০৬ ডিসেম্বর ২০১৯

‘তৃতীয়’ গণ-অভ্যুত্থান

-

গণের সাথে অভ্যুত্থান মিলে হয় গণ-অভ্যুত্থান। তখন অর্থ দাঁড়ায় জনগণের উত্থান। অর্থাৎ রাজনৈতিক দিক থেকে যে ঘটনায় জনগণের উত্থান ঘটে তাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় গণ-অভ্যুত্থান। যেকোনো দেশে গণ-অভ্যুত্থানে আর্থ-রাজনৈতিক প্রভাব হয় অর্থবহ আর সুদূরপ্রসারী। বাংলাদেশের ইতিহাসে দু’টি রাজনৈতিক ঘটনাকে গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। একটি ঊনসত্তরে আরেকটি নব্বইয়ে ঘটে। সালের সাথে মিলিয়ে বলা হয় ঊনসত্তর আর নব্বইরের গণ-অভ্যুত্থান।

প্রথমটি ১৯৬৯ সালের ২৪ জানুয়ারি। সে দিন ছিল হরতাল। ওই দিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ঢাকায় মিছিল বের হয়। সেই মিছিলে পুলিশের গুলিবর্ষণে প্রাণ হারান কিশোর মতিউরসহ চারজন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আইয়ুব সরকারবিরোধী আন্দোলন রূপ নেয় তীব্র এক গণ-অভ্যুত্থানে। পল্টন ময়দানে জড়ো হয়েছিল পাঁচ লাখ লোকের বিশাল সমাবেশ। আন্দোলন তখন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে আইয়ুব খান ঘোষণা করেন তিনি আর প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচন করবেন না। জনগণের মধ্যে প্রচণ্ড আক্রোশ এবং ক্রোধ কাজ করছিল। ছাত্রসমাজ, মেহনতি জনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের একতার বাতাবরণ সৃষ্টি হয় ওই আন্দোলন ঘিরে। ওই আন্দোলন শুধু ছাত্র বা রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নয়, বরং কৃষকদের মধ্যে, শ্রমিকদের মধ্যে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল। ফলে তা হয়ে ওঠে সফল গণ-অভ্যুত্থান। ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠন ও স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাসে একে গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

অন্য দিকে বাংলাদেশের মানুষের তীব্র উদার গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা থেকে নব্বইয়ে ঘটে দ্বিতীয় গণ-অভ্যুত্থান। তবে উদার গণতন্ত্রে ফেরা এখনো আমাদের কাছে রয়ে গেছে মরীচিকার মতো অধরা। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে বারবার গণতন্ত্রে ফেরা হয়েছে ব্যাহত। যেকোনো সুস্থ মানুষই বলবেন, এখনো দেশে ভোটাধিকার প্রয়োগের অবাধ পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন আছে। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করেন জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। জাতির ঘাড়ে চেপে বসেন স্বৈরাচার এরশাদ। দীর্ঘ ৯ বছর আন্দোলন-সংগ্রামের ফলস্বরূপ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর প্রবল গণ-আন্দোলনের মুখে স্বৈরাচার এরশাদের পতন ঘটে। এটিই আমাদের ইতিহাসে দ্বিতীয় সফল গণ-অভ্যুত্থান। যেটি দেশকে ফের গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনে। যদিও ঊনসত্তর আর নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন, তবু এই দু’টি ঘটনায় দেশীয় রাজনীতিতে এর প্রভাব অব্যাহত রয়েছে।

এবার দেশবাসী শুনলেন ‘তৃতীয় গণ-অভ্যুত্থানে’র কথা। এমন দাবি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) ড. ফারজানা ইসলামের। তার ভাষায়- ছাত্রলীগ ‘গণ-অভ্যুত্থান’ করে তার বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী ছাত্র-শিক্ষকদের গড়ে তোলা অবরোধ থেকে তাকে মুক্ত করেছেন। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ভিসি ফারজানা ইসলাম ছাত্রলীগের কাছে এ হামলা করার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এবং বলেছেন, তিনি আজ অত্যন্ত খুশি। হামলাকারী ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের কাছে একজন ভিসি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারেন, জেনে অনেকই বিস্মিত হয়েছেন। এই ‘নির্লজ্জতা’ যেন দিকশূন্য অন্ধকার। তিনি কি ভাবছেন, এভাবে পেশিশক্তির সাহায্যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় চালিয়ে নেয়া যায়? এই কি বিশ্ববিদ্যালয় ‘সামাল দেয়ার’ কায়দা? বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশ ভূলুণ্ঠিত করে, সব ধরনের অ্যাকাডেমিক রীতি-রেওয়াজ লঙ্ঘন করে, শিক্ষা-সৌজন্য-শিষ্টাচারের সব ধরনের নীতি পরিহার করে ভিসি বলপ্রয়োগ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পদ আঁকড়ে সুযোগ-সুবিধা, ক্ষমতার সুখ ভোগ করতে চান?

যেভাবে গণ-অভ্যুত্থান শব্দটির ব্যবহার তিনি করেছেন, এমন অপব্যবহারে অনেকেই অবাক হয়েছেন। অথচ এই অপব্যবহার কোনো সাধারণ নাগরিক করেননি; করেছেন একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ পদে আসীন ব্যক্তি। এমন নয় যে, শব্দটির মানে তিনি বুঝতে অক্ষম। সব জেনে-বুঝেই ঠাণ্ডামাথায় শব্দটি ব্যবহার করেছেন তিনি। তা না হলে যে ঘটনাকে তিনি গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণনা করছেন; এত দিনে নিজের ভুল স্বীকার করে দুঃখ প্রকাশ করতেন। গণমাধ্যমে সে রকম কোনো খবর আমাদের চোখে পড়েনি। তাই ধরে নেয়া যায়, তিনি তার বক্তব্যে অটল। ‘জ্ঞানপাপী’ আর কাকে বলে! জাবি ভিসির বক্তব্য যে অন্তঃসারশূন্য তা বুঝতে বিশেষ জ্ঞানের প্রয়োজন পড়ে না। যেকোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তিই তা বোঝেন। বাংলাদেশের ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল দু’টি ঘটনায় একটু চোখ বুলালে সহজেই অনুধাবন করা যায় গণ-অভ্যুত্থানের মর্মবাণী কী। কে না জানে, আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের ঊনসত্তর আর নব্বইরের ঘটনা দু’টি শিহরণ জাগানিয়া। তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান, অর্থাৎ আজকের স্বাধীন বাংলাদেশে আইয়ুব শাহীর বিরুদ্ধে সংঘটিত সফল গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই দেশবাসীর গণ-অভ্যুত্থান শব্দটি প্রিয় হয়ে ওঠে। আর নব্বইয়ের ঘটনায় তা মনের গহিনে পাকাপোক্ত অবস্থান করে নিয়েছে।

অবাক করা বিষয় হলো, এমন তাৎপর্যপূর্ণ শব্দের সাথে জাবি ভিসি ফারজানা ইসলাম তার ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতিকে গুলিয়ে ফেলেছেন। বর্ণনা করেছেন গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে। জাবি ভিসির বাসভবনের সামনে তার পদত্যাগ দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের ওপর ছাত্রলীগের মিছিল থেকে হামলার ঘটনায় অন্তত ৩৫ জন আহত হয়েছেন। ৫ নভেম্বর ওই ঘটনা ঘটে। ৪ নভেম্বর সন্ধ্যা ৭টা থেকে আন্দোলনকারীরা ভিসির বাসভবন ঘেরাও করে রাখেন। যত দিন না তাকে অপসারণ করা হবে, তত দিন অবরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন আন্দোলনকারীরা। ৫ নভেম্বর আন্দোলনকারীরা যখন ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থান নিয়েছিলেন, তখন ভিসিপন্থী শিক্ষকরা সেখানে যান। তারা আন্দোলনকারী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের তুলে দিয়ে ভিসির বাসভবনে ঢোকার চেষ্টা করেন। তবে তারা বাসভবনে ঢুকতে ব্যর্থ হন। এর কিছুক্ষণ পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের ব্যানারবাহী একটি মিছিল সেখানে আসে। ওই মিছিল থেকে ভিসিবিরোধী আন্দোলনকারীদের ওপর হামলা চালানো হয়। তারপর তারা ওই জায়গায় অবস্থান নেন। আর এটিকেই ভিসি ফারজানা বলছেন গণ-অভ্যুত্থান। এমন ঘটনাকে গণ-অভ্যুত্থান হিসেবে বর্ণনা করায় অনেকে এই উক্তিকে বলছেন এ বছরের শ্রেষ্ঠ কৌতুক। আবার অনেকে মজা করে বলছেন, ‘তৃতীয় গণ-অভ্যুত্থান’। আর সচেতন ব্যক্তিমাত্রই বলছেন, ‘সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ’।

জাহাঙ্গীরনগরে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলাকে গণ-অভ্যুত্থান বলায় জাবি ভিসির প্রতি ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে ৬ নভেম্বর ভিসি অপসারণের দাবিতে আয়োজিত সংহতি সমাবেশে ঢাবির শিক্ষক তানজিম উদ্দিন খান বলেছেন, ‘দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের ওপর ছাত্রলীগের হামলাকে ভিসি ফারজানা ইসলাম নির্লজ্জের মতো গণ-অভ্যুত্থান বলেছেন। কিন্তু দেশবাসী দেখছেন, কিভাবে ছাত্রলীগ হামলা করেছে। কার্যত ভিসির পক্ষে গণ-অভ্যুত্থান নয়, পশুত্বের অভ্যুত্থান হয়েছে। একজন সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক ফারজানা ইসলাম অভ্যুত্থানের সংজ্ঞাই জানেন না। তাহলে এমন বর্বর হামলাকে কিভাবে তিনি গণ-অভ্যুত্থান বলেন? তিনি (ভিসি) কিভাবে হামলার জন্য ছাত্রলীগকে ধন্যবাদ জানান। আসলে সরকার প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে তাদের একনিষ্ঠ গোলামি করতে পারা অথর্ব লোকদের দায়িত্ব দিয়ে থাকে। সেই ভিসিরা সরকার ও ছাত্রলীগের তল্পিবাহক হিসেবে কাজ করেন। তানজিম উদ্দিন খান জাহাঙ্গীরনগরের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনকে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন বলে দাবি করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিকতর উন্নয়নের জন্য একনেক কর্তৃক এক হাজার ৪৪৫ কোটি ৩৬ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া নিয়েই বিশ্ববিদ্যালয়টিতে বর্তমান এই উদ্ভূত ঘটনার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচটি হল নির্মাণে ৩৬৭ কোটি টাকা ছাড় হয় এবং নির্মাণকাজের নানা প্রক্রিয়াও শুরু হয়। এ সময় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য প্রণীত মহাপরিকল্পনায় বড় ধরনের অনেক ত্রুটি ধরা পড়ে। পাশাপাশি কয়েকটি জাতীয় দৈনিকে এ প্রকল্পকে ঘিরে আর্থিক লেনদেনের খবর প্রকাশিত হয়। এতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মধ্যে এসব বিষয় নিয়ে অসন্তোষ দানা বাঁধে এবং মহাপরিকল্পনার পুনর্বিন্যাস ও দুর্নীতির বিচারের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়। প্রকল্প হাতে নেয়ার শুরু থেকেই লুকোছাপা, অস্বচ্ছতার খবর একের পর এক যেভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল; সেখান থেকেই আশঙ্কা ও অসন্তোষের শুরু। আন্দোলনের চাপে শেষ অবধি জাবি প্রশাসন ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের দু’টি দাবি মেনে নেয়। এতে আন্দোলনকারীদের দাবির যৌক্তিকতাই প্রমাণ হয়। ছাত্রলীগের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ১ নম্বর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং আরো দু’জন সহসভাপতি গণমাধ্যমে স্বীকার করেন, তারা ভিসির বাসায় তার পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে টাকা ভাগবাটোয়ারার মিটিংয়ে উপস্থিত ছিলেন এবং তারা টাকার ভাগ পেয়েছেন। তারা এমনও দাবি করেন, ‘ভিসির স্বামী ও ছেলের মুঠোফোনের ৮ থেকে ১০ আগস্টের কললিস্ট পরীক্ষা করলেই প্রমাণ মিলবে।’

ভিসি কেবল একটি পদ নয়, এটি প্রতীকী অর্থে নৈতিক ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো বিশ্ববিদ্যালয়ের অভিভাবকত্বের দায়িত্ব। ভিসির ‘কালিমালিপ্ত’ হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সবার নৈতিক অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। ভিসির বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনজনিত এ অপরাধের অভিযোগ উত্থাপিত হওয়ায় তার স্বপদে বহাল থাকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অনেকে মনে করেন, তার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করা উচিত ছিল, কিন্তু তিনি তা করেননি। ফলে বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

[email protected]


আরো সংবাদ




Paykwik Paykasa
Paykwik