১৮ জুন ২০১৯

এক চমকের পর আরেক চমক

-

এবার বহুপ্রত্যাশিত সংসদ নির্বাচনে নানা ধরনের চমকের পর সরকার গঠন নিয়েও কম চমক দেখা যায়নি। অবশ্য বিরোধী দলসহ জনগণের বেশির ভাগই মনে করে, নির্বাচনকেন্দ্রিক চমকের সাথে অনেক ক্ষেত্রে একপ্রকার ধমকের সংমিশ্রণ ছিল। একই দলের হলেও নতুন সরকার গঠনের পর সবে যাত্রা শুরু। তাই এখনই চূড়ান্ত অভিমত দেয়া সমীচীন নয়। আমরা শুধু আশা করব, এমন একটি সরকার জাতি পাবে, যারা চমক কিংবা ধমকের প্রতি আসক্ত হবেন না; বরং নিজেদের দল এবং সেই দলের নেতৃত্বাধীন বিগত সরকারের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে দেশ ও জাতির প্রতি যথাযথ কর্তব্যকর্মের পরিচয় দেবেন। মনে রাখা দরকার, যে চমক জনগণের কোনো কাজে আসে না, তা অর্থহীন। আর যে ধমকের শিকার হয় সৎ-নিরীহ-আইন মেনে চলা মানুষ; তা সুশাসন ও গণতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।

সংসদ নির্বাচন কেমন হলো, কতটা গণতন্ত্রসম্মত ছিল, দেশপ্রেমিক নাগরিকদের প্রত্যাশা তা কতখানি পূরণ করতে পেরেছে; সবার কাছে এসব স্পষ্ট। যারা বলছেন, এ নির্বাচন মোটেও গণতান্ত্রিক, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি এবং এটা ছিল সম্পূর্ণরূপে কারচুপি ও সন্ত্রাসের ওপর নির্ভরশীল; নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে তিক্ত ক্ষোভের সাথে ও হতাশ হয়ে এসব বলছেন। আর যারা এর বিপরীতে দৃশ্যত উল্লসিত হয়ে বলছেন, এর চেয়ে চমৎকার নির্বাচন আর হয় না, এটা সুপারফাইন ইলেকশন- তারা সব কিছু জেনে বুঝেই নিজেদের দল ও নেতৃত্বের সাথে একাত্ম হচ্ছেন। যে দলের সমর্থক কিংবা যে পক্ষের লোক হোন না কেন, কেউ বিবেককে ফাঁকি দিতে পারবেন না। চূড়ান্ত ন্যায় ও সত্যের আদালতে একদিন প্রত্যেককে হাজিরা দিতে হবেই।

গণতন্ত্রের সূচকে আমাদের দেশ কয়েক ধাপ এগিয়েছে। এটা সুসংবাদ নিঃসন্দেহে। কিন্তু এতে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের যা কিছু অন্ধকার দিক, তা আলোকিত হয়ে যাবে না। পরের মুখে নিজের প্রশংসা শুনতে সবার ভালো লাগে। তবে চরম সত্য হলো, নিজেরাই সবচেয়ে ভালো জানি- আমরা কতটা গণতন্ত্রমনা আর সত্যবাদী। তাই সমালোচনার দরুন লন্ডনের যে ‘ইকোনমিস্ট’ ম্যাগাজিন কিছু দিন আগেও ছিল ‘চোখের বালি’, এতে এখন অনুকূল মন্তব্য দেখা গেলে একই ম্যাগাজিনকে ‘চোখের মণি’ মনে করলে জনমনে প্রশ্ন দেখা দেবেই।

‘এবারের সংসদ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়েছে; সুষ্ঠু হওয়ার সাথে এর সম্পর্ক নেই। আমরা অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন উপহার দিয়েছি, যা একটি প্রাথমিক প্রাপ্তি। আসল কথা হচ্ছে, নির্বাচনটা গ্রহণীয় ও বিশ্বাসযোগ্য কি না। অন্যথায়, তা অংশগ্রহণমূলক হলেও লাভ নেই।’ কথাগুলো বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বহুলালোচিত ভিন্নমত পোষণকারী সদস্য, মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব তালুকদারের। রম্যলেখক, ছড়াকার ও কলামিস্ট মাহবুব তালুকদার নির্বাচনের ৯ দিন পর ওপরের কথা ক’টির পুনরাবৃত্তি করে জানান, এ বিষয়ে তার আগের অবস্থানই বজায় রয়েছে। ৩ জানুয়ারি তিনি মিডিয়ার প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘বিবেককে প্রশ্ন করুন। তাহলে জানতে পারবেন, কেমন নির্বাচন হয়েছে।’

আসলে দলের সংখ্যা আর ভোটার উপস্থিতির দিক দিয়ে নির্বাচন অংশ্যগ্রহণমূলক হলেও সুষ্ঠু হওয়ার গ্যারান্টি নেই, এটা আগে থেকে ধারণা করেনি বিরোধী দল। তবে নির্বাচনের আগেই পত্রপত্রিকায় আশঙ্কা করা হয়েছিল, ‘এবার নির্বাচন দৃশ্যত শান্তিপূর্ণ হলেও অবাধ না-ও হতে পারে।’ বাস্তবে এই দুটো ধারণাই সত্য হয়েছে। আগের সংসদ নির্বাচন (২০১৪ সালের) বর্জন করেছিল দেশের প্রধান বিরোধীদলীয় জোটসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল। সে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক ছিল না; তা ছিল নিরেট প্রহসন। বিশেষত তখন থেকে বিরোধী দল ‘অংশগ্রহণমূলক’ (ওহপষঁংরাব) নির্বাচনের জোর দাবি জানিয়ে আসছে। এটা স্পষ্ট, তারা ‘অংশগ্রহণমূলক’ বলতে মূলত সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনকেই বুঝিয়েছেন, যে নির্বাচনে দেশের প্রায় সব দলই এবং অবাধে ভোটাররা অংশ নেবেন। কিন্তু তাদের দাবি ‘বাস্তবায়নের মাধ্যমে’ তাদের জব্দ করা হয়েছে। তবে এর মধ্য দিয়ে রাজনীতির অর্থ- ‘নীতির রাজা’র বদলে এক ধরনের নীতিহীনতায় হয়েছে পর্যবসিত।

যা হোক, চমকের নতুন মন্ত্রিসভার ব্যাপারে প্রতিদিন পত্রিকায় নানা ধরনের খবর থাকছে। এই মন্ত্রীদের কে কী বলছেন দায়িত্ব পাওয়ার পর, সেদিকে মনোযোগ সবার। নওগাঁর সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সাধন মজুমদার এখন খাদ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, ৪২ বছর ধরে আমি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে জড়িত। তবে খাদ্যব্যবসায়ী নই। এটি একটি বড় মন্ত্রণালয়। খাদ্যের দাম দুই টাকা বাড়লে, কমলেও দোষ হয়। ‘কৃষকের সন্তান’ হিসেবে তিনি নিজের পরিচয় দিয়েছেন। তিনি খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাথে কিভাবে দীর্ঘ দিন জড়িত, তা জানা যায়নি। এ দিকে, খাদ্যের ব্যাপারে নবনিযুক্ত কৃষিমন্ত্রী আবদুর রাজ্জাক বলেছেন, খাদ্যের পুষ্টিমান বাড়ানো এবং ভেজাল রোধ করা আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জ। আরেক চ্যালেঞ্জ হলো, কৃষিকে বাণিজ্যিক ও লাভজনক করা।

সরকারসমর্থক বুদ্ধিজীবীদের অনেকে বলছেন, আওয়ামী লীগের সদ্যবিগত সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ ছিল দারিদ্র্যমোচন। এবার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, দুর্নীতি রোধ করা। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি মন্ত্রীদের কঠোর নজরদারিতে রাখার কথা ঘোষণা করেছেন। তাদের কেউ যাতে কোনো কৌশলে দুর্নীতি না করেন, তা নিশ্চিত করাই জনগণের প্রত্যাশা। অতীতে ক্ষমতার অপব্যবহার করে অনেক নেতাই দুর্নীতির বলে জিরো থেকে ‘হিরো’ হয়েছেন বা হতে চেয়েছেন। সরকারের কিছু মন্ত্রণালয়, দফতর বা সংস্থায় বেলাগাম ও বেপরোয়া দুর্নীতি চলে আসছে বহুদিন ধরে। কাস্টমস, পুলিশ, বিআরটিএ, সওজ, শিক্ষা বিভাগ প্রভৃতি দফতরে দুর্নীতির দৌরাত্ম্য সম্পর্কে সবার জানা। পিডব্লিউডি এবং ভূমি প্রশাসনের অফিসগুলোতে দুর্নীতি চরমে, তা কারো অজানা নয়। হয়তো সংশ্লিষ্ট দফতরের মন্ত্রীদের অনেকে দুর্নীতি বন্ধ করার চেষ্টা করেছেন। তবে সত্য হলো, এই মন্ত্রীরা এক সময় বিদায় নিলেও দুর্নীতি সব সময় থেকে যায়।

এবার গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী হয়েছেন টিভির টকশোর পরিচিত মুখ শ ম রেজাউল করিম। আওয়ামী আইনজীবীদের এই নেতা নিজ মন্ত্রণালয়ে পরিচিতি অনুষ্ঠানে বলেছেন, ‘দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে তা হবে আইনের মধ্যে থেকেই।’ রেজাউল করিম নতুন মন্ত্রী হয়ে আরো বলেছেন, ‘আমার টিম লিডার প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতি করেন না এবং তা পছন্দও করেন না।’ মন্ত্রী স্বীকার করেন, এই মন্ত্রণালয়ের বিরুদ্ধে জনগণের অভিযোগ আছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘আমরা আরো স্বচ্ছ কেন হতে পারলাম না?’ গণমাধ্যমকে ‘নির্ভেজাল বন্ধু’ হিসেবে পাওয়ার আশা রেখে তিনি বলেন, ‘গণমাধ্যমের সমালোচনা থেকে আমরা শুধরে নেবো।’ তবে জানিয়ে দিলেন, ‘সংবাদ প্রকাশের আগে এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে মন্ত্রণালয়ের সাথে যেন কথা বলে নেয়া হয়।’

বাস্তবতা হলো, দুর্নীতিবাজরা সব সময় প্রমাণ রেখে দুর্নীতি করে না কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্নীতি করলে তার পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া কিংবা অভিযোগ করা সহজ হয় না। মিডিয়ায় সব দুর্নীতির খবর দেয়া সম্ভব নয়। তাই এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ অথবা মিডিয়ার খবরের জন্য অপেক্ষা না করে মন্ত্রণালয়ের শীর্ষপর্যায় থেকে দুর্নীতিসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করা এবং এ বিষয়ে অবিলম্বে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া উচিত। একই কথা দুর্নীতিপ্রবণ আরেক দফতর, ভূমি মন্ত্রণালয়ের বেলায়ও প্রযোজ্য। ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী বলেছেন, “ব্যর্থতার দায় নিয়ে মন্ত্রণালয় ছাড়ব না। দুর্নীতির ক্ষেত্রে কাজ করব ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে। যারা দুর্নীতি করছেন, সাবধান হয়ে যান। সবাইকে সততার সাথে কাজ করতে হবে। আমরা টপ টেনের মধ্যে থাকতে চাই। তবে আমার স্বপ্ন ‘টপ ফাইভ’।” উল্লেখ্য, এই পুরো মন্ত্রী গতবার প্রতিমন্ত্রী ছিলেন একই মন্ত্রণালয়ে। এ দিকে, আজো সেখানে ব্যাপক দুর্নীতি যেন ওপেন সিক্রেট।

এরশাদ আমলে ঢাকার মনোনীত মেয়রদের একজন কর্নেল (অব:) মালেক। তার ছেলে জাহিদ মালেক স্বপন এবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছেন। গত মন্ত্রিসভায় ছিলেন একই মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। তিনি বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন স্বাস্থ্য খাতের বিষয়ে। কথা হলো, এর আগে একনাগাড়ে দীর্ঘ এক দশক সর্বময় ক্ষমতা ভোগ করেও কেন তাদের দলটির পরিচালিত সরকার এসব পদক্ষেপ নেয়নি? নাকি, পাঁচ বছর পর একই ওয়াদার পুনরাবৃত্তি হবে? শিক্ষামন্ত্রী হয়েছেন ডাকনামে পরিচিত ‘দীপু মনি’। ডাক্তারি ও জনস্বাস্থ্যের ওপর ডিগ্রিধারী এই নেত্রী পয়লা দফায় ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এবার শিক্ষামন্ত্রী। তিনি নির্বাচনী ইশতেহার পূরণের ওয়াদা করেছেন। মনে রাখতে হবে, কেবল নতুন পাঠ্যবই দেয়া নয়, প্রশ্নফাঁস ও নকলবাজি বন্ধ করা এবং শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের অবসান ঘটানো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, ‘গণমাধ্যমের বিস্তৃতি ঘটার পাশাপাশি অনলাইনে ভুয়া পোর্টালও রয়েছে।’

আমরা তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি সাংবাদিক ও সংবাদপত্রের দায়িত্বশীলতার সাথে স্বাধীনতা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার দিকে। সবার প্রত্যাশা, ডিজিটাল যুগে কোনো কালাকানুন আর থাকবে না। আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সবার জন্য সুবিচার নিশ্চিত করার প্রয়াস চালাবেন বলে কথা দিয়েছেন। এ জন্য আইনের ফাঁক ও অপব্যবহার বন্ধ করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন বলেছেন, অগ্রাধিকারভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। সেই সাথে, মন্ত্রণালয়ে ইতঃপূর্বে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে কি না, সে ব্যাপারে তদন্ত এবং ভবিষ্যতে এগুলো রোধ করাও অপরিহার্য। প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ইমরান আহমেদ বলেছেন, ‘ন্যূনতম ব্যয়ে নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করা হবে।’ এ জন্য দালাল ও দুর্নীতিবাজের বিরুদ্ধে তাকে কঠোর হতে হবে বলে জনগণের অভিমত।

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন অভিনেতা মাহমুদ সাজ্জাদ এবং সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ম. হামিদের ভাই কে এম খালিদ এমপি। গত সরকারে সংস্কৃতি মন্ত্রী ছিলেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতা ও অভিনেতা আসাদুজ্জামান নূর। নতুন মন্ত্রী খালিদ এবার তার ‘জীবনের নতুন অধ্যায়ের সূচনা’র উল্লেখ করে বলেন, ‘প্রথমেই মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জ্ঞাপন করছি। পরিকল্পনা করে কাজ শুরু করব ইনশাআল্লাহ।’ ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের বাঙালি জাতীয়তাবাদী সংস্কৃতি বিকাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী পরম করুণাময় আল্লাহ তায়ালার প্রতি প্রকাশ্যে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করেছেন, এটা তাৎপর্যপূর্ণ। স্মর্তব্য, এক সময় তাদের পরিবারকে ‘রাজনৈতিকভাবে সৌভাগ্যবান’ বলা হতো। কারণ, তার এক ভাই ও ভাবী অতীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশের সংসদ নির্বাচন এবার কেমন হলো, তা নিয়ে ক্ষমতাসীন মহলের তৃপ্তিভরা প্রচারণা সবাই দেখছেন। যেখানে চীন-রাশিয়া-পাকিস্তান-সৌদি আরব অভিনন্দন জানায়, সেখানে তাদের কেবল স্বস্তি নয়; আনন্দবোধ করা স্বাভাবিক। অবশ্য এটা সচেতন মানুষের অজানা নয়, এ যুগের দুনিয়ায় আন্তঃরাষ্ট্র সম্পর্কের ক্ষেত্রে আদর্শের প্রাধান্য আর নেই। প্রধানত অর্থনৈতিক স্বার্থসহ রকমারি সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির সম্ভাবনাসমেত বিভিন্ন হিসাব-নিকাশ ও সমীকরণ বিবেচনা করা হয় এ ক্ষেত্রে।

বর্তমানে যারা ঢাকায় ক্ষমতায় আছেন, তারা ঐতিহ্যবাহী ‘ভারতবান্ধব’ হিসেবে পরিচিত। সেই ভারতের বংশোদ্ভূত বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর সুমিত গাঙ্গুলি গত ৭ জানুয়ারি আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা ‘ফরেন পলিসি’ সাময়িকীতে নিবন্ধ লিখেছেন। শিরোনাম- বাংলাদেশ ইলেকশন্স : দ্য ওয়ার্ল্ড শুড বি ওয়াচিং দ্য ডিবেকল (বাংলাদেশের নির্বাচন : বিশ্ব এই বিপর্যয় সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত)।

ইন্ডিয়ানা ভার্সিটির ভারতীয় সভ্যতা-সংস্কৃতিবিষয়ক ‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর চেয়ারে’ অধিষ্ঠিত ওই অধ্যাপক বলেছেন, ‘৩০ ডিসেম্বর বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই দেশী ও বিদেশী বিশ্লেষকদের একটি দল উল্লেখ করেছেন, এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হওয়া থেকে অনেক দূরে। তাদের এমন সন্দেহ করাটা যুক্তিসঙ্গত। অন্তত ১৭ জন মারা গেছেন নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সহিংসতায়, যাতে অনেকেই হয়েছেন আহত; ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ ব্যাপক। আওয়ামী লীগ নির্বাচনী অসদাচরণের অভিযোগগুলো নাকচ করে দিয়ে বলেছে, ‘এ জন্য বিরোধী দলকেই পুরো দায়ী করতে হয়।’

‘প্রধান’ ও ‘মুখ্য’ মন্ত্রীর পার্থক্য
গত শুক্রবার ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেশী দেশের একজন সংবাদপত্র সম্পাদক উচ্ছ্বাসভরে লিখেছেন, ‘উনিশে প্রতিবেশী দুই দেশে প্রধানমন্ত্রী দুই বাঙালি।’ এই শিরোনাম দেখে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। কারণ, বাংলাদেশের সরকারপ্রধান নিঃসন্দেহে বাঙালি হলেও পড়শি কোনো রাষ্ট্রে তো বাংলাভাষী বা বাঙালি সন্তান কেউ প্রধানমন্ত্রী নন। পাশের ভারত রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি একজন গুজরাটি। কে না জানে, গুজরাট অঞ্চল বাংলাদেশ থেকে বহু দূরে, পশ্চিম ভারতে অবস্থিত। এ দেশের আরেক প্রতিবেশী মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী বাঙালি হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

আসলে, ভারতীয় এই কলামিস্ট ‘বাঙালি প্রধানমন্ত্রী’ বলতে মমতা ব্যানার্জিকে বুঝিয়েছেন। কিন্তু তিনি তো প্রতিবেশী দেশের একটি প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী মাত্র; তিনি তার দেশের সরকারপ্রধান নন। এটা অনস্বীকার্য, ভারত আর বাংলাদেশ স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্ররূপে সমমর্যাদার অধিকারী। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রদেশ বা ‘রাজ্য’ পশ্চিমবঙ্গ সে রাষ্ট্রের অনেকগুলো প্রদেশের একটি। পশ্চিমবঙ্গের সার্বভৌমত্ব নেই, যেমন আছে বাংলাদেশের। তদুপরি ওই কলামিস্ট মমতাকে উল্লেখ করেছেন ‘বাংলার মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে। কিন্তু ‘বাংলা’ নামে কোনো প্রদেশ নেই ভারতে। বরং এ নামটি রাখার সাম্প্রতিক প্রস্তাব দিল্লি কেন্দ্রীয় সরকার বাতিল করে দিয়েছে। প্রসঙ্গক্রমে স্মর্তব্য, শেখ হাসিনার প্রথম শাসনকালে তাকে পশ্চিমবঙ্গে সংবর্ধনা ও পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। দুঃখের বিষয়, সে অনুষ্ঠানে তাকে উল্লেখ করা হয় ‘মুখ্যমন্ত্রী’ হিসেবে। অথচ তিনি একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী নন।


আরো সংবাদ