১৬ নভেম্বর ২০১৯

১৯৫ যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রশ্নটি কি মীমাংসিত?

-

১৯৭০ সালে পাকিস্তানের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ ও পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে বিজয়ী হলেও পাকিস্তানের সেনা শাসক নানা অজুহাতে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার গঠনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এসব প্রতিবন্ধকতার কারণে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়, যা পরবর্তীকালে মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের রূপ লাভ করে। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা হলেও কার্যত ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ অবধি পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা অব্যাহত থাকে।

বাংলাদেশের মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রামের ব্যাপ্তি প্রায় ৯ মাস হলেও ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত পাকিস্তানের উভয় সীমান্তে যে প্রত্যক্ষ যুদ্ধ শুরু হয় ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ এর অবসানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় ঘটে।

পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান বাহিনীর আত্মসমর্পণ-পরবর্তী ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীকে ভারতে নিয়ে যাওয়া হয়। এ ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দীর মধ্যে সামরিক ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য, বেসামরিক কর্মকর্তা এবং কিছু পরিবারের সদস্য অন্তর্ভুক্ত ছিল।

আমাদের মুক্তি তথা স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালীন এ দেশে পাকিস্তান বাহিনী যে অত্যাচার ও উৎপীড়ন চালায়, তার নেতৃত্বে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দাবি করা হতে থাকে, ১৯৫ যুদ্ধাপরাধীকে বিচারের নিমিত্ত বাংলাদেশের নিকট সমর্পণ-পরবর্তী যেন অবশিষ্ট বন্দীদের ফেরত দেয়া হয়।

ভারত ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর মধ্যে জুলাই, ১৯৭২ সালে হিমাচল প্রদেশের রাজধানী সিমলায় যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়, এটি সিমলা চুক্তি নামে অভিহিত। চুক্তিটিকে শান্তি চুক্তি বলা হলেও চুক্তিটি তারও বেশি অবদান রাখে সৈন্য প্রত্যাহার ও যুদ্ধবন্দী বিনিময়ে। যেসব নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে চুক্তিটি প্রণীত হয় তা হলো সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণের নীলনকশা, দ্বন্দ্ব ও বিরোধ মেটানো, যা আগে সম্পর্কের হানি ঘটিয়েছে; স্থায়ী শান্তি, বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার জন্য কাজ করা এবং জম্মু ও কাশ্মিরে ১৭ ডিসেম্বর ১৯৭১ যুদ্ধবিরতির কারণে উদ্ভূত নিয়ন্ত্রণ রেখা উভয় পক্ষ অতীতের সম্মত নিয়ন্ত্রণ রেখাকে উপেক্ষাপূর্বক মেনে চলবে। তা ছাড়া চুক্তিটিতে যেসব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দেয়া হয় তা হলো- (ক) প্রত্যক্ষ দ্বিপক্ষীয় দৃষ্টিভঙ্গিতে শান্তিপূর্ণ উপায়ে সব বিষয়ের নিষ্পত্তিতে পারস্পরিক প্রতিশ্রুতি; (খ) জনসাধারণের সংস্পর্শকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ভিত রচনা ও (গ) জম্মু ও কাশ্মিরের নিয়ন্ত্রণ রেখার অলঙ্ঘন সমুন্নত রাখা, যা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে স্থায়ী শান্তির পথনির্দেশক।

চুক্তিটির আরো উল্লেখযোগ্য দিক হলো উভয়পক্ষ নিজ নিজ ভূখণ্ডগত অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে, একে অপরের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার ক্ষেত্রে বিরত থাকবে, এক অপরের একতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বগত সমতার প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করবে এবং বিদ্বেষমূলক অপপ্রচার পরিহার করে চলবে। চুক্তিটিতে আরো বলা হয়, দুই দেশের শাসনতান্ত্রিক বিধান অনুযায়ী চুক্তিটির অনুমোদন হতে হবে এবং অনুমোদন দলিল হস্তান্তরের দিন থেকে চুক্তিটি কার্যকর হবে। চুক্তি কার্যকর হওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে সৈন্য প্রত্যাহার সম্পন্ন হবে।

সিমলা চুক্তি-পরবর্তী ১৭ এপ্রিল ১৯৭৩ দিল্লিতে ভারত-বাংলাদেশ বৈঠক-পরবর্তী ঘোষণা করা হয়, পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি না দেয়া সত্ত্বেও উভয় দেশে উভয়ের নাগরিক আটক থাকার কারণে যে মানবিক সমস্যা উদ্ভূত হয়েছে তার নিরসন জরুরি। ঘোষণা-পরবর্তী ভারত-বাংলাদেশ ও ভারত-পাকিস্তান একাধিক বৈঠক হয়। এসব বৈঠকের ফলে বাংলাদেশের সম্মতিতে ২৮ আগস্ট ১৯৭৩ ভারত-পাকিস্তান মানবিক সমস্যা নিরসনে চুক্তিবদ্ধ হয়। এ চুক্তিটির অনুবলে ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩ তিনমুখী প্রত্যাবর্তন শুরু হয়। তিনমুখী প্রত্যাবর্তনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল পাকিস্তানে আটক বাঙালিদের স্বদেশে ফেরত, বাংলাদেশে আটক পাকিস্তানিদের স্বদেশে ফেরত এবং ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবন্দী বিনিময়।

ফেব্রুয়ারি, ১৯৭৪ পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। স্বীকৃতি-পরবর্তী ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ উপমহাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণে ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় চুক্তি হয়। এর আগে ২৮ আগস্ট ১৯৭৩ ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত দিল্লি চুক্তিতে যে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার কথা বলা হয়, তা পাকিস্তানের বাংলাদেশকে স্বীকৃতি-পরবর্তী ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ দিল্লি চুক্তিতে সমসার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সম্ভব হয়। এ চুক্তিটি স্বাক্ষর-পূর্ববর্তী যদিও আটক বাঙালি ও পাকিস্তানিদের প্রত্যাবর্তন এবং ভারতে অবস্থানরত যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবর্তন চলতে থাকে; কিন্তু এ চুক্তিটি সিমলা চুক্তিটির ব্যত্যয়ে ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর পাকিস্তানে ফিরে যাওয়ার সপক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করে। চুক্তিটির ১৩, ১৪, ১৫ ও ১৬ অনুচ্ছেদগুলো আলোচনা করা হলে এ বিষয়ে ধারণা স্পষ্টতর হবে।

অনুচ্ছেদ নম্বর ১৩ তে বলা হয়- উপমহাদেশে পুনর্মিলন, শান্তি ও বন্ধুত্ব প্রসঙ্গে সরকারগুলোর আন্তরিক আকাক্সক্ষায় তিনজন মন্ত্রীর মধ্যে পাকিস্তানি ১৯৫ জন যুদ্ধবন্দীর প্রশ্নটি আলোচিত হয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এসব যুদ্ধাপরাধীর বাড়াবাড়ি ও বহুবিধ অপরাধ জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত ও আন্তর্জাতিক আইন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা সংশ্লেষে প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী সবার মধ্যে ঐকমত্য হয়, ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর মতো যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুরূপ অভিযোগ রয়েছে, তাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণপূর্বক জবাবদিহির সম্মুখীন করতে হবে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেকোনো সংঘটিত অপরাধের জন্য তার সরকার গভীর নিন্দা ও দুঃখ প্রকাশ করে।

অনুচ্ছেদ নম্বর ১৪ তে বলা হয়- এ সংশ্লেষে তিনজন মন্ত্রী পুনর্বাসনকাজ দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য তিনটি দেশ যে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, বিষয়টিকে সে আঙ্গিকে দেখতে বলেন। মন্ত্রীরা পুনঃঅবহিত হন যে, স্বীকৃতি-পরবর্তী পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বাংলাদেশ সফর করবেন এবং বাংলাদেশের জনগণের কাছে অতীতের ভুল ভুলে গিয়ে ক্ষমা করার আবেদন করবেন। অনুরূপভাবে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত নৃশংসতা ও ধ্বংসযজ্ঞ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেন, তিনি চান জনগণ অতীত ভুলে যাক এবং নতুনভাবে যাত্রা শুরু করুক। কারণ বাংলাদেশের জনগণ জানে, কী করে ক্ষমা করতে হয়।

অনুচ্ছেদ নম্বর ১৫-তে বলা হয়- উপরোল্লিখিত ঘটনাবলি বিশেষত বাংলাদেশের জনগণের কাছে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী অতীতের ভুল ভুলে গিয়ে ক্ষমা করার আবেদনের ওপর শ্রদ্ধা রেখে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ক্ষমার নিদর্শনস্বরূপ বিচার নিয়ে আর অগ্রসর হবেন না। সিদ্ধান্ত হয়, ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী দিল্লি চুক্তির শর্তানুযায়ী ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াধীন অন্যান্য যুদ্ধবন্দীর মতো ফিরে যেতে পারবে।

অনুচ্ছেদ নম্বর ১৬ তে বলা হয়- মন্ত্রীরা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন, উপরোল্লিখিত চুক্তি ১৯৭১ সালের দ্বন্দ্ব থেকে উদ্ভূত মানবিক সমস্যা নিরসনে দৃঢ় ভিত রচনা করেছে। উল্লেখ্য, চুক্তিটিতে ভারতের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সরদার শরণ সিং, পাকিস্তানের পক্ষে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আজিজ আহমেদ এবং বাংলাদেশের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তিটি স্বাক্ষর-পরবর্তী পাকিস্তানি ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে ক্ষমালাভ-পরবর্তী পাকিস্তান প্রত্যাবর্তন করেছে। পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া-পরবর্তী বাংলাদেশের সাথে এটি প্রথম সরাসরি একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান ছাড়া এ চুক্তির অপর পক্ষ ভারত। চুক্তিটি অবলোকনে প্রতীয়মান হয়, বাংলাদেশের সম্মতির পরিপ্রেক্ষিতে ভারত তাদের হাতে আটক ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে পাকিস্তানের নিকট হস্তান্তরে সম্মত হয়।

আন্তর্জাতিক চুক্তি বিষয়ে আমাদের সংবিধানে যে বিধান রয়েছে, তা দ্বিতীয় ঘোষণাপত্র (পঞ্চদশ সংশোধন) আদেশ, ১৯৭৮ দিয়ে সন্নিবেশিত হয়। সন্নিবেশিত ১৪৫ক অনুচ্ছেদটি সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী দিয়ে অনুমোদিত হয়। এ অনুচ্ছেদটিতে বলা হয়, বিদেশের সাথে সম্পাদিত সব চুক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ করা হবে এবং রাষ্ট্রপতি তা সংসদে পেশ করার ব্যবস্থা করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রপতি যদি মনে করেন জাতীয় স্বার্থে তা সংসদে পেশ করার প্রয়োজন নেই, সে ক্ষেত্রে পেশ করা থেকে বিরত রাখা হবে। পরবর্তীকালে শর্তাংশটি সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী দিয়ে সংশোধিত হয় এবং তাতে পূর্বোক্ত শর্তাংশের পরিবর্তে নতুন শর্তাংশ প্রতিস্থাপনপূর্বক বলা হয়- তবে শর্ত থাকে যে, জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সংশ্লিষ্ট অনুরূপ কোনো চুক্তি কেবল সংসদের গোপন বৈঠকে পেশ করা হবে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক পঞ্চম সংশোধনী বাতিল ঘোষিত হলে ১৪৫ক অনুচ্ছেদটি সংবিধান থেকে অবলুপ্ত হয় এবং পরবর্তীকালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে অনুচ্ছেদটি দ্বাদশ সংশোধনী-পরবর্তী যে অবস্থায় ছিল সে অবস্থায় প্রতিস্থাপিত হয়।

আমাদের সংবিধানে আন্তর্জাতিক চুক্তিসংক্রান্ত যে বিধানটি বর্তমানে রয়েছে, স্পষ্টত তা ’৭২-এর সংবিধানে ছিল না। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হওয়া সত্ত্বেও বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবনপূর্বক পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা সংবিধানে পুনঃসন্নিবেশিত হয়।

বিদেশের সাথে সম্পাদিত কোন চুক্তি জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট এবং কোন চুক্তি জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট নয়, তা নির্ধারণের দায়িত্ব সরকারের। তা ছাড়া রাষ্ট্রপতির নিকট যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি পেশ-পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কর্তৃক তা সংসদে পেশ করার যে ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে, তাও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। আমাদের দেশে অদ্যাবধি একটি নজিরও নেই যে, একটি সরকার কর্তৃক সম্পাদিত যেকোনো আন্তর্জাতিক চুক্তি সে সরকার অথবা পরবর্তী ভিন্ন কোনো দলীয় সরকার সংসদের মাধ্যমে বাতিল করেছে। ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় স্বাক্ষরিত হওয়া-পরবর্তী কার্যকর হয়। এ ধরনের একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি কার্যকর হওয়া-পরবর্তী কার্যকরকালীন এ বিষয়ে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও তা উপেক্ষা বা অবজ্ঞার সুযোগ যে নেই; এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণের যৌক্তিকতা কোথায়?

প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৯৭৪ সালে মুজিব-ইন্দিরা যে স্থল সীমানা চুক্তি স্বাক্ষর হয় তা সংবিধানের তৃতীয় সংশোধনী দিয়ে অনুমোদিত হয়। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা না থাকা সত্ত্বেও এ চুক্তিটি কেন বঙ্গবন্ধু সংসদে পেশ-পরবর্তী অনুমোদনের ব্যবস্থা করেছিলেন? এ চুক্তিটির সাথে ভূমিবিনিময় জড়িত থাকায় তাতে সাংবিধানিকভাবে যে ভূখণ্ড সমন্বয়ে বাংলাদেশ গঠিত, এর সংযোজন ও বিয়োজনের আবশ্যকতা দেখা দেয়। এরূপ সংযোজন ও বিয়োজনের পক্ষে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে একমাত্র সংসদই অনুমোদন ব্যক্ত করতে পারে। অনুরূপ চুক্তি বাংলাদেশ পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত থাকাকালে ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৫৮ তৎকালীন ভারতের প্রধানমন্ত্রী জওয়াহেরলাল নেহরু ও তৎকালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ফিরোজ খান নূনের মধ্যে সম্পাদিত হয়, যা নেহরু-নূন চুক্তি নামে অভিহিত। এ চুক্তিটিতে ভারত ও পাকিস্তানের ভূমিবিনিময় জড়িত থাকায় ভারতের জনৈক নাগরিক এর বিরুদ্ধে মামলা করলে তা সে দেশের সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। মামলায় সিদ্ধান্ত দেয়া হয়, চুক্তিটি কার্যকর করতে হলে সংবিধান সংশোধন করতে হবে এবং সে অনুযায়ী ১৯৬০ সালে ভারতের সংবিধানে নবম সংশোধনীর মাধ্যমে চুক্তিটি অনুমোদিত হলেও নানা জটিলতায় এর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এ চুক্তিটিতে অন্যান্য ভূখণ্ড ও ছিটমহল বিনিময়ের পাশাপাশি ১২ নম্বর দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়ন দ্বিখণ্ডনপূর্বক এর দক্ষিণ অংশ পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত এবং উত্তরাংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হবে মর্মে উল্লেখ ছিল। দক্ষিণ বেরুবাড়ী নিয়ে যে বিরোধ তার মূলে ছিল, রেডক্লিফ যে সীমারেখা টানেন তাতে ১২ নম্বর দক্ষিণ বেরুবাড়ী ইউনিয়ন ভারতের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়, কিন্তু তার লিখিত বিবরণে তা পূর্ব পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত দেখানো হয়। বাংলাদেশ-ভারত স্থল সীমানা চুক্তি ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সংসদে অনুমোদিত হলেও ভারতের সংসদে এ চুক্তিটি ২০১৫ সালে অনুমোদিত হয়।

যুদ্ধাপরাধীর বিচারের সাথে সম্পৃক্ত বাংলাদেশের কিছু আইনজ্ঞ অভিমত ব্যক্ত করেন, ৯ এপ্রিল ১৯৭৪ ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে সম্পাদিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তিটি বাংলাদেশের সংসদে অনুমোদিত না হওয়ায় চুক্তিটিতে পাকিস্তানি ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীকে ক্ষমা করার কথা বলা হলেও তা মেনে চলার জন্য বাংলাদেশ বাধ্য নয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, চুক্তিটি সম্পাদনকালে আমাদের সংবিধানে আন্তর্জাতিক চুক্তিবিষয়ক কোনো অনুচ্ছেদ ছিল না। আর তাই ত্রিপক্ষীয় এ চুক্তিটি যে সংসদে পেশ করার বাধ্যবাধকতায় আবদ্ধ নয় তা সুস্পষ্ট। সে নিরিখে পাকিস্তানি ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের প্রশ্নটি যে মীমাংসিত তা নিয়ে যেকোনো ধরনের বিতর্ক অহেতুক বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টির নামান্তর নয় কি?

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
E-mail: [email protected]


আরো সংবাদ

যথাযথ মর্যাদায় ভেটারানস ডে উদযাপিত নাশকতা কি না খতিয়ে দেখা হচ্ছে : রেলমন্ত্রী বাবরি মসজিদ রক্ষায় মুসলিমদেশগুলোকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে : ইসলামী আন্দোলন কুমিল্লায় ২ কিশোর ও গেটম্যানের বুদ্ধিমত্তায় রক্ষা পেল যাত্রীবাহী ট্রেন রাষ্ট্রপতি দেশে ফিরেছেন সাভার উপজেলা আ’লীগের সম্মেলনে : হাসিনা-সভাপতি রাজিব-সাধারণ সম্পাদক প্রধানমন্ত্রী দুবাই এয়ারশোতে যোগ দিতে আমিরাত যাচ্ছেন আজ ঢাবি থেকে ২৬ জনের পিএইচডি লাভ ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অবসর গ্রহণের সুযোগ নেই : মহানগর জামায়াত অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি জ্ঞাপনপত্র প্রাথমিক শিক্ষকদের প্রত্যাখ্যান তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিলো কমিটি

সকল