১৬ অক্টোবর ২০১৯

ভিকটিম : ক্ষতিপূরণ ও আইনগত সমীক্ষা

-

প্রাচীন যুগে ইংরেজি শব্দ ঠরপঃরস বলতে ধর্মোদ্দেশ্যে বলি দেয়া কোনো মানুষ বা প্রাণীকে বোঝাত। দেবতার নামে বা কোনো ধর্মীয় উৎসবে জীবিত মানুষকে বলি (হত্যা করা) দেয়ার ধর্মীয় সংস্কৃতি এক সময় চালু ছিল। দেবতার উদ্দেশ্যে তখন যাকে জবাই করা হতো তাকেই ‘ভিকটিম’ বলা হতো। কিন্তু আধুনিক যুগে হত্যা, আঘাত (ওহলঁৎু), হামলা (অংংধঁষঃ), অবিচার, রোগব্যাধি, প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা কমিউনিটিকে বোঝায় এ শব্দ দ্বারা। আধুনিক ধারণায়, আইন ভঙ্গের কারণেও মানুষ ভিকটিম হতে পারে। আমেরিকান ঐঁসধহ জরমযঃং অপঃ মোতাবেক, মানবাধিকার বিষয়ক ইউরোপীয় কনভেনশন-বিরোধী কোনো করণ বা অকরণের (উড় ড়ৎ ঁহফড়) দ্বারা প্রকৃতপক্ষে বা প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিসম্পন্ন ব্যক্তিকেই ‘ভিকটিম’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হচ্ছে।

২০০৪ সালে আইন বিশেষজ্ঞ ও ঔড়যহ ঔধু ঈড়ষষবমব ড়ভ ঈৎরসরহধষ ঔঁংঃরপব-এর অধ্যাপক অহফৎবি কধৎসবহ ভিকটিমের ওপর একটি তথ্যভিত্তিক সূত্র প্রদান করে বলেন, কোনো বেআইনি কার্যকলাপের জন্য কেউ শারীরিক, আবেগগতভাবে এবং অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সে ব্যক্তিও ভিকটিম বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত হবেন। অপরাধবিজ্ঞান পর্যালোচনায় ভিকটিমের সংজ্ঞায় আরো অনেক শব্দ যোগ হয়েছে, যেমনÑ কোনো ব্যক্তি কোনো কারণে ষড়ংং বা ওহলঁৎু বা যধৎফংযরঢ় প্রভৃতি কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে তিনিও ভিকটিমের আওতায় আসেন। আইন বা ক্ষমতার অপপ্রয়োগ, ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ, দুর্ঘটনা বা জীবাণু সংক্রান্ত আঘাত, অস্বচ্ছতা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইন দ্বারাও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত বা ঠরপঃরস হয়ে থাকে। ভিকটিম দুই প্রকারের, যথাÑ (১) প্রত্যক্ষ বা প্রাইমারি এবং (২) পরোক্ষ বা সেকেন্ডারি। যে ব্যক্তি প্রত্যক্ষভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন তিনি প্রাইমারি ভিকটিম। কিন্তু যে ব্যক্তি সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত নন, বরং আবেগের ক্ষেত্রে ও অনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত, তিনি ‘সেকেন্ডারি ভিকটিম’ হিসেবে চিহ্নিত।

প্রায় চার হাজার ৫০০ বছর আগে প্রাক্-ব্যবিলনিয়ান যুগে যখন ঈড়ফব ড়ভ টৎঘধসসঁ চালু ছিল, তখন অপরাধী ভিকটিমকে ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হতো। ওই আইনে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কবল থেকে নারী ও এতিমদের সুরক্ষার বিধান করা হয়েছিল। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকেই ওই আইনে অপরাধীর শাস্তির পরিমাণ নির্ধারণের ক্ষমতা দেয়া হয়েছিল, যেমন ‘চক্ষুর পরিবর্তে চক্ষু’, ‘নাকের পরিবর্তে নাক’ প্রভৃতিও তখন আইনসিদ্ধ ছিল।

প্রায় চার হাজার বছর আগে ব্যবিলনিয়ান আইন ঈড়ফব ড়ভ ঐধসসঁৎধনর মোতাবেক অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার বিষয়ে নিম্নবর্ণিত নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়-

(ক) শক্তিশালী বা প্রভাবশালী মহল দুর্বলকে আঘাত করতে পারবে না। (খ) কর্তৃপক্ষ বা রাষ্ট্র যদি ডাকাত ধরতে না পারে বা আইনের আওতায় আনতে সক্ষম না হয় তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে রাষ্ট্র ক্ষতিপূরণ প্রদান করবে। (গ) কোনো ব্যক্তি যদি কারো গবাদি পশুকে ক্ষতিগ্রস্ত বা আহত করে তাহলে আহত পশু সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিকে তার (অপরাধীর) পশুসংশ্লিষ্ট ভিকটিমকে ব্যবহার করতে দিতে বাধ্য থাকবে।

ইতালির প্রখ্যাত মনোবিজ্ঞানী ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঈবংধৎব ইবপপধৎরধ (১৭৩৮-১৭৯৪) ভিকটিমের অধিকার সম্পর্কে নতুন একটি মতবাদ চালু করেন, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো : (ক) অপরাধীর কাছ থেকে ভিকটিমের জন্য মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিপূরণ আদায় করা অযৌক্তিক। (খ) নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করার জন্য অপরাধীকে সুযোগ দিতে হবে। (গ) তিনি মনে করেন, বিচারে আদালতের রায় দ্বারা বা কোনো আদেশে কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি দৃঢ়তার সাথে বলেছেন, “অষষ সবসনবৎং ড়ভ ধ ংড়পরঃু পড়ঁষফ নব ারপঃরস ড়ভ ঃযব ষধি ধহফ ঃযড়ংব ঃধংশবফ রিঃয ধফসরংঃবৎরহম ঃযব ষধ.ি” ক্ষমতার অপব্যবহারেও মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এ দর্শনেও ইবপবৎৎধ বিশ্বাস করতেন। ১৯৪১ সালে ঐধহং ঠড়হ সর্বপ্রথম ভিকটিম ও অপরাধীর পারস্পরিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার ওপর একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। ১৯৪৭ সালে ফ্রান্সের দার্শনিক ইবহলধসরহ গবহফবষংড়হ ভিকটিমের বিষয়টি জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন।

ব্রিটিশ আইন সংস্কারক গধৎমবৎু ঋৎু ১৯৫০ সালে ঞযব জড়ড়ঃং ড়ভ ঈৎরসব শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছেন এবং ১৯৫১ সালে অৎসং ড়ভ ঃযব খধি নামে একটি পুস্তক প্রকাশ করেন, যাতে তিনি ভিকটিমের ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত বিষয়ে নিম্নবর্ণিত তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। যথাÑ (ক) ক্ষতিগ্রস্ত নারীকে আশ্রয় দিতে হবে, (খ) ভিকটিম ও অপরাধীর মধ্যে ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নির্ধারণ করতে হবে ও (গ) আঘাতপ্রাপ্তির কারণে ভিকটিম যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছেন, সে পরিমাণ অর্থ অপরাধীর নিকট থেকে আদায় করতে হবে। গধৎমবৎু ঋৎু-এর মতবাদ মোতাবেক, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ১৯৬৩ সালে সর্বপ্রথম নিউজিল্যান্ড ‘ভিকটিম ক্ষতিপূরণ তহবিল’ গঠন করে। অনুরূপভাবে, ১৯৬৪ সালে ব্রিটেন, ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউ ইয়র্ক ১৯৬৬ সালে হাওয়াই প্রভৃতি রাজ্যগুলোতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে ভিকটিম ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠিত হয়েছে।

আমেরিকার কংগ্রেস ১৯৯০ সালে ঠরপঃরসং জরমযঃং ধহফ জবংঃরঃঁঃরড়হ অপঃ এবং ১৯৯৪ সালে ঠরড়ষবহপব ধমধরহংঃ ডড়সবহ অপঃ পাস করে। অনুরূপ ২০০০ এবং ২০০৩ সালে বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতন আইন পাস করা হয়। ২০১৩ সালে শিশু আইন ও প্রতিবন্ধী সুরক্ষা আইন বাংলাদেশ পার্লামেন্ট পাস করে। কিন্তু এই আইনের প্রভাব ও কার্যকারিতা খুবই ধীরগতি এবং এর কারণ নানাবিধ।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দাবি দীর্ঘ দিনের, কিন্তু এর প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে ব্যক্তি শাসন প্রতিষ্ঠার কূটকৌশল বর্তমানে অনেক বেশি দেখা যায়।

রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ব্যক্তিশাসন প্রতিষ্ঠার পক্ষে। কারণ, ব্যক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকলে কর্মচারীরা অর্থাৎ আমলারা সমুদয় সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন এবং ক্ষমতা প্রদর্শনের রাস্তা থাকে অনেক প্রশস্ত। কেননা ব্যক্তিশাসনে জবাবদিহিতার পথ ক্রমেই সরু হওয়ার কারণে রাজকর্মচারীরা ধরাকে সরাজ্ঞান করেন বিধায় যা খুশি তাই করতে পারেন। শুধু উপরন্তু কর্মকর্তাকে সন্তুষ্ট রাখতে পারলেই তাদের পথে দৃশ্যত অন্য কোনো কাঁটা থাকে না। বিচারপ্রক্রিয়া, বিচারকের স্বাধীনতা প্রভৃতি বিষয়ে প্রতিনিয়তই অনেক কথা আওড়ানো হচ্ছে। বিচারকদের সরকারের মুখের দিকে তাকিয়ে মামলার রায় দিতে হয়, এটা বিচার প্রার্র্থীদের অনেকে অভিযোগ করে। প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিদায় প্রসঙ্গ পর্যালোচনা করলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা আজ কোন পর্যায়ে, তা সহজেই উপলব্ধি করা যায়। জনগণের অসন্তুষ্টির কারণে দিনে দিনে বিকল্প বিচারব্যবস্থার দাবি উঠেছে এবং এ ব্যবস্থার সুফল মানুষ পেতে শুরু করেছে।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে বিকল্পবিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) মাধ্যমে দেশে ১০ হাজার ৩৫৭ জনকে এর সুফল দেয়ার মাধ্যমে আট কোটি ২৫ লাখ দুই হাজার ২৭০ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষকে আদায় করে দেয়া হয়েছে বলে ‘জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা’ দাবি করেছে। এ ছাড়া সফল বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি হওয়ায় উপকারভোগীরা আদালত থেকে ২৪৩টি মামলা তুলে নেন। জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থা বিনামূল্যে দুই পক্ষের সমঝোতার মাধ্যমে এ অর্থ আদায় করে দিয়েছে। সংস্থাটির বার্ষিক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়েছে, বিকল্প পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি সারা বিশ্বে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। তাদের মতে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিরোধী পক্ষের সম্মতিতে একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি হয়েছে।

বিচারব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি। রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা জনগণের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে আইন প্রণেতাদের ব্যাপারেও। প্রথম অভিযোগ, হালে তারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়নি, বরং জনগণকে জিম্মি ও ভিকটিম বানিয়ে ‘গৃহপালিত’ নির্বাচন কমিশন দিয়ে নির্বাচনী ফলাফল হাতের মুঠোয় নিয়েছেন। এটা এক ধরনের দুর্নীতি। এ নিয়ে প্রশ্ন উপস্থাপন একমাত্র বিচার বিভাগই করতে পারতেন তার এখন আর অবকাশ কোথায়?

একটি সভ্য সমাজ ব্যবস্থায় রাষ্ট্রীয় কোনো ব্যবস্থা ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া কাক্সিক্ষত বা বাঞ্ছনীয় নয়। সুষ্ঠু বিচারিক ব্যবস্থা ছাড়া একটি রাষ্ট্র, সমাজ বা জাতি চলতে পারে না। আইনের প্রকৃত শাসনই এখন সময়ের দাবি। সে আইন হতে হবে জনকল্যাণমুখী, যে আইন শাসকের গদি রক্ষার জন্য ব্যবহৃত হয়, সে আইন মোটেও কল্যাণমুখী নয়। জনকল্যাণমুখী ব্যবহার স্বাধীনতার সার্থকতা বয়ে আনে, সার্থক হয় শহীদদের রক্ত। আইন প্রণয়ন ও প্রয়োগ হোক শাসকের নয়, বরং জনগণের স্বার্থে। ভিকটিম যেন পান তার উপযুক্ত বিচার ও ক্ষতিপূরণ। ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত হোক সর্ব ক্ষেত্রে আপন গতিতে।

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন সুপ্রিম কোর্ট)
[email protected]


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum