১৪ অক্টোবর ২০১৯

ইমরান খানের কূটনৈতিক নৈপুণ্য!

শুক্রবার আটক ভারতীয় পাইলটকে হস্তান্তর করে পাকিস্তান - ফাইল ছবি

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ যুদ্ধ উত্তেজনা আপাতত প্রশমিত হয়েছে বলে মনে হয়। আরেকটি রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের যে আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছিল, তা অনেকটা কেটে গেছে। পাকিস্তানে বন্দী ভারতীয় পাইলট অভিনন্দনকে তার নিজ দেশে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। ১ মার্চ সকালে সীমান্তে পৌঁছে যান অভিনন্দনের বাবা এয়ার মার্শাল (অব:) সিমহাকুট্টি বর্তমান এবং মা শোভা বর্তমান। দেশের মাটিতে পা রাখার সময় অভিনন্দনের মুখে ছিল হাসি। তিনি বলেন, ‘দেশে জীবিত ফেরত আসতে পেরে খুব ভালো লাগছে।’

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সর্বশেষ উত্তেজনার শুরু গত ১৪ ফেব্রুয়ারি। ওই দিন ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরের পুলওয়ামায় সিআরপিএফের গাড়িবহরে এক আত্মঘাতী হামলায় ৪০ জওয়ান নিহত হন। পাকিস্তানভিত্তিক জয়শ-ই-মুহাম্মদ এ হামলার দায় স্বীকার করেছে। ভারত এটিকে ‘জঙ্গি সংগঠন’ হিসেবে অভিযুক্ত করে আসছে। সে ঘটনার পর থেকে ভারত পাকিস্তানকে ‘সমুচিত জবাব’ দেয়ার হুমকি দিয়ে আসছিল। অবশেষে ২৬ ফেব্রুয়ারি ভোরে পাকিস্তানের বালাকোটে বিমান হামলা চালায় ভারত। পরদিন দুই দেশের সেনাদের মধ্যে গোলা ও গুলিবিনিময় হয়। শুরু হয়ে যায় আকাশযুদ্ধ। ২৭ ফেব্রুয়ারি বালাকোটে হামলার ‘বদলা’ নেয় পাকিস্তান। এ সময় আকাশযুদ্ধে ভারত দু’টি যুদ্ধবিমান হারায় বলে দাবি করেছে পাকিস্তান। বন্দী হন ভারতীয় পাইলট বিমানবাহিনীর উইং কমান্ডার অভিনন্দন। আর পাকিস্তান একটি যুদ্ধবিমান হারায় বলে দাবি করে ভারত।

অভিনন্দন ফিরলেও পাক-ভারত সীমান্ত এখনো অশান্ত। শনিবারও গোলাবিনিময় হয়েছে থেমে থেমে। বেসামরিক লোকজনও মারা গেছে। পাকিস্তানের হাতে ভারতীয় পাইলটের বন্দী হওয়ার ঘটনাটি সম্ভাব্য যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। এ মুহূর্তে দু’পক্ষ হয়তো বড় আকারে যুদ্ধে জড়াবে না। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের কৌশলও কাজ দিয়েছে। পুলওয়ামার ঘটনার পরই ইমরান খান জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে এ হামলার সাথে ‘পাকিস্তান জড়িত নয়’ বলে জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে এ পর্যন্ত যত হামলা হয়েছে তার নিরপেক্ষ তদন্তে পাকিস্তান সহযোগিতা করতে চায়। পুলওয়ামার হামলায় পাকিস্তান জড়িত বলে ভারত যে দাবি করছে তার প্রমাণ থাকলে তাও তদন্তের স্বার্থে ভারত পাকিস্তানের সাথে ‘ভাগাভাগি করতে’ পারে। তিনি ভারতকে শান্তি আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছেন। কিন্তু এ আহ্বানে সাড়া দেয়নি ভারত।

পুলওয়ামার হামলা ঘটনায় যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। বিশেষ করে এ ঘটনাকে লুফে নেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। মে মাস নাগাদ ভারতের সাধারণ নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচনে মোদির অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। তাই নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়ার জন্য পুলওয়ামার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উগ্র জাতীয়তাবাদকে উসকে দেয়ার কৌশল নেন। এ জন্য যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃৃষ্টি করা হয়। প্রেক্ষাপটে ভারতীয় বিমানবাহিনী বালাকোটে হামলা চালায়। ভারত দাবি করে, নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মিরের তিনটি জায়গায় ভারতীয় বিমানবাহিনী অভিযান চালিয়েছে। এই বিমানগুলো অন্তত দশটন বোমা ফেলেছে। এতে জয়শ-ই-মুহাম্মদের ঘাঁটি ‘গুঁড়িয়ে গেছে’ এবং ৩০০ জঙ্গিকে হত্যা করা হয়েছে। হামলার পর নরেন্দ্র মোদি জনসভায় উল্লাস প্রকাশ করে বলেন, ‘আমি বলেছিলাম, দেশকে রসাতলে যেতে দেবো না, থমকে যেতে দেবো না, মচকাব না। ভারতমাতাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তার সম্মান রক্ষা করব। আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি, দেশের নেতৃত্ব উপযুক্ত হাতেই আছে।’ এই যুদ্ধ যে দেশের জন্য নয়, নির্বাচনে জেতার যুদ্ধ, নরেন্দ্র মোদির এই অতি উৎসাহ সেটাই প্রমাণ করে।

বালাকোটে হামলার পর পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বলা হয়, ‘ভারতীয় হামলায় কেউ হতাহত হয়নি। ওই জায়গায় কোনো জঙ্গি আস্তানা ছিল না। ফাঁকা জায়গায় কিছু বোমা ফেলে গেছে ভারতীয় বিমান।’ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো ঘটনাস্থলে গিয়ে রিপোর্ট করেছে। এতে বলা হয়, ‘ভারতীয় বিমান থেকে ফেলা বোমাগুলো কোনো টার্গেটে পড়েনি, বিশেষ কোনো ক্ষতিও হয়নি।’ রয়টার্সের রিপোর্টে বলা হয়, যে গ্রামটিতে ভারত বোমা ফেলেছে সেটি হচ্ছে পাকিস্তানের বালাকোট শহরের কাছে জাবা গ্রাম। পাহাড়ি ওই গ্রামে ৪০০ থেকে ৫০০ মানুষ বাস করে। গ্রামের ১৫ জনের সাথে কথা বলেছে রয়টার্স। হামলায় ওই গ্রামের ঢালু প্রান্তরে গ্রামবাসী বোমার আঘাতে চারটি বড় গর্তের সন্ধান পেয়েছেন। সেখানে স্পিøন্টারবিদ্ধ কিছু পাইনগাছ দেখেছেন তারা। বিস্ফোরণে বাড়িঘর কেঁপেছে এবং কিছু পাইনগাছ মরেছে। আর মরেছে একটি কাক।’

ভারতীয় হামলার পরপরই পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠক বসে। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তার দেশের সশস্ত্র বাহিনী ও জনগণকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান। দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘ভারত আন্তর্জাতিক নিয়ন্ত্রণ রেখা লঙ্ঘন করেছে। পাকিস্তান এ ঘটনার জবাব উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত জায়গায় দেবে। ‘যুদ্ধের আশঙ্কায় জাতিঙ্ঘ, আমেরিকা, চীনসহ বিভিন্ন দেশ বিবদমান দু’দেশকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানায়।

এ ক্ষেত্রে দূরদর্শী এবং কৌশলী ভূমিকা পালন করেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। একসময় সেরা ব্যাটিং, বোলিং এবং অধিনায়কত্ব দেয়া ক্রিকেটের অলরাউন্ডার ইমরান খান পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ এনে দিয়েছিলেন। এবার রাজনীতিতে থেকে এবং ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী হয়ে সে নৈপুণ্যের মতোই কূটনৈতিক নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। বালাকোটে হামলার পর জাতির উদ্দেশে দেয়া তার ভাষণটি ছিল এর একটি উদাহরণ। ভারতের সাথে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে ভাষণে ইমরান খান প্রতিপক্ষকে শান্তির বার্তা দিলেন। তিনি বলেন, ‘পাকিস্তান-ভারত উভয় দেশের হাতেই পারমাণবিক অস্ত্র থাকায় আমাদের আরো দায়িত্বশীল হওয়া উচিত। যুদ্ধ একবার শুরু হয়ে গেলে তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সামর্থ্য আমার বা নরেন্দ্র মোদি কারো হাতেই থাকবে না। ভারতকে বলতে চাই, আমাদের শুভবুদ্ধি এবং প্রজ্ঞার সমন্বয়ে কাজ করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বে যতগুলো বড় যুদ্ধ হয়েছে তার পেছনে ছিল ভুল হিসাব-নিকাশ। হিটলার কখনো ভাবেননি যুদ্ধ এত বছর ধরে চলবে। আমেরিকানরা কখনো কল্পনা করেনি ভিয়েতনাম এবং আফগানিস্তানে যুদ্ধ দশকের পর দশক ধরে চলবে। আমাদের উভয় দেশের হাতে থাকা অস্ত্র নিয়ে আমরা যদি ভুল হিসাব করি তাহলে এর নিয়ন্ত্রণ যেমন আমার হাতে থাকবে না, তেমনি থাকবে না মোদির হাতেও।’

কাশ্মিরে ভারতীয় যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হলে বিমানটির পাইলট অভিনন্দন বন্দী হন। গ্রামবাসী তাকে আহত করে। তবে পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তারা তাকে উদ্ধার করেন। এ অবস্থায় ইমরান খান আহত ভারতীয় পাইলটকে আগে চিকিৎসা দেয়ার নির্দেশ দেন। তিনি পাকিস্তানের পার্লামেন্টে ঘোষণা করেন, শান্তির বার্তা হিসেবে বন্দী অভিনন্দনকে ভারতের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হবে।’ প্রতিশ্রুতি তিনি রক্ষা করেছেন। অভিনন্দন দেশে ফিরেছেন। এর আগে পাকিস্তানে দেয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘পাকিস্তানের সেনারাই আমাকে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীর কাছ থেকে রক্ষা করেছেন। তাদের সাথে ভালো সময় কাটিয়েছি, তারা পেশাদার। আমি অভিভূত।’ ভারত অভিযোগ করেছে যে, এ বক্তব্য ‘জোর করে’ নেয়া হয়েছে। পাকিস্তান অভিনন্দনকে ত্বরিত ফেরত দিয়ে সুন্দর দৃষ্টান্ত দেখালেও ভারতের পক্ষ থেকে এমন দৃষ্টান্ত দেখা যায়নি। ভারত উল্টোটাই করেছে। পুলওয়ামায় হামলার পর ক্রিকেট ক্লাব অব ইন্ডিয়া (সিসিআই) থেকে ইমরান খানের প্রতিকৃতি সরিয়ে ফেলা হয়। এরপর অন্যান্য ক্লাব এবং কলকাতার ইডেনসহ বিভিন্ন স্টেডিয়াম থেকেও ইমরান খানসহ পাকিস্তানের ক্রিকেট তারকাদের ছবি সরানো হয়।

ভারতের বিরোধী দল এবং সিভিল সোসাইটির সদস্যরা পুলওয়ামায় হামলার ঘটনা নিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করাকে মেনে নেননি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যে নির্বাচন জেতার জন্য যুদ্ধের নাটক করছেন, সেটা নিয়ে খোদ ভারতেই প্রতিবাদ চলছে। মোদিবিরোধী ২১ দলীয় জোট এ বিষয়ে স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বলেছেন, ‘দেশের প্রয়োজনে যদি যুদ্ধ হয় তাহলে আমরা দেশের সাথে আছি। কিন্তু রাজনীতির প্রয়োজনে আমরা যুদ্ধ চাই না; নির্বাচনে জেতার জন্য আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা শান্তি চাই।’

বালাকোটে হামলা নিয়ে মমতা প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, বলা হচ্ছে, তিন-চার শ’ লোক মারা গেছে। কত লোক মারা গেছে, আদৌ লোক মরেছে কি না, বোমাটা কোথায় ফেলা হয়েছিল, সেটা ঠিক জায়গায় পড়েছিল কি না আমরা জানতে চাই। এ অবস্থায় মোদি নিজ দেশে চাপে পড়েছেন। ফলে তার পক্ষে হয়তো আর যুদ্ধের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব না-ও হতে পারে।’ আমরাও সেটি চাই। শান্তিপ্রিয় বিশ্ব সেটি চায়- যুদ্ধ নয়। সমস্যা সমাধানের অন্য পথ বের করা হোক। কারণ ভারত ও পাকিস্তান যুদ্ধ বাধলে সেটি শুধু ওই দু’দেশকেই ক্ষতিগ্রস্ত করবে না, ক্ষতির মুখে পড়ব আমরাও। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum