১৫ অক্টোবর ২০১৯
তৃতীয় নয়ন

পরিকল্পনা ও কল্পনার পরি

To kill a few people is murder. But killing numerous people is merely statistics. অর্থাৎ, কয়েকজন মানুষ খুন করার অর্থ, হত্যাকাণ্ড। তবে অসংখ্য মানুষকে খুন করা মানে, নিছক পরিসংখ্যান। এমন হৃদয়হীন অবিশ্বাস্য উক্তি যিনি করে গেছেন তিনি নিজের জন্য বেছে নেয়া নামটির সার্থকতার প্রমাণ দিয়েছেন। মানবসন্তানদের প্রাণনাশ করা নিয়ে চরম অমানবিক, এই মন্তব্য করেছিলেন কমরেড যুসেফ যুগাশিভিলি যিনি ‘স্টালিন’ নামে বিশ্বে বহুল পরিচিত। ‘স্টালিন’-এর অর্থ স্টিল বা ইস্পাতের তৈরি; এককথায় ‘লৌহকঠিন’। জর্জিয়ার এক হতদরিদ্রের সন্তান স্টালিন (১৮৭৯-১৯৫৩) যে লৌহকঠিন অন্তরের অধিকারী ছিলেন, তার প্রমাণ তিনি বহুবার দিয়েছেন।
বিশ্বের প্রথম কমিউনিস্ট রাষ্ট্র হিসেবে (অধুনালুপ্ত) সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা বৃহত্তর রাশিয়ার দ্বিতীয় কর্ণধার ছিলেন স্টালিন। এদিক দিয়ে তার নাম আসে লেনিনের পরই। স্টালিনকে নিয়ে আজো বিতর্কের শেষ নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়াকে হিটলারের গ্রাস থেকে রক্ষার কৃতিত্ব তাকে নায়কের মর্যাদা দিয়েছে। অপর দিকে, কঠোর স্বৈরশাসন আর রাষ্ট্রীয় চরম নিপীড়নের ঘটনাগুলো তাকে নামিয়ে এনেছে ভিলেনের পর্যায়ে।

তা ছাড়া, পরিসংখ্যান তথা আদমশুমারিসংক্রান্ত বিষয়েও স্টালিন আলোচিত ও সমালোচিত। মাঝে মাঝেই এর পুনরুল্লেখ দেখা যায় বাংলাদেশের পত্রিকার পাতায়ও। যেমন, মাত্র গত সপ্তাহেও একটি দৈনিকে ‘সোভিয়েত গণহত্যা’ শিরোনামে স্টালিনবিষয়ক কিছু তথ্য দেয়া হয়েছে। সেখান থেকে উদ্ধৃতি দেয়া হলো।

“ঐতিহাসিকরা একমত যে, দুর্ভিক্ষ এবং রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসকে বিবেচনায় আনা হলে স্টালিন ও তার সহযোগীরা লাখ লাখ লোকের মৃত্যুর জন্য পরোক্ষ কিংবা প্রত্যক্ষভাবে দায়ী। স্টালিনের শাসনামলে আনুমানিক হিসাবে কমপক্ষে সাড়ে তিন কোটি মানুষ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। ১৯২৬-৩৭ সালের আদমশুমারিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের জনসংখ্যা বিপুলভাবে হ্রাস পায়। অনুমান করা হয়, এর আগের ৭ বছরে হত্যাকাণ্ড এবং অনাহারের শিকার হয়ে ৫০ লাখ থেকে এক কোটি লোকের মৃত্যু হয়। ১৯৩১-৩৪ সালের দুর্ভিক্ষে লাখ লাখ লোকের মৃত্যু হয়েছিল। ফলে অনুমান করা যায়, আদমশুমারিতে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়া ছিল স্বাভাবিক।

১৯২৬ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সোভিয়েত ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ছিল ১৪ কোটি ৭০ লাখ। ১৯৩৭ সালের আদমশুমারিতে লোকসংখ্যা দাঁড়ায় আগের চেয়ে ১ কোটি ৪০ লাখ কম। অনুমান করা হয়, ওই সময় প্রায় দেড় কোটি মানুষ অপমৃত্যু বা হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। বিষয়টি ফাঁস হয়ে পড়ায় এই আদমশুমারিকে ‘চৌর্যবৃত্তির শুমারি’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয় এবং গণনাকারীদের কঠোর শাস্তি দেয়া হয়। ১৯৩৯ সালে আবার আদমশুমারি করা হয়। সে আদমশুমারিতে সোভিয়েত ইউনিয়নের লোকসংখ্যা ১৭ কোটি বলে প্রচার করা হয়েছিল। ব্যাপক মৃত্যুতে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ার সত্যতা ধামাচাপা দেয়ার জন্যই স্টালিনের নির্দেশে বাড়তি জনসংখ্যা প্রচারের উদ্যোগ নেয়া হয়।”

আদমশুমারি থেকে এবার অন্য এক শুমারি প্রসঙ্গ। এই পরিসংখ্যানস্থল রাশিয়া থেকে বহু দূরে। এ ক্ষেত্রে নেই ভয়াবহতা কিংবা খুনখারাবি। তবুও সংখ্যা গণনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে গুরুতর। দেশটির নাম মালয়েশিয়া। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশটি আমাদের বাংলাদেশসহ অনেকের কাছে উন্নয়নের ‘রোলমডেল’। তাই ‘মালয়েশিয়ার দারিদ্র্যবিষয়ক পরিসংখ্যান অশুদ্ধ’ শীর্ষক সংবাদ দেখে অনেকেরই চমকে ওঠার কথা। মুসলিম বিশ্বের যে রাষ্ট্র মোটরগাড়ি পর্যন্ত বানায় এবং যারা এশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম ইমার্জিং টাইগার, তাদের হিসাবে ভুল হওয়া যেমন ‘অবিশ্বাস্য’; তেমনি কেউ কেউ মনে করতে পারেন, ‘মালয়েশিয়াতে বাংলাদেশের বহু গরিব লোক কাজ করছে ও যেতে চাচ্ছে। সে দেশের মানুষ গরিব থাকে কী করে?’ এদিকে, বিশেষ করে বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন মহলের নেতানেত্রীরা মালয়েশিয়ার মাহাথিরের মতো রাষ্ট্রনায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখে থাকেন।

যা হোক, এবার জাতিসঙ্ঘের এক রিপোর্টের সূত্রে মিডিয়ার খবর- মালয়েশিয়া সরকারের দাবি, সে দেশ থেকে দারিদ্র্য প্রায় নির্মূল হয়ে গেছে। এর সাথে ভিন্ন মত পোষণ করে জাতিসঙ্ঘের একজন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞ বলেছেন, মালয়েশিয়ার সরকার এ ব্যাপারে যেসব পরিসংখ্যান দিয়েছে সেগুলো অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক নয় এবং বাস্তবতার প্রতিফলন এতে ঘটেনি।

রয়টার্সের প্রতিনিধি কুয়ালালামপুর থেকে যে প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন, এতে উল্লেখ করা হয়, ‘মালয়েশিয়ার দারিদ্র্যহার ১৯৭০ সালে ছিল ৪৯ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে তা হ্রাস পেয়ে হয়েছে মাত্র দশমিক ৪ শতাংশে। আর এটাই মালয়েশীয় সরকারের হিসাব।’ অর্থাৎ কুয়ালালামপুর সরকারের বক্তব্য হলো, ১৯৭০ এ মালয়েশিয়ার প্রায় অর্ধেক মানুষ ছিল গরিব। এখন তারা মোট জনসংখ্যার এক শতাংশের অর্ধেকেরও কম। তবে চরম দারিদ্র্য ও মানবাধিকারের বিষয়ে জাতিসঙ্ঘের স্পেশাল র‌্যাপোর্টিয়ার ফিলিপ অ্যালস্টন বলেছেন, ‘মালয়েশিয়ায় দারিদ্র্যসংক্রান্ত সরকারি জরিপ চালানো হয়েছে বর্তমানে অচল হয়ে পড়া পদ্ধতিতে।

এ কারণে দেখা যায়, জীবনযাত্রার ব্যয় ক্রমবর্ধমান হলেও দশকের পর দশক দারিদ্র্যের পরিমাপের ভিত্তি বদলায়নি।’ এদিকে, স্বাধীনভাবে পরিচালিত জরিপ বিশ্লেষণে জানা যায়, মালয়েশিয়া দেশটিতে দারিদ্র্য আজও রয়ে গেছে ‘উল্লেখযোগ্য’ মাত্রায় এবং এর দারিদ্র্যের প্রকৃত হার প্রায় ১৫ শতাংশ। এ প্রেক্ষাপটে ফিলিপ অ্যালস্টনের ভাষায়, সরকারি পরিসংখ্যানকে মেনে নিলে বলতে হয়, দারিদ্র্যবিমোচনে মালয়েশিয়া এখন ‘বিশ্বচ্যাম্পিয়ন’। তবে আসলে যে তা নয়, এটা স্পষ্ট। তিনি ১১ দিন মালয়েশিয়া সফর করে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেছেন।

তবে মালয়েশীয় সরকারের অর্থনীতিবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আজমিন আলী বলেছেন, ‘চরম দারিদ্র্যের হারের ব্যাপারে সরকার নিজের বক্তব্যে অটল।’ শেষবারের মতো ২০১৬ সালে এটা রেকর্ড করা হয়েছে ০.৪ শতাংশ। মন্ত্রী এক বিবৃতিতে অঙ্গীকার করেছেন, সরকার অঞ্চল ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে দারিদ্র্য ও দুর্দশার বাকি পকেটগুলোকেও নির্মূল করে দেবে। অবশ্য তিনি উল্লেখ করেন, যাতে জীবনযাত্রার ব্যয়ের দিকটি ‘আরো ভালোভাবে’ প্রতিফলিত হয়, সে জন্য ‘দারিদ্র্যরেখা’র মধ্যে বসবাসরত মানুষদের আয় নির্ধারণপদ্ধতিকে সরকার পর্যালোচনা করে দেখছে। এতে দারিদ্র্যমোচনের বিষয় আরো ফলপ্রসূ হবে বলে কর্তৃপক্ষ আশাবাদী।

উল্লেখ করা দরকার, বিশ্বসংস্থার বিশেষজ্ঞ অ্যালস্টন দারিদ্র্যমোচনের পদ্ধতি পুনর্মূল্যায়নের জন্য মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি উল্লিখিত সংবাদ সম্মেলনে আরো বলেছেন, “মালয়েশিয়ার বিভিন্ন সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠী যেমন রাষ্ট্রবিহীন পরিবার, অভিবাসী শ্রমজীবী ও উদ্বাস্তুদেরও এ প্রসঙ্গে পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। অথচ তা করা হয়নি।’ তার কথা হচ্ছে, প্রতিটি খানা বা পরিবারের মাসে ৯৮০ রিঙ্গিত বা ২৩৪ ডলার ব্যয়কে জাতীয় দারিদ্র্যের সীমানা হিসেবে গ্রহণ করা ‘হাস্যকর’ ব্যাপার। কারণ, এর অর্থ হলো- চার জনের একটি শহুরে পরিবারকে এমনভাবে বাঁচতে হবে যাতে প্রতিদিন একজন লোকের মাত্র ৮ রিঙ্গিত বা ২ ডলারেরও কম খরচ করতে হবে। চরম দুর্গতির সময় ছাড়া এভাবে চলা অসম্ভব।” অ্যালস্টন বলেন, দারিদ্র্যের হার কমিয়ে দেখানোর দরুন এই সঙ্কট উত্তরণে গৃহীত সরকারি নীতিমালা ফলপ্রসূ হয় না এবং এ ক্ষেত্রে এমন অনেক কর্মসূচি রয়েছে যার তহবিল অপর্যাপ্ত; আর যা অকার্যকর।

এবার আসুন, আমাদের বাংলাদেশের কথায়। এখানে প্রায় প্রতি মাসেই কোনো-না-কোনো বিষয়ে জরিপ করা বা পরিসংখ্যান নেয়া হয়। এজন্য সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে আছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) যা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অন্তর্ভুক্ত। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সিপিডি বা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ এবং টিআইবি অর্থাৎ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশও মাঝে মাঝে জরিপ পরিচালনা করে থাকে। সরকারি সাহায্যপুষ্ট স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজও (বিআইডিএস) এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য।

তবে মাঝে মাঝে দেখা যায়, দেশের জন্য গুরুত্ববহ কোনো কোনো বিষয়ে একই সময়ে জরিপ চালিয়েও সরকারি ও বেসরকারি মহল ভিন্ন ভিন্ন, তথা বিভ্রান্তিকর পরিসংখ্যান পেশ করছে। কয়েক বছর আগে জাতীয় প্রবৃদ্ধির সম্ভাব্য হার নিয়ে এমনটা হয়েছিল। আর সরকারি প্রতিষ্ঠান বা দফতরের জরিপসহ নানা কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে জনগণের অনাস্থা ও সন্দেহের প্রবণতা সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই দৃশ্যমান। পরাধীন আমলে বিদেশী শাসকদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা এর সূচনা করেছিল আর স্বাধীন সময়ে দেশী শাসকদের আমলাতান্ত্রিক বা প্রভুসুলভ মনোবৃত্তি এটাকে রেখেছে অব্যাহত। এর জের ধরেই প্রশাসনের দেয়া পরিসংখ্যান নিয়ে জনমনে দেখা যায় সন্দেহ, আর পরিসংখ্যান ব্যুরোকে বলা হয় পরিসংখ্যান ‘বুড়ো’।

১৯৪৭ সালে এ উপমহাদেশ স্বাধীনতা লাভের পরে সৃষ্ট, তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রের একটি পরিসংখ্যান নিয়ে মুখরোচক জনশ্রুতি রয়েছে। তা হলো, সরকার একবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, দেশব্যাপী ছাগলের সংখ্যা জরিপ করা হবে। প্রচলিত ধারায়, এ আদেশ সচিব পর্যায় থেকে ধাপে ধাপে নামতে নামতে একেবারে থানা (বর্তমান উপজেলা) পর্যায়ে এসে পৌঁছে। থানা লেভেলের সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তি অফিসে বসেই মনগড়া পরিসংখ্যান রিপোর্ট বানিয়েছিলেন। তিনি সরেজমিন ছাগলের সংখ্যা অনুসন্ধানের কষ্টটুকু না করে বরং সে বাবদ বরাদ্দকৃত অর্থ পকেটস্থ করতে দ্বিধা করেননি। যথাসময়ে ছাগলসংক্রান্ত রিপোর্ট নিয়ে তিনি তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দফতরে হাজির। সে অফিসার রিপোর্টে চোখ বুলিয়ে বুঝে গেলেন যে, এটা ‘কাজীর গরু’ মার্কা প্রতিবেদন। সাথে সাথে থানা পর্যায়ের ওই কর্মকর্তাকে নির্দেশ দিলেন, ‘আরেকটা ছাগল যোগ করুন।’ তিনি তো শুনে কিছুই বুঝতে না পেরে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। এটা দেখে তার ‘বস্’ চড়া গলায় বলে উঠলেন, ‘কী হলো, লিখছেন না কেন? ছাগল একটা বাদ পড়েছে যে।’ থানা কর্মকর্তা জানতে চাইলেন, ‘ওই ছাগলটা কার?’ জবাবে ‘বস্’ বললেন, ‘আপনি নিজেই সেই ছাগল।’

মাঠপর্যায়ে কাজ না করে, অর্থাৎ বাস্তবতার সাথে সম্পর্কহীন রিপোর্ট দেয়ার ঘটনা শিক্ষা ক্ষেত্রে-বিশেষত সাক্ষরতার ব্যাপারে অনেক জায়গায় ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সাক্ষরতার বিষয়টি অতীব গুরুত্বপূর্ণ; তাই অভিযোগটি খুব গুরুতর। দেশে এমন মানুষ রয়েছেন যিনি সম্পূর্ণ নিরক্ষর হয়েও নিজের নাম লিখতে পারেন মুখস্থ করে। প্রথম দৃষ্টিতে তাকে সাক্ষর মনে হতে পারে। তবে ‘একটু বাজিয়ে দেখলেই’ গোমর ফাঁস হয়ে যাবে। এমন ‘ক অক্ষর গো মাংস মার্কা’ মানুষকে যদি সাক্ষরতার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়, তা হলে অবস্থাটা কী দাঁড়ায়? গ্রামাঞ্চলে কথায় বলে, ‘নাম তো বকশ আলী,/লিখতে ফাডাফাডি।’ অর্থাৎ, নিজের নামও লিখতে পারে না অনেকে। বিগত ষাটের দশকে (এবং পরবর্তী দশকেও) আমাদের দেশে স্কুল পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করা হয়েছে নিরক্ষরতা দূরীকরণের জন্য। এ কারণে তাদের পরীক্ষায় বিশেষ নাম্বার দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তখন দেখা যায়, বাড়ির কাজের লোক, বাসার বুয়া ও দারোয়ান প্রমুখকে অক্ষরজ্ঞান দানের তোড়জোড় শুরু হয়েছে। কিছু দিন পরে কর্তৃপক্ষের উৎসাহের ইতি ঘটলে যথারীতি এ তোড়জোড়েরও অবসান ঘটে।

বাংলাদেশের সরকারগুলো গত কয়েক দশক ধরে সাক্ষরতার ক্ষেত্রে ‘অনেক অগ্রগতি’ হওয়ার তথ্য ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে তুলে ধরছে। দেশের শতকরা ৬০ কিংবা ৭০ ভাগ মানুষ এখন নিরক্ষরতামুক্ত- এমন দাবি ও প্রপাগান্ডা ব্যাপক হলেও সচেতন নাগরিকেরা কখনো এহেন প্রচারণাকে বাস্তবভিত্তিক মনে করেন না। যে দেশে উন্নয়নের জয়ঢাক পেটানো হয় প্রকৃত উন্নতি ছাড়াই, যেখানে প্রবৃদ্ধি ঘটে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাওয়া ছাড়াই এবং গণমানুষ আজো ‘প্রজা’ রয়ে গেছে বলে ‘নাগরিক’ অধিকার পায় না, যে দেশে গণতন্ত্রের নামে সুশাসনহীন প্রশাসনের দাপট চরমে, সে দেশে শুধু সাক্ষরতা নয়, সব ক্ষেত্রেই ফাঁক ও ফাঁকি থাকা সম্ভব। এ কারণে ‘সবার জন্য শিক্ষা’ কর্মসূচি কয়েক দশকেও কাক্সিক্ষত সাফল্য পায়নি। এমনকি, নিছক ‘সাক্ষরতা’কে ‘শিক্ষা’ হিসেবে তুলে ধরেও পরিসংখ্যানের গোমরটা ধামাচাপ দেয়া যায় না। এবার সাক্ষরতা নিয়ে সরকারের যে হিসাব, তা কতটা বাস্তব আর কতখানি অমূলক, সে প্রশ্ন এখন বেশ জোরালো। সরকার যখন দাবি করছে, দেশের প্রায় ৭৪ শতাংশ মানুষ এখন সাক্ষর, তখন বেসরকারি মহল বলছে, এ সংখ্যা শতকরা ৫২ শতাংশের বেশি নয়। অর্থাৎ, দু’য়ের পার্থক্য ২০ ভাগের বেশি।

মনে রাখা চাই, পরিকল্পনা বা পরিসংখ্যানের জন্য মানুষ নয়। বরং মানুষের জন্যই শুমারি ও জরিপ, তথা পরিসংখ্যান ও পরিকল্পনা। এ জন্য এসব উদ্যোগ ও কর্মসূচিতে জনগণের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের সহযোগিতা ও সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সরকারের প্রকাশিত পরিসংখ্যান হবে বিশ্বাসযোগ্য আর সে পরিসংখ্যানভিত্তিক পরিকল্পনা হবে বাস্তবনির্ভর। অন্যথায়, গণতন্ত্র থাকে অসম্পূর্ণ আর উন্নয়ন প্রকল্প হয়ে পড়ে অকার্যকর। তখন পরিকল্পনা পর্যবসিত হয় নিছক কল্পনায়। ব্যঙ্গ করে বলা হয়ে থাকে, ‘এমন অবস্থায় পরি (বা পরী) আকাশে উড়ে যায় এবং কল্পনা মাটিতে পড়ে থাকে।’

পাদটীকা : স্টালিন দিয়ে শুরু করেছিলাম; তাকে দিয়েই এ লেখার ইতি টানছি। তিনি একটি কথা বলেছিলেন যা বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সত্যিই মোক্ষম। স্টালিন বলে গেছেন, ‘নির্বাচনে ভোট দেয়া গুরুত্বপূর্ণ। তবে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো, যারা ভোট গণনা করে, তারা।’

এ দেশে নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে না পারলেও শতভাগ ভোট পড়ার কাণ্ড ঘটান সেই মহান গণনাকারীরা যারা ‘বেশি গুরুত্বের অধিকারী’।


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum