২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

কোন দেশের কৃষকদের বাঁচাতে চান

কৃষক আব্দুল মালেক সিকদার -

সরকারের অবিরাম প্রচারণা থেকে কখনো কখনো এমন বিভ্রান্তির জন্ম হতে পারে, সরকার বোধকরি খুবই কৃষকবান্ধব। কিন্তু সরকারের কোনো পদক্ষেপেই এমন ধারণা প্রমাণ হয় না। এবার ধানের বাম্পার ফলনের পর দেখা গেল, সরকার প্রকৃতপক্ষে কৃষকের শত্রুই। কৃষকের জন্য তাদের কোনো মমতাই নেই। এবার কৃষক ধান ফলিয়ে তা ঘরে তুলতে পারছিলেন না। এক মণ ধানের দাম ৫০০ টাকা। অপর দিকে একজন মজুরের দৈনিক মজুরি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। অন্যান্য সময় কৃষক মজুরের মজুরি দিতেন ধানের আনুপাতিক হিসাবে। কিন্তু এবার মজুরের সঙ্কট প্রকট হওয়ায় মজুর মজুরি চাইছেন নগদ টাকায়। ফলে বিপাকে পড়েছেন কৃষক। বিপন্ন কৃষক কোথাও কোথাও পাকা ধানের ক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছেন। কোথাও কোথাও রাস্তায় ধান ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। সে প্রতিবাদে শরিক হয়েছেন সচেতন নাগরিকেরা এবং তারা সঙ্গতভাবেই প্রশ্ন করেছেন- এক কেজি চালের দাম যদি ৫০ টাকা হয়, তাহলে এক কেজি ধানের দাম ১২ টাকা হবে কেন? সরকার এ প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি। জবাব না দিয়ে তারা এমন সব বক্তব্য দিচ্ছেন যে, গা শিরশির করে উঠছে।

সরকারের তরফ থেকে ধানের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল মণপ্রতি ১০৪০ টাকা। কিন্তু কৃষক সে দামে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। এর মধ্যে আছে মধ্যস্বত্বভোগী। কৃষকের দাবি- সরাসরি তাদের কাছ থেকে ধান কেনা হোক। কিন্তু তাদের সে দাবির প্রতি সরকার কান দেয়নি। সরকার চালকল মালিকদের সুবিধা করে দেয়ার জন্য কৃষকদের সমুদ্রে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এখন দাবি ওঠে যে, কৃষক বাঁচাতে চালের সংগ্রহমূল্য বাড়াও। সরকারের মন্ত্রী জবাবে বলেছেন, চালের দাম বাড়ানোর কোনো সম্ভাবনা নেই। কেন নেই? কারণ, টাকা নেই। সরকারের তরফে অতিরিক্ত ধান কেনাও সম্ভব নয়, কারণ সরকারি গুদামে জায়গা নেই। তাহলে কৃষকের কী হবে? কৃষক ডুববেন। সরকার কেন দায়িত্ব নেবে? এ প্রসঙ্গে সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেছেন, কৃষকের ধান কেনার জন্য সরকারের কাছে টাকা নেই, কিন্তু কৃষি কর্মকর্তাদের গাড়ি কেনার জন্য যথেষ্ট টাকা আছে। এ কেমন বিচার!

এ দিকে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেছেন, ধানক্ষেতে আগুন লাগানোর ঘটনা বাংলাদেশের নয়। বিএনপি-জামায়াতের ষড়যন্ত্র এখনো থামেনি। সুযোগ পেলেই তারা ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। ফেসবুকে ধানের ক্ষেতে আগুন লাগানোর ছবি দেয়া হয়। বলা হয়, বগুড়ায় ধানক্ষেতে আগুন দেয়া হয়েছে। আমরা খবর নিয়েছি, বগুড়ায় আগুন দেয়া হয়নি। ভারতের পাঞ্জাবে ধানক্ষেতে আগুন লেগেছিল। ওই দেশের সরকার সেটি নেভানোর চেষ্টা করেছিল। উদ্দেশ্যমূলকভাবে সেই ছবি বগুড়ার ধানক্ষেতে আগুন বলে প্রচার করা হচ্ছে। তার এ ভাষ্য শুনে সচেতন মানুষ শিউরে উঠেছে। বগুড়ায় হতাশ কৃষক ধানক্ষেতে আগুন দিয়েছিলেন, সে খবর মিডিয়ায় ছবিসহ প্রচার হয়েছে। পরে এলাকার কলেজছাত্ররা ওই কৃষকের জমির ধান কেটে দিয়েছেন। সেটিও মিডিয়ায় প্রচার হয়েছে। সবাই দেখেছে। কেবল হানিফ সাহেবরা ঠুলি পরে থেকেছেন।

এর আগেও হানিফ সাহেব বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট নিয়ে আজগুবি কথা বলে লোক হাসিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের আগাম খবরে ঘূর্ণিঝড় ফণীতে বাংলাদেশের ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে। অথচ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ঘূর্ণিঝড় বিষয়ে কোনো কাজই নেই। সেজন্য সে টিকে তৈরিই করা হয়নি। তবে হানিফ সাহেবরা দমবার পাত্র নন। তাদের ধারণা, তারা যা জানেন না, বাংলাদেশের আর কেউই তা জানতে পারেন না। ফলে এ কথায় মাঝে মধ্যেই হাস্যরসের সৃষ্টি হয়। তারা লোক হাসান।

এর মধ্যে এলো আরো উদ্বেগের খবর। ধান নিয়ে বাংলাদেশের কৃষক যখন এতটা বিপন্ন তখন ভারত থেকে বেসরকারিভাবে ২০ লাখ টনেরও বেশি চাল আমদানির অনুমোদন দিলো সরকার। ফলে বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশের বাজারে আসতে শুরু করল ভারতীয় চাল। এটা যেন মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা। ভারত বরাবরই চাল রফতানিকারক দেশ। বাংলাদেশও প্রয়োজনে ভারত থেকে চাল আমদানি করে। এবার ভারতেও ধানের ফলন ভালো। আর তাই দ্রুত ওই চাল বাংলাদেশে রফতানির ব্যবস্থা করে ভারত সরকার।

দেশের চালের একটা শক্তিশালী মজুদব্যবস্থা দরকার আপৎকালীন প্রয়োজন মেটানোর জন্য; কিন্তু তা কি নিজের দেশের কৃষককে মেরে? এবারের পরিস্থিতি দেখে মনে হলো, সরকার যেন বাংলাদেশের নয়, ভারতীয় কৃষকদের বাঁচাতেই মরিয়া হয়ে উঠেছে। সরকার কৃষকদের আশ্বস্ত করার জন্য ঘোষণা করে বসল, কৃষকের যে উদ্বৃত্ত ধান, তার একমাত্র সমাধান চাল রফতানি। সে চাল রফতানি করার জন্যও যেতে হবে চালকল মালিকদের কাছে। চালকল মালিকেরা অসহায় কৃষকের কাছ থেকে কম দামে ধান কিনে চাল তৈরি করে বেশি দামে রফতানি করবেন। অর্থাৎ সে ব্যবস্থায়ও কৃষকের দুঃখদিনের অবসান ঘটবে না। সত্যাসত্য জানি না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি খবর দেখলাম, সরকারদলীয় ১৪৭ মন্ত্রী-এমপি এক বা একাধিক চালকলের মালিক। তাই যদি হয়, তবে শিগগিরই কৃষকের দুর্দিনের অবসান ঘটবে না।

তবুও চাল রফতানি হয়তো একটা সাময়িক সমাধান। আমরা চাল রফতানিকারক দেশ হিসেবে পরিচিত নই; বরং আমরা বরাবরই চাল আমদানি করে থাকি। এবার ধান উদ্বৃত্ত, তার মধ্যেও তো আমরা লাখ লাখ টন চাল আমদানি করছি। সে রকম পরিস্থিতিতে কেউ বিশ্বাসই করবে না যে, আমরা চাল রফতানি করতে পারব এবং সময়মতো সেই চাল ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারব।

উপরন্তু সড়কপথে আমাদের চাল রফতানির কোনো কায়দা নেই। রফতানি করতে চাইলে আমাদের বাজার খুঁজতে হবে দূরে কোথাও। কারণ প্রতিবেশী ভারত, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্পোডিয়া প্রভৃতি দেশই চাল রফতানি করে, আমদানি করে না। বিশ্ববাজারে চাল রফতানি করতে হলে এসব চাল রফতানিকারক দেশের সাথে আমাদের প্রতিযোগিতায় নামতে হবে। সে প্রতিযোগিতাও সহজ কাজ নয়। সুতরাং চাল রফতানির যে মুলা কৃষককে দেখানো হচ্ছে, সেটি খুব সহজ বা রাতারাতি সম্ভব হবে না। এক দিকে চাল রফতানির প্রস্তাব অপর দিকে চাল আমদানিতে বাংলাদেশ শুরুতেই বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে। শেষ পর্যন্ত এ উদ্যোগে কৃষকের কোনো উপকারই হবে না।

আবার ধান-চাল সংগ্রহ অভিযান শুরু হলেই সরকারি দলের লোকদের একধরনের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠে। তারা কৃষককে ক্রয়কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছতে দেয় না। এরা আবার ক্রয়কেন্দ্রের লোকদের সাথে একধরনের যোগসাজশ গড়ে তোলে। তারা কৃষককে বলে- ধান ভেজা রয়েছে, অতএব কিনতে পারবে না। তখন একটা অসহায় অবস্থার মধ্যে পড়েন কৃষক। বাধ্য হয়ে অনেক কম দামে সরকারি দলের লোকদের কাছে ধান বিক্রি করেন। এরা আবার বিক্রি করে দেয় চালকল মালিকদের কাছে। এই চক্র যুগের পর যুগ ধরে কৃষককে প্রতারণা করে আসছে। এ রকম একটি খবর এসেছে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি থানা থেকে। সরকারি ধান সংগ্রহে বাধা দেয়া ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগে বেলকুচি উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা এক যুবলীগ নেতাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন।

বেলকুচি থানার ওসি আনোয়ারুল হক জানান, ইউএনও এস এম সাইফুর রহমান বাদি হয়ে বুধবার রাতে থানায় মামলাটি করেন। আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে। মামলার প্রধান আসামি সাজ্জাদুল হক রেজা বেলকুচি উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক। বেলকুচির ইউএনও সাইফুর রহমান বলেন, বুধবার বেলা ১১টায় সাজ্জাদুল হকসহ ১৫-২০ জনের একটি দল উপজেলা অফিসে এসে আমার সাথে অশালীন আচরণ করেন এবং ভয়ভীতি দেখান। সাজ্জাদুল তার নিজের করা তালিকা অনুযায়ী ধান কেনার জন্য হুমকি দেন। তখন সভায় উপস্থিত শাহজাদপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ঘটনার প্রতিবাদ করেন। তিনি এর নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের শাস্তি দাবি করেন। সদর উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, দলীয় লোকেরাই সিন্ডিকেট করছে। এ থেকে বেরিয়ে এসে প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করতে হবে। সভায় উপস্থিত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার বলেন, ধান ক্রয়ে যারা বাধা দেবে, তারা দুষ্কৃতকারী। তাদের কোনো দল নেই।

এভাবেই সিন্ডিকেট হয়। আর কৃষককে শোষণ-বঞ্চনা করা হয়। যুগের পর যুগ ধরে এভাবেই চলছে। কৃষক কোনো দিন উঠে দাঁড়াতে পারেননি। তবে সময় বোধহয় এখন বদলে গেছে। কৃষক যেমন আগের মতো নীরবে সহ্য করছেন না, তেমনি তাদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন সুশীলসমাজও। আশা করি, সামনে সুদিন আসবে।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
[email protected]


আরো সংবাদ

প্রতিমন্ত্রী ও সচিব ঢাকায় ফিরলে সেই জামালপুর ডিসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা যুবলীগ নেতার স্ত্রী পিস্তল-গুলিসহ গ্রেফতার অভিযুক্তদের শাস্তির দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ ট্রাম্পের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা, বিতর্কে মোদী পাকুন্দিয়া থেকে অপহৃত ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী ঢাকায় উদ্ধার ঝালকাঠিতে গৃহবধূ হত্যা মামলায় দু’জনের মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন ৩ সাঙ্গাকারা-ধোনি-গিলক্রিস্টরা ধারে কাছেও নেই কামরান আকমলের দেড় মাস পর কবর থেকে ৪ বছরের শিশুর লাশ উত্তোলন চার পেসার নাকি দুই স্পিনার? ছাত্রলীগ তো বটেই, আ’লীগও সন্ত্রাসী দল : মির্জা ফখরুল ইনজুরির ভাষা যাই হোক, রশিদের মনের ভাষা ফাইনালে খেলছে

সকল