১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

পাতা পড়লেও চমকে ওঠে সরকার

পাতা পড়লেও চমকে ওঠে সরকার : ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী - ছবি : নয়া দিগন্ত

সরকারের জানা থাকার কথা, তাদের পায়ের নিচ থেকে মাটি সরে গেছে। দাঁড়ানোর কোনো শক্ত জমিন তাদের নেই। তাই সরকারের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা অবিরাম আবোল-তাবোল বকতে শুরু করেছেন। দুয়ে দুয়ে চারের বদলে তারা চার শ’ হিসাব করছেন। কোথাও কুটোটি পড়লেও ‘এই এই’ বলে হাত-পা ছুড়ে চিৎকার জুড়ে দিচ্ছেন। আর তাই যুক্তফ্রন্ট গঠনের ঘোষণায়ও তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তো একেবারে লাফিয়ে উঠে বললেন, যুক্তফ্রন্ট গঠন করা হয়েছে আসলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনাশের জন্য। কোথায় বি. চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুর রহমান মান্না, আর কোথায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি।
এর আগে আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ আরেক কথা বলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে দেশে এক লাখ মানুষ খুন হবে। কেন খুন হবে?

তার অর্থ দেশে যদি কোনো কারণে অবাধ সুষ্ঠু নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়, তাহলে বিএনপি ক্ষমতায় আসতেও পারে। আর ক্ষমতায় এসে তারা আওয়ামী লীগারদের একেবারে ‘কচুকাটা’ করে ফেলবে। অতএব, রোখো বিএনপি। কেন আওয়ামী লীগাররা ‘কচুকাটা’ হবেন? তোফায়েল আহমেদ গং তার কারণ জানেন। কারণ, গত দশ বছরের স্বৈরাচারী অপশাসনে তারা দেশব্যাপী বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের ওপর যে নির্মম নির্যাতন চালিয়েছেন, যেভাবে হত্যা গুম খুন চালিয়েছেন, যেভাবে ‘ক্রসফায়ারের’ নামে সাধারণ নিরপরাধ মানুষকে খুন করেছেন, আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারালে তারা যে ফুঁসে উঠবে, তোফায়েল আহমেদ গংয়ের তা না জানার কথা নয়। এর জন্য অবশ্য বিএনপিকে ক্ষমতায় আসতে হবে না। জনগণের মধ্যে আওয়ামী নির্যাতনে যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে, যেকোনো সময় তার বিস্ফোরণ ঘটতে পারে। তখন পুলিশ-র‌্যাব-বিজিবি, হেলমেট বাহিনী ও ছাত্রলীগ দিয়ে সেই জনরোষ রোধ করা যাবে না। এখন সব কিছু নষ্টদের দখলে চলে গেছে।

আওয়ামী লীগ সাজিয়েছে ভালো। কেবল ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য তারা প্রশাসন ধ্বংস করে দিয়েছে। ক্যাডারে ক্যাডারে বিরোধ এখন চরমে। পদ নেই তবুও পদোন্নতি হচ্ছে। যেন আসন্ন নির্বাচনে প্রশাসনের সব পর্যায়ের কর্মকর্তা সরকারের অনুকূলে কাজ করে। অনেক পুলিশের দুর্নীতি সর্বজনবিদিত। কিন্তু সরকার সে ক্ষেত্রে সব সময়ই নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে আসছে। এ রকম অভিযোগ অহরহ আসছে, পুলিশ জিম্মি করছে, গণগ্রেফতার করে পাইকারিভাবে মুক্তিপণ আদায় করছে, ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করছে। এ অভিযোগ সরকার বা পুলিশ বিভাগও অস্বীকার করছে না; কিন্তু দুর্নীতিবাজ বা দুষ্কৃতিকারীদের সাজা বলতে ‘ক্লোজড’ বা বদলি। তাতে জনগণের রোষের কোনো কিনারা হবে না। তার প্রমাণ আমরা দেখেছি সাম্প্রতিক শিশু-কিশোরদের আন্দোলনের সময়। বিমানবন্দর সড়কে জাবালে নূর বাসের ধাক্কায় কিশোরী মিম আর আরিফের হত্যাকাণ্ডের পর আমরা দেখলাম বদলে যাওয়া নগরীর চিত্র।

পুলিশের বদলে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা ঢাকা মহানগরীর ট্রাফিকের দায়িত্ব হাতে নিয়ে নিলো। লাইসেন্সবিহীন, ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালান বিচারপতি, মন্ত্রী, এমপি, পুলিশ কর্মকর্তাসহ সব প্রভাবশালী ব্যক্তি। ধরা পড়ে গেল আওয়ামী অপশাসনকালে সমাজ কতটা পচে গিয়েছিল। শিশু-কিশোরেরা পথ আটকে সব যানবাহনের লাইসেন্স-ফিটনেস চেক করছিল। পুলিশের প্রশ্রয়ে যেসব বাতিল যানবাহন রাজপথে চলছিল, সেগুলো উধাও হয়ে যায়। নাগরিকেরা এতে সৃষ্ট দুর্ভোগ হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। তারা বলছিলেন, তবুও সড়কে প্রতিদিন গড়ে ২০ জন নিরীহ মানুষের প্রাণহানি বন্ধ হোক।

কিন্তু শিশু-কিশোরেরা যখন ট্রাফিকের দায়িত্ব পালন করতে শুরু করল, তখন দেখলাম, রাস্তার শত শত ট্রাফিক পুলিশ আশ্রয় নিলো পুলিশবক্সে। চুপচাপ। বাসগুলো দাঁড়াচ্ছিল স্ট্যান্ডে। রিকশা চলছিল এক লাইনে। ট্রাফিক সিগনাল লঙ্ঘন করেননি কোনো গাড়িচালক। শিক্ষার্থীদের এই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের প্রতিবাদ করতে দেখিনি কাউকে। এই তরুণ শিক্ষার্থীরা আবার অ্যাম্বুলেন্সকে সবার আগে পথ করে দিচ্ছিল। ঢাকায় থাকি ৫০ বছর, এমন সুশৃঙ্খল অবস্থা আর কোনো দিন দেখিনি। অর্থাৎ আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ও তারুণ্য দেখিয়ে দিয়ে গেল, তারা পারে। তারা এক-একজন একাই এক শ’।

প্রথম দিকে সরকার কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। কী করবে, বুঝতে পারছিল না। তারপর চলল নানা অপপ্রচার। এরা রাজাকার। এরা বিএনপি-জামায়াত প্রভাবিত। শেষ পর্যন্ত সরকার পুরনো কায়দা ও পথ অনুসরণ করল। স্কুল-কলেজের এই শিক্ষার্থীদের সাথে যোগ দিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। ছোট ভাইদের পাশে দাঁড়ালেন বড় ভাইয়েরা। তখন সরকার নামিয়ে দিলো তাদের পেটোয়া বাহিনীকে। নামল পুলিশ, নামল ছাত্রলীগ, নামল হেলমেট বাহিনী। পুলিশের পাহারায় অপর দুই ঠ্যাঙ্গারে বাহিনী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালাল। আর নানা অভিযোগ তুলে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করা হলো ডজন ডজন শিক্ষার্থীকে। তাদের ওপর চালানো হয় অমানুষিক নির্যাতন, অথচ এই শিক্ষার্থীরা জানে না, জামায়াত কাকে বলে, বিএনপির ‘দুঃশাসন’ কাকে বলে। এরা বড় হয়ে উঠেছে আওয়ামী দুঃশাসনে। তারা ধীরে ধীরে আওয়ামী শাসন চিনেছে, আর কিছু জানে না।

আওয়ামী লীগ বারবার গর্ব করে বলেছে, তারা ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ উপহার দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম খুলে দিয়ে দেশে বিপ্লব ঘটিয়েছে। কিশোর-তরুণেরাই এসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গ্রহীতা। কিন্তু এটাই তাদের জন্য এই সরকারের আমলে কাল হয়ে দাঁড়াল। সরকার বেছে বেছে তাদের গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে পৈশাচিক নির্যাতন করছে। এক নওশাবা গ্রেফতার হয়েছিলেন হেঁটে। আদালতে তাকে আনা হয়েছিল হুইল চেয়ারে করে। তার চোখের কোণে ছিল কালি। আতঙ্কিত ছিল মুখ। শেষ পর্যন্ত তাকে ঢামেকে ভর্তি করা হয়েছিল। জামিনে মুক্তি পেয়ে নওশাবা তার স্বামীর মাধ্যমে যে বিবৃতি দিয়েছেন, সেটা কেউ বিশ্বাস করেনি। কারণ, তার সুস্থ চেহারা ও রিমান্ড শেষের চেহারা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। মনে হয়, কারো লিখে দেয়া বক্তব্য সে তার স্বামীর মাধ্যমে স্ট্যাটাস হিসেবে প্রকাশ করেছে। এতে তার মন নিশ্চয়ই প্রশান্ত হয়নি। লাখ লাখ শিক্ষার্থীর মতো তার মনও এই সরকারের প্রতি বিষিয়ে থাকার কথা।

এই সরকারের কুশীলবদের মধ্যে একটি আওয়াজ প্রবল ছিল আর তা হলো- নতুন প্রজন্ম হলো আওয়ামী প্রজন্ম। ডিজিটাল প্রজন্ম। এখন সরকার বলতে শুরু করেছে, প্রযুক্তির অপব্যবহার হচ্ছে। সরকারের সাফল্য ম্লান করে দেয়া হচ্ছে। দেশ তথা সরকারের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করা হচ্ছে। আর এসব কিছুর জন্য দায়ী তরুণ প্রজন্ম আর তাদের মদদ দিচ্ছে বিএনপি-জামায়াত। তার মানে সরকারের সাথে নেই নির্যাতনের কশাঘাতে জর্জরিত সাধারণ মানুষ, নেই শ্রমিকেরা, নেই সুশীলসমাজ, নেই এমনকি তরুণ প্রজন্মও। তাহলে ক্ষমতায় থাকার উপায় কী? সে উপায় বলপ্রয়োগের। কিন্তু বলপ্রয়োগ করে মানুষের হৃদয় জয় করা যায় না। সরকার মনে করছে, হৃদয়ের দরকার নেই। পুলিশ বাহিনী, র‌্যাব বাহিনী, বিজিবি, ছাত্রলীগ ও হেলমেট বাহিনী দিয়ে সবার মুখ স্তব্ধ করে দিয়ে যেকোনো কৌশলেই হোক ক্ষমতায় থাকতে হবে। নইলে নিজেদের রক্ষা থাকবে না।

আর নির্বাচন কমিশন? সে তো এক সাক্ষী গোপাল। তার প্রমাণ অনেক। প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন) ব্যবহার নিয়ে খুব একটা সিরিয়াস ছিলেন না। তিনি বরাবর বলে আসছিলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। ইতোমধ্যে বিশ্বের যেসব দেশে ইভিএম ব্যবহার করা হতো, তারা ইভিএম ব্যবহার বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, আয়ারল্যান্ড প্রভৃতি দেশ ইভিএম নিষিদ্ধ করেছে। ভারতেও ইভিএমের বিরুদ্ধে জোরালো আওয়াজ উঠেছে। ইভিএমের মাধ্যমে যে ভোট কারচুপি করা যায়, তা তারা চাক্ষুষ করে দেখিয়েছেন। কিন্তু হঠাৎ করেই সিইসি বলে বসলেন, জাতীয় সংসদের তিন শ’ আসনের এক শ’ আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে।

প্রস্তুতি নেই, দক্ষ জনবল নেই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেই; তবুও নূরুল হুদা সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বসলেন, ১০০ আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। কমিশনার মাহবুব তালুকদার এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভিন্নমত পোষণ করে কমিশনের বৈঠক থেকে ওয়াকআউট করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইভিএম চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না। আর কী আশ্চর্য, প্রায় সাথে সাথেই সরকারের সাক্ষী গোপাল প্রধান নির্বাচন কমিশনার নূরুল হুদা বললেন, একশ’ আসনে নয়, কিছুসংখ্যক আসনে ইভিএম ব্যবহার করা হবে। দালাল আর কাকে বলে!

এর আগে অবশ্য সিইসি নূরুল হুদা বলেছিলেন, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে অনিয়ম হবে না, এমন কোনো নিশ্চয়তা দেয়া যাবে না। অর্থাৎ তার অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সে কথা সুজনও (সুশাসনের জন্য নাগরিক) বলেছে : ‘এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়ার কোনো আশা নেই। আর নির্বাচন কমিশন এখন এমনই এক খেলো প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে যে, নির্বাচন কবে হবে বা হবে না, সে তারিখ ঘোষণা করছেন সরকারের অর্থমন্ত্রী। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, ২০ দিনের মধ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হবে। আর জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে ২৭ ডিসেম্বর। বাহ! মন্ত্রী ঘোষণা করে দিয়েছেন। সিইসি হয় আঙুল চুষবেন অথবা মুহিতের ঘোষিত তারিখে নির্বাচন দেবেন। কী আশ্চর্য!

এত কিছুর পরও সরকার নিশ্চিত নয়। গাছের পাতা নড়লেও চিৎকার করে ওঠে : ‘এই এই, কে, কে ওখানে?’ আর তাই আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আলোকচিত্রী শহিদুল আলমকে ঠুনকো অভিযোগ এনে আটক করে রেখেছে সরকার এবং আশ্চর্য ঘটনা এই যে, তার মতো লোককেও শারীরিকভাবে নির্যাতন করে রক্তাক্ত করে দিয়েছে। তার অপরাধ, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় তিনি আলজাজিরা টেলিভিশনে ওই আন্দোলন নিয়ে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। তাতে নাকি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়েছে। নোবেল জয়ী এক ডজনের বেশি আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, শিল্পী, অভিনয়শিল্প, চিত্র পরিচালক তার মুক্তির দাবি জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন, কিন্তু সরকার তাতে গুরুত্ব না দিয়ে বরং টিটকারি দিয়েছে। তিনি এখনো কারাগারে। আরো আশ্চর্যের ঘটনা এই যে, তার জামিন শুনানিতে বিব্রতবোধ করেছেন হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ। এই ঘটনায় সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ড. শাহদীন মালিকও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

এ দিকে ১ সেপ্টেম্বর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে নয়াপল্টনে আয়োজিত জনসমাবেশে লাখ লাখ মানুষের যে ঢেউ সৃষ্টি হয়েছিল, তা দেখে সরকার একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছে। আর সে কারণে ১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে প্রতিটি থানায় বিএনপি নেতাকর্মীদের আসামি করে সরকার শত শত মামলা দায়ের করেছে। সে মামলায় আসামির সংখ্যা লক্ষাধিক ছাড়িয়েছে। কোথাও কোথাও আসামিদের কোনো নামই নেই। অজ্ঞাত তিন-চার শ’ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে। পুরনো মামলাগুলোকে আবার নতুন করে চাঙা করা হয়েছে, যাতে যেকোনো বিএনপি নেতাকর্মীকে যখন খুশি তখন জেলে ভরা যায়। আতঙ্কিত সরকার বিএনপি নেতাকর্মীদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। তাই ভয়, নৌকা যখন নিমজ্জমান, তখন খড়কুটো আঁকড়ে ধরে যাত্রীরা বাঁচতে চায়- সরকার এখন নিমজ্জমান হামলা-মামলার খড়কুটো আঁকড়ে ধরেছে। ধারণা করি, নির্বাচন পর্যন্ত এই ধারা তারা অব্যাহত রাখার চেষ্টা করবে, অবশ্য যদি সে পর্যন্ত যেতে পারে।

তবে আরো আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে হবিগঞ্জে। হবিগঞ্জের মডেল থানা উপপরিদর্শক (এসআই) নাজমুল ইসলাম ১২ আগস্ট নিজের থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। এতে আসামি ৭০-৮০ জন, সবাই অজ্ঞাত। অভিযোগ হচ্ছে,গত ৩০ জুলাই হবিগঞ্জ শহরের জে কে অ্যান্ড হাইস্কুলের সামনে আসামিরা সন্ত্রাসী কার্যক্রম, যানবাহন ও সরকারি সম্পত্তির ক্ষতিসাধন এবং সরকারকে উৎখাতের চেষ্টা করেছে। যে সময় মামলা হয়েছে, একই সময়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরে নিরাপদ সড়কের দাবিতে পথে নেমেছিল শিক্ষার্থীরা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ৩০ জুলাই হবিগঞ্জ শহরে এ রকম কিছুই ঘটেনি। এমনকি নিরাপদ সড়কের দাবি নিয়ে হবিগঞ্জে কেউ রাস্তায়ও নামেনি। তারপরও হবিগঞ্জে শহর ও জেলায় চারটি থানায় অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে বিশেষ ক্ষমতা আইনে দশটি মামলা করে রেখেছে পুলিশ। ঘটনা ঘটেনি, অথচ আগাম মামলা দেয়ার উদ্দেশ্য- যখন খুশি তখন, যাকে খুশি তাকে ধরার ব্যবস্থা।

শুধু হবিগঞ্জে নয়, নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় নাশকতার অভিযোগ এনে আরো কয়েকটি জেলায় এমন আরো ভুতুড়ে মামলা করে রেখেছে পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তা বলেছেন, ‘ওপরের নির্দেশে’ এসব মামলা হয়েছে। পুলিশের জনসংযোগ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক সোহেল রানা বলেছেন, যেসব স্থানে মামলা হয়েছে, সেখানে ঘটনা ঘটেছে বলেই মামলা হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতাকর্মীরা বলেছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিহত করতেই থানায় থানায় গোপনে এভাবে মামলা করে রাখা হয়েছে, যাতে নির্বাচনের আগে-পরে প্রতিপক্ষের লোকজনকে এসব মামলায় ফাঁসানো যায়। এ রকম খামখেয়ালি ও হাস্যকর ঘটনা ঘটেই চলেছে। এ প্রসঙ্গে আরো একটি উদাহরণ দেয়া যায়। সেটি হলো, গত ছয় সেপ্টেম্বর সরকার চাঁদাবাজির মামলায় বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হককে আটক করে এক দিনের রিমান্ডে নিয়েছে।

এ সম্পর্কে এক সহযোগী বিস্তারিত খবর দিয়েছেন। তাতে দেখা যাচ্ছে, এই মামলার বাদি মোহাম্মদ দুলাল মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে চেনেন না, কোনো দিন দেখেননি। সড়ক দুর্ঘটনা ও গণপরিবহনে নৈরাজ্য নিয়ে সোচ্চার যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরীকে বাদি মোহাম্মদ দুলাল চেনেন না। দুলাল বলেছেন, নতুন একটি পরিবহন কোম্পানি খোলার কথা বলে মালিক শ্রমিক ঐক্য পরিষদের দুই নেতা টাইপ করা একটি কাগজে তার স্বাক্ষর নেন। তাতে কী লেখা তা দুলালকে পড়েও শোনানো হয়নি। তিনি পরে জানতে পেরেছেন, তাকে দিয়ে মোজাম্মেলের বিরুদ্ধে মামলা করানো হয়েছে। এমনকি এজাহারে দুলালের উল্লিখিত ঠিকানাটিও ভুয়া। বিভিন্ন ঠিকানা ঘুরে সহযোগী শেষ পর্যন্ত দুলালের বাসা পর্যন্ত পৌঁছেন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতি সড়ক দুর্ঘটনা, বাড়তি বাস ভাড়া ইত্যাদি নিয়ে কয়েক বছর ধরেই নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। গত দুই ঈদের পরই সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলন করেছিল যাত্রী কল্যাণ সমিতি। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১০ জুলাই সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সংসদের প্রশ্ন উত্তর পর্বে যাত্রী কল্যাণ সমিতির দুর্ঘটনা প্রতিবেদনকে ভুয়া বলে মন্তব্য করেন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির সাথে যুক্ত একাধিক ব্যক্তি বলেছেন, গত ঈদুল ফিতরের আগে ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনাসংক্রান্ত প্রতিবেদন না দেয়ার জন্য সরকারের একটি সংস্থা থেকে চাপ দেয়া হয়। সরকারের শেষ বছর এবং নির্বাচনের আগেই এসব প্রতিবেদনে ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হবে বলে শাসানো হয়। এরপরও যাত্রী কল্যাণ সমিতি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। আর সে জন্য মোজাম্মেলকে গ্রেফতার করা হয় বলে তারা মনে করছেন। গত ২৯ জুলাই রাজধানীতে বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর সড়কে নেমে ঢাকা অচল করে দেয় স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। পুলিশ ও সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা মেরে-ধরে এই আন্দোলন দমন করেন। এর মধ্যে ঈদুল আজহার আগে-পরে ঈদযাত্রায় সড়ক দুর্ঘটনায় আড়াই শতাধিক যাত্রীর মৃত্যুর তথ্য তুলে ধরে যাত্রী কল্যাণ সমিতি।

মামলার বাদি দেখানো দুলাল মিরপুর এক নম্বরে পরিবহনে লাইনম্যান হিসেবে কাজ করেন। মামলার এজাহারে তার মিরপুরে এক নম্বর সেকশনের ১৮ নম্বর সড়কের যে বাড়ির ঠিকানা আছে, সেটিও ভুয়া। খুঁজতে খুঁজতে মিরপুরে ঢাকা চিড়িয়াখানার সামনে পরিবহন শ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, লাইনম্যান দুলাল থাকেন মিরপুর নিউ সি ব্লকে। সেখানে খোঁজাখুঁজি করে দুলালকে বাসায় পাওয়া যায়। পৌনে এক কাঠা জমির ওপর আধাপাকা একতলা ঘরে তারা ৯ ভাইবোন থাকেন গাদাগাদি করে। ঘরটি অন্ধকার,বাল্ব নষ্ট। সংবাদকর্মী হিসেবে পরিচয় পাওয়ার পর দুলালের স্ত্রী ও মেয়ে কাঁদতে থাকেন। দুলালের মেয়ে সরকারি বাঙলা কলেজে স্নাতকে পড়ছেন। কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘মামলা দিছে শুইনা আমি বলছি তুমি কী করছো? ওই লোকটাকে পাইলে আমি মাফ চাইতাম।’

দুলালের মেয়ে বলেন, গত বুধবার দুলালের মেয়ের সাথে মিরপুর থানায় গিয়ে মামলার কপি পড়ে দেখেছেন। তিনি বলেন, তার বাবা লেখাপড়া জানেন না। কোনো রকম নিজের নাম দস্তখত করতে জানেন। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে তাকে ফাঁসিয়েছেন তারা। মামলায় দুলালকে মিরপুর রোড শ্রমিক কমিটির সড়ক সম্পাদক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই নিয়ে দুলাল বলেন, তিনি শ্রমিক নেতা নন। তার কোনো পদ-পদবিও নেই। তিনি চিড়িয়াখানা আশা পরিবহনের লাইনম্যান। বসেন মিরপুর এক নম্বরে। তিনি বলেন, ‘হেরা নেতা আমি কর্মচারী, হেরা টেহা দেয়, হেই টেহা দিয়ে আমি চলি।’ মিথ্যা তথ্যে তার স্বাক্ষর দিয়ে মামলা নিয়ে দুলাল মিয়া আশঙ্কা করেন। এ ঘটনা প্রকাশ করলে নিজের ক্ষতি হতে পারে। পরিবহনের কাজটিও হারাতে হতে পারে।

এ মামলায় আজব কাহিনী আছে। গত চার সেপ্টেম্বর দায়ের হওয়া ওই মামলায় বলা হয়, ১০-১৫ দিন ধরে মোজাম্মেল নিজেকে সড়ক পরিবহন শ্রমিক নেতা পরিচয় দিয়ে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। চাঁদা না দেয়া হলে তাকে ও তার সংগঠনের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশসহ বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি দেখানো হয়। এরপর দুলাল মিরপুরের সনি সিনেমা হলের সামনে মোজাম্মেলকে ১০ হাজার টাকা দেন। মোজাম্মেল হক চৌধুরীর ছেলে জিয়াউল হক চৌধুরী বলেন, তার বাবা চাঁদাবাজির ঘটনায় জড়িত নন। ৩ সেপ্টেম্বর যে ঘটনায় চাঁদা আদায়ের কথা বলা হয়েছে, ওই সময় তার বাবা একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিচ্ছিলেন। নিরাপদ সড়ক ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সপক্ষে কথা বলায় তার বাবাকে উদ্দেশ্যমূলক মামলা দেয়া হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
গণরোষের ভয়ে আতঙ্কিত সরকার এভাবেই পাতা নড়ার শব্দেও চমকে উঠছে। জোরে জোরে হাঁকডাক দিচ্ছে আর শূন্যে ঘুরাচ্ছে লাঠি। আমরা দেখেছি, এ রকম কোনো পথেই কোনো উৎপীড়ক সরকারের শেষ রক্ষা হয় না। 
লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com


আরো সংবাদ