২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

অসহায় গণমানুষ অসহায় গণতন্ত্র

অসহায় গণমানুষ অসহায় গণতন্ত্র - ফাইল ছবি

অনির্বাচিত বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনায় অতি উৎসাহী পুলিশ দেশব্যাপী থানায় থানায় একই ধারা, অর্থাৎ ১৯৭৪ সালের ১৫(৩) এবং বিস্ফোরক উপাদানাবলি (সংশোধন) আইন ২০০২-এর ৩ক ধারায় সিরিজ মামলা করা হচ্ছে; যাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ক্ষতি করার উদ্দেশ্যে আত্মঘাতী কাজ করাসহ দেশের সম্পদের ক্ষতি করার জন্য গোপন বৈঠকের অভিযোগসহ পুলিশ কাল্পনিক ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলে বিএনপি (নেতাকর্মী ও সমর্থক) পুলিশের ওপর ককটেল নিক্ষেপের অভিযোগ। গতকাল ডেইলি স্টারের এক খবরে জানা গেল, পুলিশ ৮৫ বছর বয়স্ক একজনের বিরুদ্ধে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ চালানোর পরিকল্পনার জন্য গোপন বৈঠকের অভিযোগ এনে মামলা করেছে, অপরজন যিনি বিদেশে অবস্থান করছেন, তার বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে।

বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ স্বাধীনতা-উত্তর আওয়ামী লীগ সরকার প্রণীত। বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ একটি নির্যাতনমূলক আইন, যা পরিবর্তনের জন্য জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলের ম্যানিফেস্টোতে থাকলেও সরকার গঠনের পর কেউ আর তা পরিবর্তন করেনি। আইনটি কালো আইন হিসেবে বিবেচিত। এ জন্য আইনটি অত্যন্ত সতর্কতার সাথে প্রয়োগ করার জন্য উচ্চ আদালতের অবজারভেশন রয়েছে। কিন্তু সরকার ব্যবহার করছে মানুষের স্বাধীনতা হরণ করার জন্য। এ ছাড়াও বিরোধী দলকে নিপীড়নের জন্য সময়ে সময়ে অবিবেচকের মতো এটা ব্যবহার হয়েছে। এমনকি এক-এগারোর অসাংবিধানিক সরকারও আইনটি প্রয়োগের মাধ্যমে ডিটেনশন দিয়েছে রাজনৈতিক নেতাদের। বাংলাদেশ সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বরাত দিয়ে বহুলপ্রচারিত জাতীয় দৈনিকগুলোতে গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ একটি সংবাদ প্রকাশ হয়েছে, যা নিম্নরূপ-

‘আমরা কাউকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করি না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে গ্রেফতার করা হচ্ছে। গ্রেফতার নিয়ে বিএনপির অভিযোগ মিথ্যা। বিএনপির যেসব ব্যক্তি গ্রেফতার হচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ রয়েছে। এসব অভিযোগের ভিডিওচিত্র রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল। রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে বাংলাদেশ ছাত্র যুব ঐক্য পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির ত্রিবার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা কে কোথায় কী করছেন তার প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। আমাদের কাছে ভিডিও ফুটেজ রয়েছে। গ্রেফতার নিয়ে বিএনপি যে অভিযোগ করেছে, তা মিথ্যা। এসবে কান দিয়ে জনগণের সময় নষ্ট করার দরকার নেই। তারা যদি কোনোটি নিয়ে চ্যালেঞ্জ করে তাহলে আমরা স্পষ্ট করে বলতে পারব, কী অভিযোগে ধরা হয়েছে। নিরপরাধ কাউকে তো গ্রেফতার করা হচ্ছে না। পারলে প্রমাণ করেন, বিএনপি নেতাকর্মীরা অপরাধী নন।’

ব্রিটেনে একটি প্রবাদ আছে- King can not do Wrong. বাংলাদেশের প্রশ্নেও যদি তাই হয়, তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে কোনো বক্তব্য নেই। যদি তাই না হয়, তবে মন্ত্রীকে তার বক্তব্য ঈমানি দায়িত্বের সাথে খতিয়ে দেখার অনুরোধ করব। ‘আমরা কাউকে বিনা অপরাধে গ্রেফতার করি না’ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই চ্যালেঞ্জিং বক্তৃতার পরিপ্রেক্ষিতে বলা বাহুল্য, দেশব্যাপী সম্প্রতি দেশের সার্বভৌমত্বকে নষ্ট করার কাল্পনিক অভিযোগে নাশকতার পরিকল্পনার মিথ্যা ও ভৌতিক অভিযোগে যে সিরিজ মামলা পুলিশ করছে, তা কি সবই সত্য? যদি তাই হয়, তবে বিদেশে বা হজে থাকা ব্যক্তিদের বিএনপি করার কারণে আসামি করা হচ্ছে কেন? কেনই বা ৮০ বছরের বেশি বয়সের বয়সী বিএনপি নেতাকর্মী এবং মৃতব্যক্তিরা এই আক্রোশ থেকে বাদ যাচ্ছেন না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ মর্মে কী ব্যাখ্যা দেবেন?

বালু, সিমেন্ট, ইট, কংক্রিটের উন্নয়নের চেয়ে দল-মত নির্বিশেষে জনগণের সার্বিক নিরাপত্তাসহ সাংবিধানিক অধিকার বাস্তবায়ন করাই একটি কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক সরকারের সার্থকতা। নিরাপত্তার পরিবর্তে যদি উন্নয়ন দেখানো হয়, তবে তা হবে কান্নারত শিশুকে ঘুম পাড়ানোর কল্পকাহিনী। পুলিশের আইজি (মহাপরিদর্শক) অর্থাৎ সর্বময় কর্তা ছানাবড়া চোখ করে গত ৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ মিডিয়ায় বলেছেন, কোনো নাশকতা ‘বরদাশত’ করা হবে না। (সূত্র : জাতীয় পত্রিকা)। এ ধরনের ‘বরদাশতের’ হুমকি পাকিস্তানি পুলিশের পক্ষ থেকেও শুনেছি। কিন্তু পুলিশ জঘন্য মিথ্যা, ভৌতিক ও কাল্পনিক যে মামলা করে জনগণকে বিভিন্ন পন্থায় হয়রানি করছে; এই অনাচার জনগণ ‘বরদাশত’ করবে কিভাবে? পুলিশের করা সিরিজ ভুতুড়ে মামলা এবং আইজির স্বৈরাচারী কায়দায় এমন ধমক সময়ে সময়ে অনেকেই দিয়েছেন; যা জনতার কাছে পাত্তা পায়নি। কুখ্যাত জেনারেল টিক্কা খান বলেছিলেন, ‘মুজে আদমি নেহি, মিট্টি চাহিয়ে।’ অর্থাৎ ‘আমি মানুষ চাই না, শুধু মাটি চাই।’ অনেক শক্তিধর জেনারেল টিক্কাকে কিন্তু অপমান-অপদস্থ হয়ে বাংলাদেশ ছাড়তে হয়েছে।

মানুষ যখন খেই হারিয়ে ফেলে তখনই মিথ্যার আশ্রয় নেয়। আসন্ন কথিত জাতীয় নির্বাচনের চার মাস আগেই এত শক্তিধর সরকারের খেই হারিয়ে যাওয়ার কথা নয়(!)। তবে ২০১৪ সালের মতো একটি হরিলুটের নির্বাচন করার জন্য সরকার যতই ফন্দি-ফিকির করুক না কেন, ততই দেশের রাজনীতিতে বিরোধীদের ঐক্যের বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। বিএনপিতে দল-উপদলের যে বিভক্তি ছিল, তারাও কাল্পনিক ভুতুড়ে মামলার কশাঘাতে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। বিএনপি নেতাকর্মীদের দ্বিতীয় বাসস্থান এখন আদালত প্রাঙ্গণ ও কারাগার। ফলে বিএনপি নেতাকর্মীদের আতঙ্কে ফেলে, দেশকে গণতান্ত্রিক রাজনীতিমুক্ত করতে গিয়ে পুলিশ দিয়ে স্বপ্নে দেখা ঘটনার ভুতুড়ে মামলা দিতে মিথ্যার পর মিথ্যা বলে সরকার প্রশাসন ও বিচার বিভাগের যে চেইন অব কমান্ড ভেঙে দিচ্ছে, তা শেখ হাসিনা সরকারকে বিনা ভোটে পুনর্নির্বাচিত করতে কতটুকু সহায়তা করবে?

সব ক্ষেত্রে সরকার Natural Justice-কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলো বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ক্রীড়াঙ্গন বাদ যায়নি। শুধু আওয়ামী ঘরানার ক্রীড়া সংগঠন আবাহনী চক্রের দুইজন কর্মকর্তার জেদের কারণে বারবার জাতীয় দলে সোহেলকে গোলকিপার হিসেবে মনোনীত করে তিনবারের মতো আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমর্যাদায় ধস নেমেছে। শেখ হাসিনা সরকার দেশকে সুস্পষ্টভাবে দুই ভাগে ভাগ করে ফেলেছে। সরকারের পক্ষের লোক যারা তাদের জন্যই রাষ্ট্রীয় সব সুবিধা উন্মুুক্ত রয়েছে, বাকিদের জন্য সবই বৈরী। রাষ্ট্রীয় আমলা যারা, দেশের জনগণের অর্থে লালিতপালিত, জনগণের করের কোটি টাকার গাড়িতে চড়েন, স্ত্রী-পরিজন নিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বিলাসবহুল বাড়িতে থাকেন, তাদের সবার দায়িত্ব দেশের সব জনগোষ্ঠীকে সমভাবে সেবা দেয়া। কিন্তু সেই রাষ্ট্রীয় বেতনভুক্ত আমলারা শুধু ক্ষমতাসীনদের সেবাদাসে পরিণত হয়েছে।

কথায় কথায় হুমকি দেন, নাশকতা বরদাশত করা হবে না। কাল্পনিক ঘটনাকে যেখানে নাশকতার পরিকল্পনা বলেন, সেখানে লগি-বৈঠার তাণ্ডব, পথচারীকে দিগম্বর করা, বিএনপি আমলে গানপাউডার দিয়ে শাহবাগে বিআরটিসি ডবল ডেকার বাসে আগুন দিয়ে ১১ জনকে পুড়িয়ে হত্যাসহ ৫৪টি বিআরটিসি বাস পুড়িয়ে দেয়ার নিন্দনীয় ঘটনা সম্পর্কে বর্তমানে অতিউৎসাহী রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের অভিমত কী? এ বিষয়ে তো তাদের বক্তব্য নেই। সব ধরনের নাশকতা ও রাজনীতির নামে অগ্নিসংযোগের ঘটনায় ঘৃণা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু রাষ্ট্রীয় কর্তারা সব বিষয়ে একতরফা তথা শেখ হাসিনা সরকার বিরোধীদের বিরুদ্ধে এত নগ্নভাবে আত্মপ্রকাশ করে কেন? এর মূল কারণ- কাকে ডিঙ্গিয়ে কে প্রমোশন ও সুবিধামতো পোস্টিং নেবে। এ প্রতিযোগিতায় জনগণের নাভিশ্বাস, তাদের ওপর জনগণের আস্থা যাই থাকুক না কেন? তাই আবারো বলছি- হায়রে অসহায় জনগণ, হায়রে অসহায় গণতন্ত্র, কত দিন আর মিথ্যার জালে আবদ্ধ হয়ে অত্যাচার, নিপীড়ন ও স্বৈরাচারী ধমক জনগণকে আমলাদের কাছ থেকে শুনতে হবে?
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (আপিল বিভাগ)
taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ