১৩ ডিসেম্বর ২০১৯

বিরোধী দলের অপরিহার্যতা

স্বাধীনতার দীর্ঘকাল পরও বাংলাদেশের রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিকতা অর্জন সম্ভব হয়নি। একটি গণতান্ত্রিক দেশে রাজনীতি প্রতিষ্ঠানভিত্তিক না হলে সেখানে কোনো নিয়মশৃঙ্খলা বা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠা পায় না। আর সে কারণে এ দেশে বহু অনিয়ম-অব্যবস্থা আজো বিরাজ করছে। আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ ভালো কিছুর সূচনা করতে পারেন বটে; কিন্তু তাকে সফল পরিণতির দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারেন না। যেমন, কোনো রাষ্ট্রের সুষ্ঠুভাবে চলার জন্য আইনকানুন-শাসনতন্ত্র বা সংবিধান রচিত হয়। এসব বিধিবিধানের প্রকৃত অনুসরণ করলে রাষ্ট্রীয় জীবনে নীতি-নিষ্ঠতা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সে থেকে মানুষ একটা স্বস্তি-শান্তির জীবন পেতে পারে। আধুনিক কল্যাণরাষ্ট্রগুলো এভাবেই অগ্রসর হয়ে থাকে। বাংলাদেশের মানুষ এমনটি আশা করেই আন্দোলন-সংগ্রাম, পরিশেষে যুদ্ধ করে দেশকে মুক্ত করেছে। তারপর এই দেশ যাতে সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যেতে পারে, সে জন্য যে বিধিব্যবস্থা থাকা দরকার তথা সংবিধানসহ যে আইনকানুন-বিধিবিধানের প্রয়োজন ছিল, তাও যথাসময়ে প্রণীত হয়েছে। কিন্তু এসবের অনুসরণ-অনুশীলন যথাযথভাবে না করায় এ থেকে তেমন কোনো সুফল পাওয়া যায়নি।

রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে যারা যুক্ত থাকেন কিংবা যে রাজনৈতিক দল সরকারে যায় তারা একটি প্রতিষ্ঠান বটে। তারা নিজেদের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে দেশ চালাবেন। তবে এ ক্ষেত্রে তাদের এই অহমিকায় ভোগা উচিত নয় যে, তারা পূর্ণাঙ্গ এবং সব ভুলত্রুটির ঊর্ধ্বে। সেজন্য সরকারি দলের পাশাপাশি তাদের প্রতিপক্ষ বিরোধীদল থাকা একান্ত অপরিহার্য। সরকারের কর্ম সম্পাদনে যে ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো ঘটবে, তাকে চিহ্নিত করা এবং সেসবের প্রতিবিধান করার দায়িত্ব বিরোধী দলের। এই দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বলা যায়, বিরোধী দলও একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। ক্ষমতাসীন দলকে এ বিষয়টি উপলব্ধি করতে হবে।

এ দুইয়ের সমন্বয়ে রাষ্ট্র পরিচালিত হয় এবং জনকল্যাণ সাধিত হয়। আমাদের দেশে সেই অতীত থেকে এর অনুশীলন না থাকায় মানুষ হাজারও সমস্যার সম্মুখীন। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো রাষ্ট্রে প্রাতিষ্ঠানিকতা না পাওয়ায় কোথাও যথাযথ পদ্ধতিতে শাসনব্যবস্থা কার্যকর হতে পারেনি। এই ত্রুটিবিচ্যুতি দূর হয়নি। যে বিরোধী দলের অবস্থান এত বেশি গুরুত্বের, তার অস্তিত্ব এখন নেই বললেই চলে। সরকারি বা ক্ষমতাসীন দলের অস্তিত্ব তখনই সার্থক হবে, যখন তাদের প্রতিপক্ষ অবাধে ও স্বচ্ছন্দে ভূমিকা রাখতে পারে। এভাবেই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা চলতে সক্ষম হয়। কিন্তু বাংলাদেশে আজ অবধি এসবের গুরুত্বের উপলব্ধি ঘটেছে বলে মনে করার কোনো উপায় নেই।

রাষ্ট্রের সরকারি দল ও বিরোধী দল গঠন করে দেবে দেশের মালিক, জনগণ। তাদের অভিপ্রায় এ ক্ষেত্রে চূড়ান্ত। আর এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে হবে প্রশ্নমুক্ত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। কিন্তু এমন শুদ্ধ নির্বাচন করার মানসিকতা আমাদের রাজনীতিকদের অনেকেরই নেই। বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসের পাতায় যদি দৃষ্টি দেয়া হয়, তবে এটাই দেখা যাবে যে, জনগণের মতের প্রতি তথা তাদের পছন্দের ব্যাপারে রাজনীতিকেরা যেন আস্থা রাখতে পারেননি। প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এক দলের জবরদস্তির ফলে মানুষের ভোটদানের স্বাধীনতা খর্ব হয়ে আসছে। যখনই যে দল ক্ষমতায় ছিল, তারা একক কর্তৃত্বে দেশ পরিচালনায় থেকে ভালো-মন্দের যাচাই-বাছাই করার কোনো গুরুত্ব উপলব্ধি করেনি। প্রতিপক্ষের যে প্রয়োজন, সেটি তাদের বিবেচনায় নেই।

সরকার সব সময় তাদের প্রতিপক্ষকে সহযোগী নয়, বরং শত্রুজ্ঞান করে তাদের বিনাশ কামনা করে এসেছে। এখন ক্ষমতাসীনেরা বিএনপির প্রতি যে আচরণ-নিপীড়ন করছে, তা অনেকটা শত্রুতার শামিল। এর ফলে রাষ্ট্রে ইতোমধ্যে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। এর প্রকৃতি অনেকটাই একদলীয় শাসনব্যবস্থার মতো। এমন শাসনপদ্ধতিতে নাগরিকদের প্রতি শাসক শ্রেণীর সেবার মনোভাব গৌণ হয়ে পড়ে এবং মানুষের স্বাধীন মত প্রকাশের কোনো সুযোগ থাকে না। তদুপরি, সংবাদমাধ্যম সব সময়ই চাপের মধ্যে থাকে। এখন দেশে গণমাধ্যম একটা অদৃশ্য চাপের মধ্যে রয়েছে। প্রশাসন নানা কৌশলে এই গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছে। এসব চাপ নিয়ে কেউ আর কথা বলার নেই। সরকার দেশে উন্নয়ন হচ্ছে বলছে; কিন্তু এসব বক্তব্যের সারবত্তা অনুসন্ধানের কোনো সুযোগ নেই।

সব সময়ই শাসক দল এই নেতিবাচক ধারণা পোষণ করে এবং সেভাবে কাজ করে বলে সমাজে কখনো ইতিবাচক ভাবনার বিকাশ ঘটেনি। এর পরিণতি হয়েছে, আমরা কখনো মন্দ থেকে ভালোকে বাছাই করে নেয়ায় যে কল্যাণ চিন্তা, তার অনুসরণ করতে পারিনি। গণতন্ত্র, মানবাধিকার, দুর্নীতিমুক্ত সুস্থ সমাজ, সুশাসন, কল্যাণচিন্তা প্রভৃতিকে অগ্রাধিকার দেয়ার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারিনি। আমাদের দেশের মানুষ গণতন্ত্র প্রাণ, গণতন্ত্রের জন্য বরাবরই বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা, সংগ্রাম-আন্দোলন করে এসেছে। বাংলাদেশ প্রজাতন্ত্রের যে মূল চেতনাগুলো সংবিধানে সংযুক্ত রয়েছে, তাতে বলা হয়েছে- এ দেশের শাসনপদ্ধতির মুখ্য বিষয় হবে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।

সর্বস্তরে ভোটের মাধ্যমে জনগণের পছন্দের ব্যক্তিদের হাতে শাসনব্যবস্থা তুলে দেয়া হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে রাষ্ট্রের চরম অভিব্যক্তি হিসেবে সংবিধানের নির্দেশনার লঙ্ঘন ঘটবে। আর সেটা রাষ্ট্রের মৌলিক উদ্দেশ্যকে ব্যাহত করবে। স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দের প্রতিফলন ঘটিয়ে ভোট প্রদানের অধিকার নাগরিকদের বিশ্বজনীন মানবাধিকার। আজকে এ দেশে যে ভোট-ব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, তাতে মানুষের সেই অধিকার নেই। গণতন্ত্র না থাকায় রাষ্ট্রীয় জীবনে কোনো জবাবদিহিতা নেই। জাতীয় সংসদ দেশে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করে থাকে। কিন্তু সে প্রতিষ্ঠানটি ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত হওয়ায় নিজের মৌলিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। আর তাতে এই প্রতিষ্ঠানের যে মুখ্য উদ্দেশ্য জবাবদিহি করার, তা সে পূরণ করতে পারছে না। যে সমাজে জবাবদিহিতা নেই, সেখানে অনিয়ম-অব্যবস্থা-দুরাচার-দুর্নীতি গ্রাস করে। তাই বাংলাদেশ এসব অনিয়মের জন্য বিশ্বের একটি চিহ্নিত দেশ।

যে দেশে এমন বিশৃঙ্খলা, সেখানে জনকল্যাণের গুরুত্ব হারিয়ে যায়। দেশটি এমন হোক, কেউ কি তা চেয়েছিল? তার জন্যই কি এত আত্মত্যাগ-সংগ্রাম করা হয়েছে?

এই অবস্থা সৃষ্টির জন্য কি অনুতাপ-অনুশোচনা করছে শাসক মহল? সম্ভবত এই অবস্থাকে তারা স্বীকারই করে না বিধায় পাল্টা বলেন, দেশে উন্নয়নের স্রোত তৈরি হয়েছে।’ তাহলে কি দেশের সব মানুষের অন্ন, বস্ত্র, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও আশ্রয়ের সংস্থান করা গেছে? বিপুলসংখ্যক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করে। লাখ লাখ কর্মহীন মানুষ এক গ্লানিকর জীবনযাপন করছে। ভবিষ্যতের কোনো স্বপ্নসাধ তারা অনুভব করে না। স্বল্পসংখ্যক মানুষের জীবনযাপনের স্বাচ্ছন্দ্য বৃদ্ধি পাওয়াকে উন্নয়ন বলার কোনো সুযোগ নেই। উন্নয়নের এমন ধারণা তো কেউ পোষণ করে না। উন্নয়নের আরো কিছু অনুষঙ্গ রয়েছে, সেগুলো পূরণ না হলে সব কিছু অর্থহীন হয়ে যাবে। ‘উন্নত জীবন’ বলতে শুধু স্বাচ্ছন্দ্যই নয়, আরো কিছু উপলব্ধি থাকতে হবে। মানুষ সামাজিক ন্যায়বিচার, চিন্তা ও মত প্রকাশের অধিকার তথা সত্যকে সত্য আর অসত্যকে মিথ্যা বলার অধিকার ও নিরাপত্তা থাকতে হবে। সবাইকে জীবনযাপন নিয়ে সম্মানবোধ করতে হবে এবং সমাজে কেউই কারো কাছে খাটো হয়ে থাকবে না। এমন আত্মসম্মানবোধ যেন সবাই লালন করতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি হওয়া চাই। কিন্তু এমন বোধ কি সরকারের আছে?

দেশে সর্বশেষ যে নির্বাচন হয়ে গেল তার বিশুদ্ধতা নিয়ে এখনো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক চলছে। গণতান্ত্রিক বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করে, এমন দেশগুলো এখনো আমাদের নির্বাচন নিয়ে পরিহাস করে। এই নির্বাচনের মাধ্যমে যে সংসদ গঠিত হয়েছে, তার ভূমিকার প্রতি নজর দেয়া হলে দেখা যাবে, জাতীয় কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। অথচ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। মিয়ানমার সে দেশের রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে হাজার হাজার মানুষের জীবন নাশ করেছে এবং লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে। এ সমস্যা নিয়ে পুরো জাতি উদ্বিগ্ন, প্রতিবাদে সোচ্চার। অথচ মারাত্মক এই সমস্যা নিয়ে সংসদে কোনো আলোচনা নেই। এমন স্থবিরতা স্মরণ করিয়ে দেয়, মানুষের দুঃখ-কষ্ট নিয়ে তাদের কোনো বোধ-বিবেচনা নেই। জাতির ঘাড়ে যে বিরাট সমস্যা এসে পড়েছে, তাতে জাতি যে উৎকণ্ঠার ভেতর রয়েছে, সেই চেতনা তাদের নেই। এমন হাল-অবস্থা কি এটাই স্মরণ করিয়ে দেয় না যে, সংসদ এ দেশের পরিচালনার প্রাণকেন্দ্র হওয়ার পরিবর্তে নিথর হয়ে আছে। জাতীয় সমস্যা নিয়ে যে সংসদ নিষ্ক্রিয়, তাদের সাধারণ মানুষের দুঃখ-বেদনা ও জীবনযাপন নিয়ে ভেবে দেখার অবকাশ কোথায়? দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে যাদের কোনো মাথাব্যথা নেই, তার প্রয়োজন নিয়ে কথা ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

রাষ্ট্রের তিন অঙ্গের অন্যতম, সংসদ তথা আইনসভার যদি এই হয় অবস্থা; তবে সেখানে রাষ্ট্রের সচল থাকা সম্ভব কী করে? সবচেয়ে ভাবনার বিষয় হলো, এসব বিষয় নিয়ে যারা কথা বলবেন প্রজাতন্ত্রের সেই বিরোধী দল, তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখাও সম্ভব হচ্ছে না দমনপীড়নের কারণে। অথচ এটা উপলব্ধি করা উচিত ছিল যে, বিরোধী পক্ষ তাদের আরশির মতো। সেখানে তাকিয়ে তারা নিজেদের মুখচ্ছবি দেখবেন। এই আরশিতে দেখা যাবে, আমাদের রাজনীতিকেরা কতটা আবর্জনা জমিয়েছেন। এমন আবর্জনা কিভাবে আমাদের রাজনীতির পথকে সঙ্কীর্ণ করে কতটা সরু করে ফেলেছে? রাজনীতিকে সঠিক গতিপথের সন্ধান দিতে হলে আলোচনা, তর্ক-বিতর্কের সুযোগ থাকতে হবে। এমন তা নেই বলব না, তবে সে ফোরামে পৌঁছানোর পথ সঙ্কীর্ণ করা হয়েছে। আবর্জনা মাড়িয়ে সে স্থলে প্রবেশ করা কঠিন। বস্তুত এমন পরিস্থিতি আলোচনার পথ রুদ্ধ করার শামিল।

অথচ যদি রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ পেত, তাহলে আজ আর রাজনীতির এমন বন্ধ্যা সময় থাকত না। নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভাসহ সব কিছুই একটা পথ-পদ্ধতির মধ্য দিয়ে অগ্রসর হতে পারত। সরকারি দল এবং তার প্রতিপক্ষ নিজেদের বলয়ে আবর্তিত হতো। নিজ নিজ দায়িত্ব পালন নিয়ে ব্যস্ত থাকত। এখন নির্বাহী বিভাগ ক্ষমতাচর্চার ক্ষেত্রে কোনো বিধিবিধানের তোয়াক্কা করে না। রাজনীতি প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে চললে ক্ষমতা নিয়ে এমন আচরণ করা সম্ভব হতো না। আইনসভা নিষ্ক্রিয় থেকে যে পথে এখন রয়েছে, তা পাল্টে যেতো। সেই স্বাভাবিক অবস্থায় সরকারের প্রতিপক্ষ সংসদে নিজেদের ভূমিকা ও দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেত। তাতে আইনসভাও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারত। এভাবে সবাই যার যার দায়িত্বের প্রতি নিষ্ঠাবান হলে রাষ্ট্রযন্ত্র গতি পেত আর তাতে মানুষের কল্যাণ হতো। তবে এখনো এই দুর্যোগে কিছু ভাগ্যবানের ভাগ্য প্রসন্ন হচ্ছে। তারা ক্ষমতার প্রভাব-প্রতিপত্তি নিয়ে অন্য দশজনের চেয়ে ভালোই আছেন।
[email protected]


আরো সংবাদ




hacklink Paykwik Paykasa
Paykwik