১৭ আগস্ট ২০১৯

পাক বিপাক দুর্বিপাক

মাত্রাজ্ঞান আর কাণ্ডজ্ঞান শব্দ দু’টি সমার্থক। প্রতিশব্দ। এগুলোর অর্থ পরিমিতিবোধ। ব্যবহারও হয় অহরহ। অর্থাৎ কোন কাজ কতুটুকু করতে হবে, সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা চাই। তা না হলে জীবন হতে পারে দুর্বিষহ। দু’টি শব্দের অনুপস্থিতিতে পড়তে হয় পাকে, বিপাকে আর দুর্বিপাকে। তবে সনাতন ধর্মাবলম্বী তরুণ-তরুণীরা সাতপাকে বাঁধা পড়তে থাকেন মুখিয়ে। মহানন্দে অগ্নিকুণ্ডের চার পাশে ঘুরতে থাকেন জীবনসঙ্গীকে নিয়ে। আবার ঘূর্ণায়মান স্রোতের পাকে পড়লে জীবন হয় বিপন্ন। ঘটতে পারে সলিল সমাধি। কখনো বা অন্যকে উপকার করতে গিয়ে পড়তে হয় বিপাকে। সমস্যার আবর্তে ঘুরপাক খেলে পড়তে হয় দুর্বিপাকে, যা অসহনীয়। হতাশার অতলগহ্বরে নিমজ্জিত হতে হয়। এসব হয় কাণ্ডজ্ঞান আর মাত্রাজ্ঞানের অভাবে। অনেক সময় মাত্রাজ্ঞানের ঘাটতিতে মাশুল দিতে হয় চড়ামূল্যে। মাত্রাতিরিক্ত। হয় পাহাড়সম বৈষয়িক ক্ষতি। মানবজীবনে নেমে আসে ঘনঘোর অন্ধকার। এমন উদাহরণ চেনাজানা চার পাশে রয়েছে ভূরি ভূরি। শুধু দেখার দু’টি চোখ থাকতে হয়।

শুভদৃষ্টির চালিকাশক্তি জ্ঞান। না জানার পরিধি জানা-ই এক অর্থে জ্ঞান। জ্ঞানই মানুষের দৃষ্টি খুলে দেয়। চলার পথের একমাত্র পাথেয়। জ্ঞানের আলোয় আলোকিত যারা, তাদের কাছে আলো-আঁধারির পার্থক্য স্পষ্ট। ভেদরেখা পরিষ্কার। নিজের জানার বাইরে তারা কোনো কাজ করেন না। পরিণাম জেনেই ফেলেন পা। তাদের জীবনরেখা সহজ সরল। অস্পষ্ট বিষয়ে এক কদমও সামনে বাড়ান না তারা। বিপদও তাদের ছুঁতে পারে না। এর জন্য চাই সব সময় তির্যক সচেতনতা। অজ্ঞজনেরা আখেরে পস্তায়। খেদোক্তি করে নিজেকেই নিজে ধিক্কার দিয়ে বলে পোড়াকপালে।

গ্রামীণ পরিবেশে শৈশব-কৈশোরে যাদের বেড়ে ওঠা, তারা জানেন ফাটা বাঁশের চিপায় আঙুল আটকালে কী তীব্র যন্ত্রণা সইতে হয়। শুধু ভুক্তভোগীই তা অনুভব করতে পারেন। শহুরে জীবনে গাড়ির কপাটে আঙুল চাপা খেয়েও পেতে হয় অসহনীয় যন্ত্রণা। ঢালিউড-টালিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা ফেরদৌসের হয়েছে সেই দশা। প্রতিবেশীর হক আদায় করতে গিয়ে বিপদ তার পিছু ছাড়ছে না। ছবির শুটিং ফেলেই তড়িঘড়ি ফিরতে হয়েছে দেশে। ছবির কাজ করতে ফের কবে ভিসা পাবেন তা-ও অনিশ্চিত। কাণ্ডজ্ঞান না থাকলে যা হয়। পরিমিতিবোধের অভাব আর কি! হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে পরকে আপন করতে গিয়ে পাহাড়ের চূড়া থেকে একেবারে গিরিখাদে। গ্রামীণ হিন্দুসমাজে নারী আড্ডায় একটি কথার প্রচলন আছে- ‘নিজের কানাকড়ি ফেলো না/ পরের শাঁখা-সিঁদুর দেখে ভুলো না।’ ফেরদৌস হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে কাজ করতে গিয়ে এ কথাও বিস্মৃত হলেন, সত্যিই এটি আমাদের জন্য বেদনার। বুদ্ধিমানেরা কোনো কোনো সময় নির্বোধ হন বৈকি।

অবশ্য, আমরা মনকে প্রবোধ দিতে পারি বিজ্ঞানী নিউটন সম্পর্কে প্রচলিত একটি গল্পের কথা স্মরণ করে। জানি না, এটির সাথে সত্যের লেশমাত্র আছে কি না। না থাকলেও ক্ষতি নেই। কারণ, সাগরের জলরাশিতে বিপন্ন জীবন বাঁচাতে মানুষ খরকুটোও আঁকড়ে ধরে। আমরাও না হয় গর্বের ধন তারকা ফেরদৌসের মান রক্ষায় গল্পটি সরল বিশ্বাসে আমলে নিলাম। পশ্চিমবঙ্গে ফেরদৌসও তো সরল বিশ্বাসে ভুল করেছেন। তবে একটি কথা স্মরণে রাখলে শেষ পর্যন্ত উপকারে আসে। আধুনিককালে প্রতিটি জীবনে কুটিলতা নয়, জটিলতা থাকতে হয়। বাদ দিই এসব কথা।

গল্পটি হলো- এক গো-খামার দেখতে গিয়েছিলেন বিজ্ঞানী নিউটন। সেখানে তিনি দেখেন, গরুর পাল খামারে ঢোকানোর মাত্র একটি ফটক। এ দেখে বিস্ময় প্রকাশ করলেন নিউটন। তিনি বললেন- খামারে ঢোকার দু’টি ফটক কই। মালিক জানতে চান কেন? নিউটন প্রতি উত্তরে বলেন, কেন ছোটটি দিয়ে বাছুরগুলো ঢুকবে আর বড় ফটক দিয়ে ঢুকবে বড়গুলো। অথচ তিনি ভুলে যান যে, একটি বড় ফটকই ছোট-বড় সব গরুর খামারে ঢোকার জন্য যথেষ্ট।

আমাদের সবার জানা, ফেরদৌস বেশ রাজনীতি সচেতন। দেশীয় রাজনীতিতে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে জোরালো অবস্থানে দেখা গেছে তাকে। শুধু তিনি নন, রুপালি পর্দার একঝাঁক তারকা একাদশ সংসদ নির্বাচনে প্রচারণার মাঠ দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। তাদের গ্ল্যামার ছড়িয়েছেন। আমরাও হয়েছি বিনোদিত। কেউ কবুল করুন আর না করুন, এটিই সমাজবাস্তবতা- সব দেশে, সব সমাজে কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীরা হয়ে থাকেন সংবেদনশীল। রাজনীতি সচেতন। হাজার হোক, তারা তো সমাজের অগ্রবর্তী অংশ। অনুকরণীয়। আর রাজনীতি একটি মহৎ কাজ। এর সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত না করা বড্ড বেমানান, যাকে বলে আনস্মার্ট।

সাধারণেরা হতে পারেন বেসামাল। তাই বলে উচ্চশিক্ষিত ফেরদৌসের মাত্রাজ্ঞান থাকবে না? তিনি তো আইডল। মানে সমাজের আদর্শ! তার বেলায় এমন হওয়া সত্যিই বেমানান। দেশে নয়, রীতিমতো বিদেশে। না, ভুল বললাম প্রতিবেশী দেশে। ফেরদৌসকে দোষ দেয়া অন্যায়। তিনি তো প্রতিবেশী ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও তুমুল জনপ্রিয়। অসাধারণেরা সাধারণের চেয়ে সময়ে-অসময়ে একটু-আধটু ছাড় পেতে পারেন। তা না হলে তো আর অসাধারণ বলে কিছু থাকে না। এমনিতেই ভারতীয় সমাজে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের কদর ঈর্ষণীয়। অনেকে নামেন লোকসভা নির্বাচনে ভোটের লড়াইয়ে। ২০১৯ সালের নির্বাচনও ব্যতিক্রম নয়। ভারতের নির্বাচনী মওসুমে তারকাদের মেলা বসেছে। সেই মেলায় শামিল হতে ডাক পড়েছিল ঢালিউডের ফেরদৌসের। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে তিনি সোজা নির্বাচনী মাঠে গিয়ে হাজির হন। তার দিলসই চেহারা দেখে বিজেপি নেতারা হয়ে পড়েন বেহুঁশ। হুঁশ ফিরে বেজায় ক্ষেপে অভিযোগপত্র নিয়ে দৌড়ান নির্বাচন কমিশনে। তাতে অবশ্য তাদের মনবাসনা পূর্ণ হয়েছে।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ফেরদৌসের ভিসা বাতিল করে। আর ফেরদৌসকে চলে আসতে হয় বাংলাদেশে। তার শুভাকাক্সক্ষীরা বলছেন, তিনি না বুঝে এমন কাজ করেছেন। আইনের ভাষায়, যার অর্থ হলো- অপরিপক্কতা। মাটির ভাষায়- বেকুবি। তার এমন দশায় শুভাকাক্সক্ষী অনেকে কপাল চাপড়ে বলছেন, এত লেখাপড়ার কী দাম থাকল? না হয় বৈশ্বিক সূচকে আমাদের দেশের শিক্ষার মান নিম্নগামী। তা তো সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনা। কিন্তু ফেরদৌস যখন ছাত্র, তখন তো এমন ছিল না। পোড়া কপাল আর কাকে বলে। তবে সান্ত্বনা এটুকু যে, তৃণমূলের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নিয়ে বিপাকে পড়া বাংলাদেশের চিত্রনায়ক ফেরদৌসের জন্য অপেক্ষা করবেন ঋতুপর্ণারা। ‘দত্তা’ সিনেমায় ফেরদৌসের সহশিল্পী ঋতুপর্ণা। ফেরদৌসের ভিসা বাতিল ও কালো তালিকাভুক্তির কারণে শুটিং চলতে থাকা ‘দত্তা’ ছবিটি নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে ছবির সহপ্রধান অভিনয়শিল্পী ঋতুপর্ণা বলেন, আমরা ফেরদৌসের জন্য অপেক্ষা করব। আশা করছি, এ ঝামেলা কাটিয়ে উঠে আবার শুটিংয়ে ফিরবেন ফেরদৌস।

ঋতুপর্ণার মতে, ‘ফেরদৌস দীর্ঘ দিন ধরে চলচ্চিত্রশিল্পে কাজ করছেন। সমানতালে দুই বাংলায় সমান সম্মান নিয়ে কাজ করেছেন। মানুষের ভালোবাসা অর্জনের পাশাপাশি অনেক সম্মাননাও অর্জন করেছেন। আমাদের অনেক সুপারহিট ছবিও আছে। আমরা দু’জন পারিবারিক বন্ধুও। আমার মনে হয় না, এটির ব্যাপারে তিনি পুরোপুরি অবগত ছিলেন। না জেনেই হয়তো কাজটি করেছেন। শিল্পী হিসেবে তার হয়তো আবেগ কাজ করেছে। শিল্পী হিসেবেই অনুষ্ঠানে গেছেন। আমি নিশ্চিত, তিনি যদি জানতেন এ রকম একটি আইন আছে, তাহলে সেখানে মোটেই যেতেন না। এ ব্যাপারগুলো তার ক্ষেত্রে বিবেচনা করা যেতেই পারে। চলচ্চিত্রশিল্পে তার ইতিবাচক ভাবমূর্তির কথাও ভাবা যেতে পারে। আমি চাইব, ফেরদৌস যাতে আবার দুই বাংলায় অবাধে কাজ করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করে দেয়া হোক।’

পাদটীকা : ভারতের লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নেয়ায় ফেরদৌসের ভিসা বাতিল করে ভারত সরকার। এ জন্য দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। এরপরই ঢাকায় ফিরেছেন তিনি। ভিসাসংক্রান্ত আচরণ লঙ্ঘনের প্রতিবেদন পাওয়ার পরে ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার ভিসা বাতিল করে।

এ ছাড়া তাকে দেশত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়। সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জে পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতাসীন দল তৃণমূলের প্রার্থী কানহাইয়ালাল আগরওয়ালের নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন ফেরদৌস। তার এ অংশগ্রহণের বিষয়ে তীব্র প্রতিবাদ করে বিজেপি। এরপর দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে কি না, সে ব্যাপারে প্রতিবেদন চায়। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ভিসা বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। সাথে সাথে তাকে কালো তলিকাভুক্ত করে ভারতীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শুধু ফেরদৌস একা নন, একইভাবে কলকাতায় জি-বাংলায় ‘করুণাময়ী রাণী রাসমণি’ সিরিয়ালের রাজা রামচন্দ্রের ভূমিকায় অভিনয় করা বাংলাদেশের শিল্পী গাজী আবদুন নূরও সাবেক মন্ত্রী মদন মিত্রের সাথে কামারহাটিতে তৃণমূলের দমদম আসনের প্রার্থী সৌগত রায়ের নির্বাচনী প্রচারে নামেন। সৌগত রায়ের খোলা গাড়িতে তিনি রোড শোয়ে অংশ নেন। যদিও নূর বলেছেন, সাবেক মন্ত্রী মদন মিত্রের সাথে তার দীর্ঘ দিনের সম্পর্ক। তার অনুরোধে প্রচার মিছিলে গেলেও তিনি কোনো কথা বলেননি। শুধু সাথে ছিলেন। নূর হয়তো সিরিয়াল করতে করতে নিজেকে রাজা রামচন্দ্র ভাবতে শুরু করেছিলেন, তাই ভিসার মেয়াদ শেষ হলেও তা নতুন করে আর নবায়ন করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেননি! এ দিকে মমতাকে উদ্দেশ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেছেন, বিদেশীদের প্রচারে নামিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার করতে চাইছেন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী।
[email protected]


আরো সংবাদ




bedava internet