১৬ অক্টোবর ২০১৮
সময়-অসময়

জনসংখ্যা ১৬ কোটি, বিবেকবান কতজন?

বাংলাদেশের পূর্ব ইতিহাস অনেক নির্মম। যারাই রাজ্য শাসন করেছেন, কেউই নিয়তির আক্রোশ থেকে রক্ষা পাননি। অন্য দিকে, ‘প্রকৃতির’ তমাল দৌরাত্ম্যের সাথে যুদ্ধ করেই এ জাতিকে টিকে থাকতে হচ্ছে। জলোচ্ছ্বাস, টর্নেডো, সুনামি, ঝড়-তুফান, বন্যা, খড়ার পাশাপাশি রয়েছে নদীভাঙন। সকালে যে আমির ছিল, ফকির হয়ে যায় সন্ধ্যা বেলা।

দুর্ভিক্ষের পাশাপাশি রিলিফ চুরি, টেন্ডারবাজির পাশাপাশি রডের বদলে বাঁশ দিয়ে মফস্বল এলাকায় সরকারি অফিস বা হাসপাতাল নির্মাণ, সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা (এ প্রবণতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে) প্রভৃতি ঘটনাকে হার মানিয়ে দেয় যখন চোখের সামনে দেখা যায় মিথ্যার কাছে জাতি পরাজিত হচ্ছে। হিটলারের প্রচার কর্মকর্তা গোয়েবলস মিথ্যাকে সত্যে পরিণত করার একটি দুষ্টক্ষত হিসেবে বিশ্ব রাজনীতিতে পরিচিত।

বর্তমানে মিথ্যাকে যেভাবে সত্যে পরিণত করা হচ্ছে, তাতে গোয়েবলস বেঁচে থাকলে আমাদের দেশের বুদ্ধিজীবী বা কর্তাব্যক্তিদের কাছে শিষ্যত্ব গ্রহণ করত। ‘জবাবদিহিতা’ নামক শব্দটি মনে হয় অভিধান থেকে উঠে যাবে। কারণ- যিনি যে দায়িত্বেই থাকুক না কেন, হোক সাংবিধানিক পদে বা নিম্ন পর্যায়ের, সবাই যেন এখন জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে ।

প্রজাতন্ত্রের যারা কর্মচারী বা কর্মকর্তা বা সর্বোচ্চ পদ থেকে চৌকিদার পর্যন্ত যারা শুধু জনগণের অর্থে কেবল লালিত পালিত নয়, বরং সীমাহীন সুখ-স্বাচ্ছ্যন্দ ভোগ করার পরও শুধু নিয়োগকর্তার সন্তুষ্টি লাভের জন্য মিথ্যাকে সত্য এবং সত্যকে মিথ্যা বলে চালিয়ে দিয়ে নির্দিধায় জনগণকে বঞ্চিত করছেন ন্যায্য অধিকার থেকে।

বর্তমান সমাজব্যবস্থায় ‘তেলের বাটি’ যেন একমাত্র যোগ্যতার মাপকাঠী। ‘কর্তা খুশি তো সব খুশি’ এ বিবেচনায়ই চলছে প্রশাসন ও সার্বিক ব্যবস্থা। ব্রিটিশ সমাজ ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় ব্লু ব্লাড বলতে একটা সমাজ রয়েছে, যাদের জন্য আইন ও আইনের শাসন অনেক শিথিল থাকে। বাংলাদেশেও একটি ব্লু ব্লাড সৃষ্টি হয়েছে, যারা ক্ষমতায় রয়েছে তাদের মধ্য থেকে।

ব্লু ব্লাডের প্রতিনিধি ও রক্ত-কণিকা ছড়িয়ে পড়েছে দেশব্যাপী। যারা ব্যবসা, বাণিজ্য, ঠিকাদারি, সর্দারি, মাতব্বরি সবই নিয়ন্ত্রণ করে এবং যাদের সেবাদাস হিসেবে সদা প্রস্তুত রয়েছে পুলিশ ও প্রশাসন। ব্লা ব্লাডেরা যেহেতু রাষ্ট্র ও সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করছে, সেহেতু সুবিধা সন্ধানী ও সুবিধাভোগীরা তাদের পক্ষেই হাততালি দিচ্ছে, যোগান দিচ্ছে সমস্ত শক্তি এবং লুটে খাচ্ছে সাধারণ জনগণের আহার। বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন তারা, যারা বিবেকের তাড়নায় বোল পাল্টিয়ে ব্লু ব্লাডের পদতলে নিজেকে আত্মাহুতি দিতে পারেননি।

বাংলাদেশে আমলাতন্ত্রের বেতন-ভাতা চলে জনগণের কষ্টার্জিত অর্থে। কিন্তু তারা ব্লু ব্লাডের সেবাদাসে পরিণত হয়েছে। অথচ সংবিধান বলছে, [অনুচ্ছেদ ২১(২)] ‘সকল সময়ে জনগণের সেবা করিবার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।’ অথচ নিচে উল্লিখিত ঘটনা থেকেই উপলব্ধি করা যাবে, জনগণের বেতনভুক্ত আমলাতন্ত্র দল-মত নির্বিশেষে জনগণকে কতটুকু ‘সেবা’ দিয়ে যাচ্ছে? ঘটনাটি হলো একদিন (২০১৮ জানুয়ারি) সুপ্রিম কোর্টের একজন স্বনামধন্য ব্যারিস্টার গাজীপুর জেলার সাভারে গিয়েছিলেন তার একটি ব্যক্তিগত কাজে।

হঠাৎ একটি ট্রাক উল্টো পথে এসে গাড়িটিকে ভেঙে দুমড়েমুচড়ে দেয়ায় তিনি নিকটস্থ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার শরণাপন্ন হলে ওসি ব্যবহারটা এমন করলেন যে, মামলা নেয়া তো দূরের কথা, ব্যারিস্টারকে ওসি পাত্তা না দিয়ে পাল্টা তার (ব্যারিস্টারের) দোষ খুঁজতে থাকেন। ব্যর্থ মন নিয়ে পরের দিন ব্যারিস্টার শরণাপন্ন হলেন এক দূরসম্পর্কীয় মামা, যিনি পুলিশের একজন ডিআইজি (পুলিশের উপ-মহা পরিদর্শক)।

ডিআইজি ফোন করে ব্যারিস্টারকে সহযোগিতা করার জন্য ওসিকে বলে দিলে ব্যারিস্টার পরের দিন থানায় পৌঁছা মাত্র ওসি এগিয়ে এসে ব্যারিস্টারকে বলেন, ‘আপনি তো আমার মামা লাগেন, এখন বলেন আপনার জন্য আমি কী করতে পারি?’ তখন ওসি ট্রাক ড্রাইভার ও মালিককে ডেকে নগদ ক্ষতিপূরণ আদায় করে দিলেন। ফলে ব্যারিস্টারকে মামলা করতে হলো না, কোর্টে যেতে হলো না, নগদেই বিচার পেয়ে গেলেন শুধু ব্লু ব্লাডের (ডিআইজি) একটি টেলিফোনের কারণে। ভাগ্যহত এই জাতি, যার কোনো ব্লু ব্লাডের রেফারেন্স নেই সে এখন সর্বহারা। মার খেয়ে বিচার পাবে না, অথচ রেফারেন্স থাকলে খুনিও প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াবে। নিজে আত্মতৃপ্তি লাভ করবে, অথচ খুনিকে খুনি বলা যাবে না, এটাই আমাদের সমাজব্যবস্থা।

দেশব্যাপী এখন সরকার কর্তৃক পুলিশকে বাদি করে গায়েবি মামলা হচ্ছে। গায়েবি মামলা অর্থাৎ যেখানে কোনো ঘটনা ঘটেনি, মিথ্যা-বানোয়াট কাহিনী সাজিয়ে প্রতি থানায় প্রতিদিনই মামলা হচ্ছে। যেখানে মৃত ব্যক্তি, বিদেশে অবস্থানরত ব্যক্তি, মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে এমন কেই গায়েবি মামলা অর্থাৎ গায়েবি গজব থেকে রক্ষা পাচ্ছেন না। জাতীয় পত্রিকান্তরে ৩ অক্টোবর ২০১৮ প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায়, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দেশব্যাপী গায়েবি মামলার সংখ্যা চার হাজার ৯৬টি। যার মধ্যে এজাহার নামীয় আসামি ৮৪ হাজার ৫৩৫ জন, অজ্ঞাত রয়েছে ২৭ হাজার ৩০৭৫ জন। দণ্ডবিধির ১৭৭ ধারা থেকে ২২১ ধারা পর্যন্ত মিথ্যা মামলা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া, মিথ্যা সার্টিফিকেট দেয়া প্রভৃতি অপরাধের জন্য শাস্তির বিধান থাকা সত্ত্বে¡ও পুলিশ জেনেশুনে ঊর্র্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে কিভাবে মিথ্যা ও গায়েবি মামলা সৃজন করছে? সরকারের আমলা বা পুলিশের বড় কর্মকর্তাদের দায়িত্ব কি মিথ্যা মামলা দিয়ে মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করা? পুলিশ কি জবাবদিহিতার ঊর্র্ধ্বে?

দেশে মানুষ যারা শেখ হাসিনা সরকারের জয়গান গায় না, তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। গায়েবি মামলা অর্থই জেল ও রিমান্ড। ম্যাজিস্ট্র্রেট গায়েবি মামলা মিথ্যা জেনেই রিমান্ড দিচ্ছেন। রিমান্ডে কী পরিমাণ বাণিজ্য তা এ দেশের সন্তান হিসেবে নিশ্চয় ম্যাজিস্ট্র্রেটরা জানেন। তা জানা সত্ত্বে¡ও রিমান্ড দিচ্ছে সব প্রার্থিত মামলায়। এ জন্যই কি দেশ স্বাধীন হয়েছিল?

নারায়ণগঞ্জ জেলার আইনজীবীদের সূত্রে জানা যায়, কোনো রাজনৈতিক মামলায় জামিন দেয়া যাবে না বলে ১ অক্টোবর ২০১৮ জেলা ও দায়রা জজ প্রকাশ্যে আদালতে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি জেলার সর্বোচ্চ বিচারক, দাঁড়িপাল্লাখচিত চেয়ারে বসে তিনি ন্যায় ও ইনসাফ করার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। রাজনৈতিক মামলা বা রাজনীতির প্রতি তার এত অ্যালার্জি থাকবে কেন? রাজনীতি যদি এ দেশে নিষিদ্ধ হয়ে যায় তবে স্বাধীনতার প্রয়োজন কী ছিল? রাজনীতি আছে এবং ছিল বলেই তো বাংলা ভাষা মাতৃভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। রাজনীতি ছিল বলেই বাংলাদেশের ছেলে সন্তানেরা এ দেশে বিচারকের আসন অলঙ্কৃত করতে পেরেছেন। তারপরও রাজনীতির প্রতি অ্যালার্জি হওয়ার কারণ কী হতে পারে?

এ দেশের একটি বুদ্ধিজীবী সমাজ রয়েছে, জাতির ক্রান্তিলগ্নে জাতির পাশে তারা এগিয়ে আসবেন এটাই জাতির প্রত্যাশা। কিন্তু তারাও এখন দলবাজিতে ব্যস্ত। সম্প্রতি জনগণের গলাকে টিপে ধরার জন্য প্রণীত ডিজিটাল আইন ২০১৮ সম্পর্কে তাদের ঐক্যবদ্ধ কোনো রা নেই। সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ মোতাবেক চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দান ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে। অথচ ডিজিটাল আইন ২০১৮-এর কুফল সম্পর্কে সরকার ঘরানার হাই প্রোফাইল বুদ্ধিজীবীরা এখন নীরব নিস্তব্ধ। অন্য দিকে, সাংবাদিকতা জগতের ঐক্যের প্রতীক জাতীয় প্রেসক্লাবকেও সরকারি ঘরানার সাংবাদিকরা কুক্ষিগত করে রেখেছে, সেখানে সরকারবিরোধী সাংবাদিকের প্রবেশ রুদ্ধ করে দিয়েছে। এটাই স্বচ্ছতা? এটাই কি গণতন্ত্র?

দেশে কিছু প্রতিষ্ঠান থাকা দরকার, যেখানে দল-মত নির্বিশেষে বসার, আলোচনা করার, অংশগ্রহণ করার জন্য খোলা থাকবে, যেমন- বাংলা একাডেমি। কিন্তু সেই বাংলা একাডেমিকেও কুক্ষিগত করে রাখা হয়েছে একটি অনির্বাচিত কমিটি দিয়ে যার সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন সরকার ঘরানার দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবী, যাকে সম্প্রতি কলকাতার সম্মাননা দেয়া হয়েছে। তারা মুখে বলেন স্বাধীনতার চেতনার কথা, অথচ কর্ম হলো একনায়কতন্ত্র।

একটি রাষ্ট্র বা জাতির ভারসাম্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যায়, যখন সাদাকে সাদা এবং কালোকে কালো বলার মানসিকতা মানুষ হারিয়ে ফেলে। পাছে লোকে কিছু বলে বা নিজেকে ক্ষমতাসীনদের অনুকম্পার প্রত্যাশায় সত্যকে সাপোর্ট করা থেকে বিরত রাখে, তখনই মানুষ বলে জাতি বা রাষ্ট্র খাদের কিনারায়। পা পিছলে গিয়ে খাদে পড়া বা নিজেকে সুবিধাজনক অবস্থায় রাখা বা নিজেকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে খাদে ফেলা এক কথা নয়। ব্যর্থতা আর জাতির সাথে গাদ্দারি এক কথা নয়।

গণমানুষের জানমালের নিরাপত্তা এবং গণমানুষ রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের ভয়ে ঊর্র্ধ্বে থাকবে এটাই গণতন্ত্র ও সভ্য সমাজের দাবি। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, গণমানুষ যারা ক্ষমতাসীনদের বিরোধী তারা এখন রাষ্ট্রের ভয়ে সবচেয়ে বেশি কাতর থাকে। তারপরও কি যেখানে সরকারের সমালোচনাকারীদের আশ্রয় পাওয়ার কথা তার কি বাস্তবায়ন হচ্ছে?

জাতির সামনে আজ প্রশ্নÑ জাতি দাঁড়াবে কোথায়? নিজের স্বার্থের চেয়ে জাতির স্বার্থ যদি মানুষ আগে না দেখে, সবাই যদি ভয়ভীতি, প্রলোভন, কামনা-বাসনার কাছে নিজের বিবেককে বিক্রি করে দেন, এ অবস্থায় একটি ‘হক কথা’ জন্য জাতি কার দ্বারস্থ হবে? এ জন্যই বারবার একটি কথা স্মরণে আসে, জনসংখ্যা ১৬ কোটি, বিবেকবান মানুষ আছে কতজন?


লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ