১৪ অক্টোবর ২০১৯

থ্যাংকস গিভিং ও বিশেষ ভোজ

-

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের নতুন সরকার যাত্রা শুরু করেছে। ৭ জানুয়ারি ৪৭ সদস্যের নতুন মন্ত্রিসভা শপথ গ্রহণ করে। মন্ত্রিসভা গঠনের আগে বড় ধরনের চমকের কথা শোনা গিয়েছিল। সেই ‘চমক’ এসেছে। কারণ নতুন এই মন্ত্রিসভায় আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা আমির হোসেন আমু, তোফায়েল আহমেদ ও মতিয়া চৌধুরীর মতো ব্যক্তিরা জায়গা পাননি। তেমনি ঠাঁই হয়নি রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু ও আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর মতো শরিক দলের সিনিয়র নেতাদের। বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিদায়ী মন্ত্রিসভার ৩৬ জনই এবার বাদ পড়েছেন। একেবারে নতুন করে মন্ত্রিসভায় এসেছেন ৩১ জন। এতে নতুন মুখ অর্থাৎ তরুণদের সংখ্যাই বেশি।

মন্ত্রিসভা গঠনের আগে গত ৩ জানুয়ারি একাদশ সংসদের সদস্য হিসেবে মহাজোটের বিজয়ীরা শপথ গ্রহণ করেন। শপথ গ্রহণের পর সংসদ ভবনে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা। সভায় মুখর করতালির মধ্য দিয়ে তাকে সর্বসম্মতভাবে সংসদীয় দলের নেতা নির্বাচন করা হয়। তখন শেখ হাসিনা দলের সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, ‘এবারই শেষ। আপনারা ভবিষ্যতের জন্য অন্য কাউকে খোঁজেন।’ এ সময় সংসদ সদস্যরা সমস্বরে বলতে থাকেন, ‘আমরা আপনাকেই চাই। আপনি আজীবন থাকবেন।’ অর্থাৎ জনগণকে এ বার্তাই দেয়া হয়েছে যে, শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগ আজীবনই ক্ষমতায় থাকতে পারবে। পাঁচ বছর পর পর নির্বাচন হবে ঠিকই, তবে সেই নির্বাচন হবে বিশেষ মডেলে। সেখানে তারা ছাড়া অন্য কেউ জিততে পারবেন না।

নির্বাচনী ব্যবস্থায় এমন মডেল দাঁড় করানো হয়েছে, যেখানে হারার কোনো সুযোগ নেই। হয়তো সেটা ৩০ ডিসেম্বর ২০১৮ মডেল কিংবা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মডেল অথবা ১৯৭৩ সালের নির্বাচনী মডেল। দেশের জনগণ তথা ভোটাররা ভোট দিতে এলেন কি এলেন না, ভোট দিলেন কি দিলেন না- সেটা বড় কথা নয়। ক্ষমতায় থেকে এবং সংসদ বাতিল না করেই নির্বাচন করা হবে। সেই নির্বাচনে ভোট দেয়া হয়ে যাবে ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ। আর দল হিসেবে আওয়ামী লীগের হয়ে যাবে নিরঙ্কুশ কিংবা ভূমিধস বিজয়। স্পন্সর পর্যবেক্ষক এসে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে সার্টিফিকেটও দেবেন!

একাদশ সংসদের সদস্যরা বলেছেন, তারা শেখ হাসিনাকে আজীবন ক্ষমতায় দেখতে চান। তিনি কি তাদের এ চাওয়া উপেক্ষা করতে পারেন? নিশ্চয়ই না। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ হেরে গেলে তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। নেতাকর্মীরা দলে দলে তার ধানমন্ডির বাসায় গিয়ে ধরনা দিলে তিনি পদত্যাগপত্র প্রত্যাহার করেন। কারণ তিনি নিজ দলের নেতাকর্মীদের কথা ফেলতে পারেন না! তেমনি ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর সংসদে শেখ হাসিনা ঘোষণা করেছিলেন, ৫৭ বছর বয়সে তিনি রাজনীতি থেকে ‘অবসর’ নেবেন। নেতাকর্মীরা সেবারও তাকে ছাড়েননি। তাই তিনি রাজনীতি থেকে অবসর নিতে পারলেন না। এ ক্ষেত্রে তার কোনো দোষ নেই। নেতাকর্মীরা তাকে ছাড়েন না, তিনি কী করবেন? শেখ হাসিনা আবারো বলেছেন, ‘এবারই শেষ’; অর্থাৎ আর ক্ষমতায় থাকবেন না। কিন্তু এ কথা বললেই কি হলো? নেতাকর্মীরা কি তাকে ছাড়বেন? ‘এবারই শেষ’ বলতেই নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা বলতে থাকেন- শেখ হাসিনাকে ‘আজীবন’ ক্ষমতায় থাকতে হবে!

২০০৮ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলসহ সংবিধান সংশোধন করে এমন সব মডেল বা ব্যবস্থা দাঁড় করানো হয়, যার ফলে ক্ষমতা হারানোর আর কোনো উপায় নেই। সে ব্যবস্থারই ফল ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন এবং ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন চিহ্নিত হয়ে আছে বিনা ভোটের ভুয়া নির্বাচন হিসেবে। ভোটহীন, ভোটারহীন এবং একতরফা প্রার্থীর ওই নির্বাচনে ভোটের আগেই ১৫৪ জনকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত বলে ঘোষণা করা হয়। সরকার গঠনের জন্য ১৫৪ জনই যথেষ্ট। বাকি ১৪৬টি আসনে নির্বাচন হলেও পাঁচ শতাংশের বেশি ভোট পড়েনি। ১৯৭৩ সালের নির্বাচনেও সাতটি আসন ছাড়া সব আসনে আওয়ামী লীগকে বিজয়ী করা হয়েছিল। কুমিল্লার দাউদকান্দিতে ইঞ্জিনিয়ার রশীদ বিজয়ী হলেও বিজয়ী ঘোষণা করা হয় খন্দকার মোশতাককে। অনেকের মতে, ১৯৭৩-এর নির্বাচন এবং ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির কলঙ্কিত নির্বাচনকেও হার মানিয়েছে এবারের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনী মডেল।

দেশের জনগণ তথা ভোটাররা আশা করেছিলেন, অন্তত ১০ বছর পর হলেও এবার তারা ভোট দিতে পারবেন। কারণ এ নির্বাচনে সব দল অংশ নিয়েছে। নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক। কিন্তু চরম দুর্ভাগ্য জনগণের। তাই ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনেও তারা ভোট দিতে পারেননি। এবার আড়াই কোটি তরুণ ভোটার প্রথমবারের মতো ভোট দেয়ার জন্য দারুণ উৎসাহ নিয়ে প্রতীক্ষা করেছিলেন। তারাও চরমভাবে বঞ্চিত হলেন। অদৃশ্য শক্তি তাদের ভোট দেয়ার স্বপ্ন গুঁড়িয়ে দিয়েছে।

দেশজুড়ে প্রায় ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রে ভোটাভুটি শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট বাক্স ‘ব্যালটে পরিপূর্ণ’ হয়ে যায়। এবার আর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের কষ্ট করতে হয়নি। নির্বাচনের আগের রাতেই ‘ভোট প্রদান’ সম্পন্ন হয়ে যায়। রাতের অন্ধকারে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা এখন ওপেন সিক্রেট বিষয়। স্বয়ং রাষ্ট্রযন্ত্র এই প্রহসনে অংশ নেয়। রক্ষক হয়ে গেল ভক্ষক। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত একটি নির্দেশনাই বাস্তবায়িত হয়েছে। সেটি হচ্ছে- ভোটের আগেই রাতের আঁধারে ব্যালট দিয়ে বাক্স ভরা। অভিযোগ উঠেছে, পুলিশ ও প্রশাসন মিলে আগের রাতে ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ব্যালট কেটে ‘বাক্স পরিপূর্ণ’ করেছে।

আর ভোটের দিন প্রতিটি কেন্দ্রে ক্যাডাররা এমনভাবে অবস্থান নেয়, যার ফলে সাধারণ ভোটার ভোট দেয়ার সাহস দেখাতে পারেনি। কিছু ভোটার ভোট দিতে গেলেও ক্যাডাররা তাদের অনেককে ফিরিয়ে দেয়। বিএনপি কিংবা ঐক্যফ্রন্টের কোনো এজেন্টকে কেন্দ্রের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি। কোথাও কোথাও কিছু এজেন্ট কেন্দ্রে ঢুকলেও খবর পাওয়া মাত্রই আওয়ামী লীগের ক্যাডাররা সেখানে গিয়ে তাদের মারধর করে বের করে দেয়। আরো লক্ষ করা গেছে, কোনো কেন্দ্রে সাংবাদিক কিংবা পর্যবেক্ষকরা গেলে তৎক্ষণাৎ আওয়ামী লীগ কর্মীরা কেন্দ্রে লাইন করে দাঁড়িয়ে গেছেন। সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের ভোটের লাইন দেখাতে এভাবেই ‘নকল ভোটারের লাইন’ সাজানো হয়েছে।

নির্বাচনী মডেল ৩০ ডিসেম্বর
৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনী মডেলটি ছিল অভিনব। এই মডেল ৫ জানুয়ারি ২০১৪ এবং ১৯৭৩-এর নির্বাচনী মডেলকেও হার মানিয়েছে। এর লক্ষ্য ছিল সব দল নির্বাচনে অংশ নেবে। কিন্তু ভোট পাবেন নৌকা ও লাঙ্গলের প্রার্থীরা। ভোটের ব্যবধানও হবে ‘আকাশ-পাতাল’। এই মডেল বাস্তবায়ন করতে গিয়ে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় দল বিএনপিকে মাঠে দাঁড়াতেই দেয়া হয়নি। দাঁড়াতে দেয়া হয়নি বিএনপির ঘনিষ্ঠ ঐক্যফ্রন্ট এবং ২০ দলীয় জোটের ধানের শীষের প্রার্থী ও কর্মী-সমর্থকদের। কয়েক মাস আগে থেকেই দেশব্যাপী বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে গায়েবি ও নাশকতার মামলা দিয়ে তাদের এলাকা ছাড়া করা হয়। নির্বাচনে বিএনপি যাতে এজেন্ট দিতে না পারে, তা নিশ্চিত করা হয় মামলা হামলা ও অভিযান চালিয়ে। সামান্য অজুহাতে বিএনপি প্রার্থীদের প্রার্থিতা বাতিল করা হলো। ধানের শীষের ১৬ জন প্রার্থীকে গ্রেফতার করা হয়। ২৭ জন প্রার্থীকে মেরে হাড়গোড় ভেঙে দেয়া হয়। উচ্চ আদালতের মাধ্যমে ১৩টি নির্বাচনী আসনে ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থিতা শূন্য করে দেয়া হয়েছিল। নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি করার ফলে বেশ কিছু আসনে ধানের শীষের প্রার্থী ছিলেন না। বেশির ভাগ কেন্দ্রেই ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীর এজেন্ট ছিলেন না। কোথাও এজেন্ট গেলেও মারধর করে তাদের বের করে দেয়া হয়।

ধানের শীষের প্রার্থীদের প্রচারও করতে দেয়া হয়নি। প্রেসগুলোতে ধানের শীষের প্রার্থীর পোস্টার ছাপাতে নিষেধ করে দেয়া হয়। কোন প্রেসে পোস্টার ছাপা হচ্ছে, জানাজানি হয়ে গেলে সেখানে গিয়ে তা বন্ধ করে দেয়া হয়। প্রার্থীদের বাসা কিংবা অফিসে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। লিফলেট বিতরণ করতে কিংবা জনসংযোগে বেরোলে হামলা চালানো হয়। ভোটের দিনেও প্রার্থীদের নামতে দেয়া হয়নি। বেশির ভাগ প্রার্থী নিজের ভোটটিও দিতে পারেননি। সিলেট-২ আসনে গুম হওয়া বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহমিনা রুশদী স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চাকরি থেকে তিন বছর আগে কেন পদত্যাগ করেননি, সে জন্য তার মনোনয়ন বাতিল করা হয়। অথচ একই আসনে এনামুল হক সরকার সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হওয়া সত্ত্বেও তার মনোনয়ন বৈধ করা হয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে সংলাপে ঐক্যফ্রন্ট সাত দফা দাবি দিয়েছিল। এর একটি দাবিও মানা হয়নি। প্রধানমন্ত্রী আশ্বাস দিয়েছিলেন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে। তিনি বলেন তার ওপর আস্থা রাখতে। কোনো দাবি না মানা সত্ত্বেও বিএনপি নেতৃতাধীন ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট নির্বাচনে গেছে। মামলা, হামলা, গ্রেফতার এবং ভয়ভীতি প্রদর্শন সত্ত্বেও ধানের শীষের প্রার্থীরা মাটি কামড়ে নির্বাচনে ছিলেন। তফসিল ঘোষণার পর থেকে বিএনপির ১০ হাজারের বেশি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। সেটাও দলটি সহ্য করেছে। কিন্তু নির্বাচন করার ন্যূনতম সুযোগও পায়নি ধানের শীষের প্রার্থীরা। ভোটের আগের রাতটি ছিল ‘কালোরাত’। ভোট হওয়ার আগেই নির্বাচন ‘সম্পন্ন’ হয়ে যায়।

ভোটের দিন এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে, যার ফলে ধানের শীষের প্রায় ১০০ জন প্রার্থী নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেন। ঐক্যফ্রন্ট আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন কেন্দ্র পাহারার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ঐক্যফ্রন্ট কর্মী-সমর্থকদের পাহারার সুযোগই দেয়া হয়নি। আওয়ামী লীগ কেন্দ্রগুলোতে এমন পাহারাই বসায় যে, সাধারণ ভোটার এবং নতুন প্রজন্মের তরুণ ভোটাররা ভোট দেয়ার কোনো সুযোগই পাননি। ভোটারদের বলা হয় তারা ‘একদিনের রাজা’। নির্বাচনের দিনে উৎসবমুখর পরিবেশে তারা তাদের অধিকার প্রয়োগ করে থাকেন। কিন্তু তাদের সেই সুযোগ ভণ্ডুল করে দেয়া হয়। তাই ভোটের উৎসবটি এবার আর হতে পারেনি।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘এটা তো নির্বাচন হয়নি, একটা প্রহসন, একটা তামাশা হয়েছে। কিভাবে শক্তি ব্যবহার করতে হয়, রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করতে হয়, টাকা ও পেশিশক্তি ব্যবহার করে একচেটিয়া এবং একতরফা নির্বাচন করতে হয় তার নমুনা ৩০ ডিসেম্বর আওয়ামী লীগ দেখিয়েছে। অতীতে কখনোই এমন নির্বাচন হয়নি। এবার পুলিশ, র‌্যাব, প্রশাসন সবাই মিলে আওয়ামী লীগের পক্ষে নির্বাচন করেছে। সেখানে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ছিলেন গৌণ, মূল কাজ করেছে পুলিশ আর র‌্যাব। একটি ইনস্টিটিউশন হিসেবে ‘নির্বাচন’ জিনিসটাকে ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। মানুষের আস্থা বলতে আর কিছু নেই।’

ড. কামাল হোসেন বলেন, স্বৈরাচারী এরশাদের আমলেও এ রকম নির্বাচন হয়নি। বিরোধীদলের এজেন্ট দূরের কথা, ভোটারদেরও কেন্দ্রে যেতে দেয়া হয়নি। স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর এটি দেখতে হবে, ভাবতেও কষ্ট হয়। নির্বাচনের আগের দিন শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চান না। সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ ভোটারদের ‘নির্ভয়ে’ ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু এসব ছিল, শুধুই কথার কথা।

নির্বাচনে সহিংসতাও কম হয়নি। ১৭ জন নিহত হয়েছে এবার। সবচেয়ে মর্মস্পর্শী ঘটনা ঘটেছে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে। ধানের শীষে ভোট দেয়ার ‘অপরাধে’ একজন সিএনজি চালকের স্ত্রীকে তুলে নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ক্যাডাররা গণধর্ষণ করেছে। ধানের শীষের সমর্থকদের বাড়িঘরে অনেক হামলার ঘটনাও ঘটেছে। নৌকার বিজয় ঘোষিত হওয়ার পর বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের চিহ্নিত করে নতুন মামলা দেয়া হচ্ছে।

ভোটের নমুনা
বিএনপি জনপ্রিয় দল। এ দলটি কয়েকবার বিজয়ী হয়ে দেশ পরিচালনা করেছে। সারা দেশে ধানের শীষের কোটি কোটি সমর্থক রয়েছেন। কিন্তু ৩০ ডিসেম্বর এমন একটি নির্বাচন হয়েছে যেখানে বিএনপির ভোট দেখানো হয়েছে মাত্র ১২-১৫ শতাংশ। বিজয়ী আসন দেখানো হয়েছে মাত্র পাঁচটি এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল আসনটি নিয়ে ছয়টি। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? অন্য দিকে ২৯৯টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়েছে ২৮৮টি আসন। আওয়ামী লীগ ২৬০টি আসনে প্রার্থী দিয়ে জয়ী হয়েছে ২৫৭টিতে। নির্বাচনে দেখানো হয় ১৯০টি আসনে ৮০ শতাংশেরও বেশি ভোট পড়েছে। ১৯টি আসনে ভোট পড়েছে ৯০ শতাংশের বেশি। এটি কেমন নির্বাচন হয়েছে, তার নমুনা গোপালগঞ্জ-৩ আসনে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী পেয়েছেন দুই লাখ ২৯ হাজার ৫৩৯ ভোট এবং তার বিপরীতে ধানের শীষের প্রার্থী পেয়েছেন মাত্র ১২৩ ভোট। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ওই আসনে অবশ্যই বিপুল ভোটে জিতবেন। তাই বলে বিএনপির ধানের শীষ মাত্র ১২৩টি ভোট পাওয়া কতটা বিশ্বাসযোগ্য? নির্বাচনে ভুল করেও তো এক-দুই হাজার ভোট পড়তে পারে। তেমনি সিরাজগঞ্জ-১ আসনে মোহাম্মদ নাসিমের প্রদত্ত ভোট দেখানো হয় তিন লাখ ২৪ হাজার ৪২৪টি। তার বিপক্ষে ধানের শীষের প্রার্থী বিশিষ্ট কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা পেয়েছেন এক হাজার একটি ভোট। এটা কি বিশ্বাসযোগ্য? ভোটের হিসাবে দেখানো হয়- ধানের শীষের ১৬১ জন প্রার্থী জামানত হারিয়েছেন। এটাও কেউ বিশ্বাস করার কথা না। নোয়াখালী-৫ আসনে ব্যারিস্টার মওদুদ মাত্র ১০ হাজার ৯৭০টি ভোট পেয়েছেন বলে দেখানো হয়েছে। এটা কি হাস্যকর নয়? তেমনি ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ড. আবদুল মঈন খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল্লাহ আল নোমান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, মীর্জা আব্বাস কি এত অল্প ভোট পাওয়া এবং জামানত হারানোর প্রার্থী? নির্বাচনের এমন ফলাফল কি জনগণ মেনে নিতে পারে?

সিইসির থ্যাংকস গিভিং
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ৩১ ডিসেম্বর সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৮০ শতাংশের বেশি ভোট পড়েছে। নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশন তৃপ্ত ও সন্তুষ্ট। নির্বাচনটি ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও উৎসবের মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।’ মানুষের কি চোখ-কান নেই। তারা কি বোকা, কিছুই দেখেননি? আসলে সরকারের হুকুম পালন ছাড়া নির্বাচনে ইসির কোনো ভূমিকা ছিল না। ঐক্যফ্রন্টের কোনো অভিযোগই তারা আমলে নেননি। সেনাবাহিনী নামানো হয়েছে ভোটের মাত্র ছয় দিন আগে। তা-ও নামকাওয়াস্তে। ধানের শীষের এজেন্ট সম্পর্কে সিইসি মন্তব্য করেছেন, তারা কেন্দ্রে না এলে আমার কী করার আছে? তার এ বক্তব্য নিজের দায়িত্বকে অস্বীকার করা ছাড়া আর কিছু নয়। ‘কর্তার ইশারায় কর্ম’ যে তিনি সম্পন্ন করতে পেরেছেন, সেটা তার আচরণেই প্রকাশ পেয়েছে।

জনতার মঞ্চের একজন বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যে এমন কর্ম করবেন তা দেশবাসী আগেই টের পেয়েছিলেন। ভোট জালিয়াতির মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে এত বড় জয় পাইয়ে দিয়ে খুশিতে এখন সাফাই গাইছেন। নির্বাচনের দু-একদিন পর নির্বাচন কমিশনে ‘থ্যাংকস গিভিং সিরিমনি’র আয়োজন করা হয়। ভূরিভোজ, পিঠা উৎসব এবং নাচ গানের আয়োজন ছিল। মানুষ জানে, থ্যাংকস গিভিং সিরিমনি খ্রিষ্টানদের একটি বার্ষিক উৎসব। ন্যায় ঢাকতেই কি এমন তৎপরতা? নির্বাচন কমিশন এবং সিইসির এই অতি উৎসাহ প্রমাণ করে তারা কার্যত ‘রাবার স্ট্যাম্প’ ছিলেন।

পুলিশের অতি উৎসাহ!
প্রবাদ আছে- ‘ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না’। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন সম্পর্কে পুলিশের সার্টিফিকেট এ প্রবাদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। আওয়ামী লীগ বলয়ের বাইরে প্রায় সব দল এবং নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, নির্বাচনে ভোট ডাকাতি হয়েছে এবং সে ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করেছে পুলিশ। বিশেষ করে থানার ওসিরা। এ অভিযোগের প্রমাণ পুলিশের অতি উৎসাহী তৎপরতা। পুলিশ ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ‘আন্তর্জাতিক’ মানের বলে উল্লেখ করেছে। দৈনিক প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচন পরিচালনার জন্য পুলিশ সদর দফতর থেকে এসপিদের চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর পরিবেশে স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক মানের হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। বলা হয়, এসপিরা তাদের ওপর অর্পিত গুরুদায়িত্ব ‘সুষ্ঠু পরিকল্পনার দ্বারা’ পালনে সক্ষম হয়েছেন। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের আওতাধীন ৫০টি থানা ও প্রতিটি ইউনিটে এ জন্য ৫ জানুয়ারি একযোগে ভোজের আয়োজন করা হয়। পুলিশ সদর দফতরে এ আয়োজন করা হয় ৬ জানুয়ারি। একইসাথে সারা দেশেও হয়েছে ভোজ।হ
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum