২৪ আগস্ট ২০১৯

‘সাম্য আর বিনয়ে’র অর্থনীতি

একটি পত্রিকার খবর- দেশে বৈশাখী অর্থনীতির আকার বাড়ছে। পত্রিকাটির মতে, ঈদ ও দুর্গাপূজার পর সবচেয়ে বড় উৎসব এখন বৈশাখ। এ উৎসবের প্রধানত দুটো দিক- রঙিন পোশাক কেনা আর মিষ্টি ও পান্তা-ইলিশ খাওয়া। চার বছর ধরে সরকারি কর্মচারী, শিক্ষক ও সেনা কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বৈশাখে মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে উৎসবভাতা পাচ্ছেন। বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও পাচ্ছেন ভাতা। বর্ষবরণে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অনুষ্ঠান দিন দিন বাড়ছে। এতে করে বৈশাখকেন্দ্রিক ব্যবসাবাণিজ্য রাজধানী থেকে গ্রামাঞ্চলে বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ছে। এ উৎসবে ১৫ হাজার কোটি টাকার পোশাক বিক্রি হয়। সব মিলিয়ে বছরে যে পরিমাণ মিষ্টি বিক্রি হয়; তার ২০-২৫ শতাংশ বিক্রি হয় বৈশাখে। পত্রিকাটি এবারের বৈশাখে ইলিশের দাম নিয়ে লিখেছে, ৭০০-৭৫০ গ্রাম ওজনের পদ্মার ইলিশ এক হালি বিক্রি হয়েছে তিন হাজার টাকায়। ৮০০-৯০০ গ্রাম ওজনের ইলিশের হালি বিক্রি হয়েছে পাঁচ হাজার ২০০ টাকায়।

দুই ঈদ এখন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় উৎসব। এ দুই উৎসব ঘিরে সবচেয়ে বেশি আনন্দ ও মজা করতে চায় দেশের মানুষ। সংবাদমাধ্যমও এটিকে একেবারে হৈ-হল্লায় উদযাপনের দিকে নিতে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়। এ উৎসবের প্রধান আকর্ষণ থাকে মজার মজার খাবার আর দামি পোশাক। বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি সূত্র চার বছর আগে জানিয়েছে, রোজার ঈদে ৩৫ হাজার কোটি টাকার তৈরী পোশাক বিক্রি হয়। ফুটপাথে বেচাকেনা হয় আরো পাঁচ হাজার কোটি টাকার পোশাক। অন্যান্য খাতে আরো ১০ হাজার কোটি টাকার বেচাবিক্রি হয় রমজানে। সব মিলিয়ে চার বছর আগে রমজানের অর্থনীতির আকার ৫০ হাজার কোটি টাকা। এ কয় বছরে তা আরো বেড়েছে। আর কোরবানির ঈদে গরু-ছাগল বিক্রি হয় ২২ হাজার কোটি টাকার। দেশের মানুষের অর্থনৈতিক সচ্ছলতা যে বেড়েছে; উৎসব আয়োজনে বিপুল খরচ থেকে তা স্পষ্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওয়েলথ-এক্স জানিয়েছে, অতি ধনী বেড়ে যাওয়ার তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম স্থান অর্জন করেছে। একই সাথে সাধারণ ধনী বেড়ে চলার তালিকায়ও বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে। উৎসব-আয়োজনে বেশি করে খরচের প্রবণতার সাথে এ পরিসংখ্যানের কোনো মিল কি রয়েছে? আবার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে প্রায় ৮ শতাংশ হারে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হচ্ছে। এ হারে অর্থনীতি বাড়লে প্রতি কয়েক বছরের মধ্যে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ হওয়ার কথা। বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের বর্তমান যে আকার, তা দেখলে এসব পরিসংখ্যান সত্য ও স্বাভাবিক মনে হয়। যাদের দৈনিক আয় এক ডলার ৯০ সেন্টের কম, তাদের হতদরিদ্র হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

সেই হিসাবে দুই কোটি ৪১ লাখ বাংলাদেশী দৈনিক এর চেয়ে কম আয় করেন। দেশে সাধারণ দরিদ্রের সংখ্যা আট কোটি ৬২ লাখ। দেশের প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি জনসংখ্যা দরিদ্র। এ হিসাব বিশ্বব্যাংকের। দেশের অর্ধেক মানুষই যদি দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, বাকি অর্ধেক জনসংখ্যা যদি বিপুল ধনী হয়ে যায়; তাকে কি সাম্য বলা যায়? তাহলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ধনী বেড়ে যাওয়া কিংবা উৎসবে বিপুল খরচ সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইঙ্গিত দেয় না।

শুরু হয়েছে পরিমিতি শিক্ষার প্রশিক্ষণ ও কৃচ্ছ্র সাধনের মাস রমজান। এ মাসে দানের একটা চর্চার কথা বলা হয়। বাস্তবে মহান স্রষ্টা দানের যে নীতিমালা দিয়েছেন তা এক অসাধারণ অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সুযোগ করে দেয়। প্রতিষ্ঠিত হয় সমাজে সাম্য, তৈরি করে মানুষের হৃদয়ে বিনয়ের মনোভাব। বাংলাদেশ একটি মুসলিম দেশ। এ ধরনের দানের চর্চা দেশে হলে মানুষের মাঝে অস্বাভাবিক বৈষম্য দেখা যেত না। অর্ধেক জনগোষ্ঠী বিপুলভাবে বঞ্চিত হতো না।

গরিব, অসহায় ও সমাজের কমজোরি ব্যক্তিকে কিছু দেয়ার পর দানকারী সাধারণত নিজেকে সুপিরিয়র বিবেচনা করে। কথাবার্তায় গরিব ও অসহায় ওই ব্যক্তিকে চাপে রাখে। অধীন করে রাখতে তাকে একপর্যায়ে দান করার খোঁটা দিয়ে বসে। নানারকম কথা বলে মানসিক যন্ত্রণা দিয়ে থাকে। সূরা বাকারার ২৬৩ আয়াতে বলা হচ্ছে, ‘সুন্দর কথা বলা, ক্ষমা করে দেয়া সেই দানের চেয়ে ভালো, যে দানের পরে আসে কষ্ট।’ দান্য করে কষ্ট দেয়ার চেয়ে ভালো কথা বলে বিদায় করে দেয়া ভালো। তার পরের আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘অনুগ্রহ করার খোঁটা ও কষ্ট দিয়ে দান-সদকা বরবাদ করে দিয়ো না।’ এ ধরনের দানকে সেই ব্যক্তির সাথে তুলনা করা হয়েছে, যে শুধু দেখানোর উদ্দেশ্যে দান করে। এ লোকদের ব্যাপারে এ আয়াতের উপসংহারে বলা হয়েছে, ‘এ ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস করে না।’ এ দানের তুলনা করা হয়েছে চাতালের ওপর জমা হওয়া ধুলোবালির সাথে, একপশলা বৃষ্টি তা একেবারে সাফসুতর করে দেয়। বস্তুত এ দানের ফলে কোনো কিছুই অর্জিত হলো না।

দানের প্রসঙ্গটি সূরা বাকারার ২৬১ আয়াতে এভাবে শুরু হয়েছে, ‘যারা নিজেদের ধনসম্পদ আল্লাহর পথে খরচ করে, তাদের উদাহরণ হচ্ছে একটি বীজের মতো, যে বীজটি বপন করার পর তা থেকে সাতটি বীজ বের হলো। এর প্রতিটি শীষে রয়েছে এক শ’ করে শস্য দানা।’ এ আয়াত অনুযায়ী, একটি দান সাত শ’ গুণ হয়ে ফেরত আসছে। আল্লাহর পথে খরচ বলতে কী বোঝায় তা বিস্তারিত বলা হয়েছে সূরা বাকারার ১৭৭ আয়াতে। সেখানে বলা হয়েছে, সম্পদ প্রিয় হওয়া সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়, এতিম, দরিদ্র, পথিক, যারা সাহায্য চাইতে আসে, আর ঋণের দায়ে যারা আটকা পড়ে গেছে তাদের দান করতে। একটি সমাজের সামর্থ্যবানেরা এ আয়াতে দেয়া তালিকা ধরে নিজেদের কাছে থাকা উদ্বৃত্ত সম্পদ ব্যয় করলে সেই সমাজে কোনোভাবে দারিদ্র্য থাকার কথা নয়। তালিকার প্রথমে রয়েছেন নিকটাত্মীয়। এর মধ্যে বাবা-মাও পড়েন।

সমাজে দেখা যায় অনেক ধনী; সে সমাজে আবার দেখা যায় তাদের নিকটাত্মীয়রা নিদারুণ দারিদ্র্যের মধ্যে দিনাতিপাত করছেন। আল্লাহর নির্দেশ পালন করলে কোনোভাবে এমন দারিদ্র্য সমাজে দেখা যেত না। বাংলাদেশে ঠিক এমন বৈষম্যমূলক সমাজ দেখা যায়। কোনোভাবে দান এমন হবে না যে, রমজান উপলক্ষে একটি শাড়ি-লুঙ্গি দান। মা-বাবাকে যেভাবে ভরণপোষণ করা হয়। একইভাবে সমাজের বঞ্চিত মানুষকে সামান্য খয়রাত নয়, তাদের প্রয়োজনীয়তা পূরণ করতে হবে। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তত বলা যায়, দেশের প্রত্যেক বঞ্চিত মানুষের প্রয়োজন পূরণের ক্ষমতা ধনীদের রয়েছে।

প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক, আমেরিকা, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের মতো দেশগুলোতে দরিদ্র পাওয়া যাবে কোথায়? এসব দেশে দরিদ্র নেই ঠিক আছে; কিন্তু আল্লাহর কথাগুলো মানলে প্রতিবেশী দরিদ্র দেশগুলোয় সাহায্য করা তাদের জন্য দায়িত্ব এসে যাবে। আমেরিকা যদি দক্ষিণ আমেরিকার দেশগুলোতে সাহায্য কার্যক্রম চালায়, সেসব দেশে নিশ্চিত কোনো দরিদ্র থাকবে না। আমেরিকা উল্টো দেয়াল তৈরি করছে, যাতে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কোনো দরিদ্র তাদের দেশে প্রবেশ করতে না পারে। একইভাবে আফ্রিকাতে যদি ইউরোপের ধনী দেশগুলো আর এশিয়ায় জাপান, তাইওয়ান কোরিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মতো ধনী দেশগুলো সাহায্যের হাত বাড়ায়, তাহলে পুরো পৃথিবী থেকে দারিদ্র্য বিলুপ্ত হয়ে যাবে। বাস্তবে এর চর্চাকারী খোদ মুসলিম দেশগুলোতেও নেই। মুসলিম ধনী দেশগুলো যদি দরিদ্র মুসলিমদের ভাই বলে দানের ভাণ্ড নিয়ে এগিয়ে আসত, তাহলে আফ্রিকা ও এশিয়ার বিপুল মুসলিম জনগোষ্ঠী হতদরিদ্র থাকত না।

আল্লাহর পথে ব্যয় বলতে সমাজে সাধারণত মসজিদে দান করা বোঝায়। ফলে মুসলিম বিশ্বে অসংখ্য মসজিদ গড়ে উঠেছে। এসব মসজিদ এক একটি উন্নত স্থাপনার নিদর্শন হয়ে দাঁড়াচ্ছে। টাইলস-মোজাইকসহ উন্নত উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে মসজিদ নির্মাণে। দেখা যাবে, এসব মসজিদের পাশে রয়েছে অসংখ্য মানুষ; যাদের থাকার ভালো বাসস্থান নেই। আমাদের দেশে পাড়া-মহল্লায় উন্নতমানের সুদৃশ্য মসজিদ নির্মিত হয়েছে, অথচ সেসব মসজিদের পাশে রয়েছে গৃহহীন মানুষ। ধনীদের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল তাদের নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশীদের দান করতে।

দান বলতে আরো সুনির্দিষ্ট করে অনেকে বোঝাতে চান জিহাদের উদ্দেশ্যে ব্যয়। একেবারে ঢাল-তলোয়ার নিয়ে জিহাদ মুহাম্মদ সা:-এর সামনে বাস্তবে এসেছিল। এখন আল্লাহর পথে এ চেষ্টা-প্রচেষ্টা হতে পারে মানুষের কাছে আল্লাহর কথাগুলো পৌঁছে দেয়ার মাধ্যমে। আল্লাহর পথে কাজ করতে গিয়ে যারা নিজেদের রোজগারের ব্যবস্থা করতে পারেন না, তাদেরকেও দান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে সূরা বাকারার ২৭৩ আয়াতে। তবে শর্ত হচ্ছে, এসব লোক নিজে থেকে চাইবেন না। একজন বিশ্বাসী তাকে দেখলে চিনতে পারবেন। আল্লাহর পথে ডাকতে ডাকতে নিজের রুটি রুজি করতে পারছেন না, এমন সব মানুষ এখন কোথায়?

দান প্রসঙ্গে এসে মানুষকে মন্দকাজ থেকে দূরে রাখার কৌশলও আল্লাহ বলে দিচ্ছেন। মুহাম্মদ সা:কে যখন তারা জিজ্ঞেস করল মদ ও জুয়া সম্পর্কে, আল্লাহ বলে দিতে বললেন, এ দুটো অনেক বড় পাপ; কিছু উপকারিতাও রয়েছে। তবে এর উপকারিতার চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি। বাকারার ২১৯ আয়াতে আবার বলা হয়েছে, তোমাকে এরা জিজ্ঞেস করে কী খরচ করবে? বলে দিতে বললেন, ‘প্রয়োজনের অতিরিক্ত যা আছে সব।’ একজন মানুষ সাধারণত মদ-জুয়ার আসরে যায় উদ্বৃত্ত সম্পদ নিয়ে। আল্লাহ তার পুরোটা দিয়ে দিতে বলছেন এখানে। যাতে এ ধরনের কাজে যাওয়ার সুযোগই না থাকে।

দান করার যে চেতনা কুরআন থেকে পাওয়া যাচ্ছে, তাতে সমাজের প্রত্যেক মানুষ সমানুপাতে ক্রয় করার ক্ষমতা অর্জন করবেন। অন্ততপক্ষে মৌলিক যে প্রয়োজন রয়েছে; সেগুলো অর্জনে সবার সমান ক্ষমতা তৈরি হবে। এর ফলে উদ্বৃত্ত অর্থ দিয়ে এমন অবস্থা তৈরি করার সুযোগ থাকবে না যে, সমাজে তা সীমালঙ্ঘন-বাড়াবাড়ির প্রবণতা বাড়াবে। যারা দান করবেন, তারা কোনোভাবে এর জন্য প্রাপ্তি দাবি করতে পারবেন না। কারণ, তাকে সাত শ’ গুণ বেশি করে ফেরত দেয়া হবে। এটি আসলে পরকালে বিশ্বাসীদের কাজ। দানের বিনিময় দুনিয়ায় দেখা না-ও যেতে পারে। আর যারা এমন ব্যয় করবেন, তারা দুনিয়ায় পাওয়ার লোভে তা করবেন না।

আমরা যখন কোনো খাদ্যদ্রব্য, ফল-ফসল দান করি, সাধারণত নিজেদের জন্য ভালোটা রেখে দেই। সূরা বাকারার ২৬৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন, ‘হে বিশ্বাসীরা তোমরা পবিত্র বস্তু যা অর্জন করছো, আর তোমাদের জন্য জমিন থেকে আমরা যা বের করে দিচ্ছি; সেখান থেকে দান করো। তবে সেখান থেকে বেছে বেছে খারাপটা দান করো না, যা তোমাদের নিজেদের দান করলে তোমরা নিজেরাই নিতে চাইবে না, একান্ত অপরাগতা ছাড়া।’

কেন মানুষ ভালোটা দান করতে পারে না, পরের আয়াতে তার কারণ উল্লেখ করে আল্লাহ বলেছেন, ‘শয়তান মানুষকে অভাব-অনটন ও দারিদ্র্যের ভয় দেখায়, নির্দেশ করে অশ্লীলতার। আর আল্লাহ পথ দেখান তার পক্ষ থেকে ক্ষমা ও করুণার। জানার ক্ষেত্রে আল্লাহ সর্ববিস্তৃত।’ মানুষের মধ্যে এ সঙ্কীর্ণতা রয়েছে যে, ‘ফুরিয়ে গেল পাবো কোথায়’। এ ধরনের শঙ্কা থেকে সে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মানুষকে দিতে চায় না; আবার ভালোটাও দিতে চায় না। এ সঙ্কীর্ণতা ছাড়লে সমাজে চমৎকার এক সাম্য প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব।
[email protected]


আরো সংবাদ




mp3 indir bedava internet