২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

দক্ষিণ এশিয়ার যুদ্ধ উত্তেজনা ও বাংলাদেশ

-

পশ্চিমে কাশ্মিরের বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার এবং পূর্বে এনআরসি ইস্যু নিয়ে সৃষ্ট টানাপড়েন পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় এক যুদ্ধ উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আফগানিস্তানে তালেবানদের সাথে শান্তি আলোচনা সমঝোতায় পৌঁছার শেষ পর্যায়ে এসে ট্রাম্প প্রশাসন তা বাতিল ঘোষণা করায় দক্ষিণ এশিয়ার সার্বিক উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে অচলবস্থাও বিরোধগুলোর শান্তিপূর্ণ নিষ্পত্তি প্রচেষ্টাকে জটিল অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

নমনীয়তার লক্ষণ নেই
কাশ্মিরের স্বায়ত্তশাসন ও বিশেষ মর্যাদার বিলোপ ঘটানোর ব্যাপারে মোদি সরকারের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে বিরূপ সমালোচনার মুখে পড়ার পর কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেছিলেন ভারত এ ব্যাপারে নমনীয় কৌশল গ্রহণ করতে পারে। কিন্তু কাশ্মিরের পর আসামের এনআরসি পদক্ষেপ সারা ভারতে ছড়িয়ে দেয়ার ঘোষণা এবং তা প্রয়োগে নানা পদক্ষেপে মনে হচ্ছে মোদির বিজেপির সরকার এবং এর পেছনে থাকা সঙ্ঘ পরিবার তার মূল ডকট্রিন কার্যকর করার পথেই এগোচ্ছে। আর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে মূল কারিগরের ভূমিকায় রয়েছেন ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও শাসক দলের প্রধান অমিত শাহ।

মোদি-অমিত শাহের সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ফ্রন্টে এমন কিছু তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ নিচ্ছে, যেটাকে দক্ষিণ এশিয়ায় একটি মাঝারি ধরনের যুদ্ধ প্রস্তুতি বলে মনে হচ্ছে। প্রথমত, যেকোনো যুদ্ধ প্রস্তুতির আগে অভ্যন্তরীণ জনমতকে প্রভাবিত করতে সত্য-অসত্য মিলিয়ে জাতীয়তাবোধকে জাগ্রত করার জন্য যে প্রচারাভিযান চালানো হয়, সেটি এখন করা হচ্ছে ভারতজুড়ে। সর্বক্ষেত্রে সরকারের নেয়া পদক্ষেপগুলোকে গ্লোরিফাই করে প্রচার করা হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, সম্ভাব্য যুদ্ধক্ষেত্র সংশ্লিষ্ট প্রদেশগুলোতে বিধায়ক ভাগানোর মতো অস্বাভাবিক পন্থায় বিজেপি ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের আসাম সফরের সময়েই সিকিমের স্থানীয় শাসক জোটের ১০ বিধায়ককে বিজেপিতে যোগদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এর আগ পর্যন্ত ৩২ সদস্যের সিকিম বিধানসভায় বিজেপির একজন সদস্যও ছিল না। পূর্ব ভারতের বৃহত্তম রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রেও শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসে বিভাজন সৃষ্টি করে বিধায়কদের বিজেপিতে ভাগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে কর্নাটক স্টাইলে। এ ক্ষেত্রে নারদ কেলেঙ্কারি ও অন্যান্য মামলায় শাসক দলের নেতাদের অভিযুক্ত করা ও জিজ্ঞাসাবাদের নামে চাপ তৈরির কৌশলকে কাজে লাগানো হচ্ছে। এ পর্যন্ত মুকুল রায় শোভন চ্যাটার্জি থেকে শুরু করে যেসব তৃণমূল নেতাকে বিজেপিতে ভাগিয়ে নেয়া হয়েছে, সবাইকেই মামলার ভয় দেখিয়ে প্রাথমিকভাবে দুর্বল করা হয়েছে। আসামের এনআরসিতে ১৭ লাখ বাংলাভাষীকে অনাগরিক করার কারণে পশ্চিমবঙ্গে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় তৃণমূল নেতাদের দলছাড়া করার আয়োজন কিছুটা ব্যাহত হচ্ছে। অমিত শাহের আসাম সফরের পর সে প্রকল্পকে নতুন করে চাঙ্গা করা হয়েছে।

পশ্চিমবঙ্গ ছাড়াও উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্ষুদ্র রাজ্যগুলোতে পরিবেশ বিজেপি সরকারের অনুকূলে রাখার জন্য অমিত শাহ বারবার সংবিধানের ৩৭১ অনুচ্ছেদ বাতিল না করার ঘোষণা দিচ্ছেন। একই সাথে বিজেপির অহমিয়া উগ্র জাতীয়তাবাদী জোট অংশীদারদের আশ্বস্ত করছেন যে, অনাগরিক ঘোষিতদের স্থান আসামে হবে না এবং তাদের ভারতের অন্য কোনো রাজ্যেও প্রবেশের সুযোগ দেয়া হবে না।

অমিত শাহ আসাম ভ্রমণের পর সেখানকার ১৯ লাখের অধিক অনাগরিক ঘোষিত বাসিন্দাকে রাখার জন্য ১১টি বন্দিশিবির নির্মাণের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। আর ঠিক এ সময়েই মহারাষ্ট্রে এনআরসি করার ঘোষণা দেয়ার পর এর প্রক্রিয়া শুরুর আগেই বন্দিশিবির নির্মাণের কাজ শুরু করা হয়েছে। সেখানকার বিজেপি শিবসেনা সরকার আসামে বিপুলসংখ্যক হিন্দু বাঙালি অনাগরিক হওয়ার মতো পরিস্থিতি এড়াতে শুরু থেকে মুসলিমদের যাতে অনাগরিক করা হয় তার আয়োজন চলছে। ভেতরে ভেতরে একই কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে দিল্লিতে। তবে আসাম ও মহারাষ্ট্রে বিজেপির সরকার থাকায় যতটা সহজে এ কাজ এগিয়ে নেয়া সম্ভব হচ্ছে দিল্লি বা পশ্চিমবঙ্গে ততটা সহজ হচ্ছে না।

রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধের শঙ্কা
কাশ্মিরের বিষয়ে মোদির সিদ্ধান্ত বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ভারতের প্রতিবেশী দেশগুলো মোদির সিদ্ধান্ত এবং তার আর্থসামাজিক পরিণতি কী নিয়ে আসে, তার ভবিষ্যৎ কী তা পর্যবেক্ষণ করবে। ভারতের অভ্যন্তরেও এ নিয়ে নানা মূল্যায়ন রয়েছে। ভারতীয় সাংবাদিক ভারত ভূষণের মতে, ‘ভারতে গৃহযুদ্ধ উসকে দিতে পারে কাশ্মির ও আসামে বিজেপি সরকারের কর্মকাণ্ড। তার মতে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, আসামে ন্যাশনাল এনআরসি বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে দেশে ‘রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ’ বেঁধে যেতে পারে, সেটি বিজেপি মমতার রাজ্যে এনআরসি বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছে বলে তার অতিরঞ্জিত মন্তব্য চিন্তা করলে ভুল হবে।’

ভারত ভূষণ উল্লেখ করেন, ‘অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক হুমকি থেকে ভারতকে মুক্ত করার অ্যাজেন্ডা নিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি; কিন্তু তাদের রাজনীতি নিজেই সম্ভবত দেশে একটা অস্থিরতা তৈরি করতে যাচ্ছে। মোদি সরকার দেশে এক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছেন, সেটা এরই মধ্যে আসাম এবং জম্মু ও কাশ্মিরে গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি করেছে। এই দল ও তাদের সরকার যেন তাদের নিজেদের আশঙ্কার শিকার নিজেরাই হয়েছে।’

অবৈধ বাংলাদেশী অভিবাসীদের নিয়ে বিজেপির যে মনোভাব, সেটা শুধু আসামে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯৯৫ সালে নিজেদের সম-আদর্শের দল শিবসেনাকে সাথে নিয়ে মুম্বাই থেকে বাংলাভাষী মুসলিমদের বের করে দেয়ার চেষ্টা করেছিল বিজেপি। দিল্লি থেকেও বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের বের করে দেয়ার একই দাবি করেছে দলটি। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘বহিরাগতদের’ বের করে দেয়ার জন্য এখন বিজেপি যে দাবি করছে, এর স্বল্পমেয়াদি কারণ হয়তো ২০২১ সালের রাজ্য নির্বাচন। তারা আসামের মতো এখানেও ভোটারদের মধ্যে মেরুকরণের চেষ্টা করছে। বিজেপি এখন সারা ভারতেই এনআরসির মতো একটা নাগরিক তালিকার দাবি করছে, যেটা সম্ভবত হবে ন্যাশনাল পপুলেশান রেজিস্টার হিসেবে। শুধু দিল্লিতে নয়, তারা অন্ধ্র প্রদেশ, তেলেঙ্গানা, মহারাষ্ট্র ও কর্নাটকেও এটা তৈরির দাবি করছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সবগুলো রাজ্য এনআরসি ধরনের একটি তালিকা তৈরির পক্ষে।

ভারত ভূষণের মতে, ‘এই ধারণা সঠিক নয় যে, আসামের উগ্র জাতীয়তাবাদী মানসিকতা সেকুলার মানসিকতা থেকে পরিচালিত এবং ধর্মের ঊর্ধ্বে সব বহিরাগতকে এখানে একই দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। বরং রাজ্যের বিজেপি সরকার হতাশ হয়েছে কারণ বহু বাংলাভাষী হিন্দু এনআরসি থেকে তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কিছু বেসরকারি হিসাব মতে, যারা বাদ পড়েছে, তাদের প্রায় অর্ধেকই হিন্দু বাঙালি। সে কারণে বিজেপি এনআরসি তালিকা রিভিউ করার দাবি তুলছে।’

দ্বিতীয় ধাপের বিপজ্জনক প্রভাব
মোদি-অমিত শাহের সরকার কাশ্মির-এনআরসি ইস্যুতে ভারতীয় জাতীয়তাবাদকে জাগিয়ে তোলার এ প্রচেষ্টার পরের ধাপটা প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য অধিক বিপজ্জনক। আর এর প্রভাবও বেশখানিকটা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির মতো। দ্বিতীয় ভাগে দু’টি পদক্ষেপ নিচ্ছে মোদি সরকার। প্রথমটি হলো, একটি মধ্যমেয়াদি যুদ্ধ চালানোর মতো করে ভারতের সব বাহিনীর কমান্ড ব্যবস্থাপনাকে বিন্যাস করা। দ্বিতীয়টি হলো, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোকে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভারতের সহযোগিতায় রাজি করার জন্য সর্বতোভাবে চাপ তৈরি করা।

দক্ষিণ এশিয়ার কাশ্মির উত্তেজনায় এই ভূখণ্ডের অন্য দুই নিয়ন্ত্রক দেশ পাকিস্তান ও চীন সঙ্ঘাতে পক্ষ হয়ে গেছে। অমিত শাহ সংসদে দাঁড়িয়েই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মির ও চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চীন দখলের কথা বলেছেন। এতে ভারতের যুদ্ধ প্রস্তুতি যে শুধু পাকিস্তানকে ঘিরে নয়, তার বার্তা দেয়া হয়েছে। চীনা প্রতিক্রিয়ায় এ বিষয়টির উল্লেখও রয়েছে। চীনকে কাশ্মির প্রতিপক্ষের কাতারে এখনই নিয়ে আসার ব্যাপারে ভারতের পররাষ্ট্র ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে মতের বিভাজনও দেখা দিয়েছে। তবে আরএসএস ও বিজেপি সরকারের কোর ব্যক্তি হিসেবে অমিত শাহের মতো সব কিছুর ওপর প্রাধান্য বিস্তারকারী হওয়ার কারণে ভারতের চীনবিরোধী যুদ্ধ প্রস্তুতিও একই সাথে অগ্রসর হচ্ছে।

কোল্যাটারাল ড্যামেজে পড়বে বাংলাদেশ?
এখানেই বাংলাদেশের জন্য প্রতিকূল এক অবস্থা সামনে চলে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশ কৌশলগতভাবে বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হলেও অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চীনের সাথে এক ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক নির্মাণ করেছে শেখ হাসিনার সরকার। পদ্মা সেতু, কর্ণফুলী টানেলের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলো চীনা আর্থিক সহায়তায় বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। চীনের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সহায়তার পাশাপাশি ৩০ ডিসেম্বরের বিগত নির্বাচনে টানা তৃতীয়বার শেখ হাসিনাকে সরকার গঠন করতে রাজনৈতিকভাবে সহায়তা করেছে চীন। এর ফলে এই নির্বাচনের পর গঠিত আওয়ামী লীগ সরকারে ভারতের চেয়ে চীনা প্রভাব অনেক বেশি বলে মনে করা হয়।

বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ভারতের নিরাপত্তা ও কৌশলগত চাহিদা পূরণের পরও চীনের সাথে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতে পারবে বলে ধারণা করেছিল। কয়েকটি কারণে কাশ্মির ও আসাম উত্তেজনার পর সেটি বেশ দুরূহ হয়ে পড়েছে বলে মনে হচ্ছে। প্রথমত, বাংলাদেশে চীনা স্বার্থের বড় অংশজুড়ে রয়েছে প্রতিরক্ষা বাণিজ্য। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের ৭০ শতাংশের মতো এখনো চীনা উৎস থেকে আসে। ভারতের নীতিনির্ধারকেরা চাইছেন, পর্যায়ক্রমে প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের এই উৎস বন্ধ করে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এ জন্য শেখ হাসিনার পূর্ববর্তী সরকারের সময় যৌথ সমরাস্ত্র কারখানা নির্মাণ, প্রতিরক্ষা সমরাস্ত্র সংগ্রহে পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সামরিক প্রশিক্ষণে ভারতকে অগ্রাধিকার প্রদান সংক্রান্ত বিভিন্ন চুক্তি ও সমঝোতাসংবলিত একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার আমব্রেলা চুক্তির প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল।

সেই চুক্তির অংশবিশেষ সমঝোতা স্মারক ও চুক্তি আকারে বিগত নির্বাচনের আগেই স্বাক্ষর করা হয়। বাকি কিছু স্পর্শকাতর বিষয় সম্পর্কিত চুক্তি সরকার প্রধানের এবারের দিল্লি সফরের সময় হতে পারে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এটি এমন একটি দু’ধারী বিষয় হিসেবে সরকারের শীর্ষ নীতিপ্রণেতাদের সামনে হাজির হয়েছে, যাতে দুই পক্ষকে সন্তুষ্ট করা একপ্রকার অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, পদ্মা সেতু প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এবং সরকারি ক্রয়নীতিতে আন্তর্জাতিক মান অনুসরণসহ কয়েকটি বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের সাথে বর্তমান সরকারের টানাপড়েনের কারণে বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে চীনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে বাংলাদেশ। প্রতিবেশী দেশের শীর্ষ নীতিপ্রণেতাদের ধারণা, এই উন্নয়ন সহায়তা নির্ভরতার পথ ধরে বেইজিং বাংলাদেশের সার্বিক ক্ষেত্রে তার প্রভাব বিস্তার করে চলেছে। এ জন্য উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে দিল্লির পরামর্শ হলো বিশ্বব্যাংক, এডিবি বা জাপান থেকে সহায়তা গ্রহণের বিকল্প পথে অগ্রসর হতে হবে বাংলাদেশকে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বাংলাদেশ এখন যেভাবে তীব্র অর্থনৈতিক সঙ্কটের দ্বারপ্রান্তে রয়েছে তাতে চীনের ৬ বিলিয়ন ডলারের যে উন্নয়ন সহায়তা পাইপ লাইনে রয়েছে তা অবমুক্ত করা না হলে সঙ্কট মোকাবেলা কঠিন হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্ভাব্য সঙ্কটের প্রস্তুতি হিসেবে বাংলাদেশের সরকার এর মধ্যে তিনটি বড় পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রথমত, উন্নয়ন প্রকল্প ও সরকারের দৈনন্দিন কাজের অর্থ জোগানে দেশের স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিদ্যমান দেড় লাখ কোটি টাকার তহবিল সরকারের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। দ্বিতীয়ত, দেশের মহাসড়কগুলোতে টোল বসিয়ে এবং বেসরাকরি খাত থেকে অধিক পরিমাণে রাজস্ব আহরণে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ। তৃতীয়ত, দেশের দুর্বল ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে একীভূত ও সমন্বিতকরণ। এ তিন পদক্ষেপ নেয়ার পরও চীনা অর্থসহায়তা অবমুক্ত না হলে ডিসেম্বর নাগাদ অর্থনৈতিক সঙ্কট কাটানো কঠিন হতে পারে। এ ক্ষেত্রে ভারতে সৃষ্ট অর্থনেতিক মন্দা ও নিম্ন বিকাশ হারের প্রভাব বাংলাদেশে পড়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না ঢাকার নীতিপ্রণেতারা।

উত্তেজনা যত বাড়ছে চাপও তত বাড়ছে
এদিকে কাশ্মির নিয়ে উত্তেজনা যত বাড়বে বাংলাদেশের ওপর সার্বিক চাপও তত বাড়তে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জেনেভায় জাতিসঙ্ঘ মানবাধিকার কমিশনের সভায় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাহমুদ শাহ কোরেশি কাশ্মির নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনায় দুর্ঘটনাজনিত যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন। দৃশ্যত পাকিস্তান ও ভারত দুই দেশই এ ধরনের যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যেকোনো যুদ্ধে জড়িত পক্ষগুলোর বাইরে মাঝখানে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার মতো অবস্থা সৃষ্টি হয় তৃতীয় কোনো দেশের জন্য। ভারত-পাকিস্তান-চীন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তেমন একটি পরিস্থিতির আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া বেশ কঠিন।

বাংলাদেশের ওপর আসামের ১৭ লাখ বাংলাভাষীকে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য মোদি-আমিত শাহ সরকারের চাপ রয়েছে এক দিকে, অন্য দিকে রয়েছে রোহিঙ্গা ইস্যু নিষ্পত্তির জন্য চীনের সহযোগিতা বিষয়। বাংলাদেশ এই দ্বিমুখী চাপে পড়ে কাশ্মির ইস্যু নিয়ে যদি শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ বেধে যায় তাহলে কিভাবে করণীয় ঠিক করবে সেটি অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ চ্যালেঞ্জ শুধু রাজনৈতিক অঙ্গনেই সীমিত থাকবে না। এটি সার্বভৌমত্বের সঙ্কট আর আঞ্চলিক-বৈশ্বিক প্রভাব বিস্তারের খেলায়ও পরিণত হতে পারে। শেখ হাসিনার সরকার এর আগে অনেক জটিল সঙ্কট উত্তরণ করতে পেরেছে। এবার কতটা কী করতে পারে, সেটিই দেখার বিষয়।

[email protected]


আরো সংবাদ