১৪ নভেম্বর ২০১৮
তৈমূর আলম খন্দকার

‘মিথ্যা’কে জাতীয়করণ করা হয়েছে

‘মিথ্যা’কে জাতীয়করণ করা হয়েছে - ছবি : নয়া দিগন্ত

সরকারি ঘরানায় বুদ্ধিজীবীদের নতুন টেনশন বিএনপি কি পথ হারাবে? লন্ডন প্রবাসী একজন সিনিয়র কলামিস্ট যাকে ‘আমার ভাইয়ের রক্ত রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ ঐতিহাসিক গানের রচিয়তা হিসেবে শ্রদ্ধা করি, তিনিও তার বিভিন্ন লেখায় বিএনপির পথ হারানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। তিনি একজন বলিষ্ঠ কলামিস্ট সন্দেহ নেই, তবে তিনি সরকার সমর্থনে থাকায় লেখাগুলো একপেশে, যা তার মতো লেখকের কাছ থেকে জাতি আশা করে না। যেহেতু আমার লেখায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সাংবিধানিক রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সরকারের কট্টর সমালোচনা থাকে, সেহেতু আমার কলামকেও একপেশে বলতে পারেন, তবে অন্ধত্বকে আমি সমর্থন করিনি, জ্ঞানত বিশেষ করে নিজেদের সমালোচনার ক্ষেত্রে। বন্ধুপ্রতিম মহিউদ্দিন আহাম্মদ (সাবেক সচিব ও রাষ্ট্রদূত) বিএনপির অস্তিত্ব সঙ্কট নিয়ে জ্ঞানগর্ভ কলাম লিখেছেন। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশে বিএনপি কেন অস্তিত্ব সঙ্কটে পড়ল এ কথা কিন্তু সরকারি ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের কলম থেকে বের হয় না। এত দিন সরকারের সাথে সুর মিলিয়ে বুদ্ধিজীবীরা বলেছে, বিএনপি আগুন সন্ত্রাস করেছে।

২০১৫ সালের পরে তো আর কোনো আগুন সন্ত্রাস কোথাও দেখা যায়নি। বিএনপিকে জেলে ঢুকানোর মামলা দেয়ার জন্যও আগুনের অনেক ঘটনা ঘটানো হয়েছে। একই বাস দুইবার পুড়িয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় মামলা রুজু করা হয়েছিল। তবে এখন দেশব্যাপী বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কেন সিরিজ মোকদ্দমা হচ্ছে? এখনো কেন বিএনপি নেতাকর্মী এলাকা ছেড়ে ঢাকায় রিকশা চালায়? এখন কেন থানায় থানায় কাল্পনিক ঘটনা সাজিয়ে বিএনপি ওয়ার্ড পর্যায়ে নেতাকর্মী, সমর্থক ও তাদের আত্মীয়স্বজনদের বিরুদ্ধে ভুতুড়ে মামলা সাজিয়ে গ্রেফতার, রিমান্ড, জেলগেটে পুনঃগ্রেফতার করে চড়া মূল্যে বাণিজ্য করা হচ্ছে? এই বাণিজ্য করার কাহিনী সরকারি ঘরানার কলকাতামনস্ক বুদ্ধিজীবী লেখেন না কেন? এ দেশের সার্বিক জনগোষ্ঠীর প্রতি কি তাদের কোনো দায়দায়িত্ব নেই?

৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮ একটি বহুল প্রচারিত প্রথম শ্রেণীর জাতীয় দৈনিকের (২০ দলীয় সমর্থিত পত্রিকা নহে) সম্পাদকীয়তে বিএনপিকে কিভাবে পুলিশি নির্যাতনের মুখে ফেলে দেয়া হয়েছে তার একটি চিত্র তুলে ধরেছে। সম্পাদকীয়তে অন্যান্য বক্তব্যের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে, যা নি¤œরূপ : ‘পুলিশ প্রশাসনের কিছু অতি উৎসাহী কর্মকর্তা সরকারকে খুশি করতে এ ধরনের হঠকারী কাজ করলেও শেষ পর্যন্ত যে মামলা টেকে না, তার ভূরি ভূরি প্রমাণ আছে। বর্তমান সরকারের সময় বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করলেও পুলিশ অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। বরং এসব রাজনৈতিক মামলাকে কেন্দ্র করে পুলিশের উৎকোচ-বাণিজ্যের প্রসার ঘটে। বিএনপির যেকোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বা সভা-সমাবেশের মধ্যে ষড়যন্ত্র খোঁজা হাস্যকরও বটে। বিএনপি নেতাকর্মীদের ষড়যন্ত্র আবিষ্কারে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নয়, ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কর্মীদেরও তৎপর দেখা যায়। শরীয়তপুরে বিএনপির এক নেতার বাড়িতে আয়োজিত বৈঠকে হামলা হয়েছে ও বগুড়ায় ছাত্রলীগের হামলায় যুবদলের তিন কর্মী আহত হয়েছেন।

এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা নিষ্ক্রিয় থাকে। তাদের যেখানে সক্রিয় হওয়ার কথা, সেখানে নিষ্ক্রিয় থাকা, আর যেখানে নিষ্ক্রিয় থাকার কথা, সেখানে অতি সক্রিয় হওয়া আইনের শাসন কিংবা গণতন্ত্রের সহায়ক নয়।’ ওই সম্পাদকীয়তে প্রকাশিত চিত্র শুধু দেশের কোনো নির্দিষ্ট এলাকার নয়, বরং এটা গোটা বাংলাদেশের চিত্র। কোনোটা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়, কোনোটা হয় না। তবে দুঃখজনক এই যে, রাষ্ট্রীয় যন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ‘মিথ্যা’ বলাতে বিশেষ করে মিথ্যা মামলায় বিরোধী দলকে ফাঁসাতে যেভাবে অভ্যস্ত করা হয়েছে, তাতে সব সময়ের রেকর্ড পুলিশ এবং এ সরকার ভঙ্গ করেছে। যার কারণে মিথ্যার জন্য ডক্টরেট বা গিনেস বুকে তাদের নাম লেখানো যায়।

‘খুনি শোক মিছিলের আগে থাকে’ এ বাক্যটি দীর্ঘ দিনের বহুল প্রচারিত ও প্রতিষ্ঠিত প্রবাদ। রাষ্ট্রীয় যন্ত্র, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে করায়ত্ত করে শেখ হাসিনা সরকার বিনা ভোটে একতরফা নির্বাচনের যে সংস্কৃতি চালু করল, যে সরকার বিএনপির শুধু নেতাকর্মী নয়, সমর্থকদের পর্যন্ত কাল্পনিক ভৌতিক মামলা দিয়ে নাজেহাল করছে, বিএনপির নামগন্ধ পেলে যেখানে চাকারজীবীদের প্রমোশন হয় না, যেখানে সরকারের মন্ত্রীর বক্তব্যে আগামী এক মাসের মধ্যে বিএনপির বড় বড় নেতাদের সাজা হওয়ার আগাম বার্তা বহন করে এবং যেখানে আদালতের বিশেষ করে নি¤œ আদালত থেকে বিএনপি নেতাকর্মীরা আইনগত কোনো ধরনের প্রটেকশন পায় না, সেখানে বিএনপি নির্মূলকারীদের সমর্থকদের মুখে যখন বিএনপির পথ হারানোর মায়াকান্না শোনা যায় তখন স্বাভাবিকভাবেই ‘খুনি শোক মিছিলের আগে থাকে’ প্রবাদটির যৌক্তিকতার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

বিএনপি চেয়ারপারসন কারাগারে যাওয়ার আগেই দেশব্যাপী প্রতি থানায় বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে কাল্পনিক মামলার এজাহারের একই ভাষায় যেমন ‘খালেদা জিয়ার মামলার রায়ের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির জন্য নাশকতা করার পরিকল্পনার’ অভিযোগে পুলিশ কর্মকর্তারা সিরিজ মোকদ্দমা রুজু করে হাজার হাজার নেতাকর্মীকে কারাগারে আটক ও রিমান্ড বাণিজ্য করে বিএনপিকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। এখন নতুন করে আবার শুরু হয়েছে দেশের সার্বভৌমিকতা নস্যাৎ করার জন্য নাশকতার পরিকল্পনা করার অভিযোগে থানায় থানায় একই ধারায় একই ধরনের মামলা রুজু করে পূর্বের ন্যায় বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী, নেতাকর্মীদের ঘর ছাড়া করছে। এ সম্পর্কে কিন্তু দেশের বুদ্ধিজীবী, সরকারি ঘরানার কলামিস্টদের কোনো রা নেই। অনেকেই বলে যে, বিরোধী দলে থাকলে সরকারি নির্যাতন ভোগ করতেই হয়। এ কথা যদি সত্য হয়, তবে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি পুলিশ যেভাবে বিরোধীদের নির্যাতন করত, স্বাধীন দেশের পুলিশ তো আরো কঠিনভাবে নির্যাতন করে। যদি তাই হয় তবে জনগণের সাংবিধানিক অধিকার রইল কোথায়?

‘বিএনপি নাই’ এ কথা হাঁকডাক দিয়েই ক্ষমতাসীনেরা বলে আসছে। এমন কথা আমলা থেকে মন্ত্রী ভায়া জাতীয় পার্টি বর্তমানে অর্থমন্ত্রীও তুচ্ছতাচ্ছিলের সাথে বলে থাকেন যে, দেশে কোথায় বিএনপি? পুলিশ প্রটেকশনে থেকে এমন কথা বলা অনেক সহজ, কিন্তু ক্ষমতাচ্যুত হলে এই পুলিশের ব্যবহারে বুঝা যায় যে, কে কতটুকু ক্ষমতাবান (!)।

একটি গণতান্ত্রিক স্বাধীন রাষ্ট্রে শুধু সরকার ও তাদের সমর্থকেরা নিরাপদে থাকবে, বাকি সব থাকবে নিরাপত্তাহীনতায়, যে রাষ্ট্রের সংবিধানকে একটি কাগজে ছাপানো একটি বই মনে করে প্রয়োজনে ব্যবহার, প্রয়োজনে অপব্যবহার করা হয়, সে ক্ষেত্রে স্বাধীনতার মূল্যবোধ কতটুকু বাস্তবায়িত হয়?
সরকার কথায় কথায় স্বাধীনতার চেতনার কথা বলে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর দেশটি স্বাধীন হয়েছে যার ফলে প্রণীত হয়েছে একটি সংবিধান। সংবিধানের ৭ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ যা নি¤েœ উল্লেখ করা হলো :

“(১) প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ, এবং জনগণের পক্ষে সেই ক্ষমতার প্রয়োগ কেবল এই সংবিধানের অধীন ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।
(২) জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তিরূপে এই সংবিধান প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন এবং অন্য কোনো আইন যদি এই সংবিধানের সহিত অসামঞ্জস্য হয়, তাহা হইলে সেই আইনের যতখানি অসামঞ্জস্যপূর্ণ, ততখানি বাতিল হইবে।”

সংবিধান যদি জনগণের অধিকার রক্ষায় রাষ্ট্রের প্রধান দলিল হয়ে থাকে তবে এই সংবিধানে ‘প্রজাতন্ত্র’ বলতে যা বুঝানো হয়েছে এবং জনগণের অধিকার তাতে কি বিএনপি সমর্থক জনগণ বঞ্চিত নয়? যদি তাই হয় তবে সংবিধানকে সার্বিকভাবে নহে বরং শাসকগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে কি সংবিধানকে এখন একপেশে বলা হবে?

বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পুনরায় ক্ষমতায় বসানোর জন্য সরকারি দলের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আমলারা উঠেপড়ে লেগেছে। কারণ ক্ষমতার পরিবর্তন হলে তাদের সম্পদের হিসাবসহ অতি উৎসাহিত হয়ে বিরোধীদের দমনের হিসাব দিতে হবে কড়ায়গণ্ডায়। একজন অভিজ্ঞ মন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, তারা পুনরায় ক্ষমতায় না বসলে বিএনপি-জামায়াত এক লাখ লোককে খুন করবে। কথা বেশি বলেন এমন একজন বলেছেন, পাঁচ লাখ। আতঙ্ক তো তাদের মধ্যেই। অন্ধকারে কেউ ভয় পেলে তখন গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে। ক্ষমতাসীনদের মানসিক অবস্থা সে দিকেই যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। যখন নিজেরা নিজেদের ওপর আস্থা রাখতে পারে না, তখনই আতঙ্কগ্রস্ত হয় এবং মিথ্যার আশ্রয় গ্রহণ করে। ফলে রাষ্ট্রে এখন মিথ্যাকেই জাতীয়করণ করা হচ্ছে।

ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যই শত হাজার মিথ্যা মামলা, মিথ্যা চার্জশিট, হয়রানির পর হয়রানি। শুধু ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণকে এত হয়রানির দরকার কী? সংবিধানের পরিবর্তন তো ক্ষমতাসীনদের হাতে। সংবিধানে এমন যদি পরিবর্তন আনা যায় যে, এমপি’র উত্তরাধিকার বংশানুক্রমে এমপি অনুরূপভাবে মন্ত্রী/প্রধানমন্ত্রী বংশানুক্রমে ক্ষমতাপ্রাপ্ত হবে তবে তো জনগণের কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নির্বাচন নামক প্রহসনের দরকার হয় না। অন্য দিকে মিথ্যাকে জাতীয়করণ করা থেকে রাষ্ট্র ও মিথ্যা কাল্পনিক মোকদ্দমা থেকে জনগণ রক্ষা পেত।
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (আপিল বিভাগ)
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ