১৪ অক্টোবর ২০১৯

বাংলাদেশে ভারত-চীন স্বার্থ সংঘাত কি আসন্ন?

শেখ হাসিনা, নরেন্দ্র মোদি ও শি জিনপিং -

বাংলাদেশের এবারের বহুলালোচিত নির্বাচনে সরকারের ধারাবাহিকতার প্রতি চীন ও ভারতের একযোগে সমর্থনের বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট। দুই দেশই প্রতিযোগিতা করে এই বিজয়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। নতুন সরকার গঠনের পর দুই দেশের সাথে সবচেয়ে ভালো সম্পর্ক বজায় থাকবে সেটিই প্রত্যাশিত হওয়ার কথা; কিন্তু সরকার গঠনের পরপরই নতুন সময়ে কোন দেশের প্রভাব কতটা তা নিয়ে বিতর্ক উঠতে শুরু করেছে। চীনে সরকারের মতামতের বাইরে ভিন্ন মত গণমাধ্যমে কমই প্রতিফলিত হয়। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের মতো দু-একটা পত্রিকা রয়েছে যেখানে অপ্রত্যক্ষ চীনা স্বার্থের ক্ষেত্রে কিছুটা নিরপেক্ষ মত বা বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। অন্য দিকে, ভারতে মুক্ত গণতন্ত্র চর্চার কারণে সংবাদপত্রের স্বাধীনতাও অনেক বেশি। সরকারের নীতির সমালোচনা সেখানে একটি সাধারণ বিষয়। বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক এবং এবারের নির্বাচনে দেশটির ভূমিকা নিয়েও নির্বাচনোত্তর অনেক আলোচনা সমালোচনা হয়েছে। দেশটির থিংক ট্যাংকগুলোও এ নিয়ে বিচার বিশ্লেষণে তাদের উদ্বেগ- উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছে।

অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সক্ষমতার অনুক্রমের মধ্যে গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য রূপান্তর ঘটেছে। একই সময়ে, প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াইয়ের এক দারুণ ক্ষেত্রও হয়ে উঠেছে এই অঞ্চল। ভারত ও চীন উভয় শক্তির প্রান্তিক দেশ বাংলাদেশ আর বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে ভারত মহাসাগরে প্রবেশাধিকার রয়েছে দেশটির। বাংলাদেশের এই অনন্য ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে, ভারত ও চীন উভয় দেশ এই ভূখণ্ডের সাথে ভালো তথা নিয়ন্ত্রক সম্পর্কের জন্য প্রতিযোগিতা করছে।

চীন ও ভারতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বিশ্বব্যাপী ভারসাম্য ও আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলছে। উভয় দেশের নিকটবর্তী দেশগুলো তাদের মধ্যে ভূ-কৌশলগত প্রতিযোগিতার সম্ভাব্য স্থান হয়ে উঠছে। গতিশীল অর্থনীতি সৃষ্টির সাথে সাথে ভারত ও চীন উভয়ই তাদের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে আঞ্চলিক ও বিশ্ব পরিস্থিতিতে।

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন ও হাসিনার কৌশল
৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ভারতের ওপর এককভাবে নির্ভর করে নির্বাচন জয়ের আয়োজন করতে পারেননি শেখ হাসিনা। তাকে ভারত রাশিয়ার পাশাপাশি চীনের দ্বারস্থ হতে হয়েছে। নিরাপত্তা পরিষদে যেকোনো বিপত্তি ঠেকাতে রাশিয়ার পাশাপাশি চীনের সমর্থন ঢাকার অবস্থানকে অনেক জোরালো করতে পারে তাতে সন্দেহ নেই। একই সাথে নির্বাচনের জন্য বিপুল তহবিলেরও প্রয়োজন পড়েছে সরকারি দলের। তহবিল সংগ্রহের জন্য চীনা প্রকল্পের ব্যাপারে সমঝোতা সবচেয়ে বড় সুযোগ এনে দেয়। স্থানীয় এজেন্টের জন্য ১০-১৫ শতাংশ কমিশন থাকে চীনা প্রকল্পে। এর সুবিধাভোগী করা যায় রাষ্ট্রের ক্ষমতাশালীদের। এই অবকাশ ভারতীয় প্রকল্প বা সরবরাহে কম। ফলে নির্বাচনী বৈতরণী পার হওয়া এবং এরপর আন্তর্জাতিক বৈধতার জন্য লবিং বাবদ বিপুল অর্থের জোগান দেয়ার জন্য চীনা সহযোগিতার বিকল্প নেই। এই সহযোগিতা বেইজিং থেকে বিপুলভাবে পাওয়া গেছে বলে জানা যাচ্ছে।

বাংলাদেশে ২৪ বিলিয়ন ডলারের চীনা সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন রয়েছে। এর মধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলারের মতো ইতোমধ্যে ছাড় করা হয়েছে। আরো ১২ বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ প্রস্তাব বিবেচনায় রয়েছে। এই বিনিয়োগের বিপুল অংশই হলো অবকাঠামো খাতে। চীনা পররাষ্ট্র নীতিতে কৌশলগত বিষয়ের গুরুত্ব অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু বেইজিং অর্থনীতি, বাণিজ্য ও বিনিয়োগসুবিধা দানের মধ্য দিয়ে কৌশলগত লক্ষ্য পূরণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। এর ফলে বাংলাদেশে কোন দল তার কৌশলগত মিত্র তার চেয়ে বেশি বেইজিংকে বিবেচনায় আনতে হয়েছে, কোন সরকার তাকে অধিক ডেলিভারি দিতে পারবে সেটি। সাধারণভাবে সরকারে যারা থাকেন তারা ডেলিভারি দেয়ার ক্ষেত্রে থাকেন বাড়তি সুবিধায়। আর সে সরকার যদি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ধীরগতির পরিবর্তে বেপরোয়া ধরনের গতিময়তার হয় তাহলে এই সুবিধা আরো বেশি। এই বিবেচনায় বেইজিং কৌশলগত রাজনৈতিক মিত্রের চেয়েও সুবিধাজনক মিত্রের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছে বেশি। আর এ ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাবের চেয়ে আমেরিকান প্রভাবকে বেশি বিপজ্জনক বিবেচনা করেছে বেইজিং। এ সুবিধা নিতে পেরেছে সরকারি দল।

চীনের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকারের প্রকল্প হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড প্রকল্প। এই প্রকল্পে বিসিআইএম করিডোর নেটওয়ার্ক বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত ঢাকার সাথে কুনমিং পর্যন্ত প্রত্যক্ষ যোগাযোগ সৃষ্টির বিষয়টি একটি অন্যতম অগ্রাধিকার চীনের জন্য। এ ছাড়া এই অঞ্চল ঘিরে বেইজিংয়ের কৌশল একটি আন্তঃরাষ্ট্র অর্থনৈতিক জোন সৃষ্টির পরিকল্পনার সাথে যুক্ত। যার মধ্যে চীনের বিকল্প জ্বালানি রুট যেমন রয়েছে তেমনি এর সাথে সংশ্লিষ্ট একটি শিল্পাঞ্চল তৈরির বিষয়ও রয়েছে। এর অংশ হিসাবে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশের অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে চীন বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। চীন থেকে অনেক শিল্প প্রকল্প বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হতে পারে। এতে লাখ লাখ চাকরির ব্যবস্থা হবে, সেই সাথে বাংলাদেশের রফতানি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ও ব্যাপকভাবে বাড়বে। এসব হলো চীনা সম্পর্কের আশাবাদ। আর এই আশাবাদকে সামনে রেখেই শেখ হাসিনার সরকার চীনের দিকে একটু বেশি ঝুঁকে পড়ছে বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রশ্ন হলো, ভারতের তুলনায় চীনের দিকে কেন বেশি ঝুঁকে পড়ছে ঢাকার সরকার। দক্ষিণ এশিয়ার পর্যবেক্ষক ডেভিড এন রবিনসনের মতে, ‘বাংলাদেশে ভারত সব সময় বড়ভাইসুলভ আচরণ করে আসছিল। ফলে এই দেশটিও চীনের দিকে ঝুঁকছে। বিষয়টি স্পষ্টভাবেই দেখা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশকে অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতকে তুষ্ট করার দশকপ্রাচীন ঐতিহ্য ভেঙে ফেলতে কোনোই দ্বিধা করেননি। তিনি তার নতুন মন্ত্রিসভায় সুশিক্ষিত, ফোকাসড ও সর্বোপরি ভারতীয় প্রভাবমুক্ত সদস্যদেরই বেশি করে স্থান দিয়েছেন।’

১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে সহায়তা দেয়ার জের ধরে ঐতিহাসিকভাবে বাংলাদেশের ওপর ভারতের জোরালো প্রভাব রয়েছে এবং দেশটি আওয়ামী লীগের সাথে বিশেষভাবে ঘনিষ্ঠ। ভারত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখলেও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ফ্রন্টে চীন বিশাল প্রেক্ষাপটে আবির্ভূত হওয়ায় দৃশ্যত সূক্ষ্ম পরিবর্তন ঘটে গেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। আঞ্চলিক রাজনীতির খেলায় শেখ হাসিনা চীনের দিকে অধিক ঝুঁকেছেন। তার নতুন মন্ত্রিসভায় ওই পদক্ষেপেরই সূক্ষ্ম প্রতিফলন ঘটে থাকতে পারে।

কুয়ালালামপুরভিত্তিক সাউথ এশিয়ান মনিটরের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চিতভাবেই মনে হচ্ছে ভারতের সাথে নাড়ির সম্পর্কটি কেটে গেছে বা কাটা পড়ার পর্যায়ে রয়েছে। আর এটিও বেশ নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছে যে, ভারতকে তার মুষ্টি শিথিল করতে হচ্ছে। তোফায়েল আহমেদ, আমির হোসেন আমুর মতো আওয়ামী লীগের বর্ষীয়ান এবং হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননের মতো সিনিয়র নেতারা ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্টের- প্রশাসনিক বা নিরাপত্তা কাঠামোর সাথে আলাদা সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিলেন। তারা সবাই অপাঙ্ক্তেয় হয়ে গেছেন। তোফায়েল ও আমুর মতো নেতারা দৃশ্যপট থেকে বিদায় নেয়ায় যোগাযোগ লাইনটিই কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। যোগাযোগের একমাত্র যে লাইনটি রয়ে গেছে তা একেবারে সরাসরি এবং তা হলো হাসিনার সাথে। মনে হচ্ছে, তিনি এমনটিই চেয়েছেন।’

বিশ্লেষণে আরো বলা হয়েছে, ‘ভারত এখন দূরে থাকায় নিশ্চিতভাবেই যে প্রতিবেশী সুবিধা পাবে সে হলো শক্তিশালী চীন। বাংলাদেশে বিপুল বিনিয়োগ করায় ভারতীয় প্রভাবের শক্তিকেন্দ্রগুলো বিচ্ছিন্ন রাখতে চীন কার্যকরভাবে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করেছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে চীন সফলভাবে পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রতিবেশী থেকে বাংলাদেশকে সরিয়ে এনেছে। সাধারণভাবে যতটুকু মনে করা হয়ে থাকে, চীনা সংশ্লিষ্টতা তার চেয়ে অনেক বেশি। এমন একটি ধারণা রয়েছে যে বাংলাদেশে চীন কেবল ব্যবসায়িক সুযোগ গ্রহণের ব্যাপারে আগ্রহী।

বিশাল পদ্মা সেতুসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রকল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করায় ব্যবসা নিশ্চিতভাবেই গুরুত্বপূর্ণ। তবে চীনের কৌশলগত অনুপ্রবেশকে এড়িয়ে যাওয়ার একটি প্রবণতা রয়েছে। নিশ্চিত বিনিয়োগ স্বার্থের সাথে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ক্রমবর্ধমান ভূকৌশলগত বৈশ্বিক তাৎপর্য থাকার কারণে বাংলাদেশের সরকার পরিচালনাকারীকে নিরঙ্কুশভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে চীন অনেক বেশি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। সে এখানে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে নয়া দিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ কাউকেই দেখতে চায় না। এ কারণেই দিল্লি-অন্তঃপ্রাণদের বাদ দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করা হয়েছে।’

এই বিশ্লেষণের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, ‘চীনা কৌশলের অংশে জয়ের (সজীব ওয়াজেদ জয়) বিষয়টিও বেশ ভালোভাবে থাকতে পারে। ভারতের সাথে হাসিনা জোরালো সম্পর্ক অব্যাহত রাখলেও বেইজিং চেষ্টা করে যাচ্ছে জয়কে জয় করার। মনে হচ্ছে রাজনীতির হৈহুল্লোড়ের মধ্যে প্রবেশ করার পর থেকেই জয়ও চীনের দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। ফলে ভারতপন্থী নেতারা বাদ পড়েছেন, তাদের স্থানে চীনপন্থীরা সুযোগ পেয়েছেন। এতে করে যথাযথ ধারায় জয়ের উত্তরাধিকার হওয়ার পথটি সুগম হতে পারে; কিন্তু এটি কি সাবলীল যাত্রা হবে? বাংলাদেশে ভারতের ব্যাপকভিত্তিক গ্রন্থি থাকায় একে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করা কঠিন হবে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে ভারতীয় প্রভাব অনেক গভীরে এবং নয়া দিল্লি চাইলে দেশে ‘অস্থিরতা’ সৃষ্টি করার মতো ক্ষমতা তার আছে।’

স্বার্থ সংঘাত সম্ভাবনা কতটা?
কৌশলী খেলোয়াড় হিসেবে শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রতি চীন-ভারত দুই দেশেরই স্বার্থসংশ্লিষ্টতাকে কাজে লাগাতে চান। তিনি এই দুই আঞ্চলিক খেলোয়াড়ের সাথে প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্বে কমই জড়াতে চেয়েছেন। এতে কোনো একদিকে একবার ঝুঁকে পড়লে পরে আবার তিনি ব্যালেন্স করেছেন। শেখ হাসিনার সামনে নির্বাচনোত্তর যে পরিবেশ তাতে দুই বড় দেশকেই তার প্রয়োজন। এর মধ্যে মাত্রাগত পার্থক্য হলো নির্বাচনের পর যে সম্ভাব্য অর্থনৈতিক শ্লথগতি ও তহবিল সঙ্কটের মোকাবেলা তাকে করতে হবে তাতে চীনের সহায়তার প্রয়োজন হবে অনেক বেশি। পাশ্চাত্য এখনো নির্বাচন এবং সরকারকে সেভাবে স্বীকৃতি না দেয়ায় অর্থনৈতিক বিরোধ বা বিধিনিষেধের সম্ভাবনা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। নিউ ইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট বা সিএনএনে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এ ধরনের ইঙ্গিতই পাওয়া যায়। এই অবস্থার মোকাবেলার জন্য ভারত তার আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক দিয়ে সহায়তা করতে পারবে; কিন্তু আর্থিক সহায়তার ব্যাপারে দিল্লির করার খুব বেশি কিছু নেই।

নতুন সরকার গঠনের পর চীন ও ভারত উভয়েই তার তাৎক্ষণিক এজেন্ডাগুলো পূরণে পদক্ষেপ চাইতে পারে। প্রাপ্ত তথ্য অনুসারে, নির্বাচনের আগে নিকট প্রতিবেশী দেশকে যেসব আশ্বাস দেয়া হয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর। অন্য দিকে, চীন এই চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে তার আপত্তির কথা জানিয়েছে। বাংলাদেশের নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের যে যৌথ পরামর্শক কমিশনের (জেসিবি) বৈঠক রয়েছে তার আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক আলোচনার এজেন্ডার শীর্ষে রয়েছে এটি। এ ছাড়া বাংলাদেশের নৌপথ নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য দিল্লি শিগগিরই চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর ব্যবহার শুরু করতে চায়। এ ছাড়া চিকেন নেকের অদূরে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতি সৃষ্টি করতে চায় ভারত। এর সব ক’টি বিষয়েই রয়েছে বেইজিংয়ের আপত্তি।

বাংলাদেশের ওপর দিয়ে কানেকটিভিটি বা ট্রানজিট ইস্যুতে বেইজিংয়ের অনাপত্তি ছিল এই নেটওয়ার্কের বিসিআইএম করিডোরের সাথে সংযুক্তির শর্তে। ভারত বিসিআইএম’র ব্যাপারে একেবারেই শীতল। ভারতের ওপর দিয়ে এশিয়ান হাইওয়ের অনুমোদিত মূল পথে এ নেটওয়ার্ক তৈরিতে দিল্লি বিলম্ব করতে চাইলে চীন ঢাকা-কক্সবাজার-সিটওয়ের বিকল্প পথে ইউনান পর্যন্ত হাইওয়ে বিস্তৃত করতে চায়। এ বিষয়ে রয়েছে দিল্লির আপত্তি। এর বাইরে ২৪ বিলিয়ন ডলারের যে চীনা সহায়তাপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন ও প্রস্তাবপর্যায়ে রয়েছে তার অনেকগুলোর ব্যাপারে ভারতের আপত্তি রয়েছে।

দিল্লির নীতি প্রণেতাদের ধারণা, নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির ব্যাপারে পশ্চিমা চাপ যত বাড়বে শেখ হাসিনার সরকার ততই বেইজিংয়ের সমর্থন ও অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। বিশেষত আর্থিক খাতে একটি বড় ধরনের সঙ্কট দেখা দিতে পারে বলে তাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ ধরনের সঙ্কটে চীনা বিনিয়োগের ওপর আরো অধিকভাবে নির্ভর করতে হবে ঢাকাকে। এর মধ্যে ঢাকার শেয়ারবাজারে কৌশলগত বিনিয়োগ অংশীদার হিসেবে চীনা কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। চীনের বেশ কিছু কারখানা বাংলাদেশের শিল্পাঞ্চলে স্থানান্তর করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া বৃহৎ আকারের চীনা সহায়তা প্রকল্পের সাথে তাদের কৌশলগত কোনো-না-কোনো কম্পোনেন্ট থাকে বলে দিল্লির সন্দেহ রয়েছে।

দিল্লির সবচেয়ে বড় ভয় হলো বেইজিংয়ের ঋণফাঁদে আটকে ঢাকাকে চীন বিশেষ বন্ধনে আবদ্ধ করে ফেলে কিনা। শ্রীলঙ্কায় এই অবস্থা সৃষ্টির কারণে ভারত প্রভাব খাটিয়ে কলম্বোতে সরকার পরিবর্তন ও নিজস্ব আস্থাভাজনকে সরকারপ্রধান করার পরও চীনা প্রভাব থেকে দেশটিকে বের করে আনতে পারেনি। চীন যেভাবে বাংলাদেশে আগ্রাসী বিনিয়োগ করছে তাতে এই অবস্থা থেকে খুব বেশি সময় না-ও লাগতে পারে।

মিয়ানমারের অভিজ্ঞতাকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিন্তা করেও ভারত বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ছে। মিয়ানমারে দশকের পর দশক ধরে চীনা বিনিয়োগ এমন স্তরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে যে অং সান সু চি’র মতো পাশ্চাত্যের পুত্রবধূকে ক্ষমতায় বসানোর পরও দেশটিকে চীনা প্রভাব থেকে তারা এতটুকু মুক্ত করতে পারেনি।

দিল্লির সামনে ডিলেমা
বাংলাদেশের নতুন পরিস্থিতিতে দিল্লির সামনে এক অদ্ভুত ডিলেমা বা দ্বিমুখী সঙ্কট হাজির হয়েছে। চীন-রাশিয়ার সাথে দিল্লি এক কাতারে চলে যাওয়ায় ৯৭ শতাংশের বেশি আসনে জয় তৈরির মতো নির্বাচনী ফলাফল শেখ হাসিনার সরকার যেভাবে হোক অর্জন করতে পেরেছে। এখন দিল্লি সহায়ক ভূমিকা অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশের সরকার দীর্ঘ সময়ের জন্য টিকে যেতে পারে; কিন্তু এ সরকারের ওপর দিল্লির নিয়ন্ত্রণ ক্রমেই শিথিল হয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্য দিকে, আরেকটি মুক্ত, অবাধ ও কার্যকর অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেয়ার জন্য যে এজেন্ডা পাশ্চাত্য সামনে নিয়ে এসেছে, তা কার্যকর হলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের দৃশ্যপট এখানে থাকবে না। তবে এ ক্ষেত্রে পাশ্চাত্য তথা অমেরিকান প্রভাব বাড়বে। আর পাশ্চাত্যের লাইনে ভারত অবস্থান নিলে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন দ্রুততম সময়ে অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে। ভারতীয় এস্টাবলিশমেন্টের জন্য ১০ বছরের ধারাবাহিকতা থেকে বেরিয়ে ভিন্নমুখী হওয়া একেবারেই সহজ কোনো সিদ্ধান্ত নয়। আবার একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আয়োজনে সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষক হওয়ার ভূমিকা ভারতের জন্য পররাষ্ট্র সম্পর্কে কম-বেশি বেদনাদায়কও বটে। এমনকি এর প্রভাব ভারতের আগামী মে মাসের নির্বাচনে পড়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

এখন কী হবে?
প্রশ্ন হলো, এখন কী হবে? ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘ঢাকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুই এশিয়ান অংশীদার ভারত ও চীন আওয়ামী লীগের অতিরঞ্জিত ম্যান্ডেটকে মেনে নিয়েছে। বিএনপিকে বিশ্বাস করে না ভারত। রাজনৈতিক সংঘাত নিজের সীমান্তে ছড়িয়ে পড়ার আগে পর্যন্ত মোদি সরকার চীনের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে চাইবে না। আর গণতান্ত্রিক বিষয়াদির তেমন পরোয়া করে না বেইজিং। ফলে বিষয়টি রয়ে গেল কেবল পাশ্চাত্যের হাতে। ২০১৫ সালের মাঝামাঝি সময়ে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের সামাল দিয়ে শেখ হাসিনা আন্তর্জাতিক প্রশংসা কুড়িয়েছেন। নির্বাচনের পর তার সেই সুনাম অনেকাংশেই ক্ষুণœ হয়েছে। নির্বাচনে কারচুপির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশেষ করে ইইউ অর্থনৈতিক কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে কি না তা দেখার বিষয়। বিশেষ করে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যে বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প ও প্রবৃদ্ধিতে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। এমনটি হবে কি না তা একটি প্রশ্ন।’

সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভাগ্য যেন বাইরের শক্তির টানাপড়েন ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ক্রীড়াক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পাশ্চাত্য তাদের বাজার ও অর্থনৈতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল একটি দেশকে চীন-রাশিয়ার বলয়ে একীভূত হয়ে যেতে দেখে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠলে খেলার এই মাঠে রক্তক্ষয়ী সংঘাত সৃষ্টি হতে পারে, যার স্প্তু আভাস নিউ ইয়র্ক টাইমসসহ পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেয়া হচ্ছে।
[email protected]


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum