১৬ অক্টোবর ২০১৮

বিচারপতি সিনহার যে স্বপ্ন ভেঙে খান খান হয়ে গেছে

বিচারপতি সিনহার ‘ব্রোকেন ড্রিম’ সিনড্রম! - ছবি : সংগৃহীত

বিষয়টি এখন রীতিমতো হট কেকে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে বসবাসরত বাংলাভাষী মানুষ ছাড়াও আরো বহু দেশ জাতি ও বর্ণ-সম্প্রদায় বিষয়টি নিয়ে চায়ের টেবিলে ঝড় তুলেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে, এমন দেশগুলোর রাজনৈতিক ব্যক্তিরা, প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, বিচার বিভাগ, সংসদ এবং সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানরাও বিষয়টির ওপর নজর রাখতে শুরু করে দিয়েছেন। আমাদের দেশের ক্ষমতাসীন দল দশমুখে বিষয়টি নিয়ে তাদের তীব্র ঘৃণা, ক্ষোভ ও খিস্তিখেউর প্রকাশ করে যাচ্ছে। অন্য দিকে, বর্তমান সরকারবিরোধী শক্তিগুলো সর্বোচ্চ কৌশল অবলম্বন করে যে যার মতো, নিজ নিজ অবস্থানে থেকে বিষয়টি থেকে সর্বাধিক ফায়দা লোটার চেষ্টা করছে। ফলে বাংলাদেশের সাবেক আলোচিত ও সমালোচিত প্রধান বিচারপতি, এস কে সিনহা রচিত বইটি এ মুহূর্তে স্মরণকালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্ঘটনার হট কেকরূপে সব মহলের কাছে রসনার রসদরূপে আবির্ভূত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রায় সব রাজনীতিসচেতন মানুষ সিনহার বিষয়টি যার যার আঙ্গিক থেকে বিগত কয়েক বছর ধরে খুব ভালো করেই জানেন। বাংলাদেশের যে বাস্তব পরিস্থিতি, তাতে কোনো বিচারপতির নাম-ধাম, পরিবেশ-পরিচিতি সাধারণত জনগণ জানে না। আমাদের জেলা জজ আদালত, হাইকোর্ট ও আপিল আদালতে কারা বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন, তা কেবল বিচারসংশ্লিষ্ট উকিল-মোক্তার, বাদি-বিবাদি এবং আদালতকেন্দ্রিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও মামলাবাজ-টাউট এবং দালাল-ফড়িয়ারাই খোঁজখবর রাখেন। তাদের মুখেই বিচার বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট বিচারকদের সুনাম-দুর্নাম রচিত ও প্রচারিত হয়। ইতিহাসের মহাক্ষণে বিভিন্ন রাজনৈতিক উত্থান-পতন ও পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে কিছু বিচারপতির নাম স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকে। তেমনি তাদের কারো কারো নামের সামনে-পেছনে বহু বিতর্ক জুড়ে দেয়া হয়। বাংলাদেশে এসকে সিনহার নাম প্রথমবার পরিচিতি লাভ করে একটি বিতর্কের মাধ্যমে। যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে সংঘটিত স্কাইপে কেলেঙ্কারির সুবাদে সিনহাকে আমরা সে সময়ে একজন কট্টর সরকার সমর্থক হিসেবে আবির্ভূত হতে দেখেছিলাম, যা তিনি দেশত্যাগের পূর্বক্ষণ পর্যন্ত বারবার প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন।

দেশের সর্বোচ্চ আদালতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজন বিশ্বাস করতেন যে, সিনহার সাথে সরকারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। অনেকে আবার তাকে ভারতের দক্ষিণপন্থী শাসক গ্রুপের মনোনীত প্রতিনিধিরূপে সন্দেহ পোষণ করতেন এবং সে কারণে তাকে সব সময় অতিরিক্ত তোয়াজ-তদবির করে চলতেন। স্কাইপে কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে সিনহা ক্রমেই তরতর করে ক্ষমতার শীর্ষপর্যায়ে উঠতে উঠতে যখন প্রধান বিচারপতির চেয়ারে বসলেন, তখন বিচার বিভাগ এবং তার নিজের পেশাগত জীবনে ভরা পূর্ণিমার জোয়ার এবং চাঁদের আলো একত্রে মিলেমিশে এক অপূর্ব জ্যোতি ছড়াচ্ছিল। তিনি যখন বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি হলেন, তখন পদটির মান-মর্যাদা, বৈভব, প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং ক্ষমতার বৃত্ত ও বলয় ছিল ঈর্ষণীয় পর্যায়ে। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আমরা যদি পঞ্চদশ সংশোধনীর পূর্বাবস্থা, যুদ্ধাপরাধের ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং ২০০৯ থেকে ২০১৪ সাল অবধি বিচারালয়ের কিছু প্রেক্ষাপট বর্ণনা করি, তো হালে আজকের প্রসঙ্গের যথার্থতার সন্ধান মিলবে।

২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মাধ্যমে নবম পার্লামেন্ট গঠিত হলে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসে। ২০০৯ সালের পুরোটা সময় দেশের বিচারাঙ্গন গতানুগতিকভাবেই চলে আসছিল। সরকার পূর্বতন সরকারগুলোর মতোই রুটিন ওয়ার্ক করে যাচ্ছিল। বিচারক নিয়োগ, অধস্তন আদালতের নিয়োগ-বদলি, অ্যাটর্নি জেনারেলের অফিস এবং আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকাণ্ডে এমন কিছুই দেখা যাচ্ছিল না যা আগের সরকারগুলো করেনি।

আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে যুদ্ধাপরাধের বিচারের প্রসঙ্গ ছিল। নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি নিয়ে গরজ দেখাচ্ছিলেন না। এ অবস্থায় ২০০৯ সালের একটি পার্লামেন্ট অধিবেশনে একজন সংসদ সদস্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বের গ্রিন সিগন্যাল বা দলীয় হাইকমান্ডের বুদ্ধি-পরামর্শ ছাড়াই হঠাৎ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে একটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করলে মুহূর্র্তের মধ্যে সংসদের অবস্থা সবার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং অনেকটা আকস্মিকভাবে সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়।

উল্লিখিত সিদ্ধান্ত প্রস্তাবের আলোকে ২০০৯ সালের মধ্যে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট সংশোধন করে ২০১০ সালে নতুন আইন পাস করে গেজেট প্রকাশ করা হলো। এ আইনের সূত্রে ২০১২ সালের মার্চ মাসে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য আলাদা ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারক, প্রসিকিউটর এবং অন্যান্য কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। সরকার শুরু থেকেই চাচ্ছিল, নির্বাচনী ওয়াদা পালনের জন্য প্রতীকী বিচার করতে। কিন্তু একশ্রেণীর সুবিধাবাদী লোক ঘোলা পানিতে মাছ শিকারে নেমে নিজেদেরকে ক্ষমতা ও আলোচনার পাদপীঠে আনার জন্য উঠেপড়ে লাগেন। তারা সরকারকে বাধ্য করেন সরাসরি কনফ্রন্টেশনে জড়িয়ে ফেলার জন্য যা গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলনের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল। এরই মধ্যে অভাবিতভাবে সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী পাস হয়ে যায় ২০১১ সালের ৩০ জুন- যার মাধ্যমে নির্বাচনীব্যবস্থায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল হয়ে গেল।

সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী এবং যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম নিয়ে টানা কয়েক বছর, ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সব আলোচনা-সমালোচনার শীর্ষে ছিল বিচারাঙ্গন। পত্রপত্রিকা, সামাজিকমাধ্যম, ইলেকট্রনিক মিডিয়া, হাট-বাজার-গ্রাম-গঞ্জ- সর্বত্রই আইন-আদালত নিয়ে প্রতিদিন চায়ের কাপে ঝড় উঠতে থাকে। এরই মধ্যে স্কাইপে কেলেঙ্কারি এবং জনৈক বিচারপতির হম্বিতম্বির কারণে বিচারাঙ্গন, বিশেষ করে সুপ্রিম কোর্টের কর্মকাণ্ডের প্রভাব ক্রমেই বাড়তে থাকে। ওই সময়ে বিচারাঙ্গনের ক্ষমতা পার্লামেন্ট, মন্ত্রিপরিষদ, সিভিল সার্ভিস, পুলিশ সার্ভিস থেকে শুরু করে রাষ্ট্র ক্ষমতার সব স্তরে ও সাধারণ নাগরিক জীবনে কাঁপন ধরিয়ে দেয় এবং কিছু ক্ষেত্রে বিব্রতকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। উড়ন্ত বিমানে যথাযোগ্য সম্মান না পেয়ে জনৈক বিচারকের আদালতে বিমানের কর্তাব্যক্তিদেরকে তলব করে যাচ্ছেতাই ব্যবহার, রাস্তায় ট্রাফিক মোড়ে আদালত বসানো, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, সম্মানিত সুধী ও নাগরিকবৃন্দ, শীর্ষ ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী ও পেশার লোকজনকে হাইকোর্টে তলব করে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা, ইত্যাদির মাধ্যমে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়, যার কারণে আদালত অবমাননার ভয় প্রত্যেক সভ্য ও ভদ্রমানুষকে তাড়া করতে থাকে।

২০১২ সালে সরকার এবং হাইকোর্ট বিভাগের মধ্যে দুটো ঘটনা ঘটে; যার ফলে বিচার বিভাগের ক্ষমতা আরো নিরঙ্কুশভাবে প্রমাণিত হয়ে যায়। একবার হাইকোর্টের একটি বেঞ্চের বিচারক বিচার চলাকালে সংসদের তৎকালীন স্পিকার এবং বর্তমানের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সম্পর্কে বেপরোয়া মন্তব্য করেন। পুরো সংসদ ক্ষোভে-বিক্ষোভে অনেক কিছু করার পরও সংশ্লিষ্ট বিচারকের টিকিটি স্পর্শ করা তো দূরের কথা- তার একটি কেশাগ্রে ফুঁ দিতেও সক্ষম হয়নি। আরেকটি ঘটনায়, হাইকোর্ট স্বপ্রণোদিত হয়ে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের মালিকানাধীন সড়ক ও জনপথ বিভাগের প্রধান কার্যালয়কে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করে তা নজিরবিহীনভাবে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণের সঙ্গে একীভূত করে নেন। সরকার এ ক্ষেত্রে সামান্য টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করেনি। অন্য দিকে, ওই দফতরের হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের দীর্ঘ দিনের স্মৃতিবিজড়িত ভবন ও প্রাঙ্গণ ছেড়ে দিয়ে মুখে তালা এঁটে অন্যত্র চলে যান। সরকারের জনপ্রিয় কথক এবং যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরও বিষয়টি নিয়ে সামান্য প্রতিক্রিয়া পর্যন্ত দেখাতে সাহসী হননি।

এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এস কে সিনহা যখন প্রধান বিচারপতির আসনে বসেন, তখন তার জৌলুশ ছিল দেখার মতো। কিন্তু শুরুতেই দুটো ঘটনায় তার ছন্দপতন ঘটে যায়। প্রথমটি ছিল, সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের সঙ্গে তার বিরোধ এবং দ্বিতীয়টি হলো, আপিল বিভাগের সদ্য সাবেক বিচারপতি শামসুদ্দীন চৌধুরী মানিকের সঙ্গে রীতিমতো যুদ্ধাবস্থার মতো দ্বন্দ্ব সঙ্ঘাত। উভয় ঘটনাতেই তিনি বিজয়ী হন বটে; কিন্তু তার ইমেজে বেশ কিছু কালির আঁচড় লাগে।

তিনি কী প্রক্রিয়ায় হাইকোর্টের বিচারপতি হয়েছিলেন, ‘এক-এগারো’র সময় তাকে নিয়ে সৃষ্ট ঘটনা এবং পরবর্তীকালে আপিল বিভাগে নিয়োগ এবং প্রধান বিচারপতি পদে আসীন হওয়ার পেছনে নানা গল্প-গুজব ও কল্পকাহিনীর মধ্যে তার সনাতন ধর্মের অনুসারী হওয়া, ভারত সংযোগ এবং সরকারপ্রধানের সাথে ব্যক্তিগত সুসম্পর্ককে লোকজন বেশি প্রাধান্য দিয়েছে। প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর তিনি রীতিমতো সুবক্তা হয়ে ওঠেন। তার বিভিন্ন বক্তৃতা-বিবৃতি, মন্তব্য ও সিদ্ধান্ত প্রায়ই জাতীয় দৈনিকগুলোর শিরোনামে পরিণত হয়। প্রধান বিচারপতি হিসেবে তিনি তার চলাফেরা, গণযোগাযোগ এবং কর্মকাণ্ড বহু গুণে বাড়িয়ে দেন। তার বহু কর্মকাণ্ড সরকারকে বিব্রত করে তোলে এবং সরকারপ্রধান ক্রমেই তার প্রতি বিশ্বাস ও আস্থা হারিয়ে ফেলেন।

জনাব সিনহা রাজনীতির মানুষ না হওয়া সত্ত্বে¡ও রাজনীতির কারিশমার দ্বারা আকৃষ্ট হয়ে পড়েন। অভিযোগ আছে, তিনি গোপনে ও প্রকাশ্যে সরকারবিরোধীদের সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ রক্ষা করতেন। তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল এবং সরকারের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গেও সুসম্পর্ক রক্ষা করতেন। তার আচরণ ও কথাবার্তা ছিল নিদারুণ দ্ব্যর্থবোধক এবং খুব কৌশলী। যুদ্ধাপরাধের মামলাগুলো- বিশেষ করে সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী, মতিউর রহমান নিজামী, মীর কাসেম আলী এবং মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মামলার চূড়ান্ত রায় ঘোষণার আগে তিনি বিচার চলাকালে এমন সব মন্তব্য করেন, যাতে মনে হয়েছিল যে, আসামিরা হয়তো খালাস পেয়ে যাবেন, নয়তো অপেক্ষাকৃত কম দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। ধারণা করা হয়, তিনি এসব করেছিলেন সরকারের প্রতিপক্ষকে সাময়িকভাবে ঠাণ্ডা রাখার জন্য। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি যে রায় দিয়েছিলেন, তাতে সরকারপক্ষ খুশি হলেও আসামি পক্ষ বেকুব হয়ে গিয়েছিল। তবে তার কৌশলের কারণে আসামিপক্ষ তাকে শত্রু মনে না করলেও সরকার তাকে ধীরে ধীরে বন্ধুর তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিল। কারণ সিনহার কৌশল বুঝার ক্ষমতাসম্পন্ন মেধাবী লোক ক্ষমতাসীন দলে খুব বেশি নেই।

দুটো ঘটনার কারণে জনাব সিনহা সরকারের শত্রুতে পরিণত হয়ে গেলেন। তবে তার দৃষ্টিতে ঘটনাগুলো ছিল রাষ্ট্রের জন্য কল্যাণকর, যা কিনা শেষ পর্যন্ত সরকারের ইমেজ বাড়াত। তিনি তার চিন্তাগুলো সরকারের উঁচু মহলে পৌঁছাতে পারেননি বা সে চেষ্টা করেননি। এ অবস্থায় তার কর্মকাণ্ড নিয়ে সরকারের মধ্যে অনাস্থা, অবিশ্বাস, সন্দেহ এবং বিরক্তি দিন দিন বাড়তে থাকে। প্রথম যে ঘটনা নিয়ে তার সঙ্গে সরকারের বিরোধ ঘটে, সেটা ছিল অধস্তন আদালতের ওপর মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তে সুপ্রিম কোর্টের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা নিয়ে। বহুলালোচিত মাসদার হোসেন মামলার রায় মোতাবেক নিম্ন আদালতের যাবতীয় কার্যক্রম সুপ্রিম কোর্টের ওপর ন্যস্ত হওয়ার কথা।

কিন্তু সরকারের নির্বাহী বিভাগ সেটি বাস্তবায়নে ততটাই গড়িমসি প্রদর্শন করে যা জনাব সিনহার জন্য রীতিমতো অবমাননাকর হয়ে ওঠে। তিনি এ ব্যাপারে ধৈর্যহারা হয়ে এমন কিছু মন্তব্য করতেন, যেগুলো পত্রিকায় ব্যানার হেডলাইন হতো এবং সরকারের সঙ্গে তার দূরত্ব বৃদ্ধি করত। পরিস্থিতির অবনতি হতে হতে ঘটনাক্রমে এমন পর্যায়ে পৌঁছে যখন সরকার মনে করতে থাকে যে, বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা পার্লামেন্টের হাতেই থাকা উচিত। সে মতে, সরকার তড়িঘড়ি করে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী সংসদে পাস করে নেয়। অন্য দিকে, হাইকোর্টও তড়িঘড়ি করে তা বাতিল করে দিলে জনাব সিনহা সরাসরি সরকারের মুখোমুখি অবস্থানে চলে আসেন। তার শত্রুরা পেছন থেকে তালি বাজাতে আরম্ভ করে দিলেন।

জনাব সিনহা তার সহকর্মীদের শ্রেণীস্বার্থ ও সম্মানের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে সরকারের সঙ্গে রীতিমতো লড়াই শুরু করেন এবং সেই লড়াইয়ে অত্যন্ত অপমানজনক ও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে তিনি পদ-পদবি ও দেশত্যাগে বাধ্য হন। প্রবাসে গিয়ে তিনি সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন ইংরেজিতে, যার শিরোনাম হলো ‘ব্রোকেন ড্রিম’ বা ভাঙা স্বপ্ন অথবা স্বপ্নভঙ্গ। বইটি প্রকাশের পর এ দেশের সরকারি দল এবং বিরোধী দল পরস্পরবিরোধী সমালোচনায় মুখর হয়ে উঠেছে। বইয়ে কোনো আশ্চর্যজনক ঘটনা প্রকাশিত হয়নি। কোনো অজানা উপাখ্যানও সন্নিবেশিত হয়নি। বইটির সাহিত্য মান, ঐতিহাসিক গুরুত্ব কিংবা ভাষাশৈলীর চমৎকারিত্ব নিয়েও বলার মতো কিছু নেই। তার পরও বইটি নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে লাগাতারভাবে, যার কারণে লেখক হিসেবে জনাব সিনহা তার বইটির আরো একটি পরিমার্জিত সংস্করণ বের করার ঘোষণা দিয়েছেন, যেখানে আরো নতুন তথ্য থাকবে বলে তিনি আগাম ঘোষণা দিয়ে পাঠকের চিত্তে চাঞ্চল্য সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন।
সিনহার বই নিয়ে আমাদের কোনো আগ্রহ নেই- বইটি যতটুকু পড়েছি তা না পড়লেই ভালো হতো।

কারণ বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা, বিচারকদের মানসিকতা ও চরিত্র নিয়ে তিনি যেসব তথ্য দিয়েছেন তা পড়তে চাই না। অন্য দিকে, বই এবং বইয়ের লেখক নিয়ে হাল আমলে পক্ষ-বিপক্ষে যেসব আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে তা-ও আমার মতে, ভালো নয়। তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রক্ষমতা, সরকার এবং সরকারি দল সাধারণত আম-দুধের মতো মিলেমিশে ক্ষমতার মধুচন্দ্রিমা উদযাপন করে। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতাই সব সময় প্রভুর ভূমিকায় থাকে এবং তাদের দয়ার পাত্র-পাত্রীরা চরণদাস বা চরণদাসীর মর্যাদায় বিভিন্ন পদ-পদবিতে গড়াগড়ি দেয়।

বড় বড় পদে নিয়োগ লাভের জন্য কোনো ব্যক্তি যদি রাজনীতিবিদদের পদ চুম্বন করে কর্মযোগ ঘটায়, তবে তার উচিত সারা জীবন মালিকের বন্দনা করা। চাকর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে যেভাবে মাথা নোয়ানো থাকে, মুখে কৃতজ্ঞতা, ভয়-অনুরাগ ও আনুগত্যের বলিরেখা ফুটে ওঠে, ঠিক একই নিয়মে কর্মের শেষ দিন পর্যন্ত মাথা, হাত ও মুখের অনুশীলন বজায় রাখতে হয়। অন্যথায়, মালিকের চাবুকে চাকরের পৃষ্ঠদেশ ও পশ্চাদ্দেশ রঞ্জিত হলে তৃতীয়পক্ষের কী-ইবা করার থাকে!

রাজনৈতিক নেতৃত্বের মন-মানসিকতা তার সব নেতাকর্মী, সুবিধাভোগী ‘হোন্ডা-গুণ্ডা-পাণ্ডা’ এবং প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রতি মোটামুটি একই রকম থাকে। রাষ্ট্রের প্রশাসনে কর্মরত কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী যদি রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছ থেকে করুণা-অনুগ্রহ-দয়া-দক্ষিণ্য-আনুকূল্য ইত্যাদি গ্রহণ করেন তবে তার হালত যাই হোক না কেন, সে ক্ষেত্রে নেতা-নেত্রী তাকে একজন অযোগ্য দলীয় দুর্বৃত্ত বৈ অন্য কিছু ভাবেন না। যিনি যোগ্যতার পরিবর্তে পদলেহন করে পদ-পদবি পেতে চান অথবা যিনি প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অন্ধকার পথে হেঁটে কারো দয়ায় যদি কিছু লাভ করেন, তা হলে সারাটি জীবন তার নিয়োগকর্তা তাকে সম্মান ও মর্যাদা দেয়ার প্রয়োজন মনে করেন না।

এ ধরনের ঘটনা যেখানে ঘটে, সেখানে যদি মালিক তার অযোগ্য চাকরকে হঠাৎ তোয়াজ-তদবির শুরু করেন, তবে মালিকের পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে। বিপরীতে, কোনো সুবিধাবাদী চাকর যদি হঠাৎ তার নিয়োগকর্তার কাছ থেকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ সম্মান ও স্বীকৃতি দাবি করে বসে, তবে তার পতনও হয় নিদারুণ শোচনীয়। আমি মনে প্রাণে স্বপ্ন দেখতে চাই যে, জনাব সিনহার ক্ষেত্রে তৃতীয় বিশ্বের চিরায়ত রাজনৈতিক নিয়োগের কলাকৌশল প্রয়োগ হয়নি। তিনি আপন যোগ্যতা, বলিষ্ঠ মেধা ও অনন্য কর্মদক্ষতায় আপন অবস্থানে পৌঁছে গিয়েছিলেন এবং নিজেকে নিয়ে, দেশ ও জাতিকে নিয়ে সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখেছিলেন, যা হয়তো তার নিজের বিবেচনায় ভেঙেচুরে খানখান হয়ে গেছে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

 


আরো সংবাদ