২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯

অস্বস্তিতে রেখে চলে গেলেন মাহফুজ উল্লাহ ভাই

মাহফুজ উল্লাহ - ফাইল ছবি

আমাদের অস্বস্তির মাঝে রেখে চলে গেলেন মাহফুজ উল্লাহ ভাই। তার মতো করে আশা জাগানিয়া কথা আর কেউ বলবেন না। প্রায় এক মাস হয়ে গেল, তিনি অনন্ত জগতের বাসিন্দা। প্রতিভাবান এই সাংবাদিকের চিরবিদায়ে তার ঘনিষ্ঠজনরা তেমন কিছু লেখেননি। তারা রীতিমাফিক শোক প্রকাশ করেছেন, তার কফিনে ফুলের তোড়া দিয়েছেন, জানাজায় শামিল হয়েছেন, তার রূহের মাগফিরাত কামনা ও জান্নাতুল ফেরদাউসে তাকে সুউচ্চ মর্যাদা দানের জন্য মহান আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করেছেন। তার পরকালীন কল্যাণের জন্য দোয়া করা ছাড়াও তার জন্য এ কারণে লেখার প্রয়োজন অনুভব করেছি। যারা তাকে আরো নিবিড়ভাবে দেখেছেন, তাকে শ্রদ্ধা করেছেন ও ভালো বাসতেন, তাদের উচিত- তাকে স্মরণীয় করে রাখার চেষ্টা করা।

পেশার সূত্রে তার সাথে ভালো পরিচয় ছিল, ঘনিষ্ঠতা ছিল না। ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের নির্বাচনের সময় তার সাথে কথা হয়ে থাকতে পারে, পেশাগত অন্য কোনো বিষয় নিয়ে আমার কথা হয়নি। কারণ আমি তার পর্যায়ের মানুষ ছিলাম না। রাজনীতি বা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়েও তার সাথে আমার মতবিনিময় হয়নি। জাতীয় প্রেস ক্লাবের যে টেবিলগুলোতে তিনি বা অন্যান্য প্রবীণ সাংবাদিক চলমান রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করতেন, আমি কখনো সেই টেবিলগুলোর ধারেকাছে বসতাম না। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই নিজেকে রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিস্টে পরিণত করা বা কোনো রাজনৈতিক দল বা দলের আদর্শের পক্ষে অবস্থান নেয়ার সংক্রমণ থেকে রক্ষা করেছি। সাংবাদিকতা জীবনের সূচনাকালেই ‘সাংবাদিকের কোনো বন্ধু নেই’ মর্মে যে আপ্ত বাক্যটি শিখেছিলাম, তা মনে শক্তভাবে গেঁথে যাওয়ায় আমার তেমন কোনো বন্ধু নেই বা ছিল না।

মাহফুজ উল্লাহ ভাই পেশা হিসেবে কেন সাংবাদিকতা বেছে নিয়েছিলেন, নিজে এ পেশায় যোগ দেয়ার পর অনেক সময় তা ভেবেছি। তার জ্ঞান, চিন্তাচেতনা, মনন ও কথার মারপ্যাঁচে নিজের যুক্তিকে প্রতিষ্ঠা করার যে যোগ্যতা ছিল, তাতে তিনি ভালো রাজনীতিবিদ হতে পারতেন। রাজনীতির তাত্ত্বিক হতে পারতেন। কিন্তু বাম ঘরানার রাজনৈতিক দীক্ষা ও ছাত্র রাজনীতিতে নেতৃত্ব দানকারী মাহফুজ উল্লাহ ভাই কর্মজীবনে সাংবাদিকতায় জড়িয়ে খুব বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি। ‘সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় তার কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় ব্যয় করেছেন। সেখানে অনেক অবদান রেখেছেন। তার তৈরি করা কভার স্টোরি এবং তার নেয়া খ্যাতিমান দেশী ও বিদেশী ব্যক্তিত্বদের সাক্ষাৎকার পাঠ করে নিজেকে সমৃদ্ধ করেছি। ‘বিচিত্রা’ একটি সময় পর্যন্ত অত্যন্ত জনপ্রিয় ম্যাগাজিন ছিল তাতে সন্দেহ নেই; কিন্তু এটিও সত্যি যে, ‘বিচিত্রা’ যুক্তরাষ্ট্রের ‘টাইম’, ‘নিউজউইক’; এমনকি প্রতিবেশী দেশের ‘ইন্ডিয়া টুডে,’ আউটলুক,’ বা অধুনালুপ্ত ‘ইলাসট্রেটেড উইকলি অফ ইন্ডিয়া’ ধরনের ম্যাগাজিন ছিল না।

দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদক ছিলেন এমন সাংবাদিকও ওইসব ম্যাগাজিনের কোনো কোনোটির সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন। ‘বিচিত্রা’র ক্ষেত্রে তা হয়নি। ‘বিচিত্রা’ সরকারি ট্রাস্টের ম্যাগাজিন ছিল এবং সেখানে চাকরি ছিল নিরাপদ। নিয়মিত বেতনভাতা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো অনিশ্চয়তা ছিল না। ট্রাস্টের মালিকানাধীন দুটি দৈনিক ও একটি ম্যাগাজিনে নির্মল সেন, আনোয়ার জাহিদ ও আহমেদ হুমায়ূনের মতো সাংবাদিক ইউনিয়নের জাঁদরেল সব নেতা চাকরি করতেন। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় এসে তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এই পত্রিকাগুলোর প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সে ভিন্ন এক ইতিহাস। বলছিলাম, মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের চেয়ে অনেক কম যোগ্যতাসম্পন্নরা জাতীয় দৈনিকের সম্পাদক হয়েছেন, মালিক সম্পাদক হয়েছেন।

প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, প্রেস সেক্রেটারি ইত্যাদি হয়েছেন। কিন্তু সরকারি দায়িত্ব বলতে মাহফুজ উল্লাহ একসময় ছিলেন কলকাতায় বাংলাদেশ ডেপুটি হাইকমিশনে প্রেস অফিসারের। নব্বইর দশকের পরে একটির পর একটি যে টেলিভিশন চ্যানেলের আত্মপ্রকাশ ঘটেছে সেগুলোর কোনো একটি নিয়ন্ত্রক হলেও তাকে মানাত। এ ব্যাপারে তার কোনো আগ্রহ ছিল কি না বা পেশার শীর্ষে আরোহণ করতে না পারার কোনো হতাশা তার মধ্যে ছিল কি না, তাও জানি না। কিন্তু পেশাগত জীবনের শেষ ধাপে এসে অর্থাৎ অসুস্থ হওয়ার আগ পর্যন্ত তাকে টেলিভিশনের পর্দায় টকশোর উজ্জ্বল যুক্তিধর কথক হিসেবে বিএনপির রাজনীতির পক্ষে ভূমিকা পালন করতে দেখা ছাড়া শীর্ষ কোনো অবস্থানে তাকে দেখতে না পারার দুঃখ আমার কাটবে না।

মাহফুজ ভাই বিএনপির রাজনীতি করতেন না। কিন্তু দেশে ধর্ষিত ও শতচ্ছিন্ন, বিধ্বস্ত গণতন্ত্রের নামাবলির আড়ালে দেশ ও জাতির ওপর নীরবে চেপে বসা কঠিন দুঃশাসনের সময় বিপুল জনসমর্থনে পুষ্ট, বিএনপিকে জাগিয়ে তোলার চেষ্টায় তিনি দলটি পক্ষাবলম্বন করে নির্ভয়ে তুখোড় যুক্তিবাণে ক্ষমতাসীন মহলের অন্যায় ও অবৈধ কর্মকাণ্ড জনগণের সামনে তুলে ধরার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। তার চেতনায় যে রাজনীতি ধারণ করতেন সেই রাজনীতির কোনো ভবিষ্যৎ না থাকায় বিএনপিকে পিঠ সোজা করে দাঁড় করানোর চেষ্টা চালিয়েছেন। বিএনপির পক্ষে লিখেছেন বাংলায় ও ইংরেজিতে। কিন্তু তিনি মাঠের রাজনীতি করতেন না। বিএনপির নেতাকর্মীদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ছিল কুশাসনের প্রতিবাদে মাঠে সোচ্চার থাকা। তারা কোনো মন্ত্রবলেই জাগ্রত হওয়ার অবস্থায় ছিলেন না বা এখনো নেই। তাদের এ অবস্থাকে তাদের শীতনিদ্রাকাল বলা চলে না, বরং তারা কুম্ভকর্ণের মতো নিদ্রিত হয়ে আছেন; সে নিদ্রা থেকে যখন তারা জাগবেন তখন ক্ষতির কারণ হবেন জনগণেরই। একদলীয় শাসন থেকে জাতিকে মুক্ত করে যে বিএনপি বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেছে, সে দল জাতির কোনো ক্ষতি করুক, মাহফুজ উল্লাহ ভাই তা চাননি।

উনি এর আগেও একবার গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন এবং সেরেও উঠেছিলেন। এই পর্যায়ে তার বড় ভাই প্রফেসর মাহবুবউল্লাহর সাথে তাকে নিয়ে বেশ দীর্ঘ সময় ধরে কথা হয়। প্রবল বর্ষণমুখর এক রাতে আমি ও প্রফেসর মাহবুবউল্লাহ নয়াপল্টনের এক সংবাদপত্র অফিসে আটকা পড়েছিলাম। রাত ১টা পেরিয়ে গেল। বাড়ি ফেরা প্রয়োজন। না হয় বাড়ির লোকজন উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বে। মাহবুবউল্লাহ গ্রিন রোডে থাকেন, আমি বনানীতে। এত রাতে যানবাহন পাওয়া অনেকটা দুরাশা। আমরা কথা বলছি মাহফুজ উল্লাহ ভাইকে নিয়ে। ভাইয়ের প্রতি তার পিতৃসুলভ দুর্বলতা প্রকাশ পাচ্ছিল। তিনি বললেন, ‘বাইরে থেকে মাহফুজ দৃঢ় হলেও অন্তরে সে কোমল। তার এত নামডাক সত্ত্বেও জীবনে সে কিছু করতে পারেনি। তার আর্থিক অবস্থা খুব ভালো নয়। ওর বড় ধরনের কোনো ঘটনায় আমাদেরই এগিয়ে যেতে হয়। তবুও আমরা চাই, যে যা বিশ্বাস করে তা নিয়েই থাকুক।’

মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের কাছাকাছি আসা ও ঘনিষ্ঠতার সুযোগ ঘটে আমার অনুবাদকর্ম এবং পরিবেশ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে। বেক্সিমকো মিডিয়া ‘অন্বেষা’ নামে একটি সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছিল। এর সম্পাদকের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল মাহফুজউল্লাহ ভাইকে। ফরিদী নুমান অন্বেষা’র শিল্পী হিসেবে নিয়োগ পায়। ১৯৮৭ সালে আমার সম্পাদনায় মাসিক ‘নতুন ঢাকা ডাইজেস্ট’ প্রকাশিত হওয়ার সূচনা থেকেই নুমান ডাইজেস্টের সাথে জড়িত ছিল এবং ২০০৬ সালে প্রকাশনা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ছিল আমার সাথে। ‘অন্বেষা’ প্রকাশিত হয় ঢাকা ডাইজেস্টের প্রকাশনা শুরুর এক দশক পর থেকে। সম্ভবত ধানমন্ডি ১ নম্বর সড়কে ছিল ‘অন্বেষা’র অফিস। পাশাপাশি আরেকটি ভবনে বেক্সিমকোর মিডিয়া অফিস। এই মিডিয়ার প্রধান নির্বাহী হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ইকবাল আহমেদ নামে এক ব্যক্তি।

আমার পেশাগত জীবন তখন বেশ টানাপড়েনের মধ্যে চলছিল; যদিও ওই সময় মানবজমিনের ফিচার এডিটর হিসেবে কাজ করছিলাম। আমার শুভাকাক্সক্ষী এক সচিব, যাকে আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকে জানি, তিনি আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন, যা বলতেন তা হুকুম দেয়ার মতো। একদিন ফোন করে বললেন, ইকবালের সাথে আমার কথা হয়েছে। তুমি তার সাথে দেখা করে বেক্সিমকোর বাংলা বা ইংরেজি দৈনিক যেখানে মন চায়, জয়েন করো। অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দেবে। তবে দ্বিধাগ্রস্ত হলাম। আমি যেচে গিয়ে চাকরি প্রার্থনা করব! তিনি তাগিদ দেন, তোমাকে কিছু করতে হবে না। কথা যা হওয়ার, আমার সাথেই হয়েছে। ওদের ২০০ কোটি টাকার প্রজেক্ট আমার টেবিলে। আমার কথা ফেলতে পারবে না। কাল সালমান এফ রহমান আমার কাছে আসবেন। প্রয়োজনে তাকেও বলব।’

ইকবাল আহমেদের সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি সৌজন্য আলাপ করে পরদিন যেতে বলেন সবকিছু ফাইনাল করতে। ফরিদী নুমান ওর নিয়োগপত্র আমাকে দেখিয়েছিল, পনের-বিশ পৃষ্ঠার নিয়োগপত্র। টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনসে ভরা। ইকবাল নিজেই আমার নাম ঠিকানা লিখে নেন। তবে সেখানে আর যাবো না সিদ্ধান্ত নিয়েই তার রুম থেকে বের হয়ে আসি। বের হতেই নুমানের সাথে দেখা। সে অবাক হলো, আমার আগমনের কারণ জানতে চায়। কিন্তু আমি বলিনি। ‘অন্বেষা’ অফিসে নিয়ে যায় আমাকে। বেশ গোছান অফিস। করপোরেট টাইপের। মাহফুজ উল্লাহ ভাই ছিলেন না। এর কিছুদিন আগেই আমার অনুবাদে খুশবন্ত সিং-এর উপন্যাস ‘দিল্লি’ প্রকাশিত হয়েছে। প্রচ্ছদ শিল্পী ফরিদী নুমান। নুমানকে ‘দিল্লি’র একটি কপি দিয়েছিলাম। নুমান বলল, ‘দিল্লি’র কপিটি মাহফুজ উল্লাহ ভাই দখল করেছেন। আমাকে আরেকটি বই দিতে হবে।

ক’দিন পর প্রেস ক্লাবে মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের সাথে দেখা হলে উনি আমার পিঠ চাপড়ে উচ্ছ্বাসের সাথে বলেন, ‘মঞ্জু, ওয়েলডান। অনুবাদ চমৎকার হয়েছে। মনে হয়, খুশবন্ত সিং নয়, আপনিই ‘দিল্লি’র মূল লেখক।’ শুনে লজ্জিত হই। ঘনিষ্ঠতার শুরু এভাবেই। ২০০১ সালের জুন মাসের প্রথম সপ্তাহে দিল্লিতে আইইউসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজার্ভেশন অভ নেচার) সেকেন্ড ওয়ার্ল্ড কংগ্রেসে দিতে এফইজেবির (ফোরাম অফ এনভায়রনমেন্টাল জার্নালিস্টস) এর প্রতিনিধি হিসেবে আমি, ডেইলি স্টারের চিফ রিপোর্টার শেহাবউদ্দিন নাফা এবং ইনকিলাবের সিনিয়র রিপোর্টার মফিজুর রহমান সেখানে যাই। আমি এফইজেবির ভাইস প্রেসিডেন্ট, মফিজুর রহমান জেনারেল সেক্রেটারি এবং নাফা ভাই এক্সিকিউটিভ মেম্বার। আইইউসিএন’র কান্ট্রি অফিসে পাসপোর্ট জমা দেয়ার পর তারাই ভিসা সংগ্রহ করেছিলেন। ওই সময় আইইউসিএন’র বাংলাদেশ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ ছিলেন প্রফেসর আইনুন নিশাত (পরে ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ভাইস চ্যান্সেলর)।

তার অফিসে গিয়ে জানতে পারি মাহফুজ উল্লাহ ভাইও যাচ্ছেন তার পরিবেশ সংগঠন ‘সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট’ এর প্রতিনিধি হিসেবে। আর যারা যাবেন, তাদের বেশির ভাগের নাম জানি না। বাংলাদেশী টিম বেশ বড়োসড়ো। দিল্লি পৌঁছে প্রথম রাত ওয়াইএমসিএ হোস্টেলে কাটিয়ে পরদিন সকালেই চলে গেলাম বাঙালি অধ্যুষিত সিআর পার্কে (চিত্তরঞ্জন পার্ক) আমার পূর্ব পরিচিত নাগ বাবুর রেস্ট হাউজে। সব ধরনের বাঙালি খাবার সেখানে সহজলভ্য। কনফারেন্স হবে বিজ্ঞান ভবনে।

বিজ্ঞান ভবনে গিয়ে মাহফুজ ভাই, প্রফেসর আইনুন নিশাতসহ বাংলাদেশী সবার সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তিন দিনের কর্মসূচি হাতে পেলাম। একটির পর একটি সেশনে ঠাসা কর্মসূচি। আইইউসিএন’র কয়েকটি কমিটি নির্বাচন করা হবে। মাহফুজ উল্লাহ ভাই পই পই করে বলে দিলেন, ভোটের সময় যাতে আমরা উপস্থিত থাকি। কিন্তু আমরা ভোটিং মেম্বার ছিলাম না। দু-একটি সেশনে হাজিরা দিয়ে তিনজন চলে যাই লাজপত নগরের সেন্ট্রাল মার্কেটে। আগেও বেশ ক’বার ওই মার্কেটে গেছি। নাফা ভাইয়ের অনেক কিছু কেনাকাটার ছিল, তার মধ্যে একটি হলো জাফরান (ঝধভভৎড়হ)। এটা ভাবির ফরমায়েশ। শিখ দোকানি জুয়েলারি বাক্সর মতো একটি বাক্স বের করল।

খোলার পর দেখা গেল লাল মখমলের ওপর ছোট্ট একটি কৌটা। কৌটার ঢাকনা খোলার পর লাল রঙের গুঁড়া দেখতে পেলাম। ওটাই জাফরান। প্রতি গ্রামের দাম দুই হাজার রুপির কাছাকাছি। পিলে চমকানো দাম। তবুও নাফা ভাই সেই অমূল্য বস্তু কিনলেন। দোকানি অতি ক্ষুদ্র চামচ দিয়ে প্লাস্টিকের কৌটায় তুলে সংরক্ষণ পদ্ধতিও বাতলে দিলে। এটি মূলত একটি মসলা, সম্ভবত সবচেয়ে দামি মসলা। ক্রোকাস সাটিভাস (ঈৎড়পঁং ঝধঃরাঁং) নামে এক ধরনের ফুলের রেণু ধারণকারী সুতাতুল্য দণ্ড আহরণ করে সেগুলো শুকিয়ে জাফরান তৈরি করা হয়। ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার সুতা থেকে মাত্র এক পাউন্ড জাফরান তৈরি হয়। আমরা আরো কিছু প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে বিকেলে ফিরে এলাম কনফারেন্স ভেনু বিজ্ঞান ভবনে। আমাদের হাতে শপিং ব্যাগ দেখে মাহফুজ উল্লাহ ভাই ক্ষুব্ধ হলেন। বললেন, বুঝলাম, আপনারা ভোটিং মেম্বার নন। কিন্তু উপস্থিতির সংখ্যারও পৃথক গুরুত্ব আছে। সন্ধ্যায় কোথাও যাবেন না।

লাল কিল্লায় আমরা একসাথে ‘সাউন্ড অ্যান্ড লাইট শো’ দেখতে যাবো। সবার টিকিট কাটা হয়েছে। এরপর ‘করীম’স এ ডিনার করবো।’ বাংলাদেশী প্রতিনিধিদের জন্য ডিনার হোস্ট করেছেন আইইউসিএন এর ব্যাংক প্রতিনিধি, যিনি একজন বাংলাদেশী (নাম মনে নেই)। মাহফুজ উল্লাহ ভাই জানতে চাইলেন কী বই কিনেছি। তখনো কোনো বই কেনা হয়নি। পরদিন খান মার্কেটে গিয়ে কিনব, বললাম। উনি কোনো এক খ্যাতিমান ইতিহাসবিদের ‘হিস্ট্রি অভ দ্য মোগলস’ কেনার পরামর্শ দিয়ে বললেন বইটা অনুবাদ করতে। বইটি তিনি পড়েছেন, তার কাছে আছে। তাকে বললাম, তা হলে কিনব না। ঢাকায় গিয়ে আপনার কাছ থেকেই নেব। তিনি এ শর্তে সম্মত হলেন, বইটা আমি অনুবাদ করব। আমি কথা দেই, শর্ত মানব। সন্ধ্যায় তার নেতৃত্বে লালকিল্লার উদ্দেশে যাত্রা করলাম। ১৯৯২-এর লালকিল্লায় যাওয়া হয়নি। ‘সাউন্ড অ্যান্ড লাইট শো’ আগে কখনো দেখিনি। ১৯৮৩ সালে বার্লিনে অবস্থানকালে রাইখস্ট্যাগ বা পার্লামেন্ট ভবন পরিদর্শনকালে ‘সাউন্ড অ্যান্ড লাইট শো’ দেখার সুযোগ ছিল। কিন্তু পর্যটকদের অত্যধিক ভিড় দেখে উৎসাহ হারিয়ে ছিলাম।

বাস যেখানে গিয়ে থামল সেটি লালকিল্লা নয়। ড্রাইভার ভুল করে পুরনো কিল্লা নিয়ে এসেছে। শের শাহ সূরী দ্বিতীয় মোগল সম্রাট হুমায়ূনকে দিল্লি থেকে হটিয়ে এই কিল্লা নির্মাণ করেছিলেন। এখানেও ‘সাউন্ড অ্যান্ড লাইট শো’র ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু আমাদের টিকিট লালকিল্লার। খুব দূর নয়। সাড়ে তিন মাইল। যা হোক, বাস ঘুরে লাল কিল্লায় গেল। আমরা কিল্লার ভেতর প্রবেশ করলাম। শো এর স্থান দিওয়ান-ই-আম ও দিওয়ান-ই-খাস এর মধ্যবর্তী উন্মুক্ত স্থানে। দর্শক সংখ্যা বিপুল। মাহফুজ উল্লাহ ভাই নির্দেশ দিলেন, কেউ দলছুট হলেও যাতে গেটের বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করে। কারণ ফেরার পথে বাস থাকবে না। শো শেষে আমরা কিল্লার বাইরে এসে জড়ো হলাম। পরের গন্তব্য জামা মসজিদের পাশে করীমস রেস্টুরেন্ট। হাঁটার দূরত্ব হলেও আমরা রিকশায় উঠে করীমসে গেলাম। এর ইতিহাস দীর্ঘ।

এটির প্রতিষ্ঠাতা করীমউদ্দিনের পিতা মোহাম্মদ আজিজ শেষ মোগল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের দরবারি বাবুর্চি ছিলেন। ১৮৫৭ সালে সিপাহি বিদ্রোহের পর তারও ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে যায়। প্রথম দিকে ভ্রাম্যমাণ খাবার সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করলেও ১৯১৩ সালে জামা মসজিদের পাশে করীমস রেস্টুরেন্ট চালু করেন করীমউদ্দিন। এখন দিল্লিতে করীমস-এর ১৩টি শাখা। চার প্রজন্ম ধরে চলছে করীমস এর রেস্টুরেন্ট। দিল্লিবাসী তো বটেই, ভোজন বিলাসী পর্যটকদেরও অনিবার্য গন্তব্য করীমস। রেস্টুরেন্টে কোনো টেবিল ফাঁকা নেই। অনেকে বাইরে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন। আমরা তেরোজন। ম্যানেজারকে সংখ্যা জানিয়ে রাখতে হলো।

আমাদের ডাকা হলে সবাই নির্ধারিত টেবিলে বসলাম। হোস্ট প্রফেসর আইনুন নিশাত এবং আইইউসিএন’র ব্যাংকক রিজিওনাল অফিস থেকে আগত বাংলাদেশী এক কর্মকর্তা। মেন্যু দিয়ে গেল ওয়েটার। নানা ধরনের কাবাবের সুগন্ধে ভরে আছে রেস্টুরেন্ট। খাসির আস্ত রান ঝলসানো হচ্ছে। কিন্তু কোনো পোড়া দাগ নেই। সম্পূর্ণ সাদা। খাসির চারটি রান, শিক কাবাব, নান, কয়েক ধরনের আচার, চাটনি ও টক দই। আসলেই ‘দরবারি খাবার’। আমরা আয়েশ করে খেলাম। বিল ও বখশিশ মিলিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার রুপি। আইইউসিএন’র রিজিওনাল কর্মকর্তা বিল পরিশোধ করলেন। করীমস এর সামনেই পানের দোকান। দিল্লিতে পানের দাম সবসময় বেশি। সাধারণ পান তিন রুপি (বাংলাদেশে তখন এক খিলি পান এক টাকা), মিষ্টি পান পাঁচ রুপি। পান মুখে পুরে আমরা যখন বিদায় নিচ্ছিলাম, মাহফুজ উল্লাহ ভাই স্মরণ করিয়ে দিলেন, পরদিন আমরা যাতে কনফারেন্সের সব সেশনে অ্যাটেন্ড করি।

পরদিন বিজ্ঞান ভবনে গেলাম। লাঞ্চব্রেক পর্যন্ত তিনটি সেশনে বিভিন্ন বিষয়ের ওপর বক্তৃতা শুনলাম। বেশ ক’জন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও ছিলেন। লাঞ্চ সেরে মাহফুজ ভাইকে বললাম, আর না, কয়েকটা বই কিনতে খান মার্কেটে যাবো। ‘হিস্ট্রি অব দ্য মোগলস’ কিনব না, আপনার কাছ থেকেই নেব। খান মার্কেটে গিয়ে কয়েকটি বই কিনে আবার সেন্ট্রাল মার্কেট। বাদবাকি কেনাকাটা করে বিকেলে রেস্ট হাউজে ফিরে এলাম। সন্ধ্যায় আমাদের সাথে দেখা করতে এলেন দিল্লিতে নিযুক্ত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিনিধি ইহসানুল করিম হেলাল (বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রেস সেক্রেটারি)। তার বাসায় আমন্ত্রণ জানালেন। এর আগে ১৯৯৯ সালে লোকসভা নির্বাচন কভার করতে দিল্লি গিয়ে আমি, ইত্তেফাকের গিয়াসউদ্দিন আহমেদ, বাসসের নূরুল হুদা, ভোরের কাগজের শ্যামল দত্ত (বর্তমানে সম্পাদক), প্রথম আলোর সানাউল হক তার বাসায় ডিনার করেছি। এবার সময় কম বলে আমরা যেতে পারব না। সকালে বিজ্ঞান ভবনে গিয়ে সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে এলাম। পরদিন ঢাকার ফিরতি ফ্লাইট।

এরপর ঢাকায় মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের সাথে অনুবাদ নিয়েই কথা হতো। তার কাছ থেকে ‘হিস্ট্রি অব দ্য মোগলস’ আর নেয়া হয়নি। উনি নিজেই একদিন বললেন, তার বইটা একজন নিয়ে গেছে। হাতে পেলেই আমাকে দেবেন। ২০০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে আইইউসিএন’র আরেকটি কনফারেন্সে গেলাম শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে। কলম্বো যেতে বাংলাদেশীদের ভিসার প্রয়োজন পড়ে না। তবে ভিসা ছাড়া যেতে হয় ঘোরাপথে, ব্যাংকক হয়ে। ভারতীয় ডাবল এন্ট্রি ভিসা পাওয়ার ঝামেলা এড়াতেই এ ব্যবস্থা। এবারের টিমও বেশ বড়। আইইউসিএন কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ প্রফেসর আইনুন নিশাত, সেন্টার ফর সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের মাহফুজ উল্লাহ ভাই, পরিবেশবিদ হাসনা মওদুদ ও মো: সরোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড স্টাডিজের কয়েকজন প্রতিনিধি এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা এবং এফইজেবি থেকে আমি নিজে। ব্যাংকক এয়ারপোর্টে দীর্ঘ সময়ের ট্রানজিট।

প্রফেসর আইনুন নিশাত দলনেতা হলেও আসলে নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন মাহফুজ উল্লাহ। ট্রানজিটের পুরো সময়ে আপ্যায়নের দায়িত্ব পালন করলেন তিনি। গভীর রাতে আমরা কলম্বো পৌঁছলাম। সেখানে আমাদের থাকার ব্যবস্থা কলম্বো প্লাজা হোটেলে। কনফারেন্স ভেন্যু বন্দরনায়েকে মেমোরিয়াল ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স হল। সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে হোটেল লাউঞ্জে ব্রিফ করেন মাহফুজ উল্লাহ ভাই। কনফারেন্সের গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশনের পর আমাকে মিডিয়া সেন্টারে খুঁজে নেন তিনি, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যে ইস্যুগুলো তুলে ধরা হয়েছে, তার ওপর রিপোর্ট করতে বলেন। আমি বাসসে রিপোর্ট পাঠাই। প্রথম দিনের রিপোর্টে মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের ভূমিকাকেই প্রাধান্য দেই। পরদিন সকালে অনলাইনে খবর দেখে আইনুন নিশাত একটু নাখোশ হন। রাতে খেয়ে আমরা একযোগে ঘুরতে বের হলাম সাগর তীরে। এক জায়গায় বসে আড্ডা দেই। মাহফুজ ভাইয়ের পীড়াপীড়িতে হাসনা মওদুদ গান গেয়ে শোনান। তিনি নিজেও আবৃত্তি করলেন, গান গেয়ে শোনালেন। প্রথম রাতে প্রফেসর আইনুন নিশাত সবাইকে ডিনার করালেন বেশ দামি এক রেস্টুরেন্টে। এ প্রস্তাবটি ছিল মাহফুজ উল্লাহ ভাইয়ের। তার কথা, ব্যাংকক এয়ারপোর্টে আমি সবাইকে আপ্যায়ন করেছি, আজ নিশাত ভাইয়ের পালা।

দ্বিতীয় রাতে আমাদের ডিনারের দাওয়াত ছিল কলম্বোতে নিযুক্ত বাংলাদেশ হাইকমিশনারের বাসায়। যার ভাণ্ডারে যা ছিল আমরা তিন রাতে সাগর পাড়ে বসে তা উজাড় করেছি। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মাজহারুল হান্নান আমুদে মানুষ। তিনি বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার আয়তন ও জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রসঙ্গে বললেন, শ্রীলঙ্কার আয়তন বাংলাদেশের অর্ধেকেরও কম। জনসংখ্যা দুই কোটি। জনঘনত্ব বাংলাদেশে প্রতি বর্গমাইলে দুই হাজার ৮০০, শ্রীলঙ্কায় প্রতি বর্গমাইলে ৮৫০। এটি সহনীয়। বাংলাদেশে জন্মনিয়ন্ত্রণের সব উপায় ব্যর্থ হয়েছে। দিনে গুরুতর বিষয় নিয়ে আলোচনা করে এবং রাতে চটুল কথাবার্তার মধ্য দিয়ে আমরা তিন দিন অতিবাহিত করেছি। ১৩ ডিসেম্বর কলম্বোতে আমাদের শেষ রাত এবং রাতটি আমাদের জন্য শ্বাসরুদ্ধকর ছিল। হোটেল রুমে ফিরে টেলিভিশন অন করতেই ব্রেকিং নিউজ। ইরাকে আমেরিকান বাহিনীর হাতে সাদ্দাম হোসেনের গ্রেফতার। একজন মুসলিম শাসককে গর্ত থেকে টেনে বের করে আনা হচ্ছেÑ দৃশ্যটি সুখকর ছিল না। সাদ্দাম হোসেনের স্বৈরশাসন কেউ পছন্দ করেনি। আমেরিকানদের ইরাকে হামলা করে ধ্বংসলীলা চালানোকেও কেউ ভালোভাবে নেয়নি। টেলিভিশনে প্রতি মুহূর্তের খবর দেখে বিনিদ্র রাত কাটল।

ঢাকায় ফিরে আসার পর মাহফুজ ভাইয়ের সাথে প্রেস ক্লাবে এবং পরিবেশ সংক্রান্ত কোনো সেমিনারে বেশ ক’বার দেখা হয়েছে। দেখা হলেই আমি কী অনুবাদ করেছি বা করছি তা জানতে চেয়েছেন। ওই সময় তিনি টেলিভিশন টকশোর জনপ্রিয় আলোচক। টেলিভিশনের পর্দায় তার প্রায় প্রাত্যহিক উপস্থিতির কারণে কখনো তাকে অনুপস্থিত বা বিচ্ছিন্ন ভাবার সুযোগ ছিল না। এখন আর তাকে দেখতে পাবো না। বিশ্বাসী হিসেবে পরকালে সান্নিধ্য লাভের আশায় তার রূহের অনন্ত শান্তি কামনা করি।


আরো সংবাদ