০৭ ডিসেম্বর ২০১৯

ওয়াজ মাহফিলের আলোচ্য বিষয়

-

বাংলাদেশে অনেক ওয়াজ মাহফিল হয়ে থাকে। এসব মাহফিলের মাধ্যমে সাধারণ জনগণ ইসলামের বিভিন্ন দিক জানতে পারেন। ওয়াজ মাহফিলের গুরুত্ব অনেক। এ ধরনের মাহফিলে আজকাল যেসব বিষয়ে আলোচনা হয়, তাতে দেখেছি কোনো ধারাবাহিকতা অনুসরণ করা হয় না। অনেক সময়ে ছোট বিষয়কে বড় করে ফেলা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে মাজহাবি ঝগড়া নিয়ে বেশি সময় ব্যয় করা হয় এবং বিপক্ষের বিরুদ্ধে অনেক কঠোর মন্তব্য করা হয়। এসব সঠিক বলে মনে হয় না। এ পরিপ্রেক্ষিতে আমি ওয়াজকারীদের সহায়তার জন্য কতগুলো পয়েন্ট উল্লেখ করছি, যা তারা ওয়াজে ব্যবহার করতে পারেন। এসব পয়েন্টের মধ্যে প্রত্যেক ওয়াজে দু-তিনটি করে ব্যবহার করা যায়।

১. ইসলামের একত্ববাদ ও তাওহিদ সম্পর্কে আলোচনা; বিশেষ করে আল্লাহ এক হওয়ার দলিল পেশ করা। জগতের স্রষ্টা যে একজনের বেশি হতে পারেন না, সে বিষয়ে আলোচনা এবং শিরক যে মারাত্মক ভুল, এ সম্পর্কে আলোচনা।

২. আখেরাত সম্পর্কে আলোচনা, বিশেষ করে আখেরাত হওয়া কেন জরুরি তার ওপর আলোচনা। স্বাভাবিকভাবে, আখেরাত না থাকলে মানুষ বিচারের মুখোমুখি হওয়ার ভয় পেত না এবং তারা যা খুশি তা করতে সাহস পেত।

৩. রাসূল সা:-এর নবুওয়াতের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা। রাসূল সা:-এর চরিত্রই প্রমাণ করে, তিনি ছিলেন সত্য নবী। কুরআন মাজিদই প্রমাণ করে, কোনো মানুষের পক্ষে এটি রচনা করা সম্ভব নয়। সুতরাং রাসূল সা:-এর দাবি যে, এটা আল্লাহ তায়ালার কাছ থেকে পাওয়া, তা অবশ্যই সত্য।

৪. নামাজ, রোজা, হজ সম্পর্কে আলোচনা। এসবের গুরুত্ব এবং এর উপকার সম্পর্কে আলোচনা; জাকাত সম্পর্কে আলোচনা- বিশেষ করে ফসলের জাকাত ও উশর সম্পর্কে আলোচনা। বাংলাদেশে যারই কোনো ফসল ১৮ মণের বেশি হয়, তাকে ফসলের উশর দিতে হবে। কিন্তু এটাকে আমাদের দেশের ধনী কৃষকরা অবহেলা করছেন। অথচ এটা ফরজ।

৫. ওয়াজ মাহফিলে রাসূল সা:-এর জীবনী নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করা উচিত। তাঁর নবীজীবনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো আলোচনা করা দরকার। বিশেষত বদর, ওহুদ ও আহজাব যুদ্ধ সম্পর্কে আলোচনা করা দরকার।

৬. খেলাফতে রাশেদার ইতিহাস এবং তাদের সময়ে তাদের সাফল্য সম্পর্কে আলোচনা করা উচিত। ওয়াজ মাহফিলে হজরত আবু বকর রা:, উমর রা:, উসমান রা:, আলী রা: সম্পর্কে আলোচনা করা উচিত। পরবর্তীকালের মানুষের তুলনার এদের গুরুত্ব অনেক বেশি। একই সাথে, খেলাফতের নীতিমালা নিয়েও আলোচনা করা উচিত। খেলাফতের অর্থ যে নির্বাচিত সরকার, এটা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

৭. সুদ হারাম হওয়া সম্পর্কে ব্যাপক আলোচনা করা জরুরি। সুদ সবচেয়ে বড় হারামগুলোর মধ্যে একটি। আল্লাহ তায়ালা স্বয়ং সুদখোরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছেন। আমাদের দেশের বিভিন্ন স্থানের সুদ ব্যবসায়ীদের অপকর্মের বিষয়ে আলোচনা করা উচিত। সুদের ফলে মানুষ নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে। একই সাথে, ইসলামী ব্যাংকিংয়ের সুফল সম্পর্কে আলোচনা করা প্রয়োজন। এটা প্রমাণিত যে, ইসলামী ব্যাংক সনাতন ব্যাংকের তুলনায় উন্নত।

৮. সমাজে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য কী কী করতে হবে, তা বলা দরকার। ইসলাম সুবিচারকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। কুরআনের ২০ থেকে ৩০টি আয়াতে সুবিচারের কথা বলা হয়েছে। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার প্রতি সুবিচার করতে হবে। নারীর প্রতি সুবিচার করতে হবে। স্ত্রী ও স্বামীর প্রতি সুবিচার করতে হবে। স্ত্রীর ব্যাপারে সুবিচারের কথা কুরআনে বিশেষভাবে বলা হয়েছে (আশেরুহুন্না বিল মারুফ)।

৯. অশ্লীলতার বিরুদ্ধে আলোচনা করতে হবে। অশ্লীলতা সমাজের নৈতিকতা ধ্বংস করে দেয়। সব ধরনের অশ্লীলতার বিরুদ্ধেই জোর দিয়ে বলতে হবে। বাজে বিজ্ঞাপন, বাজে পত্রিকা, ইন্টারনেটের অশ্লীলতা ইত্যাদি ব্যাপারে আলোচনা করতে হবে।

১০. প্রধান প্রধান ইসলামী আইন সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে। যেমন- বিবাহের আইন, তালাকের আইন ও উত্তরাধিকার আইন। কী কী খাওয়া হারাম; কী কী কাজ নিষিদ্ধ, এসব সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে।

১১. এতিম ও মিসকিনদের সম্পর্কে আলোচনা করতে হবে। পবিত্র কুরআনের অনেক জায়গায় এতিম ও মিসকিনদের কথা বলা হয়েছে। জাকাতের একটি খাত হচ্ছে, মিসকিনদের সাহায্য করা। কুরআনে এ কথা বলা হয়েছে যে, এতিমের মাল যেন কেউ ভক্ষণ না করে।

ওপরে যেসব বিষয় বলা হলো তা একই সভায় আলোচনা করা সম্ভব হয়তো হবে না। প্রত্যেক ওয়াজে নির্দিষ্ট তিন থেকে চারটি পয়েন্ট নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। কয়েক বছর পর পর একই স্থানে এ বিষয়গুলো আলোচনা করা যেতে পারে। মোটামুটিভাবে এসব পয়েন্টের ওপর ঘুরেফিরে আলোচনা করতে হবে।

লেখক : সাবেক সচিব, বাংলাদেশ সরকার


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik