২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ইভিএমে ভোট কেন নয়

ইভিএম - ছবি : সংগ্রহ

একটি দেশের মানুষ কী পদ্ধতিতে ভোটাধিকার প্রয়োগ করবে তা দেশটির আইন দিয়ে নির্ধারিত। বিশ্ব সংস্থা জাতিসঙ্ঘের অন্তর্ভুক্ত ৯০ শতাংশের বেশি দেশে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ পদ্ধতি চালু রয়েছে। এ পদ্ধতিতে পোলিং অফিসার একজন ভোটারের নাম-ঠিকানা যাচাইপূর্বক তাকে ব্যালট পেপার দেন এবং পরে তিনি গোপন কক্ষে (বুথ) গিয়ে ব্যালট পেপারে সিল মেরে তা পোলিং অফিসারের সামনে রাখা ভোট বাক্সের মধ্যে ফেলেন। পৃথিবীর অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে যান্ত্রিক ভোট দেয়ার পদ্ধতির প্রচলন রয়েছে। এ পদ্ধতিটিতে যে যন্ত্রের মাধ্যমে ভোট দেয়া হয় সেটিকে বলা হয় ইভিএম (ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন)।

অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে ভোট প্রদান চালু পরবর্তী সময়ে এটি কারচুপি প্রতিরোধক নয়, এমন অভিযোগের ভিত্তিতে তা প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। জার্মানির ফেডারেল কোর্ট ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে ভোট দেয়াকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করলে সে দেশে এ যান্ত্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে ভোটগ্রহণ ব্যবস্থার বিলোপ ঘটে। ইউরোপীয় রাষ্ট্র আয়ারল্যান্ডে একসময় ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে ভোটগ্রহণ ব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়েছিল। কিন্তু এ প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতিটি কারচুপি প্রতিরোধক না হওয়ায় এর গ্রহণযোগ্যতা বিষয়ে বিতর্ক দেখা দিলে দেশটি আজ থেকে দুই দশকেরও অধিক সময় আগে এ ব্যবস্থা থেকে সরে দাঁড়ায়। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৩তম প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশের চেয়ে তার প্রতিদ্বন্দ্বী ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আলগোর অধিক পপুলার ভোট পেয়েছিলেন। সে নির্বাচনে ফ্লোরিডা অঙ্গরাজ্যে ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে গৃহীত ভোটে কারচুপির অভিযোগ উঠলে তা দেশটির ফেডারেল কোর্ট অবধি গড়ায়। সে সময় ফেডারেল কোর্টে রিপাবলিকানদের প্রধান্য থাকায় শেষাবধি বুশ রক্ষা পায়। য্ক্তুরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যে ইভিএম পদ্ধতিতে ভোট গ্রহণ বিষয়ে ড. অ্যালেক্স হালডারম্যান নামে এক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। তার গবেষণায় উঠে আসে য্ক্তুরাষ্ট্রে ইভিএম কারচুপি প্রতিরোধক নয়। এর পর থেকে সে অঙ্গরাজ্যে ইভিএম প্রথা রহিত করা হয়। অতঃপর আরো ২২টি অঙ্গরাজ্যে ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে ভোট গ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয় এবং দেশটির জনমতের বর্তমান অবস্থানের আলোকে ধারণা করা হয়, ধীরে ধীরে সব অঙ্গরাজ্যেই ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে ভোট গ্রহণ নিষিদ্ধ হবে।

আমাদের প্রতিবেশী ভারত পৃথিবীর সবচেয়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। দেশটিতে ফেডারেল পদ্ধতির শাসন কাঠামো বিদ্যমান। দেশটির কেন্দ্রীয় সংসদকে বলা হয় লোকসভা। সে দেশের লোকসভা নির্বাচন মাসব্যাপী চলে। ভারতের লোকসভা ও বিধান সভা (প্রাদেশিক পরিষদ) উভয় নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে ভোট নেয়া হয়। ভারতের রাজধানী দিল্লি ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চল সমন্বয়ে একটি প্রাদেশিক পরিষদের মর্যাদা সম্পন্ন পরিষদ রয়েছে। এ পরিষদটিতে বর্তমানে আম আদমি নামের একটি দল ক্ষমতাসীন রয়েছে। সম্প্রতি দিল্লি পার্লামেন্টের সভায় একজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ সদস্য ইভিএমে কিভাবে ভোট কারচুপি হয় তার বিশদ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ দিলে তা সম্পূর্ণ ভারতব্যাপী বিপুল বিতর্কের জন্ম দেয়। এ বিতর্কটি বর্তমানে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দেশটির আগামী লোকসভা ও প্রাদেশিক বিধানসভা নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে ভোট গ্রহণ বহাল রাখা যাবে কি না, তা নিয়ে অশ্চিয়তা দেখা দিয়েছে।

আমাদের বাংলাদেশে জাতীয় সংসদের ভোটগ্রহণ পদ্ধতি নিয়ে যে আইনটিতে বিশদ বিবরণ রয়েছে সেটিকে বলা হয় গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২। এ আইনটিতে সুস্পষ্টরূপে উল্লেখ রয়েছে- একজন ভোটার ব্যালট পেপারের মাধ্যমে ভোট দেবেন। আমাদের একাদশ সংসদ নির্বাচন সংবিধানের বিদ্যমান বিধান অনুযায়ী অনুষ্ঠিত হলে ৩১ অক্টোবর ২০১৮ থেকে ২৮ জানুয়ারি ২০১৯-এর মধ্যবর্তী ৯০ দিনের যেকোনো দিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। একাদশ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান পূর্ববর্তী সময়ে বর্তমান দ্বাদশ নির্বাচন কমিশন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে মতবিনিময় করে। মতবিনিময়কালীন ইভিএম পদ্ধতির মাধ্যমে ভোটগ্রহণ বিষয়েও আলোচনা হয়। আলোচনায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ দলটির জোটভুক্ত অপর কয়েকটি দল ইভিএমের স্বপক্ষে মতামত ব্যক্ত করলেও দেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিসহ বেশির ভাগ রাজনৈতিক দল ইভিএমের বিপক্ষে মতামত দেয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজনৈতিক দল ইভিএমের বিপক্ষে মতামত দেয়ার কারণে মতবিনিময় শেষ হওয়া পরবর্তী নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয় ইভিএমে ভোট গ্রহণ পদ্ধতি বিষয়ে নির্বাচন কমিশন জনমতকে প্রাধান্য দেবে।

একাদশ সংসদ নির্বাচন যখন দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে, এমনই সময়ে নির্বাচন কমিশন তড়িঘড়ি করে কমিশনের একটি সভা আহ্বানের মধ্য দিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে সংশোধনীর প্রস্তাব অনুমোদন করে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের আইনি বিধান প্রণয়নের পদক্ষেপ নেয়া। জনৈক নির্বাচন কমিশনার কমিশনের ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্তটি সময়োপযোগী না হওয়ায় এবং জনআকাক্সক্ষার পরিপন্থী হওয়ায় এ বিষয়ে দ্বিমত পোষণ করেন।

যেকোনো নতুন আইন প্রণয়ন বা বিদ্যমান আইনে সংশোধনীর ক্ষেত্রে জনমত যাচাই অত্যন্ত জরুরি। জনমত যাচাই ছাড়া পৃথিবীর উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোতে কখনো নতুন আইন প্রণয়ন বা বিদ্যমান আইন সংশোধন করা হয় না। আমাদের দেশের জনমত ইভিএমের সপক্ষে নাকি বিপক্ষে তা নির্বাচন কমিশনের সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর মতবিনিময়কালীন নিরূপণ সম্ভব হয়েছে। তা ছাড়া বর্তমানে এ বিষয়ে যেকোনো পন্থায় জনমত যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়া হলে জনমতের পাল্লা যে ইভিএমের বিপক্ষে হবে সে প্রশ্নে কোনো সংশয় নেই।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য থেকে জানা যায়, নির্বাচন কমিশন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ সংশোধনের প্রস্তাব অনুমোদনের আগেই কমিশনের পক্ষ থেকে পরিকল্পনা কমিশনে জাতীয় সংসদের ১০০ নির্বাচনী আসনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোটগ্রহণের জন্য এক লাখ ৫০ হাজার ইভিএম কেনার প্রকল্পের অর্থায়নে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকার চাহিদাপত্র পাঠানো হয়। নির্বাচন কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী প্রতিটি ইভিএম কেনার খরচ হবে দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের হেফাজতে যে ৩৮০টি ইভিএম রয়েছে এগুলো প্রতিটি ক্রয়ে নির্বাচন কমিশনের ১০ হাজার ৫০০ টাকা ব্যয় হয়েছিল। নির্বাচন কমিশন ইভিএম কেনার জন্য যে তিন হাজার ৮০০ কোটি টাকার চাহিদা দেয়া হয়েছে, তার অনুমোদন দেয়া হলে জনগণের করের অর্থ থেকে এ ব্যয় নির্বাহ করা হবে। জনগণের দেয়া করের অর্থের যেকোনো ব্যয়ের স্বচ্ছতা থাকা অপরিহার্য।

বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করলেও এখনো উন্নয়নশীল দেশের পর্যায়ে পৌঁছাতে অনেক পথ বাকি। বাংলাদেশে এ যাবৎকাল যে পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, তা ক্ষমতাসীন দলবহির্ভূত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে দেখা গেছে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়েছে নির্বাচনকালীন বিরোধী দলগুলো কখনো এটি মেনে নেয়নি। আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচন বর্তমান ক্ষমতাসীনদের অধীন অনুষ্ঠিত হলে ব্যালট অথবা ইভিএম যে পদ্ধতিতেই ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হোক না কেন বিজয় কার ঘরে উঠবে তা আগাম অনুধাবনে এ দেশের সচেতন জনমানুষ সক্ষম। এ কথাটি অনস্বীকার্য, বর্তমান নির্বাচন কমিশন ও ক্ষমতাসীন দল যাদের অবস্থান ইভিএমের সপক্ষে আসন্ন সংসদ নির্বাচন ক্ষমতাসীন দলবহির্ভূত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হলে তারা সে অবস্থান হতে সরে দাঁড়াবেন।

দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য দেশ ও জনগণের কল্যাণ ও মঙ্গলসাধন। বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় বসবাস অযোগ্য শহর। বসবাস অযোগ্য প্রথম শহরের তালিকায় রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার রাজধানী দামেস্ক। দামেস্ক যুদ্ধবিধ্বস্ত শহর না হলে ঢাকার স্থান যে প্রথম হতো তা নির্দি¦ধায় বলা যায়। যে সব কারণে ঢাকা দ্বিতীয় বসবাসের অযোগ্য শহর; এর অন্যতম হলো শহরটির যানজট। বিশ্বব্যাংকের সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাটজটের কারণে প্রতি বছর ঢাকায় ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা বিনষ্ট হচ্ছে, যার আর্থিক মূল্যমান ৩০ হাজার কোটি টাকা।

যে পরিমাণ অর্থ ব্যয়ে নির্বাচন কমিশন ১০০টি আসনে ইভিএমের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের উদ্যোগ নিয়েছে; এর চার-ভাগের এক-ভাগেরও কম অর্থ ব্যয়ে ঢাকা শহরে ২০টি ইউলুপ নির্মাণ করা হলে নগর পরিকল্পনাবিদদের ধারণা, শহরটির যানজটের বহুলাংশে লাঘব হবে। স্বভাবতই প্রশ্ন দেখা দেয়, আমাদের নিকট ইভিএমে ভোটগ্রহণ জরুরি নাকি, ঢাকা শহরের যানজট নিরসন তার চেয়ে জরুরি?
পৃথিবীর প্রতিটি দেশ নিজ দেশের জনআকাক্সক্ষা অনুযায়ী দেশের ভালো-মন্দ নিরূপণ করে থাকে। ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করা হলে ব্যালটে হাতে গণনার পদ্ধতির চেয়ে চার থেকে ছয় ঘণ্টা আগে ভোটের ফলাফল জানা যায়। ভোটগ্রহণের পদ্ধতি যা-ই হোক না কেন, দেশবাসী নিশ্চিত হতে চায় ভোট প্রদানে ও গণনায় যেন কোনো ধরনের কারচুপি না হয়। ভোটগ্রহণের সাথে যারা সংশ্লিষ্ট এবং নেপথ্যে থেকে তাদের যারা নিয়ন্ত্রণ করছে তাদের মধ্যে সততা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা না থাকলে ভোট গ্রহণ পদ্ধতি ব্যালট নাকি ইভিএম এ প্রশ্নটি অবাস্তব।

ইভিএম পদ্ধতিতে ভোটগ্রহণ করতে হলে এর সাথে যারা সংশ্লিষ্ট তাদের ব্যাপক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচন আজ থেকে যে সময়ের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত হবে সে সময়ের মধ্যে ইভিএমে ভোটগ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষিত করে তোলা কিছুতেই সম্ভব নয়। সুতরাং জনমত যাচাই ছাড়া কেন এবং কী উদ্দেশ্যে জনগণ প্রদত্ত করের অযৌক্তিক অর্থ ব্যয়ে ইভিএমের মাধ্যমে একটি মহলের ভোট গ্রহণের উদ্যোগ?
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতিবিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ