১৯ জুলাই ২০১৯

শাহ্ আবদুল হান্নানের লেখা ইসলামকে জানা-বোঝার একটি প্রয়োজনীয় বই

শাহ্ আবদুল হান্নানের লেখা ইসলামকে জানা-বোঝার একটি প্রয়োজনীয় বই - ছবি : সংগৃহীত

‘উন্নত চিন্তা মহৎ জীবন এবং আদর্শ সমাজ’ হচ্ছে বাংলাদেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ সর্বমহলে ও ভিন্ন ধর্মসম্প্রদায়ের কাছে নন্দিত গোঁড়ামিবিযুক্ত ইসলামী আদর্শের ধারক-বাহক ব্যক্তিত্ব এবং বাংলাদেশ সরকারের সাবেক সচিব শাহ আবদুল হান্নানের লেখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বই। আমরা অনেকেই জানি- শাহ আবদুল হান্নান দীর্ঘ দিন ধরে সমাজ ও জাতি গঠনে বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি করে আসছেন বিভিন্ন গণমাধ্যমে। কখনো লিখেছেন বিভিন্ন বিষয়ে কিছু বই। তার লেখার বিষয়বস্তু বৈচিত্র্যপূর্ণ। বিশেষ করে সামাজিক ও রাজনৈতিক আচরণ, অর্থনৈতিক গতিধারা, জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, ন্যায়বিচার, নৈতিকতা, মূল্যবোধ ইত্যাদি তার লেখার উপজীব্য। সমসাময়িক ঘটনাবলিকে উপজীব্য করে তিনি ইসলামী আদর্শের আলোকে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে অসমান্তরাল পারঙ্গম। বিভিন্ন সমস্যাকে সমাজের সামনে উপস্থাপন করে এর সমাধান কী হতে পারে ইসলামী আদর্শের আলোকে সে ধরনের আলোকপাতে তিনি সমধিক মনোযোগী। তার লেখা নিবন্ধ-প্রবন্ধ ও বইপত্রের কিছু বিনামূল্যে বিতরণও করে থাকেন।

আমরা জানি, ইসলাম একটি কালজয়ী আদর্শ। অথচ ইসলামের আদর্শিক জ্ঞান সম্পর্কে সুস্পষ্ট কোনো ধারণা আমাদের সমাজের অনেকেরই নেই। বিশেষ করে আমরা যারা স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত, তাদের মধ্যে অনেকেই ইসলাম সম্পর্কে সত্যিকার ধারণা নেই বরং আছে নানা বিভ্রান্তি। ফলে এই গোষ্ঠীটি ইসলামী আদর্শ-বিরোধীদের অপপ্রচারের শিকারে পরিণত হয় খুব সহজেই। বিশেষ করে সমাজের এই মহলটি ইসলামী ধারণা সম্পর্কে সম্যক অবহিত হতে পারবেন ইসলামী চিন্তাবিদ শাহ আবদুুল হান্নানের আলোচ্য বই ‘উন্নত চিন্তা মহৎ জীবন আদর্শ সমাজ’ বইটি পাঠ করে। নিজেদের রক্ষা করতে পারবেন নানা ধরনের অহেতুক বিভ্রান্তি থেকে।

বইটির বিষয়-বৈচিত্র্য যেকোনো পাঠককে আগ্রহী করে তোলার জন্য যথেষ্ট। ১০টি অধ্যায়ে এর বিষয়গুলোকে ভাগ করা হয়েছে। প্রতিটি অধ্যায়ে রয়েছে বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোচনা। অধ্যায়ভিত্তিক বিষয়গুলো হচ্ছে- সামাজিক প্রসঙ্গ, রাজনৈতিক প্রসঙ্গ, অর্থনৈতিক প্রসঙ্গ, আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গ, উম্মাহ সংক্রান্ত প্রসঙ্গ, নারী প্রসঙ্গ, শিক্ষা প্রসঙ্গ, সংস্কৃতি প্রসঙ্গ, গ্রন্থ আলোচনা এবং বিবিধ প্রসঙ্গ।
প্রথম অধ্যায়টি সামাজিক ইস্যু নিয়ে। এতে রয়েছে বেশ কয়েকটি বিষয়ে আলাদা আলাদা আলোচনা। এ অধ্যায়ের প্রথম লেখাটির শিরোনাম ‘ইসলাম ও জননিরাপত্তা’। এতে তিনি লেখেন, ‘ইসলাম রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। রাসূল সা: মদিনাতে পৌঁছেই একটি সঙ্ঘবদ্ধ সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন। এই রাষ্ট্র গঠন ও প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল, অবশ্যই ইসলামী আইন-কানুন ও আদর্শ কার্যকর করা। সেই সাথে এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জননিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা। জননিরাপত্তা বিনষ্ট করাকে ইসলাম একটি বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করে। তিনি তার ওই বক্তব্যের সমর্থনে উপস্থাপন করেন সূরা মায়েদার ৩২ নম্বর আয়াত। টেনে আনেন বিদায় হজের ভাষণের একাংশ ছাড়াও কুরআনের আয়াত। এভাবেই তিনি ইসলাম ও জননিরাপত্তা বিষয়টির ওপর গঠনমূলক আলোকপাত করেন।

এ অধ্যায়ের অন্য বিষয়গুলো উপস্থাপনেও তিনি একই কৌশল অবলম্বন করেছেন। এ অধ্যায়ের অন্য বিষয়গুলো হচ্ছে- তালাকপ্রাপ্ত নারীর সমস্যা ও প্রতিকার। প্রধান প্রধান সামাজিক সমস্যায় সরকার ও এনজিওগুলোর দায়িত্ব, পারিবারিক নির্যাতন- একটি বিশ্ব সমস্যা, রাস্তায় ছিন্নমূল মানুষ ও মানসিক রোগগ্রস্তদের পুনর্বাসন জরুরি। শহরের ছিন্নমূল মানুষের পুনর্বাসন, পথশিশুদের রক্ষায় সমন্বিত উদ্যোগ, শিশু দত্তক গ্রহণ ও প্রতিপালনে আইন প্রণয়ন, কিশোরীদের যৌন হয়রানিতে বিশ্ব সমাজের করণীয়, গৃহকর্মীর মূল্যায়ন ও মর্যাদা, এক সুমি বেগমের কথা এবং আমাদের করণীয়, যে কারণে সাধারণ মানুষ নিঃস্ব হচ্ছে। ধূমপান বন্ধে গণ-আন্দোলন প্রয়োজন, ফসলের বাম্পার ফলন ও আমাদের করণীয়, আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা উন্নয়নে অবিলম্বে করণীয়, স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো ও রোগ প্রতিরোধের উপায়। এসব বিষয় আলোচিত হয়েছে প্রথম অধ্যায়ে। লক্ষণীয়, বিষয়গুলো প্রকৃতপক্ষেই আমাদের সমসাময়িক সামাজিক সমস্যা সংশ্লিষ্ট। এসব সামাজিক সমস্যা আমরা কী করে ইসলামী নীতি-নৈতিকতা ও মৌলনীত অবলম্বন করে সমাধান করতে পারি, তারই ওপর আলোকপাত করা হয়েছে এসব লেখায়।

আমরা যদি বইটির বাকি ৯টি অধ্যায়ের আলোচিত বিষয়গুলোর দিকে তাকাই তবে একই বিষয়বৈচিত্র্য লক্ষ করতে পারি। বিষয়গুলো আমাদের চার পাশের সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সমস্যাকে ঘিরে। এসব বিষয়ে ইসলাম কী সমাধান দিতে পারে- তাই জানিয়ে দেয়ার প্রয়াস রয়েছে এই বইটিতে। একটি মাত্র লেখায় এসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার কোনো অবকাশ নেই। তবে বইটি সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা যাতে পাঠকরা পেতে পারেন, সেজন্য কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে বই থেকে যৎসামান্য উদ্ধৃতি তুলে ধরা সমীচীন মনে করছি। এই উদ্ধৃতগুলো থেকে পাঠক সাধারণ একটি সুস্পষ্ট ধারণা পাবেন, লেখক শাহ আবদুল হান্নান সত্যিই স্বল্পকথায় ইসলামের জটিল বিষয়গুলো সহজে প্রকাশ করার বিশেষ ক্ষমতা রাখেন।

রাজনীতি প্রসঙ্গ নিয়ে রচিত তার বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ‘সাম্প্রদায়িকতা ও সেকুলারিজম’ শীর্ষক লেখাটিতে তিনি লিখেছেন : ‘আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িকতার কথা আজ বেশ উচ্চারিত হচ্ছে। এক শ্রেণীর রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের লোক প্রায়ই সাম্প্রদায়িকতার কথা বলে থাকেন। এরা মূলত সেকুলার ও বাম ঘরানার। তাদের জীবনের লক্ষ্য মনে হয়, দেশ থেকে সাম্প্রদায়িকতা উচ্ছেদ। তবে তারা স্পষ্ট করে বলেন না, ‘সম্প্রদায়িকতা’ মূলত কী? এতে এমন ধারণাই সৃষ্টি হয়েছে যে, তারা একটি শব্দের আড়াল থেকে বক্তব্য রাখেন যাতে কেউ ধরতে না পারে যে, কার বিরুদ্ধে বলা হচ্ছে। কিছু দিন ধরে তারা পাঠ্যপুস্তকে ইসলামী বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করাকে সাম্প্রদায়িকতা বলছেন, তা হলে বুঝা গেল- ইসলাম হচ্ছে তাদের ভাষ্যমতে, ‘সাম্প্রদায়িকতা’। তারা ধর্মমাত্রকেই সাম্প্রদায়িকতা মনে করেন, তবে বেশি বলেন ইসলামকে লক্ষ্য করে। তদের মতে, যারা দাবি করছেন, যারা চান সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণ থেকে গ্রিক দেবীর মূর্তি অপসারণ করা হোক, তারা সাম্প্রদায়িক, তাই তারা সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এ মূর্তি চান না।

‘তবে ইসলামের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িকতার অভিযোগ বিরাট অন্যায়। ইসলাম জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাইকে মানবাধিকার দিয়েছে। এ প্রসঙ্গে ওআইসির মানবাধিকার ঘোষণা দেখা যেতে পারে।

‘আমরা জানি, সেকুলার বা ধর্মনিরপেক্ষ শক্তি কতটা মানবাধিকার রক্ষা করে। হিটলার-স্টালিন- এরা সবাই সেক্যুলার ছিলেন। তারা কত মানুষ হত্যা করেছেন, তা সবাই জানে। প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে প্রায় ছয়-সাত কোটি লোক নিহত হয়। তা সেক্যুলার শাসকদের দিয়েই হয়েছে। আমেরিকার কালোদের ওপর ও বর্তমান মুসলিমদের ওপর সেকুলার শাসকেরাই অত্যাচার করছে। ভিয়েতনাম, আলজেরিয়া, ইরাক, আফগানিস্তানে সেকুলার শাসকেরাই অত্যাচার ও হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। সে তুলনায় ইসলামী শাসনব্যবস্থায় তেমন কিছুই হয়নি। অন্যান্য ধর্মভিত্তিক শাসনব্যবস্থায়ও তেমন কিছু করেনি।

‘সর্বোপরি সেকুলারিজম সারা বিশ্বে নৈতিকতা ধ্বংস করে দিয়েছে। ভোগবাদী বানিয়ে দিয়েছে মানুষকে। নৈতিকতা পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন। তা কেবল ধর্মই করতে পারে। নৈতিকতা প্রকৃতি থেকে আসে না; সেকুলারিজম ওপর থেকেও আসে না। নৈতিক আচরণের ভিত্তি হচ্ছে স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস এবং পরজীবন, আখেরাতে বিশ্বাস বা ধর্ম।’

এভাবে তিনি বইটির প্রতিটি অধ্যায়ে এমন সব সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, আন্তর্জাতিক, ধর্মীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার লেখাগুলো সহজ-সরল, যেকোনো সাধারণ পাঠককে আকৃষ্ট করার মতো। অবশিষ্ট অধ্যায়গুলোতে আলোচিত বিষয়গুলো থেকে কয়েকটির শিরোনাম এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে- ইসলাম ভবিষ্যতে সভ্যতা ও পাশ্চাত্য ও ইসলামী জীবনধারার তুলনা; কুরআনের মূল্য বিবেচ্য বিষয় কী, আত্মসমর্পণের দ্বন্দ্ব, শিক্ষা ইস্যু, ঈদ সংস্কৃতিস্বরূপ ও মূল্যায়ন, মুসলিম সংস্কৃতি : বৈশিষ্ট্য ও ভিত্তি, ভ্যালেন্টাইন ডে ও এর প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন দিক, ঐতিহ্যমণ্ডিত শব্দ পরিবর্তনের প্রচেষ্টা, ফুটবলে মেয়েদের শালীন পোশাক পরা, সন্ত্রাস আর জিহাদ এক নয়, এমনই আরো কিছু শিরোনাম।

শাহ আবদুুল হান্নান একজন বোদ্ধা পাঠকও বটে। তিনি অনেক সময় তার পঠিত বই সম্পর্কে আলোচনা করেন তার লেখার মাধ্যমে। এ ধরনের কিছু লেখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এ বইটিতে। যেমন : ‘দি মেসেজ অব কুরআন : এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তাফসির’ শীর্ষক লেখাটি মোহাম্মদ আসাদের (১৯০০-১৯৯১) ভাষান্তরিত ও ব্যাখ্যাত একটি বইয়ের আলোচনা। এ ছাড়া রয়েছে ড. ওসমান বকরের লেখা 'ঞধযিরফ ধহফ ঝপবরহপব : Tawhid and Sceince : History and Philosophy of Islamic Sceince' বইয়ের বাংলা সংস্করণের ওপর একটি লেখা। নবম অধ্যায়ে তেমনি ভিন্ন ভিন্ন লেখায় রয়েছে আরো বেশ কয়েকটি বইয়ের আলোচনা।

সব মিলিয়ে শাহ আবদুল হান্নানের আলোচ্য বইটি ইসলামকে জানা-বোঝার একটি অনন্য প্রয়োজনীয় বই। বইটি পাঠে ইসলাম সম্পর্কে অনেকের অনেক ভুল ধারণা ভাঙতে সহায়তা করবে। বইটি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থট (বিআইআইটি)। বইটি সম্পাদনা করেছেন ড. এম আবদুল আজিজ। ২৭০ পৃষ্ঠার বইটি ছাপা হয়েছে হোয়াইট প্রিন্টে। প্রচ্ছদ ও অঙ্গসজ্জা মনিরুজ্জামান মনির ও মো: জহিরুল হক খান। বইটি পাঠকপ্রিয় হবে বলেই আমার বিশ্বাস।


আরো সংবাদ

gebze evden eve nakliyat instagram takipçi hilesi