২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইরান আতঙ্কে পশ্চিমাদের নির্ঘুম রাত!

ইরান আতঙ্কে পশ্চিমাদের নির্ঘুম রাত! - ছবি : সংগৃহীত

আমাদের দেশের লোকজন ইরান বা পারস্য সম্পর্কে তেমন একটা মাথা না ঘামালেও অনাদিকালের পশ্চিমা দুনিয়া শত শত নয় হাজার হাজার বছর ধরে পারস্য আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটিয়ে আসছে। মানবের আদি সভ্যতা, প্রাচীন রাজনীতি, সাম্রাজ্য, শাসনতন্ত্র, সঙ্গীত, বিজ্ঞান-শিল্পকলা-ধর্মতত্ত্ব ইত্যাদি প্রায় সব কিছুরই জন্মস্থান পারস্য। পৃথিবীর প্রাচীনতম তিনটি সভ্যতা যথা- মেসোপটেমিয়া, ব্যাবিলন এবং আসিরীয় সভ্যতাকেন্দ্রিক যে রাজনীতি তৎকালীন জমানার মানুষ শুরু করেছিলেন, তা যখন সাম্রাজ্যে রূপ নিয়েছিল তখন পারসিক জাতিই তার নেতৃত্ব দিয়েছিল। পৃথিবীর আদিকালের প্রথম সভ্য মানুষ হিসেবে স্বীকৃত আর্য জাতির উদ্ভব কিন্তু পারস্যের ভূমি থেকেই হয়েছিল, যারা সময়ের প্রয়োজনে নিজ ভূমি ছেড়ে মধ্য এশিয়া, ইউরোপ ও ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বিজয়ীর বেশে সর্বত্র নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিল।

পাক ভারতের ইতিহাসে পারস্যকেন্দ্রিক দুটো বড় ঘটনা আমরা সাধারণত আলোচনা করে থাকি। প্রথমটি ছিল তাম্র যুগের ঘটনা। অর্থাৎ খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩০০ থেকে ১৩০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ কালে সিন্ধু নদের অববাহিকায় মহেঞ্জদারো ও হরপ্পা নামের যে সভ্যতা ভারতবর্ষে গড়ে উঠেছিল তা তছনছ হয়ে যায় পারস্য থেকে আসা আর্যদের সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণে। পরে, ভারতবর্ষের রাজনীতি, অর্থনীতি, ধর্মকর্ম, শিল্প-বাণিজ্য ধীরে ধীরে আর্যরা দখল করে নেয় এবং এই ভূখণ্ডের মাটি ও মানুষের সাথে মিশে যায়। দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৭৩৯ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি। পারস্য সম্রাট নাদের শাহ কর্নালের যুদ্ধে মোগল সম্রাট মোহাম্মদ শাহের বাহিনীকে তছনছ করে দিয়ে দিল্লির রাজপ্রাসাদ দখল করে নেন। পরে তিনি মোহাম্মদ শাহের সাথে সন্ধি করে পারস্য ফিরে যান বটে, তবে সাথে করে নিয়ে যান ভুবন বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন এবং রত্ন পাথর কোহিনূর।

ইউরোপের লোকেরা পারস্যকে কিরূপ ভয় করত তার বিস্তারিত বিবরণ পাওয়া যায় ইতিহাসের জনক হিরোডোটাসের বইতে। পারস্য সম্রাট মহামতি সাইরাসের জমানায় পুরো পৃথিবীর চেনাজানা তিনটি মহাদেশ যথা- এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার কৌশলগত প্রধান অঞ্চলগুলোতে পারসিকদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। পরে সম্রাট মার্কসেসের জমানায় পারসিকদের ইউরোপ অভিযান এখন পর্যন্ত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যুদ্ধাভিযান হিসেবে ইতিহাস দখল করে আছে। প্রায় পঞ্চাশ লাখ সৈন্য এবং অন্যান্য লোকজনসহ প্রায় এক কোটি লোক নিয়ে তিনি ৪৮০ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে গ্রিস আক্রমণ করে সমসাময়িক দুনিয়ায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

পারস্যের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব অল্প কয়েকবার তারা বিদেশীদের মাধ্যমে পরাজিত ও শাসিত হয়েছেন। তাদের প্রথম পরাজয় ছিল সম্রাট আলেকজান্ডারের হাতে। দ্বিতীয় দফায় তারা আরবের মুসলিমদের কাছে পরাজিত হয়। খলিফা ওমর রা:-এর নির্দেশে সেনাপতি সাদ বিন আবি ওয়াক্কস কাদেসিয়ার যুদ্ধে পারসিক বাহিনীকে পরাজিত করে হাজার বছরের ঐতিহ্যবাহী পারসিক রাজতন্ত্র এবং তাদের অগ্নিপুজার ইতিহাসের ওপর ইসলামের বিজয়কেতন উড়িয়ে দেন। পরে ইসলামি খিলাফত উমাইয়া, আব্বাসীয়, ফাতেমীয়, মুর প্রভৃতি নামে বিভক্ত হয়ে পড়লে মূল পারস্যভূমি খণ্ডিত আকারে শাসিত হতে থাকে বিভিন্ন মুসিলম সাম্রাজ্য দিয়ে। তবে বৃহত্তম পারস্যভূমি এবং তাদের একসময়ের করদ রাজ্য মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল নিয়ে খাওরেজম সাম্রাজ্য নামের ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও শক্তিশালী একটি সাম্রাজ্য গড়ে ওঠে, যা মোঙ্গল নেতা চেঙ্গিস খানের আমলে ১২১৯ থেকে ১২২১ সালের মধ্যে ধ্বংস হয়ে যায়। আজকের ইরান, আফগানিস্তান, মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তান, চেচনিয়া, উজবেকিস্তান, কাজাকিস্তান, কিরঘিজস্তান প্রভৃতি অঞ্চল নিয়ে পারসিকরা তৎকালীন দুনিয়ার আব্বাসীয় খেলাফত, ফাতেমীয় খেলাফত ও স্পেনের উমাইয়া শাসনকে কৌশলে পাশ কাটিয়ে যে বৃহত্তম সাম্রাজ্য কিভাবে গড়ে তুলেছিরেলন তা নিয়ে ইতিহাসবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং পণ্ডিতদের গবেষণা এখনো শেষ হয়নি।

চেঙ্গিস খান খাওরেজম সাম্রাজ্য ধ্বংস করেন এবং পরবর্তীকালে তার নাতি হালাকু খান বাগদাদ ধ্বংস করার ফলে পুরা মধ্যপ্রাচ্য, পারস্যসহ পুরো দূরপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়ার রাজনীতি কয়েক শ’ বছরের জন্য টালমাটাল এবং বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। ফলে পারস্য ভূমিতে মোঙ্গল সৈন্য, ফাতেমী সৈন্য, স্থানীয় সামন্তদের সৈন্যরা নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রায় ৩৫ বছর হানাহানি করে। শেষ পর্যন্ত ১২৫৬ সালের দিকে হালাকু খানের বংশধরেরা ইলখানি সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে প্রায় এক শ’ বছর পারস্য এবং মধ্য এশিয়ার বেশ কিছু অঞ্চল শাসন করতে থাকেন। ইলখানিদের পতন হয় শিয়া ও সুন্নি মতবাদ নিয়ে সৃষ্ট গৃহযুদ্ধে, যা চলে প্রায় ৩৫ বছর ধরে। সাম্রাজ্যের এই দুরবস্থার মধ্য মধ্য এশিয়ার মুসলিম বিজেতা তৈমুর ১৩৭০ সালে পারস্য দখল করেন এবং তার বংশধরেরা ১৫০৭ সাল অবধি তা বহাল রাখেন।

পারস্য যখন তৈমুর লঙের বংশধরেরা শাসন করছিলেন তখন পর্দার আড়ালে তিনটি রাজনৈতিক শক্তি ধীরে ধীরে নিজেদের অবস্থান পাকপোক্ত করে তুলছিল। শিয়া ও সুন্নি বিরোধে শিয়ারা রাজনৈতিক নেতৃত্বের শরণাপন্ন হয়ে অধিকতর শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে। ১৫০২ সালে রাষ্ট্রীয়ভাবে শিয়া মতবাদ চালু হওয়ার আগে পারস্যে সুন্নি মতাবলম্বী জনগোষ্ঠী ছিল শতকরা ৯০ ভাগ। সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায় খাওরেজম সাম্রাজ্যের পতনের পর মধ্য এশিয়াতে ধীরে ধীরে নিজেদের সুসংগঠিত করতে থাকে। প্রায় দুই শ’ বছরের অব্যাহত চেষ্টা এবং রাজনৈতিক কৌশলে তারা একসময় একটি শক্তিশালী রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করতে সমর্থ হয়, যা কিনা পারস্যকে আধুনিক ইরানে পরিণত হওয়ার পথ করে দেয়। আজারবাইজানের আরদাবিল নগরীতে শিয়ারা সাফাভিদ মতবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ ও পরিচালনার জন্য যে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম শুরু করেছিল, তার চূড়ান্ত পরিণতি রূপ লাভ করে ১৫০১ সালে। তখন শাহ ইসমাইল নিজেকে ইরানের শাহ বা শাহেন শাহ ঘোষণা করে পতনরত তৈমুর বংশের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরেন। এর পরের ঘটনা কম বেশি সবাই জানেন। কারণ শাহ ইসমাইলের প্রতিষ্ঠিত সাফাভিদ রাজবংশ আধুনিক ইরানের পুরো ভূখণ্ড একত্র করে ১৫০১ থেকে ১৭৩৬ সাল পর্যন্ত শাসন করার পাশাপাশি আজারবাইজান, বাহরাইন, জর্জিয়া, উত্তর ককেশিয়া, ইরাক, কুয়েত এবং আফগানিস্তান শাসন করে। এ ছাড়াও তারা তুর্কমেনিস্তান উজবেকিস্তান, সিরিয়া, পাকিস্তান এবং তুরস্কের বেশ কিছু এলাকা দখল করে নিজেদের সাম্রাজ্যভুক্ত করে নিয়েছিলেন।

নাদের শাহের হাতে সাফাভিদ বংশের পতনের পর তার বংশধরেরা ১৭৩৬ থেকে ১৭৯৬ সাল পর্যন্ত পারস্য শাসন করেন। এরপর আগা মোহাম্মদ খান কাজার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত কাজার রাজবংশ ১৯২৫ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করে। তারপর শুরু হয় পাহলবী বংশের শাসন, যা চলে ১৯৭৯ সাল অবধি। পৃথিবী কাঁপানো ইরানি বিপ্লবের মাধ্যমে আয়াতুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে যে শাসনব্যবস্থা চালু হয় তা আজ অবধি চালু রয়েছে। ১৯৭৯ সাল থেকে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত পুরো বিশ্ব রাজনীতি, সমরনীতি ও কূটনীতিতে ইরানকেন্দ্রিক এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে এবং ঘটে চলছে যা সামাল দেয়ার ক্ষমতা ইরানবিরোধীরা দেখাতে পারেনি। ইরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদেরকে জিম্মি, ইরাক-ইরান যুদ্ধ, ইরান-কন্ট্রা অস্ত্র কেলেঙ্কারি, হিজবুল্লাহ সমস্যা, সিরিয়ার যুদ্ধ ইত্যাদি প্রতিটি ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিমা বিশ্ব বারবার শোচনীয়ভাবে পরাজিত, নাজেহাল ও লাঞ্ছিত হয়ে আসছে।

সম্মানিত পাঠক হয়তো আলোচ্য নিবন্ধের উল্লিখিত অংশ পাঠ করার পর প্রশ্ন করতে পারেন, প্রাচীন পারস্যের ইতিহাস থেকে শুরু করে মধ্য যুগ এবং আধুনিককালের ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনা করে আমি আসলে কী বোঝাতে চাচ্ছি- অথবা এতসব ব্যাখ্যা- বিবৃতির সাথে শিরোনামের সম্পর্ক কী! এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলার আগে একটি বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। আর তা হলো- পশ্চিমারা কেন ইরানকে সব দিক থেকে পঙ্গু করতে চায়। তারা কি ইরানের তেলসম্পদ কুক্ষিগত করার মানসে অথবা ইরানের রাজনৈতিক ভিত্তি দুর্বল করে সেখানে একটি তাঁবেদার সরকার প্রতিষ্ঠা করতে চায়, নাকি পশ্চিমাদের ইরানভীতির পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে! আমার মনে হয়, পশ্চিমারা ইরানকে তাদের সাম্রাজ্যবাদের পথে প্রধান অন্তরায় এবং প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করে। বিশেষত মধ্যপ্রাচ্য, দূরপ্রাচ্য এবং মধ্য এশিয়াসহ উত্তর আফ্রিকার দেশগুলোতে পশ্চিমাদের শোষণ, শাসন এবং তাঁবেদার সৃষ্টির পথে একমাত্র ইরানই হতে পারে তাদের প্রধান বাধা। কারণ ওইসব এলাকা ঐতিহাসিকভাবে হাজার হাজার বছর ধরে ইরানের অধীন ছিল। ওইসব এলাকার জনগণের মন-মানসিকতা, সংস্কৃতি, পেশা, জীবনধারা, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং খাদ্যসামগ্রীতে রয়েছে ইরানি ঐতিহ্যের ছাপ। ইরানের শাসককুল এবং জনগণও তাদের অতীত ইতিহাসের আলোকে উল্লিখিত এলাকার ওপর পুনরায় রাজনৈতিক কর্তৃত্ব স্থাপনের ব্যাপারে নিজেদের ঐতিহ্য ও অভ্যাস অনুযায়ী চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

এখন প্রশ্ন হলো- বর্তমান দুনিয়ার বাস্তবতায় ইরানের নয়া সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব আসলে কি আদৌ সম্ভব হবে- নাকি এটা তাদের অলীক কল্পনা তা নিয়ে আমার মতো আম-আদমি চিন্তিত না হলেও পশ্চিমারা ঠিকই নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন। তারা জানেন যে, জাতি হিসেবে ইরানিদের যে ‘হোমোজিনিয়াসনেস’ রয়েছে তা পৃথিবীর অন্য কোনো জাতির নেই। আন্দোলন, সংগ্রাম, যুদ্ধ-বিগ্রহ ইত্যাদির মাধ্যমে টিকে থাকার বর্ণাঢ্য ইতিহাস যেমন তাদের রয়েছে তেমনি জমিনের বুকে সুদীর্ঘকাল ধরে সর্ববৃহৎ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা, পরিচালনা এবং সফল হওয়ার ইতিহাস, যা অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠীর নেই। তারা সব সময় অত্যন্ত সফলভাবে ভিন দেশে নিজেদের সাম্রাজ্য ও আধিপত্য যেমন প্রতিষ্ঠিত করেছে তেমনি তাদের দেশে আক্রমণকারী ভিন দেশীদের চরমভাবে নাজেহাল করে বিতাড়িত করে ছেড়েছেন। পৃথিবীর অন্য সব জাতিগোষ্ঠীর মতো ইরান বিদেশী আক্রমণকারীদের নিজ ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত হতে দেয়নি। এমনকি শত শত বছর পর হলেও তাদের নির্মূল এবং দেশ ছাড়া করে ছেড়েছে। আলেক্সান্ডারের গ্রিক বংশধরেরা, হালাকু খানের ইলখানিরা এবং তৈমুর লঙের তুর্কমেনীয়রা ইরানের মাটিতে বংশ বিস্তার তো দূরের কথা নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখতে পারেনি। এমনকি আরবরাও ইরানে থাকতে পারেনি।

ইরানের সঙ্গীত, সংস্কৃতি ও সাহিত্য, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ইত্যাদির সাথে তারা পৃথিবীর কোনো প্রান্তের কোনো কিছুকেই তুলনা করতে নারাজ। তাদের হাফিজ, রুমি, শেখ সাদি, ফেরদৌসি প্রমুখ কবি সাহিত্যিকের সুনাম-সুখ্যাতির কারণে তারা যারপরনাই গর্বিত। তাদের ইবনে সিনা, জাবের আল হাইয়ান, আল কেমি, আল রাজি, ইবনে বুখারি, আহম্মদ ইবনে হাম্বল, ইমাম শাফেয়ী প্রমুখ মহামানবের পাশাপাশি, সাইরাস, মার্কসেস, দারায়ুস, খসরু, শাহ-আব্বাস প্রমুখ সর্বকালের সেরা সম্রাট ও রাষ্ট্রনায়ক রয়েছেন। রয়েছেন রেজা লুৎফির মতো সঙ্গীতজ্ঞ এবং ইস্পাহানের মতো সুন্দরতম নগরী। ফলে ইরানিরা জাতি হিসেবে সমন্বিতভাবে যেভাবে দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে তেমনটি অন্য কোনো জাতিগোষ্ঠী পারে না। ফলে তারা যদি পুনরায় বর্তমান প্রেক্ষাপটে তাদের অতীত ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে তবে পশ্চিমাদের মধ্যযুগের মতো অনাহার-অর্ধাহারের কবলে পড়ে যাযাবরের জীবন বেছে নিতে হবে।

পশ্চিমারা খুব ভালো করেই জানে, ইরানকে দমিয়ে না রাখলে তার পক্ষে পুরো মধ্যপ্রাচ্যের কর্তৃত্ব নিয়ে নেয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। তারা মধ্য এশিয়া, গ্রিস, উত্তর আফ্রিকা ও আফগানিস্তানের ওপর যদি বাণিজ্য কর্তৃত্ব অর্জন করে তবে পশ্চিমা অর্থনীতির কী হাল হবে তা সহজেই অনুমেয়। তারা তাদের সাম্প্রতিক বন্ধু তুরস্ক, রাশিয়া, চীন, জার্মানি ও ফ্রান্সের সাথে যদি সুসম্পর্ক চালিয়ে যেতে পারে এবং ইরাক-লিবিয়া, সিরিয়া, লেবানন, সুদান, ইথিওপিয়া, কাতার, আলজেরিয়া প্রভৃতি দেশের রাজনীতিতে যে প্রভাব বিস্তার করে ফেলেছে তাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, গ্রেট ব্রিটেন এবং তাদের চিহ্নিত কিছু মধ্যপ্রাচ্যের কথিত বন্ধু রাষ্ট্রের জন্য আগামী সহজভাবে পথ চলা সত্যিকারভাবে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। ইরান বর্তমানে আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর রাজনীতিতে যেভাবে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে তাতে করে আগামী দিনে অনেক দেশের মানচিত্র পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। আর এ কারণেই পশ্চিমারা সর্বশক্তি নিয়োগ করে ইরানকে পঙ্গু, অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

 


আরো সংবাদ