১৮ ডিসেম্বর ২০১৮

শক্তির কেন্দ্র ভুয়া অস্তিত্ব

শক্তির কেন্দ্র ভুয়া অস্তিত্ব -

মানুষ শক্তির ভক্ত, কিছু ব্যতিক্রম বাদ দিয়ে। কারণ ব্যতিক্রম জীবনের সব স্তরেই থাকে। শক্তির পরিমাণ, বাস্তবতা এবং ব্যবহার নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। তবে এর একটি বিষয় সবাইকে সতর্ক রাখে। সেটা হলো পরিমাণ। সেটা বুঝতে প্রায়ই মানুষ জন্তুর কথা ভাবে। কয়েকটি জন্তু আবার বেশি পরিচিত। ঘোড়া, গরু, শূকর, কুকুর ও বিড়াল। এরা গৃহপালিত পশু হওয়ার কারণেও হয়তোবা। তবে এদের মাঝে ঘোড়া বা অশ্ব তার শক্তিই এর বিষয়ের প্রধান পরিমাপক। আজকের আলোচনা এই অশ্বশক্তি নিয়েই।

কখনো গাড়িতে (মোটর গাড়িতে) ভ্রমণ করছেন, প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঠবে, এটার ইঞ্জিন কত অশ্বশক্তি? যখন যন্ত্রবাহন ছিল না, তখন চলাচলের একটি প্রধান বাহন ছিল অশ্ব বা ঘোড়া। সে জন্যই হয়তোবা যন্ত্রকে বুঝতে অশ্বশক্তিকে পরিমাপক হিসেবে নেয়া হয়ে থাকবে। যদিও বাস্তবতায় অশ্বশক্তি হিসেবে যে পরিমাপ ব্যবহার করা হয়, তার সাথে অশ্বের কোনো যোগাযোগ নেই। অন্য কথায় ভুয়া অস্তিত্বই হচ্ছে আজকের আধুনিক সভ্যতার অন্যতম পরিমাপক।

কার কত অশ্ব আছে? এ প্রশ্নের জবাবের ওপর সেকালে নির্ভর করত কে কত সমাজের মাঝে শক্তিমান। এমনকি রাষ্ট্রের শক্তিরও প্রকাশ হতো এই অশ্বশক্তির পরিমাণ নিয়ে। কারণ তখন এই অশ্বই শক্তির গতি নির্ধারণ করত। এখন তা পরিমাপ হয়ে বিরাজ করছে। কারণ অন্য কোনো সূচক মানুষের কাছে এত সহজে বোধগম্য হয় না।

মানুষ এই জন্তুগুলোকে শক্তির পরিমাপক হিসেবে গণ্য করে, তেমনি ঘৃণা-যন্ত্রণা-নিন্দা প্রকাশের অন্যতম প্রধান বাহন হিসেবে মনে করে। যখন কাউকে নিন্দা বা সমালোচনা করতে কেউ চায় তখনই হয়তো কুকুরের, শূকরের অথবা গরুর নাম জিহ্বার আগে এসে যায়। অথচ এই গৃহপালিত পশুগুলো সবার প্রিয় এবং প্রয়োজনীয়। অর্থাৎ মানুষ কি তাহলে তার প্রিয় ও অপ্রিয় দু’টি বিষয়কেই একই নিক্তিতে বিচার করে? এর জবাব অবশ্যই ‘হ্যাঁ’ হবে; কারণ প্রতিটি বিষয়েরই প্রধানত দু’টি প্রকাশ থাকে- হ্যাঁ এবং না।

তবে এমনভাবে যদি ভাবা যেত একটি মোটর গাড়ি চলছে কত অশ্বশক্তি নিয়ে এবং সে অশ্বগুলোই যখন একটি গাড়ি কোথাও পার্ক করা হলো, সেখানে এলো ব্যাপারটি তখন কেমন হতো। সেই অশ্বগুলো তাদের মূত্র ও অন্যান্য বর্জ্য দিয়ে ভর্তি করল স্থানটি। তেমনি যদি গাড়িগুলো পার্কিংয়ে বর্জ্য দিয়ে ভরে ফেলত। আসলে তেমনটি কেউ ভাবে না। অর্থাৎ বাস্তবতা কখনোই মানুষের ইচ্ছা ও আকাক্সক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন নয়। হয়তোবা সে জন্যই প্রাকৃতিক বাস্তবতা জনজীবনকে রক্ষা করছে। মানুষের নিজের সব ইচ্ছার প্রতিফলন হলে জীবন বর্জ্যে পরিপূর্ণ হয়ে যেত। এভাবে নিজেদেরকেও ধ্বংস করত।

আবার বর্জ্যও বর্তমান জীবনব্যবস্থার একটি প্রধান অঙ্গ। অতীতেও এটা ছিল, তবে এর ব্যবহার আজকের টেকনোলজির যুগের মতো নয়।
এ বক্তব্যগুলোর প্রধান অর্থ হলো শক্তিই আসল চালিকা তা দৃশ্যমান হোক বা না হোক। এই চালক জীবন সমর্থক হলে মানবসমাজে শান্তি আসে, নতুবা বিরতিহীন অশান্তি বিরাজ করে।
যেমন ঘোড়াকে সঠিক প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করলে, তার শক্তি নানাভাবে উপকারী ব্যবহারে নিয়োজিত করা যায়, তেমনি এর উল্টোটি ঘটবে এর সঠিক ব্যবহার না হলে। তবে এটা সত্য, মানব ইতিহাসে সব শক্তিরই অপব্যবহার হয়েছে বেশি। ফলে সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ-যুদ্ধ মানুষের সব শ্রেষ্ঠ নির্মাণগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। অর্থাৎ জীবকুলের মাঝে মানুষই একমাত্র নিজেদের ধ্বংসের জন্য সদা চঞ্চল।
মানুষই প্রতিক্ষণে নির্মাণ করছে পথ এবং পদ্ধতি কেমন করে নিজেদের ধ্বংস করা যায়। এর মাঝে অদৃশ্য পথগুলোই মারাত্মক। কারণ আপাতদৃষ্টিতে এই পথগুলো অত্যন্ত আকর্ষণীয় এবং সবাই সেই পথে চলতে চায়।

অথচ মানুষই সৃষ্টি করেছে সুন্দর-পরিপূর্ণ জীবন নির্মাণ এবং যাপনের পথ। তবে সে পথগুলোতে চলতে হলে মানতে হয় অনেক নিয়ম। যেমন শ্বাপদ থেকে বাঁচতে হলে, বাসস্থানকে করতে হয় নিরাপদ, যা শুধু শক্ত বেষ্টনী দিয়েই সম্ভব। অথচ এই বেষ্টনীকে দুর্বল বা ভাঙতে চায় প্রকৃতি এবং মানুষ উভয়েই। এ জন্যই মানবজীবন থেকে কখনো দুর্যোগ দূর হচ্ছে না।
একজন লেখক নিজকে জিজ্ঞাসা করেছেন- মানুষ যখন একা একা বাস করত তখন কেমন ছিল? আবার যখন গোষ্ঠীগতভাবে বাস করত তখন কেমন ছিল? এক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মানুষ যখন থেকে গোষ্ঠীগতভাবে বাস করতে শুরু করল, তার পর থেকেই শুরু হয় সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ ইত্যাদি। এর কারণ অনেকের মাঝে একটি হল ভুয়া অস্তিত্ব রক্ষা এবং দখলসীমার বৃদ্ধি। এখান থেকেই ‘বড় ভাই’ (বিগ ব্রাদার) ধারণাটির জন্ম। এখন সারা বিশ্বের রাজনৈতিক এবং সামাজিক মঞ্চের প্রধান দখলদার এই ‘বড় ভাইরাই’। অধ্যাপক নীল পোস্টম্যান এই বড় ভাইদের সম্পর্কে এক চমৎকার মন্তব্য করেছেন। ‘বড় ভাইরা আমাদের খেয়াল রাখে না তার ইচ্ছা অনুসারে। তবে আমরা তাকে স্মরণ করি আমাদের (ইচ্ছা অনুসারে) যখন সাধারণ মানুষের গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা শিশুসুলভ হয়ে পড়ে, জনগণ যখন ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে পড়ে থাকে, সাংস্কৃতিক জীবন যখন চিত্তবিনোদনের সমগ্র অংশজুড়ে থাকে, যখন এক কথায়, মানুষ শুধুই শ্রোতা হয়ে পড়ে, তখন জাতি এক বিপদের সম্মুখীন হয়। সংস্কৃতির মৃত্যু হওয়ার সম্ভাবনা হয় প্রকট।’

বর্তমান সময়ে এই রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সুস্থতাকে দখল করেছে টিভি মাধ্যম। ক্ষমতাবানরা বা ক্ষমতা দখলের ইচ্ছুকরা তাই এই মাধ্যমকে প্রথমেই দখল করে এমন অবস্থার সৃষ্টি করছে, যেখানে মানুষের পক্ষে কোনো বিষয়ে স্বচ্ছ ধারণা করা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এই দখল সংস্কৃতির মূলে হলো ‘ভুয়া বিষয়গুলো’। স্লোগান এবং প্রচারে এই অস্তিত্বহীন বিষয়গুলোই সব স্তরে প্রধান হয়ে উঠছে। বোদ্ধাজনেরা কোনো কিছুই করতে পারছে না। কারণ চিত্তবিনোদনের এই প্রচার এত প্রবল যে, বাস্তবতাও ডুবে যাচ্ছে। এসব দেখে-শুনে মার্কিন বিখ্যাত গায়ক জন লেনন গেয়েছিলেন, ‘কিছুই আসল না (নার্থিং ইজ রিয়াল)। এটা এখন বিশেষ করে রাজনৈতিক জীবনের জন্য প্রযোজ্য। এখানে সবই মেকি। সবই নিয়ন্ত্রণের মাঝে। বাস্তবতাকে ক্রমান্বয়ে মুচড়িয়ে বিকৃত করা হচ্ছে।’

ড. জন ডাবলু হোয়াইটহেড (প্রেসিডেন্ট রাদারফোর্ড ইনস্টিটিউট) লিখেছেন, এখনকার টিভি শোগুলো প্রকাশ্য ও পরোক্ষভাবে ক্ষমতাবান এবং রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। জনগণ এর বাইরে দেখতে পায় না বা জানতে পারে না। এমনকি প্রত্যক্ষদর্শী তাদেরও এই ভুয়া দৃশ্যগুলোকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করা হচ্ছে। এখন এ শোগুলোর প্রধান লক্ষ্য কিভাবে জনগণের মগজ ধোলাই সম্পন্ন করে তাদের সেখানে স্থির রাখা। এর প্রতিযোগিতায় মানুষ আরো বিভ্রান্ত হচ্ছে। ড. হোয়াইটহেড বলছেন, ‘সত্য নির্ণয় করাটাই এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা।’

মিডিয়া স্কলার ব্রাড ওয়েইট এবং সারা ব্রুকার একটি নতুন ইংরেজি শব্দ তৈরি করেছেন। এটা হলো ‘হিউমিলিটেইনমেন্ট’। এর বাংলা এমন করা যায়- ‘অবমানিতকরণ পদ্ধতি’। এটা হলো কাউকে শোতে অপমান এবং অবমাননা করে আনন্দ পাওয়া। বর্তমান সময়ে রাষ্ট্র, ক্ষমতাবান এবং রাজনৈতিক দলের অনেকেই এই পদ্ধতির অনুসারী। এর সুযোগে দুর্নীতি, চুরিসহ সব সামাজিক এবং রাষ্ট্রীয় অনাচারের গতি থামছে না। উন্নত দেশগুলোও এর নেতৃত্ব দিচ্ছে অনেক স্তরে।

চুরির কথাই ধরা যাক। এর ব্যাপকতার সীমা নেই। যেখানে কৈফিয়ত পদ্ধতি সচল, সেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘটনাই এর সম্যক ব্যাখ্যা দেবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ফোরবিস মাগ্যাজিন তার ডিসেম্বর ২০১৭ সালের ইস্যুতে প্রকাশ করে, সে দেশের ‘পেন্টাগন ২১ ট্রিলিয়ন ডলার কেমন করে খরচ করল তার হিসাব দিতে পারছে না। কারণ কোনো হিসাব নেই’ (এক ট্রিলিয়ন এক লাখ কোটি)। এটা কত টাকা বা ডলার? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি হলো ১৮.৬ ট্রিলিয়ন ডলার। এ টাকার আকার কেমন হবে। ধরা যাক সব ডলারই এক হাজার ডলারের মান। তা হলে এগুলো যদি একটির পর আরেকটি রাখা যায় তা হলে এর উচ্চতা হবে ৬৩ মাইল। কেউ যদি বছরে ৪০ হাজার ডলার আয় করে তার এই চুরির ডলারের সমান আয় করতে লাগবে ২৫ মিলিয়ন বছর। অর্থাৎ পেন্টাগন কত খরচ করছে কেউ জানে না। অথচ ২০১৫ সালে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বাজেট ছিল ১২০ বিলিয়ন ডলার। এই অতি সংক্ষিপ্ত বিবরণ থেকে আন্দাজ করা যায়, হিসাবহীন খরচ সামরিক বাহিনীসহ বিশ্বের সব সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে কেমনভাবে করছে।

ড. হোয়াইটহেড লিখেছেন, এর সামান্য অংশও যদি জনকল্যাণে ব্যয় হতো, তাহলে মানুষের জীবনে ব্যাপক পরিবর্তন আসত। বিশ্ব থেকে ক্ষুধা একেবারেই নির্বাসিত হতো। অথচ এই খরচগুলো হচ্ছে ‘ভুয়া অস্তিত্বের’ স্লোগান দিয়ে। যেমন আইএস, মৌলবাদ ইত্যাদি। বিখ্যাত কমেডিয়ান লি ক্যাম্প পেন্টাগনের এই চুরিকে বিশ্বের সর্ববৃহৎ চুরি বলে আখ্যায়িত করে বলেছেন, ‘জাতীয় নিরাপত্তার’ নামে এই খরচ আসলে ছিল চুরি এবং এটা চলবে। এটাই বিশ্বের ক্ষমতাবানদের ক্ষমতার উৎস।


আরো সংবাদ