২১ অক্টোবর ২০১৯

শাহাদতবার্ষিকীতে জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণ ও মূল্যায়ন

জিয়াউর রহমান - ছবি : সংগ্রহ

গত দু’টি বুধবারে ধারাবাহিকভাবে জোটের রাজনীতি নিয়ে লিখেছি। আগামীকাল ৩০ মে জিয়াউর রহমানের শাহাদতবার্র্ষিকী হওয়ায়, আজকের কলামটিতে তার প্রসঙ্গে লেখাটাই উপযুক্ত মনে করি। জুন মাসের ৫ তারিখ বুধবার ঈদের ছুটির সময়; ওইদিন কলাম লেখা অবাস্তব। অতএব জোট ও জোটের রাজনীতি নিয়ে, পরবর্তী কলামটি সম্মানিত পাঠকেরা পড়বেন ১২ জুন তারিখে।

উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী অর্জনগুলো
তিনি ছিলেন জনগণের হৃদয়ের মানুষ। ছিলেন কাজের মানুষ। সামরিক শৃঙ্খলাকে, সামরিক আবেগকে তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে নিয়ে আসেন। তার দূরদৃষ্টিমূলক, রাষ্ট্রনায়কোচিত কর্মকাণ্ডে, বাংলাদেশ উন্নয়নের মহাসড়কে প্রথম পা রাখে; এ দেশ পৃথিবীর জাতিসমূহের মিলনমেলায় নিজের নাম উজ্জ্বলভাবে প্রস্ফুটিত করে। মধ্যপ্রাচ্যের মুসলমান দেশগুলো, বাংলাদেশের তাৎক্ষণিক প্রতিবেশী দেশগুলো এবং বিশ্বে নেতৃত্ব প্রদানকারী পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সঙ্গে জিয়া বাংলাদেশের সুসম্পর্ক গড়ে তোলেন। ইরাক এবং ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল; উভয়পক্ষের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ওই যুদ্ধ নিরসনের লক্ষ্যে তিনজন রাষ্ট্রপ্রধানের কমিটি করা হয়েছিল, সেই কমিটির অন্যতম সদস্য ছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। সর্বোপরি, উদীয়মান সামরিক ও অর্থনৈতিক শক্তি চীনের সাথে ভারসাম্যমূলক সম্পর্ক সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন জিয়াউর রহমান। তার রাজনৈতিক বিরোধীরা সমালোচনা করতেই পারেন। কিন্তু বিশ্লেষণকারী ব্যক্তিরা বিনাদ্বিধায় বলবেন, জিয়াউর রহমান সমন্বয়ের, সহনশীলতার এবং সমঝোতার রাজনীতি ও বহুদলীয় রাজনৈতিক গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন। গবেষকগণ স্বীকার করেন, তিনি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তৃণমূল মানুষের অংশগ্রহণে বিশ্বাস করতেন, কঠোর শৃঙ্খলায় বিশ্বাস করতেন এবং নিজেকে দুর্নীতির ঊর্ধ্বে রাখায় বিশ্বাস করতেন। তিনি তরুণ ও মেধাবীদের রাজনীতিতে আগ্রহী করে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। তিনি সেনাপতি থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়েছিলেন; তিনি বন্দুকের যোদ্ধা থেকে কোদালের কর্মী হয়ে দেশ গড়ার জন্য প্রাণান্তকর চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে হত্যা করার জন্য চেষ্টা করেই যাচ্ছিল। চূড়ান্ত পর্যায়ে, ষড়যন্ত্রকারীরা ৩০ মে ১৯৮১ সালে তাকে হত্যা করে। জীবন ও মৃত্যু মহান আল্লাহ তায়ালার হাতে; এখানে বান্দার হাত রাখার কোনো জায়গা নেই। মানুষ হিসেবে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কোনো না কোনো সময় মারা যেতেন। পৃথিবীর বহু দেশের বহু রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী বা জাতীয় নেতা দায়িত্ব পালনরত অবস্থায় আততায়ীর হাতে প্রাণ দিয়েছেন। বাংলাদেশেও, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব থাকাকালেই বিদ্রোহী সামরিক আততায়ীদের হাতে শাহাদত বরণ করেছেন। প্রেসিডেন্ট জিয়া, ভূরাজনৈতিক-পরিবেশগত কারণে শাহাদত বরণ করেছেন। তিনি স্মৃতিতে অমর। সংক্ষিপ্ত একটি কলামে শহীদ জিয়ার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন অসম্ভব হলেও আজকের তরুণ প্রজন্মের জন্যই দু’চারটি কথা একান্তই বলা প্রয়োজন।

মুক্তিযুদ্ধের সূচনা ও স্বাধীনতার ঘোষণা
১৯৭১ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি বা মার্চ এই সময়টাকে আমরা বিবেচনা করছি। সময়টা ছিল উত্তাল। রাজনৈতিকভাবে অস্থির। ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে, আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করেছে, প্রাদেশিক এবং জাতীয় পর্যায়ে। সবার দৃষ্টি নবনির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে গঠিত নতুন সংসদের অধিবেশনের দিকে। সুনির্দিষ্ট তারিখ হলো ৩ মার্চ ১৯৭১, এই দিন সংসদ বা জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বসবে ঢাকায়। রাজনীতিবিদেরা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করছিলেন। কিন্তু ৩ মার্চের অধিবেশনটিকে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান হঠাৎ করেই স্থগিত করেন। অতঃপর আসে ঢাকার রেসকোর্সে লাখ লাখ মানুষের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণ। ওই ভাষণ দেশব্যাপী মানুষের মনে প্রভাব বিস্তার করেছিল, সেনাবাহিনীর বাঙালি অফিসারদের মনেও প্রভাব বিস্তার করেছিল। জ্যেষ্ঠ বাঙালি সেনা কর্মকর্তারা, রাজনীতিবহির্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করছিলেন। চট্টগ্রামে অন্যতম জ্যেষ্ঠ বাঙালি সেনা অফিসার ছিলেন মেজর জিয়াউর রহমান। চট্টগ্রাম ষোলোশহর ২ নম্বর মোড়ের কাছে যেখানে চিটাগং শপিং কমপ্লেক্স আছে, সেখানেই ছিল অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের ভেতরে আবাসনের সঙ্কট থাকায়, অষ্টম বেঙ্গলকে ষোলোশহরে রাখা হয়েছিল। আরো একটা কারণ ছিল; শিগগিরই এ রেজিমেন্ট তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তান চলে যাওয়ার কথা। মেজর জিয়া ছিলেন এই অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক বা সেকেন্ড ইন কমান্ড (সংক্ষেপে টু-আই-সি)। জিয়াউর রহমান সচেতন ছিলেন যে, শত শত সৈনিক এবং স্বাধীনতাকামী হাজার হাজার চট্টগ্রামবাসীর নিরাপত্তা এবং আশা-আকাক্সক্ষার সাথে তার কর্মতৎপরতা জড়িত। তাই পুরো মার্চ মাস, তিনি এই ব্যাপারে মনোনিবেশ করেন। চট্টগ্রাম সেনানিবাসের বায়েজিদ বোস্তামী গেট দিয়ে সেনানিবাসে প্রবেশ করলে, একশ’ গজ যাওয়ামাত্রই হাতের ডানে পড়বে ‘স্মৃতি অম্লান’ নামক মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর। সেখানে অনেক কিছু জানা যাবে। যা হোক, মূল আলোচনায় ফিরে আসি। চট্টগ্রাম মহানগরের ষোলোশহরে অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে, ২৬ মার্চ ১৯৭১ এর প্রথম প্রহরেই জিয়া পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সূচনা এবং স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তার সার্বক্ষণিক সহযোগী ছিলেন এবং সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছিলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলে চাকরিরত বাঙালি অফিসার (ক্যাপ্টেন অলি আহমদ, মেজর মীর শওকত আলী, ক্যাপ্টেন চৌধুরী খালেকুজ্জামান প্রমুখ)। ২৭ মার্চ ১৯৭১ কালুর ঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথমে নিজের নামে ও নিজের দায়িত্বে ঘোষণা করেন; পরে বঙ্গবন্ধুর নামে পুনরায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

১৯৭১ থেকে ১৯৭৫-এর দায়িত্ব
১৯৭১ সালের ৪ এপ্রিল, বর্তমান হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার তেলিয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজারের বাংলোয় অনুষ্ঠিত মুক্তিযুদ্ধের প্রথম অপারেশনাল কনফারেন্সে অন্যান্য জ্যেষ্ঠ অফিসারকে নিয়ে জিয়াউর রহমান উপস্থিত ছিলেন। সেই কনফারেন্সের সিদ্ধান্ত মোতাবেক, তখনকার মতো উপস্থিত জ্যেষ্ঠ বাঙালি সেনা অফিসারদের মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন করে দেয়া হয়েছিল। সেই মোতাবেক মেজর জিয়াউর রহমান অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল নিয়ে চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে যুদ্ধ করতে করতে, রামগড় সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন এবং বাংলাদেশের সামরিক সিদ্ধান্তে ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন শুরু করেন। একপর্যায়ে তৎকালীন মেজর রফিকুল ইসলামের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে তিনি ফোর্স কমান্ডারের দায়িত্ব নেয়ার জন্য অন্যত্র চলে যান। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ সরকারের সিদ্ধান্ত মোতাবেক যখন প্রথাগত ব্রিগেডের মতো ফোর্স গঠন করা হচ্ছিল, তখন প্রথম ফোর্সটির নাম দেয়া হয়েছিল ‘জেড ফোর্স’। ‘জেড’ জিয়াউর রহমানের নামের আদি অক্ষর। জিয়া ওই ফোর্সের কমান্ডার হন। সেই জেড ফোর্সের অন্তর্ভুক্ত ছিল পুনর্গঠিত প্রথম, তৃতীয় ও অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। নয় মাস ধরে সেক্টর কমান্ডার এবং ফোর্স কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে জিয়াউর রহমান দূরদর্শিতা ও সামরিক চৌকশতার পরিচয় দেন। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে, জেড ফোর্স বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহের উত্তর অংশে যুদ্ধরত ছিল। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয় তথা আমরা বিজয় অর্জন করি। ১৯৭২ সালের শুরুতেই, জেড ফোর্সকে কুমিল্লা সেনানিবাসে স্থিতিশীল করা হয় এবং ৪৪ পদাতিক ব্রিগেড হিসেবে এর নতুন যাত্রা শুরু করা হয়; জিয়াউর রহমান তার প্রথম ব্রিগেড কমান্ডার। ১৯৭২ সালের এপ্রিলে নতুন করে সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী এবং নৌবাহিনী স্বতন্ত্র পরিচয়ে যাত্রা শুরু করে। সেই সময় আশা করা হয়েছিল, তৎকালীন কর্নেল জিয়াউর রহমানকে বাংলাদেশ সরকার, সেনাবাহিনীর প্রধান নিযুক্ত করবেন। একই ব্যাচ বা (পাকিস্তান মিলিটারি একাডেমি কাকুলের ১২তম লং কোর্স) এর সহপাঠী, কিন্তু জ্যেষ্ঠতার তালিকায় জিয়াউর রহমানের কনিষ্ঠ, তৎকালীন কর্নেল কেএম সফিউল্লাহকে সরকার, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রথম সেনাপ্রধান (চিফ অব আর্মি স্টাফ) হিসেবে নিয়োগ দেন। অনেকেই মনে করেছিলেন, অপমানিত ও অবহেলিত বোধ করে প্রতিবাদস্বরূপ, কর্নেল জিয়াউর রহমান পদত্যাগ করবেন। কিন্তু করেননি। তিনি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন; দেশের খেদমত করার নিমিত্তে, তিনি সেনাবাহিনীতে থেকে যান। সরকারের প্রতি পূর্ণ আনুগত্য নিয়ে এবং একজন শৃঙ্খলামুখী অফিসার হিসেবে ১৯৭৫-এর ২৪ আগস্ট সকাল পর্যন্ত সেনাবাহিনীর উপ-প্রধান হিসেবে চাকরি করেছেন। অতঃপর তিনি সেনাবাহিনী প্রধান নিযুক্ত হন। ৩ নভেম্বর ১৯৭৫ তারিখে, তৎকালীন ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ বীর উত্তমের নেতৃত্বে একটি সেনাঅভ্যুত্থান বা মিলিটারি কু-দ্য-তা সঙ্ঘটিত হয়। অভ্যুত্থানকারীরা জিয়াকে গৃহবন্দী এবং পদচ্যুত করেছিলেন; যেটা সেনাবাহিনীর সাধারণ সৈনিকেরা পছন্দ করেননি। জিয়া ধৈর্য ও কৌশলের সাথে ওই পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছিলেন।

সেনাপ্রধান জিয়া, ৭ নভেম্বর ও পরবর্তী তৎপরতা
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে ৭ নভেম্বর ১৯৭৫ অতি গুরুত্বপূর্ণ। ওই রাত ও দিনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং সেনাবাহিনীর অস্তিত্ব টলটলায়মান ছিল। তখন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান সুদৃঢ়ভাবে, প্রত্যক্ষভাবে সেনাবাহিনীর দায়িত্ব অব্যাহতভাবে পালন করেন এবং পরোক্ষভাবে পুরো জাতির হাল ধরেছেন। বীর উত্তম জিয়াউর রহমান, বীরত্বের সাথে ওই নভেম্বরের পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছিলেন। তিনি সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন; গোপন রাজনীতিকে ক্রমান্বয়ে পরাভূত ও অপসারণ করেন। ১৯৭৫ সালের নভেম্বর মাসের ৭ তারিখের পর ছয় মাসের মধ্যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে উদ্দীপনামূলক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এবং শক্তিশালী সাংগঠনিক পরিবর্তন এসেছিল; এর উদ্যোক্তা ছিলেন তৎকালীন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। স্বাধীনতার পরপরই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো ছিল চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, ঢাকা, যশোর ও রংপুর সেনানিবাস কেন্দ্রিক এবং স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেডভিত্তিক। নতুন সেনাবাহিনীর জন্য, নতুন দেশের শত প্রকারের সীমাবদ্ধতার মধ্যে এটা ছিল স্বাভাবিক। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ পর্যন্ত ধীরে ধীরে সেনাবাহিনী সুসংগঠিত হতে থাকে; যদিও একটি মারাত্মক ধরনের বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল জাতীয় রক্ষীবাহিনীর অস্তিত্ব ও কর্মকাণ্ড। সেনাবাহিনীর প্রধান হওয়ার পরপরই, উপযুক্ত অভ্যন্তরীণ পরামর্শ সভার পর, জিয়াউর রহমান রক্ষীবাহিনীকে সেনাবাহিনীতে আত্মীকরণের সিদ্ধান্ত নেন। ১৯৭৬ সালেই ঢাকা মহানগরে প্রথম পদাতিক ডিভিশন সংগঠিত করেন, যার পরিচিতি দেন ‘৯ পদাতিক ডিভিশন’ হিসেবে। পরবর্তী দুই বছরের মধ্যে সাবেক স্বতন্ত্র ব্রিগেডগুলোর পাশাপাশি পদাতিক ডিভিশন সংগঠিত করার আদেশ দেন। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে প্রথমবারের মতো একটি আন্তঃবাহিনী অনুশীলন, যেটার নাম ছিল এক্সারসাইজ আয়রনশিল্ড করিয়েছিলেন; ওই অনুশীলনের জন্য প্রধান সমন্বয়ক ছিলেন, ওই সময়ের সুপ্রিম কমান্ড হেডকোয়ার্টার্স (বর্তমানের সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ)-এর প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার মেজর জেনারেল মীর শওকত আলী বীর উত্তম। অতঃপর সেনাবাহিনীর সাংগঠনিক শক্তি ক্রমান্বয়ে সুসংগঠিত হতে হতে এই পর্যন্ত এসেছে। জিয়াউর রহমান আনসার ও ভিডিপিকে দায়িত্বশীল, দেশব্যাপী সুবিন্যস্ত ও সাংগঠনিকভাবে জনমুখী একটি সংগঠনে রূপ দেয়ার সূচনা করেছিলেন।

৩০ মে’র ঘটনা : জানার সুযোগ ও উসিলা
প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মৃত্যুর ঘটনা ছিল চট্টগ্রাম সেনানিবাসে অবস্থানকারী সেনাবাহিনীর একটি অংশের পরিচালিত বিদ্রোহের পরিণতি। একটি কলামে সবকিছু লেখা সম্ভব নয়, তাই অনেক রেফারেন্সের মধ্যে মাত্র একটি রেফারেন্স উল্লেখ করে রাখছি। আমার লেখা এবং ২০১১ সালে ‘অনন্যা’ প্রকাশিত বই ‘মিশ্র কথন’-এ শতাধিক পৃষ্ঠায় এই ঘটনাগুলোর মূল্যায়ন বিধৃত আছে। বিদ্রোহকে ইংরেজি পরিভাষায় ও সামরিক পরিভাষায় মিউটিনি বলা হয়। ১৯৮১ সালের ৩০ মে সঙ্ঘটিত চট্টগ্রাম সেনা বিদ্রোহের বা মিউটিনির বিচার হয়েছিল। কিন্তু আজ অবধি প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার হয়নি। মিউটিনির বা বিদ্রোহের বিচার হয়েছিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইন ৩১ ধারা মোতাবেক। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আইন মোতাবেক, অভিযুক্ত ব্যক্তিরা তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ব্যারিস্টার অ্যাডভোকেট তথা আইনজীবী সেটা সম্ভব না হলে সামরিক অফিসারদের মধ্য থেকে আত্মপক্ষ সমর্থনকারী কর্মকর্তা পাওয়ার অধিকার রাখতেন। ২৯ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির মধ্যে ২৫ জনই ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা অফিসার বা মুক্তিযোদ্ধা জুনিয়র কমিশনড অফিসার। অতএব, স্বাভাবিকভাবেই, ওই ২৯ জনের আবেদন ছিল সেনাবাহিনীর মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের মধ্য থেকেই যেন, কাউকে না কাউকে, আত্মপক্ষ সমর্থনকারী কর্মকর্তা হিসাবে নিযুক্তি দেয়া হয়। ১৯৮১ সালের জুন মাসে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃপক্ষ, মোট তিন জন আত্মপক্ষ সমর্থনকারী কর্মকর্তা (ডিফেন্ডিং অফিসার) নিযুক্ত করতে সম্মত হন, যার মধ্যে কনিষ্ঠতম ছিলেন তৎকালীন লেফটেন্যান্ট কর্নেল (পরে মেজর জেনারেল) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, তথা এই কলামের লেখক। পাঠক যেন মনে করেন না যে, এই তিনজন ব্যক্তির দায়িত্ব ছিল প্রেসিডেন্টকে হত্যা করার সমর্থন জানানো। এই তিনজন অফিসারের দায়িত্ব ছিল ২৯ জন অভিযুক্ত ব্যক্তির আত্মপক্ষ সমর্থন করা; তথা এটা প্রমাণে সহায়তা করা যে, তারা বিদ্রোহের জন্য দায়ী নন বা তারা বিদ্রোহ করেননি। কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে অভিযুক্তদের বিচার হয়েছিল; সেনাবাহিনী আইন (বাংলাদেশ আর্মি অ্যাক্ট) মোতাবেক কোর্ট মার্শালের রায় বাস্তবায়ন হয়েছিল। কিন্তু সেই কোর্ট মার্শাল সম্বন্ধে, সে কোর্ট মার্শালের পরিচালনাও নিরপেক্ষতা সম্বন্ধে আমার ব্যতিক্রমী মতামত আছে যা ‘মিশ্র কথন’ বইয়ে লিখেছি। কোর্ট মার্শাল (তথা আদালতটি) বসেছিল চট্টগ্রাম মহানগরের লালদীঘির পাড়ে অবস্থিত কারাগারের অভ্যন্তরে। ওই কারাগারেই অভিযুক্ত ২৯ জন বন্দী ছিলেন। তাদের আত্মপক্ষ সমর্থন করতে হলে, ঘটনা সম্বন্ধে জানতেই হবে। জানার নিমিত্তে ওই ২৯ জন অভিযুক্তের সঙ্গে আমরা আলাপ করেছিলাম, তাদের মধ্যে বেশির ভাগেরই পিতা-মাতা, স্ত্রী, ভাইবোন প্রমুখের সঙ্গেও আমরা কথা বলেছিলাম। আলাপের কারণে, তাৎক্ষণিক ঘটনা এবং তার আগেরও অনেক ঘটনা প্রসঙ্গে, আমাদের জানার সুযোগ হয়েছিল। এটা ছিল অত্যন্ত বিরল সুযোগ। আশ্চর্যজনক মনে হলেও বাস্তবতা হলো, ভীতিকর পরিস্থিতিতে আমরা লিখিত নোট রাখতে পারিনি, যা কিছু জমা রাখার সেটা জমা রেখেছিলাম স্মৃতির মণিকোঠায়। অপ্রিয় বাস্তবতা হলো, কালের পরিক্রমায় অনেক কিছু স্মৃতিশক্তি থেকে ছুটে যায় বা যাচ্ছে। উল্লেখ্য, যেসব অভিযুক্ত ব্যক্তি বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড পেয়েছিলেন, তারা দণ্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর সসম্মানে, স্বমহিমায় নাগরিক জীবনযাপন করছেন।

জিয়া হত্যার দায়
সেনাবাহিনীতে চাকরি করার কারণে, সক্রিয় চাকরি জীবনে, এ ধরনের মিউটিনি ও কোর্ট মার্শাল বিষয়ে লেখালেখি কঠোরভাবে নিরুৎসাহিত ছিল। কিন্তু ঘটনার তিরিশ বছর পর (১৯৮১-২০১১) ‘মিশ্র কথন’ বইটি লিখেছি। বইটি লেখার সময় অনেক কথা যেগুলো অভিযুক্তদের কাছ থেকে জেনেছিলাম, সেগুলো উল্লেখ করতে পারিনি। কারণ, সেগুলো গবেষকের বা আইনজীবীর দৃষ্টিতে প্রমাণযোগ্য নয়; কিন্তু আমার কাছে অতি বিশ্বাসযোগ্য। ওই আমলের বিদ্রোহী মনোজাগতিক পরিস্থিতির সারমর্ম এই অনুচ্ছেদে তুলে ধরলাম।
তৎকালীন (১৯৭৮ থেকে ’৮১ সালের মে) চট্টগ্রাম সেনানিবাসের পদাতিক ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আবুল মঞ্জুর বীর উত্তম চাচ্ছিলেন জিয়াউর রহমানকে কাবু করতে; জেনারেল মঞ্জুরকে প্রত্যক্ষভাবে না হলেও সুনির্দিষ্ট-পরোক্ষভাবে উৎসাহ জোগাচ্ছিলেন ঢাকায় অবস্থানকারী কয়েকজন জ্যেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশের বাইরের আর্থ-রাজনৈতিক শক্তি। প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের দু’একটি পত্রিকায় এবং অন্যান্য দেশের পত্রিকায়, প্রকাশিত বিশ্লেষণমূলক সংবাদে এবং অনেক বাংলাদেশী লেখকের পুস্তকে এ ধরনের সুস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘনিষ্ঠ সহচর এবং ১৯৮০ সালের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঘনিষ্ঠ সরকারি সহকর্মী, কর্নেল ড. অলি আহমদ বীর বিক্রম, মরহুম মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল মইনুল হোসেন চৌধুরী বীর বিক্রম, বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ব্যারিস্টার নাজমুল হুদা এবং আরো কেউ কেউ তাদের লেখা পুস্তকে বা কলামে বা সাক্ষাৎকারে এ ধরনের ইশারা দিয়েছেন। ২৯ মে ১৯৮১ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বীর উত্তম চট্টগ্রাম গিয়েছিলেন; মূল কাজ ছিল রাজনৈতিক; তার মধ্যেও বিএনপি দলীয় রাজনৈতিক কর্ম। এই সুযোগটি ষড়যন্ত্রকারীরা কাজে লাগিয়েছে। প্রশ্ন : সুযোগটি কী? উত্তর : প্রেসিডেন্টকে হাতের নাগালে পাওয়া। প্রশ্ন : সুযোগটি কী কাজে বা কোন কাজে লাগানো হয়? উত্তর : তাকে হত্যা করা। ৩০ মে ১৯৮১ সালের আগের দিনগুলোতে, ষড়যন্ত্রকারীরা জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে হত্যা করার জন্য কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে বা কী কী প্রস্তুতি নিয়েছে অথবা কেনইবা তাদের একাধিক ষড়যন্ত্র সফল হয়নি, এই কথাগুলো বিভিন্ন জ্ঞানী ব্যক্তি তাদের পুস্তকে লিখেছেন; আন্তর্জাতিক ও জাতীয় জার্নালে লিখেছেন। আমার লেখা ‘মিশ্র কথন’ বইটিতেও এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত আছে।

আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার
আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম চালিকাশক্তি হলো গণতন্ত্রের চর্চা তথা গণতান্ত্রিক রাজনীতি। বাংলাদেশের মানুষকে, তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার দিতে অস্বীকার করেছিল তদানীন্তন পাকিস্তানি সামরিক জান্তা। মুক্তিযুদ্ধের অনেক দীর্ঘমেয়াদি ও মধ্যমেয়াদি কারণ থাকলেও, তাৎক্ষণিক কারণ ছিল সামরিক জান্তার এই অগণতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫-এর জানুয়ারি পর্যন্ত বাংলাদেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র ছিল। অতঃপর একদলীয় গণতন্ত্র বা শাসন প্রবর্তিত হয়েছিল; তখনকার একটি মাত্র দলের নাম ছিল ‘বাকশাল’। ৭ নভেম্বর ১৯৭৫-এর পরে পার্লামেন্ট ও সাংবিধানিক রাজনীতি সাময়িকভাবে ছিল স্থগিত। অতঃপর, জিয়াউর রহমানের আগ্রহ ও নির্দেশে, বাংলাদেশের স্বার্থেই, নতুন করে বহুদলীয় গণতন্ত্রের সূচনা করা হয়। সেই সময় পুরনো দলগুলো পুনরুজ্জীবিত হয় এবং একাধিক নতুন দল জন্ম নেয়। পুনরুজ্জীবিত দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রখ্যাত হলো আওয়ামী লীগ এবং নতুনভাবে জন্ম নেয়া দলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত নাম হলো বিএনপি। যারা জিয়াউর রহমানকে ভালোবাসেন, তাদের অনুভূতি হলো- জিয়াউর রহমান, ১৯ দফার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের জন্য একটি ভিশন তুলে ধরেছিলেন। জিয়া প্রেমিকদের অনুভূতি হলো, তার অনুসরণের মধ্যই বিএনপির সাফল্যের চাবিকাঠি নিহিত। বিএনপি এখন একা নয়; দেশে কোটি কোটি মানুষের আশা-আকাক্সক্ষার মূর্ত প্রতীক এই দল। বিএনপি ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক; যদিও বিএনপি আজ নেতৃত্বের অঙ্গনে ও সাংগঠনিক অঙ্গনে একটি কঠিন সময় পার করছে। বিএনপির আছে কোটি কোটি শুভাকাক্সক্ষী। বিএনপির অন্যতম সম্পদ জিয়াউর রহমানের নাম, স্মৃতি এবং এই নামের ক্যারিশমা। এই সম্পদকে কত বেশি ব্যবহার, কী নিয়মে ব্যবহার করা উচিত সেই প্রশ্নের উত্তর, গভীর আলোচনার দাবি রাখে।

লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com


আরো সংবাদ




portugal golden visa
paykwik