডেন্ট আচার্য গিরিরাজ কিশোর ২০১০ সালে এলাহাবাদ হাইকোর্ট বেঞ্চের দেয়া রায়ের পর বলেছিলেন, বাবরি মসজিদের রায় হিন্দুদের আরো পবিত্র স্থান মুসলমানদের দখল থেকে মুক্ত করার পথ খুলে দিলো।’ তখন তিনি আরো বলেন, ‘ভারতীয় মুসলমানদের এখন প্রস্তুতি নিতে হবে মথুরা ও বারানসির দু’টি মসজিদ আমাদের কাছে ফেরত দিতে, যেখানে এর আগে মন্দির ছিল।’

আসলে তিনি বলছিলেন বারানসির জ্ঞানবাপি মসজিদ ও মথুরার শাহী ঈদগাহ মসজিদের কথা। উগ্র হিন্দু গোষ্ঠীগুলো বলছেÑ মথুরার মসজিদের স্থানটিতে দেবতা কৃষ্ণের জন্ম হয়েছিল এবং সেখানে একটি মন্দির ছিল। এদের বিশ্বাসনির্ভর আরো দাবি হচ্ছেÑ মুসলমানদের শাসনামলে উত্তরপ্রদেশের বিভিন্ন জেলায় হাজার হাজার মন্দির ভেঙে মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে তারা এমন ২৯৯টি মসজিদের তালিকা তৈরি করেছে।

এখন এরা যদি এসব ব্যাপারে নিম্ন আদালতে মামলায় যায়, তবে এসব আদালত সুপ্রিম কোর্টের নজির উল্লেখ করে সেসব মসজিদও হিন্দুদের দিয়ে দিলে অবস্থা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা এই মুহূর্তে আন্দাজ-অনুমান খুবই মুশকিল। শুধু তাই নয়, তাজমহলও নাকি ছিল মন্দির, সেটিও এখন হিন্দুদের দিয়ে দিতে হবে বলে দাবি করা হচ্ছে। আসলে এসব ব্যাপারে পরিস্থিতি আরো ঘোলাটে করে তোলার ফ্লাডগেটটিই খুলে দিলো সুপ্রিম কোর্টের রায়। এর অর্থ ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের একটি নিয়ামক হয়ে কাজ করতে পারে এই রায়। অনেকেই বলছেন, এই পরিস্থিতিতে সুন্নি ওয়াকফ বোর্ডের উচিত হবে না কোর্টের নির্দেশিত বিকল্প ৫ একর জমি মসজিদ নির্মাণের জন্য গ্রহণ করা।


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik