০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

‘মদিনা সনদ’ ও আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থান

-

‘মদিনা সনদ’ নিয়ে আমাদের দেশের অনেকের মধ্যে কৌতূহল রয়েছে, আসলে এটা কী? কিছু বুদ্ধিজীবী ‘মদিনা সনদ’-এর মধ্যে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ পাওয়ার প্রয়াস পাচ্ছেন। ধর্মনিরপেক্ষতা হলো কার্যত এক ধরনের নাস্তিক্যবাদের আধুনিক রূপ। তাই বলা হয়, ধর্মাশ্রয়ী কোনো মানুষ ধর্মনিরপেক্ষ Secular হতে পারে না। ‘Secularism : the belief that the religion should not be involved in the organization of society, education etc. ‘সমাজ সংগঠন, শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে ধর্মসংশ্লিষ্ট হতে পারবে না’; এমন বিশ্বাসই হলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ।’ Secularism is a code of duty pertaining to this life founded on considerations purely human, and intended mainly for those who find theology indefinite, unreliable or unbelievable. ‘ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ একটি কর্তব্যপালন পদ্ধতি, যা এই জীবনের সাথে সংশ্লিষ্ট, কেবল মানবীয় বিবেচনার ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং যারা ধর্মতত্ত্বকে আস্থা ও বিশ্বাসযোগ্য মনে করে না তাদের জন্য প্রণীত।’ (জর্জ জ্যাকব হোলিয়ক, ইংলিশ সেকুলারিজম : অ্যা কনফেশন অব বিলিফ, শিকাগো ১৮৯৬, পৃ. ৩৫)।

সাম্প্রতিক সময়ে পত্রপত্রিকা ও টিভি টকশোতে কিছু বুদ্ধিজীবী জোরেশোরে বলছেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ সা: কর্তৃক প্রদত্ত ‘মদিনা সনদ’ ছিল ‘ধর্মনিরপেক্ষ’। এটা বলে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ইসলামসম্মত করার সুযোগ খোঁজা হচ্ছে বলে অনুমিত হয়। এ বক্তব্য ঐতিহাসিক সত্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। বরং ‘মদিনা সনদ’-এর চার জায়গায় মহান আল্লাহর ওপর আস্থা, বিশ্বাস ও জবাবদিহির কথা লিপিবদ্ধ আছে। ‘এ সনদের সাক্ষী আল্লাহ; তিনিই এর রক্ষণাবেক্ষণকারী এবং অমান্যকারীর ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষিত হবে’, এ কথাও উল্লিøখিত আছে এতে। ‘মদিনা সনদ’-এর মাধ্যমে যে রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা ছিল সম্পূর্ণরূপে ধর্মভিত্তিক। এ সনদের ১৩ নম্বর ধারায় রয়েছে, ‘স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে হজরত মুহাম্মদ সা: আল্লাহর বিধান অনুযায়ী এর ফয়সালা দেবেন।’ ব্যক্তি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক পর্যায় পর্যন্ত পবিত্র কুরআনের বিধানগুলো মদিনা রাষ্ট্রে কার্যকর ছিল। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ অনুযায়ী সুদ, মজুদদারি, ফটকাবাজি প্রভৃতি নিষিদ্ধ করে জাকাত, উশর, ফাই, গনিমাহ ও খারাজভিত্তিক ইসলামী অর্থনীতি চালু করা হয়। বিচারকার্যক্রম পরিচালিত হতো শরিয়তের বিধান অনুযায়ী। সে সমাজে কিসাস, হুদুদ, তাজিরাত ইত্যাদি দণ্ডবিধি ছিল পুরোপুরি কার্যকর। এ কারণে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ প্রফেসর পি কে হিট্টির মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য : ‘মদিনার ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে পরবর্তীকালে বৃহত্তর ইসলামী রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল স্থাপিত হয়।’ (Out of religious community of Madinah the later and larger state of Islam arose.)।

৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা থেকে হিজরতের পর রাসূলুল্লাহ সা: মদিনায় বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ইহুদিদের মধ্যে সামাজিক ঐক্য ও রাজনৈতিক সমীকরণ, জাতীয় নিরাপত্তা, ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মাধ্যমে একটি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চুক্তি সম্পাদন করেছেন, যা ইতিহাসে ‘মদিনা সনদ’ (Charter of Madinah) নামে পরিচিতি লাভ করে। এটাই ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান। এর আগে শাসকের মুখের কথাই ছিল রাষ্ট্রীয় আইন। প্রকৃতপক্ষে ‘জোর যার মুল্লুক তার’- এটাই ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের শাসননীতি। খ্রিষ্টপূর্ব দুই হাজার বছর আগে বর্তমান ইরাকের মেসোপটেমিয়ার যেসব আইন বিধিবদ্ধ (Code of Hammurabi) করা হয়, তা ছিল অসম্পূর্ণ এবং আধুনিক সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার সাথে সাংঘর্ষিক। পক্ষান্তরে রাসূলুল্লাহ সা:-এর সংবিধান সত্যিই যুগোপযোগী ও প্রগতির পরিচায়ক। ৪৭টি ধারা সম্পন্ন এ সনদের প্রধান দিকগুলো হলো-

১. মদিনা সনদে স্বাক্ষরকারী ইহুদি, খ্রিষ্টান, পৌত্তলিক ও মুসলিম সম্প্রদায়গুলো সমান নাগরিক অধিকার ভোগ করবে এবং তারা একটি সাধারণ জাতি (Commonwealth) গঠন করবে। ২. হজরত মুহাম্মদ সা: নবগঠিত প্রজাতন্ত্রের সভাপতি হবেন এবং পদাধিকার বলে তিনি মদিনার সর্বোচ্চ বিচারালয়ের (Court of appeal) সর্বময় কর্তা হবেন। ৩. পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা বজায় থাকবে; মুসলমান ও অমুসলমান সম্প্রদায় বিনা দ্বিধায় নিজ নিজ ধর্ম পালন করবে; কেউ কারো ধর্মে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। ৪. কেউ কুরাইশদের সাথে কোনো প্রকার সন্ধি স্থাপন করতে পারবে না কিংবা মদিনাবাসীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে কুরাইশদের সাহায্য করতে পারবে না। ৫. স্বাক্ষরকারী কোনো সম্প্রদায়কে বহিঃশত্রু আক্রমণ করলে, সব সম্প্রদায়ের লোকেরা সমবেত প্রচেষ্টায় বহিঃশত্রুর আক্রমণকে প্রতিহত করবে। ৬. বহিঃশত্রুর আক্রমণে স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়গুলো নিজ নিজ যুদ্ধব্যয়ভার বহন করবে। ৭. স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের কোনো ব্যক্তি অপরাধ করলে তা ব্যক্তিগত অপরাধ হিসেবেই গণ্য করা হবে। এর জন্য অপরাধীর সম্প্রদায়কে দোষী করা যাবে না। ৮. মদিনা শহরকে পবিত্র হিসেবে ঘোষণা করা হলো এবং রক্তপাত, হত্যা, বলাৎকার ও অন্যান্য অপরাধমূলক কার্যকলাপ একেবারেই নিষিদ্ধ করা হলো। ৯. অপরাধীকে উপযুক্ত শাস্তি ভোগ করতে হবে এবং সর্বপ্রকার পাপী বা অপরাধীকে ঘৃণার চোখে দেখতে হবে। ১০. ইহুদিদের মিত্ররাও সমান নিরাপত্তা ও স্বাধীনতা ভোগ করবে। ১১. দুর্বল ও অসহায়কে সর্বতোভাবে সাহায্য ও রক্ষা করতে হবে। ১২. মহানবী সা:-এর পূর্বানুমতি ছাড়া মদিনাবাসী কারো বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে না। ১৩. স্বাক্ষরকারী সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো বিরোধ দেখা দিলে মহানবী সা: আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ফয়সালা দেবেন।

এই সনদের ফলে- প্রথমত, বহুধাবিভক্ত মদিনাবাসীর গৃহযুদ্ধ বন্ধ হয়ে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
দ্বিতীয়ত, জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব মুসলমান, খ্রিষ্টান ও ইহুদি নাগরিকের সমান অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও কর্তব্যের সীমারেখা নির্ধারিত হয়। তৃতীয়ত, স্বদেশত্যাগী মুহাজির বাসস্থান ও জীবিকা উপার্জনের ব্যবস্থা হয়। চতুর্থত, মুসলমান ও অমুসলমানের মধ্যে পরস্পর মৈত্রী, সদ্ভাব ও সহযোগিতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব ও প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পঞ্চম, মদিনায় ইসলামের ধর্মীয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়ে ধর্ম প্রচার ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। স্পষ্টত, এটা গোত্রভিত্তিক আরববাসীকে ধর্ম ও রাজনীতির ভিত্তিতে নতুন আর্থসামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার দিকে ধাবিত করে। ষষ্ঠ, এই চুক্তি সম্পাদনকারী সব মানুষের জানমাল-ইজ্জতের নিরাপত্তার গ্যারান্টি প্রদান করা হয়। সপ্তম, বর্ণ-গোত্র-গোষ্ঠী, ভাষা ও আঞ্চলিকতার ঊর্ধ্বে এক বিশ্বজনীন ভ্রাতৃ সমাজ, এক উম্মাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই চুক্তির ফলে মদিনায় নগর রাষ্ট্রের (City State) উদ্ভব হলো এবং রাসূলুল্লাহ সা:কে মুসলিম ও অমুসলিম উভয় পক্ষ থেকে এই নতুন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপ্রধানরূপে স্বীকার করে নেয়া হয়। রাসূলুল্লাহ সা:-এর জন্য আন্তর্জাতিক সমাজ গঠনের পথ উন্মুক্ত হয়ে গেল। অষ্টম, এই চুক্তির বলে রাসূলুল্লাহ সা: আইন, বিচার, প্রতিরক্ষা ও প্রশাসনিক বিষয়গুলো নিজের ও মুসলমানদের জন্য সংরক্ষিত করে দেন। নবম, এই চুক্তি জুলুম, বৈষম্য, অবিচার এবং এ ধরনের অন্যান্য গর্হিত বিষয়ের দ্বার রুদ্ধ করে দেয়। আরববাসীদের ব্যক্তিগতভাবে খুনের প্রতিশোধ গ্রহণের প্রাচীন পদ্ধতির পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে বিষয়টিকে একটি সম্মিলিত কর্তব্য রূপে গণ্য করা হয়। দশম, প্রাচ্যবিদ উইলিয়াম মুরের বক্তব্য অনুসারে, এই চুক্তির মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সা: একজন মহান পরিকল্পনাবিদ ও পরিচালক রূপে ধ্যান-ধারণা ও চিন্তা-চেতনায় বহুধাবিভক্ত, আদর্শ-বিশ্বাসে বিভিন্নমুখী এবং পরস্পর থেকে চরম বিচ্ছিন্ন একটি জনগোষ্ঠীকে সুসংহত ও ঐক্যবদ্ধ করার সুকঠিন কাজটি একজন শ্রেষ্ঠ ও বিজ্ঞ রাজনীতিবিদের মতো পরম দক্ষতার সাথে সুচারুরূপে সম্পাদন করেন। রাসূলুল্লাহ সা: এমন একটি রাষ্ট্র এবং এমন একটি জনসমাজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করেন, যা ছিল আন্তর্জাতিক রীতিনীতির ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত (ড. মুহাম্মদ হামীদুল্লাহ, আল-ওয়াছা’ইকুস সিয়াসিয়াহ ফিল আহ্দিন নববী, পৃ.১৫-২১; ইব্ন হিশাম, সীরাতুন্নবী, ১খ.,পৃ. ৫৫৪-৫৬১)।

ইতিহাস প্রমাণ করে, এই ঐতিহাসিক সনদ বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবদমান কলহ ও অন্তর্ঘাতের অবসান ঘটিয়ে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, সম্প্রীতি, প্রগতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, গোত্রীয় দম্ভ, ধর্মবিদ্বেষ ও অঞ্চলপ্রীতি মানবতার শত্রু ও প্রগতির অন্তরায়। মদিনা সনদ এ দুষ্ট ক্ষতগুলোকে মুছে দেয় এবং সামাজিক নিরাপত্তা, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতাকে নিশ্চিত করে। সনদের প্রতিটি ধারা পর্যালোচনা করলে বলা যায়, মহানবী সা:-এর মানবাধিকার ঘোষণার প্রকৃষ্ট পরিচয় প্রতিভাত হয়ে ওঠে। ১২১৫ সালের ম্যাগনা কার্টা, ১৬২৮ সালের পিটিশন অব রাইটস্ ১৬৭৯ সালের হেবিয়াস কর্পাস অ্যাক্ট, ১৬৮৯ সালের বিল অব রাইটস এবং ১৯৪৮ সালের ১০ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘ কর্তৃক ঘোষিত সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণা (Universal Declaration of Human Rights)-এর শত শত বছর আগে মানবতার ঝাণ্ডাবাহী মহানবী সা: সর্বপ্রথম মানুষের আর্থসামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অধিকার ঘোষণা করেন। পরস্পরবিরোধী ধর্ম সম্প্রদায়ের মধ্যে মহানবী সা: কর্তৃক সম্পাদিত এ সনদ সমগ্র মানবজাতি ও অখণ্ড মানবতার এক চূড়ান্ত উত্তরণ।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, ওমর গনি এমইএস কলেজ, চট্টগ্রাম


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik