১৮ নভেম্বর ২০১৯

হিন্দুত্বের রাজনীতির বলি!

ভারতের কেন্দ্রীয় পার্লামেন্ট বা লোকসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির বিজেপি আবার বিজয়ী হয়েছে, তারা ক্ষমতায় ফিরে আসছে এবং ২০১৪ সালের নির্বাচনের চেয়েও এবার আরো বেশি আসন নিয়ে। বিজেপির জোটের নাম এনডিএ। গত এমন নির্বাচনে বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। তবুও সে সরকার, এনডিএ জোট সরকার হিসেবেই ক্ষমতায় ছিল। আর এবার বিজেপি একাই পেয়েছে ৩০৩ আসন। আর জোট হিসেবে এটা ৩৫২ আসন। গত ২০১৪ সালে এই সংখ্যাগুলো ছিল ২৮২ ও ৩৩৬।

এক কথায় বললে এবার ‘হিন্দুত্ব’- এই মুখ্য ইস্যুর ভিত্তিতে নির্বাচন হয়ে গেল। ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হিন্দুত্বকে প্রধান ইস্যু করে নির্বাচন করতে চাইলে বাকি সব দলকে যে তাতে শামিল হতে বাধ্য করা যায় আর ভোটারদেরও আর সব ইস্যু ফেলে হিন্দুত্বকে প্রধান বানিয়ে নির্বাচনে সে ভিত্তিতে ভোট দিতে বাধ্য করা যায়- এরই জলজ্যান্ত প্রমাণ হলো ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচন।

এর মূল কারণ, ভারত-রাষ্ট্র গঠনই হয়েছে হিন্দুত্বকে কেন্দ্র করে। সে কথাই আবার মনে করিয়ে দেয়া হয়েছে। বিশেষত প্রধান নির্বাহী হিসেবে নেহরুর কাছে এই প্রশ্নের উত্তর ছিল না যে অসংখ্য ভিন্নতার বিভিন্ন লোক-জনগোষ্ঠীকে এক রাষ্ট্রে রাখার উপায় কী? কোন বন্ধনে আটকে রাখা যায়? এ জন্য ‘হিন্দুত্ব’ ছাড়া অন্য কিছু উপযুক্ত হতে পারে না- তাদের চোখে এটাই সদুত্তর ছিল। তাই ভারত-রাষ্ট্রের গঠন ভিত্তি হয়ে যায় হিন্দুত্ব। এ কারণেই আবার কোনো কিছুকে অহিন্দুত্ব মনে হলে তাকে চাপিয়ে রাখার অবস্থান নেন তারা। হিন্দুত্বকে এক নতুন মানে দেয়ারও চেষ্টা করা হয়। এটি একটি কালচার বা সিভিলাইজেশনের নাম ইত্যাদি বলে হিন্দুত্ব শব্দের দগদগে ধর্মীয় দিকটি আবছা করার চেষ্টাও দেখা যায়। আবার হিন্দুত্ব শুনতে ভালো লাগে না বলে একে ‘সেকুলারিজমের জামা’ পরিয়ে আড়ালে ঢেকে রাখার চেষ্টা হয়ে থাকে সব সময়।

কিন্তু এই প্রচেষ্টাকে আরএসএস-জনসঙ্ঘ-বিজেপি ভারতের জন্মকাল থেকে কখনোই মানেনি, বরং প্রকাশ্যে তর্ক তুলেছে। প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে দাবি তুলছে, হিন্দুত্বকে আঁকড়ে ধরে এরই আধিপত্য চেয়েছে এবং প্রকাশ্যে। অভিযোগ এনেছে কংগ্রেসিরা মুসলমান-তোষামোদকারী হওয়ার কারণে দেশ ভাগ হয়ে পাকিস্তান হাতছাড়া হয়ে গেছে। এই অভিযোগে তাদের নাথুরাম গডসে কংগ্রেস নেতা গান্ধীকে খুন করেছে।

১৯৭৭ সাল থেকে কংগ্রেস দলের দুর্বল হওয়া শুরু হতে থাকে। ১৯৮৯ সালে এসে ক্ষমতায় ‘কংগ্রেস কোয়ালিশন’ শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে প্রথম পূর্ণ পাঁচ বছরের বিজেপি সরকারই কায়েম হয়েছিল। নব্বইয়ের দশকের শুরু থেকেই আবার প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের স্পষ্ট বয়ান, ব্যাখ্যা ও দাবি নিয়ে বা বাবরি মসজিদ ইত্যাদি ইস্যু নিয়ে মাঠে হাজির হয়েছিলেন আরএসএস-বিজেপির নেতা আদভানি। এবার নির্বাচনী ফলাফল প্রকাশের পরের দিন সকালে মোদি-অমিত আদভানির বাসায় গিয়ে সেকালে হিন্দুত্বের বয়ান ব্যাখ্যা নিয়ে হাজির হওয়ার কারণে আদভানিকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়ে এসেছেন। আসলে মোদির শাসনের দ্বিতীয় পর্বের নির্বাচনে এসে তিনি প্রমাণ করলেন, সবচেয়ে সফলভাবে হিন্দুত্বকে নির্বাচনে মুখ্য রাজনৈতিক ইস্যু করা সম্ভব, নির্বাচনে জেতাও সম্ভব।

কেন কেবল হিন্দুত্বকে ভরসা করে মোদি নির্বাচনে নেমেছিলেন? ২০১৪ সালে তার মুখ্য ইস্যু ছিল অর্থনৈতিক। এবার অর্থনৈতিক শব্দটি তিনি কোথাও উচ্চারণই করেননি। দুনিয়ায় ‘রাইজিং ইকোনমি’র দেশ বলে এক নতুন টার্মের ব্যবহার শুরু হয়েছিল। ‘রাইজিং অর্থনীতির ইন্ডিয়া’ তার একটি। কিন্তু মোদির আগের কংগ্রেস সরকারের দ্বিতীয় টার্মে মাঝপথে (২০১১) এসে তা মুখ থুবড়ে পড়েছিল। মানুষের আশা-আকাক্সক্ষাও ভাঙতে শুরু করে। সে দিকটা খেয়াল করে মোদি ২০১৪ সালের নির্বাচনে, ডুবে যাওয়া ওই অর্থনৈতিক ইস্যুর সাথে দাবি করেছিলেন, তিনি এটা আবার তুলে আনতে পারবেন। কারণ, গুজরাটের অর্থনৈতিক সাফল্যের তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী তিনি। তাই যেন তাকে ভোট দেয়া হয়। এর সাথে হিন্দুত্ব ইস্যুও ছিল, তবে তা সেকেন্ডারি। কিন্তু এবার? তিনি জানেন এবার অর্থনৈতিক সাফল্য তার নেই, ডিমনিটাইজেশন আর জিএসটি ইস্যুতে তার কপাল খোলেনি। বিশেষ করে কাজ সৃষ্টির যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাতে তিনি ফেল করেছেন।

মোদিই ব্যতিক্রমী রাজনীতিবিদ। সেটা এই অর্থে যে, তিনি নিজের দল, বিশেষ করে সরকার চালান দলীয় নেতাদের পরামর্শের কোনো টিম দিয়ে নয়; বরং তিনি তা করে থাকেন প্রফেশনাল ম্যানেজমেন্ট কনসাল্টিং কোম্পানি দিয়ে। যারা গবেষণাও করে থাকেন। মোদি-অমিতের বিশেষ ‘রাজনৈতিক ব্র্যান্ড’ এটিই। এ জন্য তারা বিজেপির মতো দল করলেও খুবই ‘স্মার্ট।’ সেই কনসালট্যান্টদের পরামর্শেই তিনি কেবল হিন্দুত্ব ইস্যুতে নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে দেখালেন। যে উত্তর এখনো অমীমাংসিত তা হলো- বিভিন্ন আত্মপরিচয় বা বৈশিষ্ট্যের মানুষ একটা রাষ্ট্রে কিসের ভিত্তিতে জড়ো হয়ে থাকে, কী তাদের এক জায়গায় ধরে রাখে- আটকে ধরে রাখার কোনো ভিত্তি কি অনিবার্য? নাকি অপ্রয়োজনীয় এবং এর বিকল্প আছে?

এ প্রশ্নটি ভারতে তো বটেই, উপমহাদেশেই মীমাংসিত নয়, স্পষ্ট উত্তর নেই এবং এক ভারতের কারণেই সবখানে এটা অমীমাংসিত ও এত অসন্তোষ।

আধুনিকতা আইডিয়ার প্রথম ও প্রাথমিক বৈশিষ্ট্য ছিল রেনেসাঁ। ইউরোপের রেনেসাঁকে ভারতে বিশেষ করে সেকালের বাংলায় নিয়ে এসেছিলেন ব্রিটিশ শাসকেরা। রাজা রামমোহন রায়কে বাংলায় ‘রেনেসাঁর আদিগুরু’ বলা হয়। তিনিও রেনেসাঁ চিন্তার পেছনে পুরো ভারতজুড়ে একটাই ধর্ম, তথা হিন্দুত্ব থাকা জরুরি মনে করতেন। তিনিই একেশ্বরবাদী ব্রাহ্ম ধর্মের প্রবর্তক, যা আসলে একটু রিফর্মড হিন্দুত্বই- হিন্দু ন্যাশনালিজম। তবে তার মৃত্যুর পরে এটার অকার্যকারিতায় বঙ্কিম, অরবিন্দ, বিবেকানন্দের হাতঘুরে আরো রিফর্মড হয়ে উনিশ শতকের শেষের দিকে তা কংগ্রেস দলের হাতে পৌঁছেছিল। আরো পরে এটাই বঙ্গভঙ্গ রদ আর কথিত স্বদেশী আন্দোলনের মূলমন্ত্র ও প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। দেশভাগের পরে নেহরুর হাতে এই হিন্দুত্ব- এরই ব্যবহার হয় রাষ্ট্র গঠনে। তার আগে কংগ্রেসের উত্থানের পর থেকেই হিন্দুত্ববাদী চিন্তার কারণেই আমাদের উপমহাদেশে সব বিভক্তির জন্ম। লক্ষণীয় বিষয় হলো, ভারত যদি একটা মডার্ন রিপাবলিকই হতে চেয়ে থাকে, তবে তার আবার হিন্দুত্বের, হিন্দু ন্যাশনালিজমের দরকার কেন? এর জবাব কংগ্রেস বা বিজেপি কখনো দেয়নি, দেবে না- খুঁজবে না।

গত পাঁচ বছরে গরু নিয়ে যেভাবে সামাজিক আতঙ্ক তৈরি করা হয়েছে, নৈরাজ্য সৃষ্টি করা হয়েছে, গরু ব্যবসায়ীকে পাবলিক লিঞ্চিং করা হয়েছে বিজেপি-আরএসএসের নামে ফ্রিজে গরুর গোশত রেখেছে এই অভিযোগে বাসায় ঢুকে বিজেপি-আরএসএসের কর্মীরা মানুষ খুন করেছে। আর প্রধানমন্ত্রী মোদি এসব নৈরাজ্য চলতে দিয়েছেন। মুসলমানদের নিয়ে এই চরম বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রীয় আচরণের পরও ভারত রিপাবলিক থাকে কেমন করে?

কংগ্রেস বা এর সভাপতি রাহুল গান্ধী- এদের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করার মতো। মোদির হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ প্রতিক্রিয়া কংগ্রেসে না হয়ে আমরা দেখছি বরং কংগ্রেস নিজেই কথিত সেকুলারিজমের জামা খুলে প্রকাশ্যে নিজেও হিন্দুত্ববাদী হয়ে গেছে। আবার দাবিও করছে, এটা নাকি মোদির মতো হার্ড হিন্দুত্ববাদ নয়, ‘সফট হিন্দুত্ববাদ’। অর্থাৎ তথাকথিত সেকুলারিস্ট কংগ্রেস হিন্দুত্বকে ঠেকাতে চাওয়া ছেড়ে সরাসরি মোদির হিন্দুত্বের ভাগ চাইতে নেমেছে। অপর দিকে কলকাতার কমিউনিস্টরা এই নির্বাচনে সব আসন হারিয়েছে। শুধু তাই নয়, নিজেদের ভাগের ২২ শতাংশ ভোট কমিয়ে সেটাও দিয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদী মোদির দলকে।

নির্বাচন প্রচারণা বন্ধ হলে, পরদিন মোদি হিন্দু তীর্থস্থান কেদার নাথের মন্দিরে গিয়ে ধ্যান করার শো-অফ করতে গেলে তা দেখে কংগ্রেসিদের জবাব হলো- রাহুল সেখানে হেঁটে গেছিলেন আর মোদি গেছেন বিশেষ হেলিকপ্টারে; কাজেই আমরা শ্রেষ্ঠ। এখানেই হিন্দুত্বের বিজয় লাভ। মোদি আসলে ভোটের ফলাফলে নয়, এখানেই বহু আগে কংগ্রেস, সিপিএমদের হারিয়ে দিয়েছেন। হিন্দুত্ব কত ভারী, এর লক্ষণীয় ও উল্লেখযোগ্য অসংখ্য ঘটনায় ভরা ছিল এই নির্বাচন।

সব পর্বের নির্বাচনই শেষ হয়েছিল ১৯ মে। এদিন সন্ধ্যায় মোদি-অমিত সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, তাদের জোট ৩০০-র কাছাকাছি আসনে বিজয়ী হবে। ফলাফল বিজেপির অনুমানকেও অনেক ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ শুধু বিরোধীদেরই সব অনুমান ফেল করেনি, খোদ বিজেপির অনুমানও কাজ করেনি।

সাধারণত রাজ্য সরকারে কোন দল সরকারে আছে, এটা লোকসভা নির্বাচনে একটা ফ্যাক্টর হয়ে থাকে, তারা সাধারণত আসন বেশি পেয়ে থাকে। কিন্তু এই নির্বাচনে দু-একটা ব্যতিক্রম ছাড়া কোথাও এমন ফ্যাক্টর কাজ করেনি। এমনকি যেখানে মাত্র পাঁচ মাস আগে রাজ্য সরকারের নির্বাচনে কংগ্রেস বা বিজেপির বিরোধী দল জিতেছে, সেখানেও এবার বিজেপি প্রায় সব (বা একটা বাদে) লোকসভা আসনে জিতেছে। এ অবস্থা হয়েছে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, ছত্তিশগড় বা কর্নাটক রাজ্যে। খুব ব্যতিক্রমী পরিস্থিতি ছাড়া ভারতের নির্বাচনে এটা দেখা যায় না।

আসামে এনআরসি বা নাগরিকত্ব প্রমাণের আইন চালু করার পর ৪০ লাখ হিন্দু-মুসলমান নানা কারণে নাগরিকত্ব প্রমাণ করতে পারেনি। এদের অনেকেই এখন ক্যাম্পে কাতরাচ্ছে। এ বছরের শুরুতে এর বিরুদ্ধে প্রবল বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল। মিজোরামে ‘বাই বাই ইন্ডিয়া’ বলে প্লাকার্ড হাতে মিছিল হতে দেখেছিলাম আমরা। কিন্তু কয়েক মাস পর এবার নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, এ জাতীয় সব নাগরিক আপত্তি হাওয়া হয়ে গেছে। বিজেপি ওই সাত রাজ্যেই বেশির ভাগ আসন নিয়েছে, কোনো কোনো রাজ্যে সবগুলোই।

আবার পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তৃণমূলের মমতা প্রচণ্ডভাবে চ্যালেঞ্জড হয়েছেন। এই প্রথম তার তৃণমূল দলের ৩৪ আসন নেমে হয়ে গেছে মাত্র ২২টা। আর বিজেপি একাই ১৮ আসন পেয়ে গেছে। পশ্চিম বাংলা ও নর্থ-ইস্ট জোনে মোদির হিন্দুত্বের রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রধান বাধা এই মমতাই; বিশেষ করে এনআরসি বা নাগরিকত্বের হুজুগ তুলে বাংলাদেশী অনুপ্রবেশকারী বলে ইসলামবিদ্বেষ জাগানো ও দাঙ্গা বাধানোর রাজনীতি করে ক্ষমতা দখলের পাঁয়তারা করার বিরুদ্ধে। কাজেই বিজেপিকে সফল হতে গেলে মোদির প্রথম কাজ হবে সবার আগে মমতাকে সরানো।

ফলাফল প্রকাশের দিন, মোদি পাবলিক মিটিং করেছেন। সেখানে তিনি হিন্দুত্বের রাজনীতি ভুলে যাওয়ার ভান ধরে ‘নিজেকে সবার নেতা’ বলে দাবি করেছেন। গত ২০১৪ সালের নির্বাচনে তার স্লোগান ছিল ‘সবকা বিকাশ সবকা সাথ’- সেই স্লোগান তিনি এবারের নির্বাচন শেষ হওয়ার পরে প্রথম উচ্চারণ করলেন।

এ কথাটিও সঠিক যে, বিজেপির হিন্দুত্বের প্রধান উদ্দেশ্য, পাবলিক বা ভোটার মেরুকরণ করে সব হিন্দু ভোট কাউকে না দিয়ে নিজের বাক্সে আনা। সে হিসাবে অনেকে নির্বাচনের সময় ‘মোদি একটু হিন্দুত্ব নিয়ে বাড়াবাড়ি করেছে, এখন এসব ছেড়ে সব ঠিক হয়ে যাবে, ভালো হয়ে যাবে’ ভাবতে পারেন। অনেকের মধ্যেই এই মনোভাব দেখেছি। এ ছাড়া মানুষ আসলে ক্ষমতা বা শক্তের ভক্ত হয় তাড়াতাড়ি। কিন্তু একটা বিষয়ে সবাই নিশ্চিত থাকতে পারে। তা হলো- হিন্দুত্বের রাজনীতিকে মোদির পক্ষে আর সামনে এগিয়ে না নিয়ে; থেমে যাওয়া বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে, এটা আর সম্ভব নয়।

অচিরেই পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির আগানোর প্রধান কর্মসূচি হতে যাচ্ছে এনআরসি; মানে আসামের মতো ‘নাগরিকত্বের তালিকা তৈরি’ করার দাবি তুলবে তারা। ইতোমধ্যেই দিল্লিতে এ নিয়ে কাজ শুরু হয়ে গেছে বলে অনেকে দাবি করছে। কলকাতায় যদি আসামের মতো এনআরসি-তৎপরতা শুরু করতে পারে, আর তাতে কোনো হিন্দু নাগরিকত্ব প্রমাণে ব্যর্থ হয়, তাকে মোদি সরকার নতুন করে নাগরিকত্ব দেবে। আর মুসলমান হলে তাকে নাজেহাল করা হবে। কথিত পুশব্যাক যদি নাও হয়, অন্তত ক্যাম্পে তাকে ফেলে রাখবে। ভোটার লিস্ট থেকে বাদ দিয়ে ওয়ার্ক পারমিট দিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণীর মর্যাদায় পশ্চিমবঙ্গে থাকতে দিতেও পারে। আবার কখন দাঙ্গার খোরাক বানিয়ে নিজেদের ক্ষমতায় যাওয়ার সিঁড়ি বানিয়ে ফেলবে, কে জানে। গরিবী হালে হলেও মানুষ যতটুকু সুস্থ জীবনে ছিল, সেসব ছিনিয়ে এখন সবার জীবনে এক প্রবল অশান্তি হাজির করা হবে।

(ত্রিপুরাসহ) নর্থ-ইস্ট আর পশ্চিম বাংলা মিলে এই জোনে মোট লোকসভা আসন প্রায় ৬৫টি। এখানে মোদির টার্গেট হবে এই ৬৫ আসন হাসিল করা। এনআরসি ইস্যু দিয়েই স্থায়ীভাবেই এই আসনগুলো নিজের পক্ষে নিশ্চিত করা মোদির আশু লক্ষ্য।

মতুয়া জনগোষ্ঠীর মতুয়া বড় অংশ কালক্রমে পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁও মহকুমায় সদলে মাইগ্রেটেড হয়ে গেছে। গুরুভিত্তিক এই জনগোষ্ঠী দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। আগের দীর্ঘ দিনের এমপি ছিলেন মমতা ঠাকুর। তিনি তৃণমূল দলের এমপি ছিলেন, কিন্তু তিনি এবার হেরে গেছেন। সেই জায়গায় বিজেপির টিকিটে শান্তনু ঠাকুর জিতেছেন। এ দুই প্রার্থীই গুরু মৃত হরিচাঁদ ঠাকুরেরই বংশধর। আনন্দবাজার লিখেছে, ‘মোদিজি ঠাকুরনগরের সভায় এসে বলে গিয়েছিলেন, যেসব হিন্দু বাংলাদেশ থেকে এ দেশে এসেছেন, তাদের নাগরিকত্ব দেয়া হবে।’ এতে হিন্দুদের মধ্যে একটা উথালপাথাল শুরু হয়েছে। শোনা যাচ্ছে, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া পশ্চিমবঙ্গের হিন্দুরাও এ কারণেই এবার দুই হাত তুলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে।

আসামের এনআরসি তৎপরতা শুরু করার সময় মোদি সরকার বাংলাদেশকে নাকি আশ্বস্ত করেছিল। বলেছিল এটা ‘ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার’। বাংলাদেশী হিন্দুরা ভারতে গেলে নাগরিকত্ব দেয়া হবে, এমন কোনো আইন বা ইস্যু তখন ছিল না। এখন আছে। রাজ্যসভায় পাস না হওয়া, পেশ না করা আইন এখন আছে। যা এখন সচল হবে অনুমান করা যায়। বাংলাদেশেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়বে অনুমান করা যায়। একদল হিন্দু পশ্চিমবঙ্গে গিয়ে ভারতীয় নাগরিকত্ব নিয়ে রাখার চেষ্টা করতে পারে। আবার পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি তৎপরতা যদি শুরু হয় আর তাতে সেখানকার মুসলমানেরা কোনো খারাপ আচরণ বা দুর্দশার মুখোমুখি হয়, এর খুবই নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বাংলাদেশে। তাই পুরো বিষয়টি নিয়ে মোদি সরকার কী করতে চায় তা জানা আমাদের সরকারের জন্য খুবই জরুরি। আর তাতে বাংলাদেশে কী কী প্রভাব পড়তে পারে, এর একটা অ্যাসেসমেন্ট করে বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে আগেই এতে আমাদের উদ্বেগগুলো কী কী তা নিয়ে কথা বলা, স্বার্থ বিঘœ হলে আপত্তি উদ্বেগ জানানো ও তৎপর হওয়া জরুরি।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]


আরো সংবাদ