১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও কিছু ভাবনা

-

একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে সে রাষ্ট্রের সংবাদপত্র। সংবাদপত্র শুধু ছাপা অক্ষরে কয়েকটি পৃষ্ঠার কাগজ নয়, বরং গণমানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, অধিকার-বঞ্চনা, পাওয়া-না পাওয়ার প্রতিফলন ও প্রতিচ্ছবি। সংবাদপত্রসহ মিডিয়া আছে বলেই স্বৈরতন্ত্রের বা আধিপত্যবাদের কর্মকাণ্ড মানুষ জানতে পারে। স্বৈরশাসক বা অপরাধীরা মিডিয়াকেই ভয় পায়, মিডিয়াই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। ক্ষমতাহীন সাধারণ মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তির নিঃশ্বাস নিতে পারে মিডিয়ার জন্য।

স্বৈরতন্ত্র যখন আঘাত হানে, তখন মিডিয়াকেই তাদের লক্ষ্য নির্ধারণ করে। ’৭৫ সালে বাকশাল গঠনের সময়ও মাত্র চারটি পত্রিকা রেখে বাকি সব বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। মিডিয়া জগতও জাতির সার্বিক সমস্যা জনগণের কাছে প্রকাশ করে এবং জনগণের প্রকৃত অবস্থান তুলে ধরার জন্য মিডিয়াই একমাত্র অবলম্বন। বাংলাদেশে যেসব বিষয় মিডিয়াতে প্রকাশ পেয়েছে, প্রধানত সেগুলোরই বিচার বা সমাধান হয়েছে। অন্যগুলো বরফের নিচে চাপা পড়তে পড়তে একদিন বরফ গলে নদী থেকে সমুদ্রে চলে যায়। কিন্তু সরকার তখন আর এর খোঁজ রাখে না। স্মরণ রাখে শুধু ভুক্তভোগীরা। সঙ্গত কারণেই, সংবাদপত্রকে একটি রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়।

অন্যান্য আইনের পাশাপাশি, সংবাদপত্রগুলোর প্রকাশনা ‘ছাপাখানা ও প্রকাশনা (ঘোষণা ও নিবন্ধীকরণ) আইন-১৯৭৩’ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। একই আইনের (চ) ধারা মোতাবেক ‘সংবাদপত্র’ অর্থ গণসংবাদ বা গণসংবাদের ওপর মন্তব্যসহ কোনো সাময়িকী এবং সরকার কর্তৃক গেজেটে প্রজ্ঞাপন দ্বারা সংবাদপত্র হিসেবে ঘোষিত, এরূপ যেকোনো শ্রেণীর সাময়িকী এর অন্তর্ভুক্ত হবে।’

সংবাদপত্র একটি শিল্প বটে। ফলে মালিক গোষ্ঠী কর্তৃক বাণিজ্যিক বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়, কিন্তু পরিবেশিত সংবাদ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বিবেচনা করা নৈতিকতার পরিপন্থী। ‘নৈতিকতা’ এমন একটি বিষয় যা আইন দিয়ে পরিমাপ বা নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। তবে পত্রিকার নৈতিকতার মাপকাঠি নির্ভর করে সংবাদ পরিবেশনের সততা এবং পাঠকের মূল্যায়নের ওপর। একতরফা সংবাদ বা বক্তব্য পরিবেশনা পত্রিকার সততা ও নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ না ছাপানো কিংবা কোনো লেখকের লেখায় বিক্ষুব্ধ হলে বিক্ষুব্ধ ব্যক্তির মন্তব্য বা (যদি সম্পাদকের সমালোচনাও হয়) লেখা না ছাপানো নৈতিকতার পরিপন্থী। সম্পাদক নিজে কোনো রাজনৈতিক

দলের সমর্থক বা সদস্য হতে পারেন, কিন্তু পত্রিকা ‘যা দেখবে তা লিখবে’ এটাই হবে করণীয়। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো কোনো পত্রিকা কার্যত নৈতিকতার পরিপন্থী ভূমিকা রাখছে। ‘নিরপেক্ষতা’র মুখোশ পরে সরকারি মুখপত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে সুকৌশলে।

কখনো দেখা যাচ্ছে, যার ১০টি ব্যবসা আছে, তিনি মিডিয়া জগতে প্রবেশ করেন প্রতিপত্তি বা প্রভাবকে টেকসই করার জন্য। তবে যারা পেশাগতভাবে সাংবাদিকতা করেন, তাদের বিষয় আলাদা। ‘সংবাদপত্র’ একটি ‘প্রতিষ্ঠান’ হিসেবে পক্ষপাতিত্বে জড়িয়ে পড়বে এটা নিশ্চয়ই জনগণ সমর্থন করে না। সংবাদপত্র যদি পক্ষপাতিত্ব বা রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ে বা কারো মুখপত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে সেটি নিরপেক্ষতা হারায়। সে ক্ষেত্রে জনগণ নিরপেক্ষ সংবাদ পাঠ থেকে বঞ্চিত হয়। একটি রাজনৈতিক দলের নিজস্ব মুখপত্র থাকতে পারে। কিন্তু ‘নিরপেক্ষ’ থাকার ঘোষণা দিয়ে একটি পত্রিকা কারো পক্ষ নিতে পারে না।

উদাহরণ হিসেবে বলতে চাই, অবসরপ্রাপ্ত একজন ঊর্ধ্বতন দায়িত্বশীল ব্যক্তির লিখিত একটি উপসম্পাদকীয় গত ৩ জুন একটি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। ওই পত্রিকায় লেখক বিএনপি নেতাদের ‘মিথ্যাবাদী’ বলে আখ্যায়িত করে ‘লর্ড হো হো’র সাথে তুলনা করেছেন। ওই আর্টিকেলে তিনি লিখেছিলেন- তাদের (বিএনপি নেতাদের) অবস্থা আজ লর্ড হো হোর মতো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় বার্লিন বেতারের মাধ্যমে মিথ্যা প্রচারণার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ঘৃণা ও কৌতুকভাবে ডাকা হতো ‘লর্ড হো হো’ বলে। আমার কাছে মনে হয়েছে, সরকারবিরোধী গণতান্ত্রিক একটি রাজনৈতিক দলকে হেয় করার প্রয়াস এ লেখায় লক্ষণীয়। সমালোচনা করার অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে, কিন্তু অপমানকর ও অযৌক্তিক বক্তব্য দেয়া বাঞ্ছনীয় নয়। কিন্তু এর পরবর্তী ঘটনা আরো দুঃখজনক।

বিএনপি সম্পর্কে এই বক্তব্য খণ্ডন করে আমার একটি আর্টিকেল ই-মেইলে ওই পত্রিকায় পাঠাই। লেখাটি ছাপানোর অনুরোধ করি। লেখাটি না ছাপানোর কারণে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে লেখাটি আবার পাঠাই। তার পরও লেখাটি না ছাপানোর কারণে নিজে উপস্থিত হয়ে সেটি পত্রিকা অফিসে জমা দিয়ে আসি। ফটোকপিতে স্বাক্ষর করে আর্টিকেলটি আমার কাছ থেকে জমা নেয়া হয়। তার পরও লেখাটি আজও প্রকাশিত হয়নি।

প্রকাশনায় কারো বিরুদ্ধে অসত্য কোনো মন্তব্য করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার সৃষ্টি হয় তার প্রতিবাদ করার। একই সাথে প্রকাশিত অসত্য বক্তব্যের প্রতিবাদ বা পাল্টা বক্তব্য প্রকাশে সংশ্লিষ্ট পত্রিকা আইন ছাড়াও নৈতিকতার কাছে দায়বদ্ধ।

নিয়মতান্ত্রিক সমালোচনা সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার। এ অধিকার বাস্তবায়নের জন্য গণমাধ্যম অঙ্গীকারবদ্ধ বলেই সমাজ মনে করে। বিচার বিভাগের এবং গণমাধ্যমের নিরপেক্ষতা প্রতিটি বিবেকবান মানুষের দাবি। অবশ্য কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠা করা বা কোনো রাজনৈতিক দলের মুখপত্র হওয়ার রীতি পৃথিবীব্যাপী রয়েছে, যার পাঠক রয়েছে নিজস্ব গণ্ডিতে। কিন্তু গণমাধ্যম কোনো দলের মুখপত্র হয়ে কাজ করার প্রকাশ্যে ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত কোনো পক্ষপাতিত্বপূর্ণ আচরণ নৈতিকতার পরিপন্থী। যে পত্রিকা জনগণের পক্ষে, সে পত্রিকায় সবার মত প্রকাশের অধিকার দিতে হবে।

উল্লেখ্য, ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কোনো কোনো পত্রিকা সংবাদ পরিবেশন করে না। কারণ এর মালিক নিজেই ‘ভূমিদস্যু’। ওদের বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে না। কারণ, প্রশাসনের মুখ কিভাবে বন্ধ করতে হয়, ভূমিদস্যুরা তা জানে। কথা হলো, সে ক্ষেত্রে নিরীহ, নিপীড়িত সাধারণ গণমানুষ কোথায় গিয়ে আশ্রয় খুঁজবে? কারণ, এখনো সাধারণ মানুষ মনে করে, গণমাধ্যমই জনগণের আশা-আকাক্সক্ষারও ভরসার স্থল, যাদের কাছে আশ্রয় নেয়া যায়।

লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী


আরো সংবাদ

দিনে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি জবি ছাত্রলীগের! কম দেয়ায় মারধর সাভারে বকেয়া বেতনের দাবিতে গার্মেন্টস শ্রমিকদের বিক্ষোভ ইরানের সাথে যুদ্ধের জন্য আমেরিকা প্রস্তুত কিশোরগঞ্জে হত্যা মামলায় ৪ সহোদরসহ ১০ জনের যাবজ্জীবন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৪ বছরে ১২ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন বাজেট, খরচে স্বচ্ছতা কতটা? সাভারে নদীতে নিখোঁজ জেলের লাশ উদ্ধার গৃহবধূর অশ্লীল ভিডিও ধারণ করে চাঁদা দাবি : যুবক গ্রেফতার সাপ-কুমির নিয়ে মোদিকে হুমকি পাকিস্তানি শিল্পীর মহাদেবপুরে বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির পরিচিতি সভা অনুষ্ঠিত মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে লাফ দিয়ে মায়ের আত্মহত্যা শীঘ্রই ছাড়া পাচ্ছেন না ফারুক আবদুল্লাহ

সকল