২৫ মার্চ ২০১৯

মূল্য কতটা দিতে হবে তুরস্ককে?

রজব তাইয়েব এরদোগান - ফাইল ছবি

রাশিয়ায় নির্মিত এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার ব্যাপারে তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধ সর্বব্যাপী রূপ নিতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স এই চুক্তি বাতিল করা না হলে ‘মারাত্মক পরিণতি’র ব্যাপারে সতর্ক করার পরও তুর্কি প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান এই চুক্তি থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দেননি। এরপর ন্যাটো প্রধান ও পেন্টাগনের মুখপাত্র এস-৪০০ চুক্তি কোনোভাবেই তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না মর্মে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছেন। এরপরও এরদোগান জানিয়েছেন, এস-৪০০ চুক্তিটি একটি সম্পন্ন বিষয়। এটি পুনর্বিবেচনার কোনো অবকাশ নেই। অধিকন্তু এস-৫০০ এর ব্যাপারেও মস্কোর সাথে আঙ্কারার আলোচনা শুরু হবে। আমেরিকার চাপের কাছে তুরস্কের নতিস্বীকার না করার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এফ-৩৫ জঙ্গি বিমান কেনার চুক্তি এবং প্যাট্রিয়াটিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের প্রস্তাব অকার্যকর হয়ে পড়তে পারে।

টানাপড়েন অনেক দিন ধরে
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক হঠাৎ উত্তেজনাকর হয়ে পড়েছে, এমনটি নয়। বেশ কিছুদিন ধরে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অনুসৃত নীতির সাথে তুরস্কের স্বার্থের সাংঘর্ষিক অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছিল। এ নিয়ে সৃষ্ট উত্তেজনা প্রশমনের জন্য উভয় পক্ষ চেষ্টাও করেছে। একপর্যায়ে সম্পর্ক আবার বেশ খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে আসে। এবার মনে হচ্ছে, বিষয়টি সে দিকে এগোচ্ছে না। এখন আমেরিকান থিংক ট্রাংকগুলোর পরামর্শ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অনুসৃত নীতির মধ্যে বিশেষ মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের আগ্রহ কমই দেখা যায়।

কাউন্সিল অব ফরেন রিলেশন্সের মিডল ইস্ট অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজের সিনিয়র ফেলো স্টিভেন এ কুক-এর সম্প্রতি প্রকাশিত Neither Friend nor Foe : The Future of U.S.-Turkey Relations (বন্ধুও নয় বা শত্রুও নয়: যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ) শীর্ষক বইটি এ ক্ষেত্রে বেশ গুরুত্বপূর্ণ। এই বহুল আলোচিত বইয়ে কুক লিখেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক এখন শেষ। তুরস্ক আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের একটি ন্যাটো সহযোগী দেশ হিসেবে রয়ে গেছে, যদিও দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের আর অংশীদার রাষ্ট্র নয়। আঙ্কারা যখন নীতিমালাকে অশ্রদ্ধা করে, তখন সরাসরি তুরস্কের বিরোধিতা করতে অনিচ্ছুক হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উচিত কাজ হতে পারে না।’ তিনি আরো বলেছেন,‘যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক এখন আগের মতো অভিন্ন হুমকি মোকাবেলা বা স্বার্থ অর্জনে এক হয়ে কাজ করে না।’

কুক তার বইয়ে আমেরিকার নীতিনির্ধারকদের সতর্ক করে দিয়ে আরো বলেন, ‘দুই দেশের সম্পর্ক কূটনৈতিকভাবে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ হওয়ার পরও ওয়াশিংটন আঙ্কারার সাথে বিশ্বাস এবং কৌশলগত সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করতে পারবে কি না তা পরিষ্কার নয় বরং এর পরিবর্তে মার্কিন নীতিপ্রণেতাদের যুক্তরাষ্ট্র-তুরস্ক পরিবর্তিত সম্পর্ককে কিভাবে পরিচালনা করতে হবে তার ওপর কাজ করা উচিত। এটি স্বীকার করে নেয়া উচিত যে, তুরস্ক যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী মিত্রের অবস্থান থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিপক্ষের কাছে চলে গেছে।’

কুক এ ব্যাপারে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে হোয়াইট হাউজকে পরামর্শ দিয়েছেন: প্রথমত, ন্যাটোর ইনসিরলিক বিমানঘাঁটির বিকল্প তৈরি করা। কারণ এরদোগানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রয়োজনে তুরস্কের বৈদেশিক নীতি ঠিক করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র তার নিজস্ব স্বার্থ আদায়ের জন্য এই ঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। আমেরিকার কর্মকর্তাদের এমন অবস্থান গ্রহণে বাধ্য করা উচিত হবে না যাতে তুরস্কের রাজনীতিবিদদের পরিবর্তিত স্বার্থের জন্য মার্কিন নিরাপত্তা স্বার্থ দুর্বল হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয়ত, সিরীয় কুর্দিদের মিলিশিয়া সংগঠন ওয়াইপিজির সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্ক বন্ধ করার ব্যাপারে তুরস্কের দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করা উচিত। ওয়াইপিজি ইসলামিক স্টেটের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিরিয়াকে স্থিতিশীল করার একটি কার্যকর শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইপিজির পৃষ্ঠপোষকতা থেকে সরে আসাটা ওয়াশিংটনকে ‘অবিশ্বাস্য সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করবে।

তৃতীয়ত, মার্কিন নীতিকে উপেক্ষা করার মতো, তুর্কি নীতির ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো সরকারি অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এফ-৩৫ প্রোগ্রামে তুরস্কের সাথে তার সহযোগিতার অবসান ঘটাতে হবে। তুরস্ক ‘আমেরিকার সবচেয়ে উন্নত সামরিক বিমানের সুবিধাগুলো’ যেখানে উপভোগ করছে, সেখানে দেশটি কর্তৃক মার্কিন স্বার্থ ও নীতিগুলোকে খোলাখুলিভাবে উপেক্ষা অব্যাহত থাকার বিষয়টি মেনে নেয়া যায় না।

‘ঠাণ্ডা লড়াই’য়ের সূত্রপাত
কুকের এই পরামর্শ ওয়াশিংটন পুরোপুরি গ্রহণ করেছে বলে মনে হচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তুরস্ককে এই হুমকিও দিয়েছে যে, রাশিয়ার সাথে এস-৪০০ চুক্তি বাতিল করা না হলে তুরস্কের ওপর সামরিক ও অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করা হতে পারে। এতে করে যে, ন্যাটোতে তুরস্কের অবস্থানের বিষয়টিও পুনর্বিবেচনা করা হবে সে ইঙ্গিতও দেয়া হয়েছে। এ ছাড়াও, সিরীয় কুর্দিদের সাথে তুরস্ক সীমান্তে একটি বাফার জোন গঠনের ব্যাপারে আঙ্কারা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে সেটিও অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যি সত্যি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে তা হলে তুরস্কের সিরীয় সীমান্ত অঞ্চল নতুনভাবে অস্থির হয়ে উঠতে পারে। এরদোগানের শক্তিমান অভ্যন্তরীণ প্রতিপক্ষ গুলেনবাদীর নতুন করে সক্রিয় করার উদ্যোগ নিতে পারে ওয়াশিংটন। কুক তার বইয়ে তাদের আমেরিকার মিত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

প্রশ্ন উঠতে পারে, অত্যন্ত হিসাবি রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে পরিচিত এরদোগান আমেরিকার শত্রুতাকে জাগিয়ে তোলার মতো এত কঠিন পথে কেন এগোনোর ঝুঁকি নিচ্ছেন? কোনো কোনো বিশ্লেষক এই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করার পেছনে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এরদোগানের সাফল্য অর্জনের একটি উদ্দেশ্যকে সামনে নিয়ে আসতে চান। কিন্তু যারা তুরস্ক অঞ্চল ও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন তারা এই ইস্যুর সাথে তুরস্কের আঞ্চলিক সংশ্লিষ্টতা ও অখণ্ডতার যোগসূত্র দেখতে পাবেন।

মূল ইস্যু কুর্দি রাষ্ট্র
শতবর্ষ আগে মধ্যপ্রাচ্য ভাগবাটোয়ারা করে নতুন নতুন রাষ্ট্র সৃষ্টির সময় ব্রিটিশ ও ফ্রান্স কর্তৃপক্ষ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র গঠন না করে এই কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চলকে চারটি দেশের মধ্যে ভাগ করে দিয়েছিল। এই রাষ্ট্রগুলো হলো- তুরস্ক, সিরিয়া, ইরান ও ইরাক। বিস্তীর্ণ কুর্দি অঞ্চলকে এভাবে বিভাজন করার পর গোপনে কুর্দিদের স্বাধীনতার জন্য ইন্ধন জুগিয়ে যায় পশ্চিমা শক্তি। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি রাষ্ট্রের সাথে কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্ঘাত লেগে থাকে। এ সঙ্ঘাত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ছাড়িয়ে সশস্ত্র রূপ নেয় প্রায় সব ক্ষেত্রে। আর কুর্দিদের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে সামরিক ও অর্থনৈতিক গোপন সমর্থন জোগায় আঞ্চলিক শক্তি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র। ইরাক ও সিরিয়ার একটি অংশ নিয়ে উগ্রবাদী আইএস রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কুর্দিদের প্রত্যক্ষ সামরিক সহায়তা দেয়ার একটি সুযোগ তৈরি করা হয় পাশ্চাত্যের সামনে। সাদ্দাম হোসেনকে উৎখাতের নামে ইরাক অভিযানের পর দেশটির সমৃদ্ধ কুর্দি অঞ্চল প্রায় স্বাধীন এক স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে রূপ নেয়। সিরিয়ায় আসাদবিরোধী সশস্ত্র লড়াই ছড়িয়ে পড়ার পর সিরিয়ার কুর্দি অঞ্চলও অনেকটা স্বাধীন হয়ে পড়ে। তখন তাদের লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, এর সাথে তুরস্ক ও ইরানের কুর্দি অঞ্চলকে সংযুক্ত করা।

এর আগেই মধ্যপ্রাচ্যের পুনর্বিন্যাসের যে মানচিত্র ২০০৬ সালে ইউএস ডিফেন্স জার্নাল এবং পরে আটলান্টিকা সাময়িকীতে প্রকাশ করা হয় তাতে এই চার দেশের কুর্দি অঞ্চল নিয়ে পৃথক কুর্দিস্তান প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। ইরাকে সাদ্দাম উৎখাতের অভিযান এবং সিরিয়ায় আইএস উৎখাতের সন্ত্রাসবিরোধী মার্কিন তৎপরতার মাধ্যমে ইরাক-সিরিয়ার কুর্দিদের স্বাধীনতার কাছাকাছি নিয়ে আসা হয়। বাকি থাকে তুরস্ক ও ইরান।

মার্কিন নেতৃত্বাধীন পাশ্চাত্যের এই পরিকল্পনার ব্যাপারে তুরস্কের কৌশলবিদরা গভীরভাবে অবহিত। তারা জানেন, সিরিয়াকেন্দ্রিক যে ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে, তার প্রধান লক্ষ্য হলো তুরস্ক। ইসরাইলের পরিকল্পনা অনুসারে, মধ্যপ্রাচ্যের শক্তিমান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে ইরাক সিরিয়া লিবিয়া ও ইয়েমেনকে ভঙ্গুর করে ফেলা হয়েছে। আনুগত্যের বন্ধনে নিয়ে আসা হয়েছে মিসর ও সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তিধর দেশকে। এর পরের লক্ষ্য হচ্ছে তুরস্ক। তুরস্কে গেজি পার্কের গণ-অভ্যুত্থান চেষ্টা ও ২০১৬ সালের ১৫ জুলাইয়ের সামরিক অভ্যুত্থান প্রচেষ্টার সাথে এর সম্পর্ক রয়েছে।

ব্যর্থ অভ্যুত্থান ও নতুন কৌশল
ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের সাথে ন্যাটোর স্থানীয় সামরিক কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা তুরস্কের নিরাপত্তা উদ্বেগকে অনেকখানি বাড়িয়ে দিয়েছে। এর সাথে যুক্ত গুলেনবাদীদের প্রধান মদদ আসে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও পাশ্চাত্যের কয়েকটি দেশ থেকে। এই অবস্থায় ন্যাটো ও পাশ্চাত্যনির্ভর নিরাপত্তাব্যবস্থায় তুরস্ক নিজের সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতা রক্ষা করতে পারবে কি না তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহের ব্যাপারে তুরস্কের প্রয়াস অনেকখানি ব্যর্থ হয়ে পড়ে। অন্য দিকে, সিরীয় পরিস্থিতিতে দ্রুত পরিবর্তনের কারণে দেশটির নিরাপত্তা ঝুঁকিও ঘনীভূত হতে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে প্রতিরক্ষা নির্ভরতার ক্ষেত্রে ভারসাম্য আনা তুরস্কের একটি জরুরি কৌশল হয়ে দাঁড়ায়। আঙ্কারা একদিকে শক্তিমান মুসলিম দেশগুলোর সাথে আন্তঃসহায়তার মাধ্যমে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনের প্রয়াস চালায়। অন্যদিকে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিকেও নজর দেয়। এমন তথ্যও নানা সূত্র থেকে পাওয়া যায় যে, ২০১৬ সালের জুলাইয়ের সেনা অভ্যুত্থান ব্যর্থ করে দেয়ার ক্ষেত্রে রাশিয়ার গোয়েন্দা তথ্যসহায়তা সক্রিয় ছিল। এর ফলে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে একদিকে ন্যাটোর তৎপরতায় তুরস্কের স্থানিক নজরদারি বৃদ্ধি পায়, অন্য দিকে রুশ বিমান ভূপাতিত করার কারণে স্থবির হওয়া সম্পর্ক রাশিয়ার সাথে পুনঃপ্রতিষ্ঠা পায়।

এর ধারাবাহিকতায়, রাশিয়ার সাথে এস-৪০০ আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সংগ্রহে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় আঙ্কারা ও মস্কোর মধ্যে। এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা সংগ্রহ চুক্তির আগে সৌদি আরব ও কাতারও একই ধরনের চুক্তি করেছে। কিন্তু তুরস্কের ক্ষেত্রে এ ব্যাপারে যে প্রতিক্রিয়া যুক্তরাষ্ট্র প্রদর্শন করছে, সেভাবে করেনি অন্য দু’টি দেশের ক্ষেত্রে। যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রতিক্রিয়া যে আরো সামনে এগোবে, তাতে সন্দেহের অবকাশ এখন কমই রয়েছে। প্রশ্ন হতে পারে, সেই প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে?

প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র তুরস্কের সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ককে সীমিত করতে পারে। ১০০টি এফ-৩৫ জঙ্গি বিমান সরবরাহের বিষয়টি স্থগিত করতে পারে। প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেনার যে প্রস্তাব এস-৪০০ চুক্তি বাতিলের বিনিময়ে দেয়া হয়েছে, সেটির সমাপ্তি টানা হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, ন্যাটোতে তুরস্কের যে ভূমিকা রয়েছে সেটিকে সঙ্কুচিত করা হতে পারে। তুরস্কে ন্যাটোর যে বিমানঘাঁটি রয়েছে সেটিকে গ্রিসে সরিয়ে নেয়া হতে পারে। তুরস্কের জন্য ন্যাটোর সহায়তা ও অন্যান্য সুবিধা কমানো হতে পারে।

তৃতীয়ত, তুরস্কের সরকার পরিবর্তনের প্রচেষ্টাকে জোরদার করা হতে পারে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাফল্য অর্জনের জন্য বিরোধীদলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা চালানো হতে পারে। পরবর্তী মেয়াদে এরদোগান ও তার দল একেপি যাতে ক্ষমতায় আসতে না পারে সে চেষ্টাও করা হতে পারে।

চতুর্থত, অর্থনৈতিক অবরোধ ও অন্যান্য ব্যবস্থা নেয়ার মাধ্যমে তুরস্ককে তীব্র অর্থনৈতিক চাপে ফেলা হতে পারে। এতে তুর্কি রফতানি আয় এবং স্থানীয় মুদ্রা লিরা আরেক দফা মান অবনতির চাপে পড়তে পারে।

পঞ্চমত, মধ্যপ্রাচ্যে যুুক্তরাষ্ট্রের যেসব আঞ্চলিক মিত্র দেশ রয়েছে সেগুলোকে তুরস্কের বিপরীতে শক্তিশালী করার পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে। সামরিক মদদ দেয়া হতে পারে কুর্দিদের পিকেকে এবং ওয়াইপিজিকে।

এসব পদক্ষেপের বিষয় তুরস্কের নীতিনির্ধারকদের বিবেচনার মধ্যে থাকার কথা। এর আগে তুর্কি প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কিছুটা এগিয়ে আনার পেছনে কৌশলগত কিছু লক্ষ্য রয়েছে বলে ইঙ্গিত করেছিলেন তুর্কি দৈনিক ‘ইনি সাফাক’ পত্রিকার সম্পাদক ইব্রাহিম কারাগুল। তিনি তুরস্কের প্রধান সমস্যা ‘অখণ্ডতা রক্ষা ও নিরাপত্তা’ বলে চিহ্নিত করে বলেছিলেন, আঙ্কারাকে নিজের অবস্থান রক্ষা ও সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য একটি সর্বাত্মক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। প্রেসিডেন্ট ও সংসদ নির্বাচনকে সেই লড়াইয়ের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন তিনি।

সর্বাত্মক লড়াইয়ের সূচনা
এস-৪০০ চুক্তিকে কেন্দ্র করে এখন তুরস্কের সামনে যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাকে সর্বাত্মক লড়াইয়ের সূচনা বলা যেতে পারে। এ সময়ে এরদোগানকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক স্থিতিকে নিশ্চিত করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প রফতানি বাজার সৃষ্টি করতে হবে এবং ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য অবরোধের মুখে যাতে লিরার মান অবনয়ন না ঘটে তার প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। তুরস্কের প্রতিপক্ষবলয় যাতে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত না হতে পারে, সে জন্য কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রয়াস চালাতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যে যে বিভাজন এখন সৌদি আরব আর ইরানকে কেন্দ্র করে তৈরি হয়েছে, তার মাঝখানে মধ্যপন্থী দেশগুলোর একটি ভিন্ন জোট-আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক যেভাবেই হোক- তৈরি করার প্রয়াস পেতে হবে।

প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ন্যাটো-বলয় ছেড়ে পুরোপুরি রাশিয়ার প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকে পড়া কৌশলগতভাবে তুরস্কের পক্ষে সম্ভব হবে না। এ ক্ষেত্রে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ মিত্রদের সাথে যোগসূত্র রেখে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে আত্মনির্ভরশীল একটি অবস্থা তৈরি করতে হবে।
বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অর্থনীতি হবে তুরস্কের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রধান চালিকাশক্তি। এ ক্ষেত্রে যথাসম্ভব রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজার সুবিধা গ্রহণ করতে হবে। ইউরোপের সাথে এমন ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি করতে হবে যাতে জার্মানি ও অন্যান্য প্রভাবশালী ইউরোপীয় বাজার তুর্কি পণ্য ও কর্মশক্তির জন্য বন্ধ হয়ে না যায়।

তুর্কি খেলাফতের অবসানের সময় তখনকার পরাশক্তিগুলোর সাথে করা চুক্তি অনুসারে, তুরস্কের জ্বালানি অনুসন্ধান ও উত্তোলন শত বছরের জন্য সীমিত করা হয়েছিল। সেই মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। তুর্কি জ্বালানি অনুসন্ধান সংস্থা এর মধ্যে এই ব্যাপারে সক্রিয় উদ্যোগ নিয়ে স্থল ও সমুদ্রসীমায় জ্বালানি অনুসন্ধানের প্রস্তুতি শুরু করেছে। এই উদ্যোগকে সামনে এগিয়ে নিতে হবে।

তুরস্কের জন্য আগামী দিনগুলো একদিকে হবে চ্যালেঞ্জের, অন্যদিকে হবে সম্ভাবনার। মুসলিম বিশ্বের ও আঞ্চলিক নেতৃত্ব গ্রহণে সক্রিয় হওয়ার মতো অনেক সম্ভাবনা তুরস্কের রয়েছে। এই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে এরদোগানের মতো পরিণামদর্শী নেতৃত্ব দেশটির জন্য একটি অনন্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত হতে পারেন। এরদোগানের নেতৃত্ব বা ভূমিকা বিতর্কের ঊর্ধ্বে বলা যাবে না। তবে তুরস্কে তার চরম বিরোধীরাও এই মত পোষণ করেন যে, দেশটিকে অখণ্ড রাখার জন্য এরদোগানের কোনো বিকল্প নেতৃত্ব এখন নেই। যে মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মুখ্য এজেন্ডা হয়ে দাঁড়িয়েছে তুরস্কের শতকরা ৩০ ভাগ, কুর্দি ভূখণ্ডকে আলাদা করে স্বতন্ত্র কুর্দিস্তানের সাথে যুক্ত করে দেয়া, সে সময় তুরস্কের শতকরা নিজের অখণ্ডতা রক্ষাকে প্রধান এজেন্ডা করার আর কোনো বিকল্প নেই। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে এটিই। 
[email protected]


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al