১৬ ডিসেম্বর ২০১৮
আত্মপক্ষ

বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাঙালি মুসলমান

বঙ্কিমচন্দ্রের দৃষ্টিতে বাঙালি মুসলমান - সংগৃহীত

বিষয়টি নিয়ে এর আগেও অনেকবার আলোচনা করেছি। এখন আবার করছি, কারণ বঙ্কিমচন্দ্রকে নিয়ে আমাদের কিছু বুদ্ধিজীবী যা বলছেন, তা মোটেও সত্য নয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টপাধ্যায় বাংলাভাষী মুসলমানদের সম্পর্কে অত্যন্ত হীন মনোভাব পোষণ করতেন। আজকের রাষ্ট্র বাংলাদেশ গঠিত হতে পেরেছে বাংলাভাষী মুসলমান থাকার কারণে। বঙ্কিমচন্দ্রের পক্ষে তা কল্পনা করা সম্ভব ছিল না। বঙ্কিমচন্দ্রের একটি প্রবন্ধ আছে ‘বাঙালির উৎপত্তি’ নামে। এতে তিনি বলেছেন, বাংলা ভাষা আর্য পরিবারভুক্ত একটি ভাষা। কিন্তু যারাই এ ভাষায় কথা বলে তারা আর্য মানব পরিবারভুক্ত নয়। বাঙালি ব্রাহ্মণরা হলেন খাঁটি আর্য। এ ছাড়া বাংলাভাষীদের মধ্যে আছে কোল অনার্য, আছে দ্রাবিড় অনার্য, আর আছে বাংলাভাষী মুসলমান।

বাংলাভাষী মুসলমানকে বঙ্কিম চন্দ্র বুঝাতে চেয়েছেন সর্বনিম্ন মানবধারাভুক্ত মানুষ হিসেবে। বঙ্কিমচন্দ্র ইংরেজদের একজাতি বলেছেন, যদিও ইংরেজরা গঠিত হয়েছে স্যাকসন, নরমান এবং ডেনদের সংমিশ্রণে। কিন্তু স্যাকসন, নরমান এবং ডেনরা উৎপন্ন হয়েছে এক আর্য মানবধারা থেকে। বাংলা ভাষাভাষীদের সবার পূর্বপুরুষ আর্যমানবধারাভুক্ত নয়। বিশেষ করেম মুসলমানরা তো নয়ই। অথচ আজকের বাংলাদেশ গঠিত হতে পেরেছে মূলত বাঙালি মুসলমানের ওপর নির্ভর করেই। তাই এর উদ্ভবকে ব্যাখ্যা করা যায় না বঙ্কিম দর্শনের সাহায্যে। অথচ আমাদের কিছু খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবী প্রমাণ করতে চাচ্ছেন, বঙ্কিমের চিন্তার মধ্যে বর্তমান বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের আকর রয়েছে।

বঙ্কিমচন্দ্রের একটি উপন্যাস আছে যার নাম আনন্দমঠ (১৮৮২)। বইটি মুসলিম বিদ্বেষে পরিপূর্ণ। এতে আছে বঙ্কিমচন্দ্র রচিত ‘বন্দেমাতরম’ গানটি। আছে ২৬টি পঙ্ক্তি গানটিতে। যার মধ্যে ২০টি পঙ্ক্তিই হলো সংস্কৃত ভাষায়। অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র চেয়েছিলেন সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে হিন্দু জাগরণ আনতে; ঠিক বাংলা ভাষার মাধ্যমে নয়।

ড. দীনেশচন্দ্র সেন তার বিখ্যাত History of the Bengali Language and Literature বইতে বলেন যে, বাংলা ভাষার বিকাশ সম্ভব হয়েছিল মুসলিম সুলতানদের শাসন আমলে। তারাই প্রথম করেছেন বাংলা ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা। এর আগে বৌদ্ধ ও হিন্দু রাজারা করেছেন সংস্কৃত ভাষার পৃষ্ঠপোষকতা। বঙ্কিমচন্দ্র, আমরা দেখলাম, তার আনন্দমঠে ‘বন্দেমাতরম’ গান রচনা করেছেন মূলত সংস্কৃত ভাষায়।

বাংলা ভাষার ইতিহাস নিয়ে যারা আলোচনা করেছেন, তাদের মধ্যে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার অন্যতম। তার মতে, ‘সপ্তদশ শতকের শেষ ও অষ্টাদশ শতকের প্রথমে এবং সম্ভবত ইহার পূর্বেই বাংলা গদ্যভাষার যে একটি সরল প্রাঞ্জল রূপ ছিল, তাহা সর্বাংশে সাহিত্যের উপযোগী। দেশীয় প্রবীণ সাহিত্যিকরা ইচ্ছা করিলে গদ্যে উৎকৃষ্ট রচনা করিতে পারিতেন। কিন্তু যে কোন কারণেই হউক তাঁহারা কবিতায় লেখা পছন্দ করিতেন।’ রমেশচন্দ্র মজুমদার তার এই সিদ্ধান্তে এসেছেন পর্তুগিজ খ্রিষ্টান পাদ্রীদের বাংলা গদ্যে রচিত গ্রন্থগুলোর গদ্যকে অনুশীলন করে। পর্তুগিজ মিশনারিরা এই বাংলা গদ্য লেখা শিখেছিলেন ঢাকার ভাওয়ালগড়ের কাছে অবস্থানের সময়।

তাই আমরা অনুমান করতে পারি, কেবল পশ্চিমবাংলায় নয়, পূর্ববঙ্গে ও বাংলা গদ্য প্রচলিত ছিল। বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে এই গদ্যের উদ্ভব হয়নি। বঙ্কিমচন্দ্রের জ্যেষ্ঠভ্রাতা সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় খুবই উন্নতমানের বাংলা লিখেছেন। তিনি তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা বঙ্কিমচন্দ্রের কাছ থেকে বাংলা গদ্য রচনা করতে শিখেছিলেন, এরকম অনুমান করা চলে না। ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হতে পেরেছে বঙ্কিমচন্দ্রকে নির্ভর করে- এরকম চিন্তাটাই ইতিহাসভিত্তিক নয়। অথচ আমাদের অনেক বুদ্ধিজীবী সেটা প্রমাণ করতে চাচ্ছেন। বাংলাদেশে বিখ্যাত হিন্দু বিপ্লবী সন্ত্রাসবাদী দল ছিল ‘অনুশীলন’ পার্টি। ‘অনুশীলন’ নামটি গৃহীত হয়েছিল বঙ্কিমচন্দ্রের আনন্দমঠ থেকেই। কোনো মুসলমানকে এই দলে গ্রহণ করা হতো না। এই দলের লক্ষ্য ছিল ‘হিন্দুরাজ্য’ প্রতিষ্ঠা। কেশব বলিরাম হেজওয়ার (Keshav Baliram Hedgewar) ছিলেন ভারতের মহারাষ্ট্রে নাগপুরের অধিবাসী।

তিনি সেখান থেকে কলকাতায় আসেন মেডিক্যাল কলেজে পড়াশোনা করতে। এখানে তিনি পরিচিত হন অনুশীলন পার্টির সমর্থকদের সঙ্গে। আর হয়ে গেলে তাদের রাজনৈতিক দর্শনে দীক্ষিত। তিনি ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে নাগপুরে ফিরে গঠন করেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ, যা এখন জঝঝ নামে বিশেষ পরিচিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জঝঝ-এর নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এমএস গোলওয়ালকার (গ.ঝ. এড়ষধিষশধৎ)। গোলওয়ালকার হয়ে ওঠেন হিটলারের আর্যবাদের বিশেষ ভক্ত। ভারতে আরএসএস এখন চাচ্ছে হিন্দুরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল একজন আরএসএস সদস্য হিসেবে। আরএসএস এর ভিত্তি অনুসন্ধান করলে আমরা যেয়ে পৌঁছাই বঙ্কিচন্দ্রের আনন্দমঠে। অথচ বাংলাদেশে এমন অধ্যাপকরা আছেন যারা এখন প্রমাণ করতে চাচ্ছেন বঙ্কিমচন্দ্র ছিলেন ‘একজন মানবতাবাদী’ এবং তিনি মোটেও মুসলিমবিদ্বেষী ছিলেন না।’

বাংলা ভাষার ইতিহাস ঘাঁটলে আমরা দেখি, এর গদ্যের বিকাশে ব্যাপটিস্ট খ্রিষ্টান মিশনারি উইলিয়াম কেরি, মার্শম্যান, ওয়ার্ড প্রমুখ পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এরা কেবল ধর্ম বিষয়ে গদ্যে বই লেখেননি। বই লিখেছেন জ্ঞান-বিজ্ঞানের নানা শাখায়, যেমন : ভূগোল ও জ্যোর্তিবিজ্ঞানে। বাংলা গদ্যবিকাশের ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব অনস্বীকার্য। ১৭৭৮ খ্রিষ্টাব্দে নাথানিয়েল ব্রেসি হেলহেড ইংরেজি ভাষায় রচনা করেন বাংলা ব্যাকরণ। তিনি এতে বাংলা বাক্যের দৃষ্টান্ত প্রথম ছাপার ব্যবস্থা করেন বাংলা অক্ষরে। ব্রিটিশ শাসন আমলে বাংলা ভাষা বাংলা হরফে ছাপানো আরম্ভ হয়।

পর্তুগিজ মিশনারিরা তাদের বই ছাপিয়েছিলেন রোমান অক্ষরে; বাংলা অক্ষরে নয়। মুসলমানদের মধ্যে প্রথম খুব উন্নতমানের বাংলা গদ্য লেখেন মীর মশাররফ হোসেন (১৯৪৮-১৯১২)। তিনি বাংলা গদ্য লেখতে শিখেছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে প্রকাশিত ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ পত্রিকার সম্পাদক কাঙাল হরিনাথের কাছ থেকে; বঙ্কিমচন্দ্রের কাছ থেকে নয়। আসলে আমরা যে বাংলা লিখে থাকি, তার উৎস খুঁজতে হয় কাঙাল হরিনাথের মধ্যে; বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে নয়।
‘মুক্তবুদ্ধি-চর্চা’ বলে একটি কথা আমরা ব্যাপকভাবে শুনছি। কিন্তু ‘মুক্তবুদ্ধি’ বলতে আসলে ঠিক কি বুঝতে হবে সে সম্বন্ধে কেউ কোনো পরিষ্কার ধারণা দিচ্ছেন না। মুক্তবুদ্ধি বলতে অনেকেই বোঝাতে চাচ্ছেন নাস্তিকতাকে। কিন্তু নামকরা বিজ্ঞানীদের মধ্যে আস্তিক বিজ্ঞানীর অভাব নেই।

যেমন : বিখ্যাত জার্মান বিজ্ঞানী বা বৈজ্ঞানিক ম্যাক্স প্লাঙ্ক ছিলেন আস্তিক। আইনস্টাইনও নিজেকে আস্তিক ইহুদি বলে দাবি করেছেন। একজন ব্রিটিশ বৈজ্ঞানিক বাইবেলের যথার্থতা নিয়ে লিখেছিলেন একটি গ্রন্থ। ‘আস্তিক হলেই মানুষ আর যুক্তিবাদী থাকে না’, এ রকম মনে করা যায় না। অথচ আমাদের দেশে কিছু বুদ্ধিজীবী ধর্মকে বোঝাতে চাচ্ছেন কেবলই ‘অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের ফল’ হিসাবে। উনবিংশ শতাব্দীতে বিলাতে একদল চিন্তক ব্যক্তি নিজেদের দাবি করতে থাকেন মুক্তবুদ্ধির সাধক হিসেবে।

এরাই প্রথম Rationalist Press স্থাপন করেন ১৮৯৯ সালে। তারা বিজ্ঞানবিষয়ক নানা গ্রন্থ ছাপিয়ে সুলভ মূল্যে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছিল। এরা সেসব গ্রন্থই ছাপান যাতে আস্তিকতার বদলে নাস্তিকতা প্রসার পায়। এসব পুস্তিকার একটা প্রভাব এসে পড়ে আমাদের দেশের চিন্তক মহলে।

কিন্তু এসব পুস্তকই যে, আমাদের চিন্তাচেতনার নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ায়, তা নয়। ঊনবিংশ শতকে যে ব্রিটিশ দার্শনিকের প্রভাব আমাদের দেশে চিন্তক ব্যক্তিদের ওপর সবচেয়ে বেশি পড়েছিল, তিনি হলেন জন স্টুয়ার্ট মিল (১৮০৬-১৮৭৩)। মিল ঠিক আস্তিক ছিলেন না। আবার তিনি যে নাস্তিক ছিলেন, এমনও নয়। তিনি ছিলেন অজ্ঞেয়বাদী। অর্থাৎ তিনি মনে করতেন, এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত করা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি মনে করতেন, ধর্মের উপযোগিতা আছে; কেননা ধর্মের অন্যতম গোড়ার কথা হলো মানুষ হিসেবে মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া। আর্তমানবতার সেবায় মানুষকে ধর্ম উৎসাহ প্রদান করে। এখানেই আছে ধর্মের বিশেষ সামাজিক উপযোগিতা।


আমরা আলোচনা করছিলাম বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় (১৯৩৮-১৮৯৪) কে নিয়ে। তার আগে জন্মেছেন এবং সাহিত্যচর্চা করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত (১৮২৪-১৮৭৩)। হিন্দুরা মেনে চলতেন মনুর বিধান। মনুর বিধানে সমুদ্র পাড়ি দেয়া নিষিদ্ধ। কিন্তু মাইকেল যেহেতু হিন্দুধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, তাই তার পক্ষে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়া হতে পেরেছিল যথেষ্ট সহজ। আর ইউরোপীয় সাহিত্যের ধ্যানধারণাকে তিনি গ্রহণ করতে পেরেছিলেন অনেক সহজেই। বঙ্কিমচন্দ্র নন, মধুসূদনই বাংলা ভাষা-সাহিত্যে আধুনিক ইউরোপীয় চিন্তাচেতনার প্রথম প্রবর্তক। তবে তিনি ‘সাহেব’ হতে চাননি যাকে আমরা বলতে চাই বাংলা ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ।

এর প্রথম প্রকাশ আমরা দেখি তার লেখার মাধ্যমে। অথচ আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবীরা মধুসূদনকে বাদ দিয়ে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদের আকর খুঁজতে চাচ্ছেন বঙ্কিমচন্দ্রের মধ্যে। এটা আমাদের কাছে মনে হচ্ছে বিস্ময়কর। আমার হাতে সেদিন একটা পত্রিকা এসে পড়ল ‘নতুন এক মাত্রা’ নামে। এর সম্পাদক হলেন আল মুজাহিদী। আল মুজাহিদী একজন প্রথিতযশা সাংবাদিক। তারা কেন এ সময় বঙ্কিমচন্দ্রকে এতটা গুরুত্ব দেয়ার যুক্তিযুক্ত বোধ করলেন, জানি না।

তবে এ দেশে অনেক ভারতপন্থী বুদ্ধিজীবী আছেন যারা বঙ্কিমকে সামনে এনে চাচ্ছেন আমাদের বর্তমান জাতিসত্তা সম্পর্কে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে। এরকম প্রবন্ধ প্রকাশ করা এ চেষ্টার আনুকূল্য প্রদান করে। কৌতূহলী পাঠক যদি পত্রিকাটির (ভাদ্র-আশ্বিন ১৪২৫/ সেপ্টেম্বর-আক্টোবর ২০১৮, শরৎ সংখ্যা) এই বিশেষ সংখ্যা সংগ্রহ করেন এবং সেখানে বঙ্কিমচন্দ্র সম্পর্কে যা আলোচিত হয়েছে, তার সঙ্গে মিলিয়ে আমার বর্তমান আলোচনা পাঠ করেন, তবে এই লেখার যুক্তিবিন্যাস পাঠকের কাছে অনেক সহজে প্রকটিত হতে পারবে।


লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ