১৯ মার্চ ২০১৯

খাশোগি হত্যাকাণ্ডে অভ্যন্তরীণ ও বিশ্বে অস্থিরতা

খাশোগি হত্যাকাণ্ডে অভ্যন্তরীণ ও বিশ্বে অস্থিরতা - ছবি : সংগৃহীত

খাশোগি হত্যা সৌদি আরবের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্ব, ‘হাউজ অব সৌদ’ এবং বিরুদ্ধবাদীদের মঞ্চে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে, একই সাথে, বহির্বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও সরকার সৌদিবিরোধী অবস্থানে সরে যাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সৌদি তুরস্ক সম্পর্ক। আঞ্চলিকভাবে শক্তিশালী দু’টি ভ্রাতৃপ্রতিম দেশ এখন মুখোমুখি। প্রায় দুই দশক আগে তুরস্কে একে পার্টি ক্ষমতা লাভের পর আঙ্কারা-রিয়াদের কাক্সিক্ষত সম্পর্ক দৃষ্টিগোচর হচ্ছে না।

ইরানের জ্বালানি তেল ও সামরিক শক্তির বিকাশ, সিরিয়ায় সরকার পরিবর্তন, বিদ্রোহী দমন ও কুর্দিস্তান ইস্যু, ইরাকে সরকার গঠন, কাতারের সার্বভৌমত্ব রক্ষা ইত্যাদি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে উভয় দেশের মধ্যে বিস্তর মতভেদ। এরদোগান ২০১৫ সালে সৌদি আরব সফর করেছিলেন এবং বাদশা সালমান ২০১৬ সালে তুরস্কে যান। কিন্তু এসব সফর ‘তুষের আগুন’ নেভাতে সক্ষম হয়েছে বলে মনে হয় না। একটি দেশ যুক্তরাষ্ট্রের উপদেশ শোনে, আরেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে উপদেশ দেয়। দুই দেশের পররাষ্ট্রনীতি দুই মেরুতে অবস্থান করছে। এমন অবস্থায় এবার খাশোগি হত্যাকাণ্ড ‘তুষের আগুন’কে আরো প্রজ্বলিত করেছে।

এটা যদি আর দশটি হত্যাকাণ্ডের মতো হতো, তবে ঘটনা বেশিদূর গড়াত না। তুরস্ক বলেছেÑ গত মাসে এর পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তবে খাশোগি হত্যাকাণ্ড হয়তো বড় কোনো ঘটনার শুরু। এ জন্য এরদোগানকে সাবধানে পা ফেলতে হবে। কেননা, তাকে সরিয়ে দেয়ার জন্য বড় ধরনের ক্যু হয়েছিল। তখন তিনি যে হোটেলে ছিলেন, সেখানে হেলিকপ্টার গানশিপ দিয়ে বৃষ্টির মতো গুলি চালানো হয়েছিল। তিনি যে বেঁচে গেলেন শুধু তা নয়, আরো ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট হলেন। যারা ক্যুর নেপথ্যে, তারা যদি খাশোগি খুনের নেপথ্যে থাকেন, তবে ঘটনা তো মাত্র শুরু। মনে রাখতে হবে- ইরাকের সাদ্দাম হোসেন, লিবিয়ার গাদ্দাফি, মিসরের নাসের- সবার মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ জড়িত ছিল কোনো না কোনোভাবে। তারা সবাই আরব জাতীয়তাবাদের প্রবক্তা। অধিকন্তু এরদোগানকে মুসলিম উম্মাহর প্রবক্তা মনে করা হয়। তাই তুরস্ককে সতর্ক থাকতে হবে।

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, খাশোগি আরব বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা, বহুলালোচিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সমর্থক। ২০১৭ সালে তাকে সোস্যাল মিডিয়ায় প্রশ্ন করা হয়েছিলÑ আপনি মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য কি না? খাশোগি জানিয়েছিলেন, যারা কোনো পরিবর্তন চান, নিজের ধর্মকে ভালোবাসেন, মুক্তি চান, ‘আরব বসন্ত’কে বাস্তবে দেখতে চান, তাদের ব্রাদারহুডকে বেছে নিতে হবে। মুসলিম ব্রাদারহুডের হয়ে কাজ করা সম্মানজনক।’ এদিকে, আরব বসন্তের কারণে সৌদি আরবের ‘ওয়াহাবি’ মতবাদের সাথে ব্রাদারহুডের দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। ব্রাদারহুডকে তুরস্ক ও কাতার সমর্থন করে থাকে।

২০১৪ সালে সৌদি প্রশাসন ব্রাদারহুডকে ‘কালো তালিকা’ভুক্ত করে এবং সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেয়; সেই সাথে, ব্রাদারহুডবিরোধী শিবিরকে মদদ দিতে থাকে। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিজয়ী ব্রাদারহুড সমর্থিত প্রেসিডেন্ট ড. মুরসির বিরুদ্ধে মিসরের সেনাপ্রধান জেনারেল সিসি যখন অবস্থান নেন, তখন সৌদি আরব তাকে সবরকম সমর্থন-সহায়তা দিতে থাকে এবং পরে কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ দেয়। তুরস্ক রিয়াদের এসব পদক্ষেপের বিপরীতে অবস্থান নিয়েছে।

সৌদি আরব ‘আরব ন্যাটো’ গঠন করতে চায়। এর মূল লক্ষ্য ইরানকে ‘শেষ’ করা। তুরস্ক ‘ইসলামি সেনাদল’ গঠন করতে চায়; যার উদ্দেশ্য- সব মুসলিম দেশের স্বার্থ রক্ষা। সৌদি আরব তুরস্কবিরোধী, সিরিয়ান কুর্দিদের সামরিক ও আর্থিক সহায়তা বাড়িয়ে দেয়। অথচ তুরস্ক কুর্দিদের ‘সন্ত্রাসী’ বলে অভিহিত করে। অনেকে মনে করেন, তুরস্ক খাশোগি ইস্যুকে হারিয়ে যেতে দেবে না।

খাশোগি হত্যার অডিও রিলিজ হওয়ার পর কী ভয়াবহ অবস্থায় তাকে হত্যা করা হয়, তা বোঝা গেছে। জীবিত থাকাকালেই তার আঙুুল কেটে নেয়া হয়। মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, ‘সৌদি প্রশাসনের একজন’কে দেখানোর জন্য এই আঙুল কাটা! মিডিয়া ও আন্তর্জাতিক টকশোতে এ ঘটনায় ‘সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের সংশ্লিষ্টতা’ আছে মর্মে প্রচার করা হচ্ছে। তিনি নাকি এতই ক্ষমতাধর যে, তিনি তার মাকে হাউজ অ্যারেস্ট করেছেন এবং বাদশাহ সালমানের সাথে সাক্ষাৎ বন্ধ করে দিয়েছেন। তা এ কারণে যে, তিনি প্রিন্স খালেদকে ক্রাউন প্রিন্স বানাতে আগ্রহী! এ যাবৎকালের সব কাজকর্ম বিশ্বব্যাপী সবাই প্রত্যক্ষ করলেও যুবরাজের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার মতো ঘটনা পাওয়া যায়নি। সংস্কারের বিষয়ে আলেমরা বিরুদ্ধাচারণ করলেও তিনি তাদের সাথে বৈঠক করেছেন। তবে কথিত চরমপন্থী কিছু আলেমকে বন্দী করেছেন। আরব রাষ্ট্রগুলো এসব বিষয়ে নজর দিচ্ছে না। তারাও গণতন্ত্র বাদ দিয়ে রাজতন্ত্র কায়েম রাখতে চান। মানবাধিকার বিষয়ে কানাডা প্রতিবাদ করে এখন সৌদি আরব থেকে বিতাড়িত। কিন্তু খাশোগি বিষয়টি ভিন্ন। সৌদি কন্স্যুলেটের ভেতর ও তুরস্কে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।

খাশোগির হাতঘড়িতে উন্নতমানের ভয়েস রেকর্ডিং থাকবে, তা সৌদি সরকার চিন্তা করেনি। তুরস্ক এ পর্যন্ত চেষ্টা করেছে, এ ঘটনা যেন কোনোভাবেই তুরস্ক-সৌদিবিরোধের আরেক সূত্র না হয়; ‘মানবাধিকার’ ও ‘মুক্তচিন্তা’র আওতায় যেন বিষয়টি দেখা হয়। সৌদি প্রশাসন কখনো বলেনি যে, কন্স্যুলেট আমার দেশ, আমরা যা খুশি করব, কার কী বলার আছে ইত্যাদি। সংস্কার চিন্তা ও পেট্রোডলারের কারণে পশ্চিমারা হাউজ অব সৌদের কাছাকাছি থাকতে চায়। কিছু খোয়াতে হলেও ওরা পিছপা হয় না। যা হোক, যুবরাজের ভাগ্যের আকাশে এখন কালো মেঘের ঘনঘটা। সৌদি আরবের মান-মর্যাদা অনেকটাই ভূলুণ্ঠিত। খাশোগি হত্যার পর ব্রিটেনের বিখ্যাত সকারটিম ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড শেয়ারহোল্ডাররা যুবরাজকে ক্লাবটি ক্রয়ে বাধা দিয়েছেন। কী অসম্মান! হাউজ অব সৌদে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা ঘটতে পারে। খাশোগি হত্যায় মসজিদুল হারামাইনের খাদেম হিসেবে বিশ্ব মুসলমানের যে শ্রদ্ধা ছিল, তা ফিকে হয়ে যাওয়াই স্বাভাবিক।
খাশোগি হত্যার কারণে রাজপরিবার কার্যত দুর্বল হয়ে গেছে। সারা বিশ্বের নজর এখন সৌদি আরবের ওপর। বিশ্ব মুসলমানের যে ভক্তি-শ্রদ্ধা তাদের প্রতি, সেটি আগের অবস্থানে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে কি?

সৌদি আরবের বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক অনেক বন্ধু রয়েছে, কিন্তু খাশোগি ঘটনা বন্ধুত্বকে হালকা করে দিয়েছে। পাশের গরিব ইয়েমেনের এক কোটি মানুষকে ক্ষুধার অন্ধকারে ঠেলে দেয়া এবং বন্ধুপ্রতিম কাতারকে অবরোধ করার চেয়েও খাশোগি হত্যাকাণ্ড বিশ্ববিবেককে নাড়া দিয়েছে বেশি। সৌদি আরবের মতো অন্যান্য আরব রাষ্ট্র যারা স্বেচ্ছাচারী ব্যবস্থাকে অনুসরণ করে, তারা কত জনকে হত্যা ও বন্দী করেছে, কত স্কলার, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীকে কথিত নিরাপত্তা ও শান্তির জন্য দেশত্যাগ করতে হয়েছে, কতজন গ্রেফতার ও নির্যাতিত হয়েছেন, সেসবের হিসাবও নেয়া হচ্ছে। নিজের সৃষ্ট বিপদের মুহূর্তে আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় যেভাবে কথা বলতে হয়, তা করতে সৌদি প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে। বরং ক্ষমতাবানের মিথ্যাচার দেখে বিশ্ববাসী হতবাক হয়েছে। সৌদি বাদশাহ সালমান পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্য এমবিএসের ভাই প্রিন্স খালিদকে উত্তরাধিকারী করার পরিকল্পনা নিচ্ছেন বলে ফ্রান্সের এক দৈনিক প্রচার করেছে। বলা হয়েছে, সৌদি আনুগত্য পরিষদের কাছেও তেমন প্রিয় নন বর্তমান যুবরাজ। তাবে বিষয়টি এখনো অস্পষ্ট।

জার্মানিতে আশ্রয়লাভকারী প্রিন্স খালিদ বিন ফারহান তার প্রভাবশালী চাচাদের ক্যু করার জোর পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বাদশা সালমানকে পরিবর্তন এবং যুবরাজ মোহাম্মদের প্রশাসন প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। তাকেও খাশোগির আগে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেছেন। তিনি আরো জানান, গত বছরের নভেম্বরে শুদ্ধি অভিযানের কথা বলে শত শত বিশিষ্ট ব্যক্তিকে বন্দী করা হয় এবং তাদের কাছ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলার ‘মুক্তিপণ’ আদায় করা হয়।

সৌদি আরবের বর্তমান অবস্থানে তার সুন্নি মিত্ররাও কার্যত দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইরানবিরোধী মোর্চার অনেকেই এখন ‘স্বাধীন’ভাবে চলতে চাইবে। কাতারবিরোধী মোর্চাও সেরকম। প্রিন্স বিন সালমান কাতারের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আহ্বান জানালে কাতারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে আগে ক্ষমা চাইতে বলেছেন। ইরান বলেছে, আমেরিকাকে ছেড়ে বরং মধ্যপ্রাচ্যকে শক্তিশালী করার জন্য। লেবাননী প্রধানমন্ত্রী হারিরির অবস্থা কি এখানে উল্লেখ্য নয়? লেবাননের নির্বাচনী ফলাফলে কি যুবরাজের বোধোদয় হয়নি?

তিনি লেবাননের সুন্নিদের সমর্থন আদায় করতে চেয়েছিলেন। এ ঘটনায় সৌদি শাসক পরিবারের বড় ক্ষতি যেটি, তা হলো- তাদের যেসব বুদ্ধিজীবী, মিডিয়া কর্মী, সমালোচক রয়েছেন, তারা আরো জোরালোভাবে আবির্ভূত হবেন। কারণ তারা মনে করছেন, এমন কোনো ঘটনায় বিশ্ব তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং সৌদি প্রশাসন পাল্টা ঘটনার পুনরাবৃত্তি করবে না।

ট্রাম্পও এখন ঝুঁকির মুখে। তিনি ‘ইরানি সন্ত্রাস’ নিয়ে অগ্রসর হতে পারছেন না। যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে কিছু বলা কঠিন, নিজের স্বার্থের জন্য যেকোনো পক্ষ নিতে তাদের কোনো দ্বিধা নেই। তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় ‘নেট প্রফিট’ লক্ষ করে। সম্পদ লুট করার জন্য আরব দেশগুলোর লড়াই অব্যাহত রাখার নীতিতেই তারা অটল। এখন বিশ্বের বড় বড় কলামিস্ট ও সমালোচকেরা খাশোগি হত্যার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও জামাতা কুশনার জড়িত বলে দেখাচ্ছেন। তারা যুক্তি দেখাচ্ছেন, সিআইএ কিলার টিমের কথাবার্তা সাইফার করেছিল। এরপরও তাদের ‘রেসিডেন্ট’কে রক্ষার জন্য কেন সতর্ক বার্তা পাঠায়নি বা ব্যবস্থা নেয়নি! ব্রিটিশ সাপ্তাহিক সানডে এক্সপ্রেস জানায়, ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট কমিউনিকেশন্স হেডকোয়ার্টার্স সৌদি আরবের এ পরিকল্পনা জানতে পারে এবং তা থামানোর জন্য সে দেশের কাছে আবেদন জানায়। এমন একটি মারাত্মক বিষয় সিআইএর হাতে না পড়ার কথা নয়। খাশোগির বান্ধবীকে ট্রাম্প হোয়াইট হাউজে আমন্ত্রণ জানালেও তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছে এ জন্য যে, ট্রাম্প তদন্তের ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক নন এবং হত্যার বিষয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান নেননি।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্ম সচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার


আরো সংবাদ




iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al