১৭ নভেম্বর ২০১৮

তিনি যে কারণে স্মরণীয়

কুলদীপ নায়ার - ছবি : সংগ্রহ

কুলদীপ নায়ার একজন ভারতীয় নাগরিক হিসেবে নিজ দেশের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কিছু লিখতেন না। তবে তার লেখায় অনেক সময় দৃশ্যত এতটা উদার ও অসাম্প্রদায়িক অভিমত পরিদৃষ্ট হতো যে, পাঠকেরা বিস্মিত হতেন। তবে কুলদীপের স্বধর্ম ও স্বদেশের পাঠকেরা এর চেয়েও বেশি চমকে উঠবেন এটা জেনে যে, তার মতো হিন্দু সন্তানের সাংবাদিকতার সূচনা ‘আঞ্জাম’ নামের উর্দু দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে। তিনি কী করে আরবি হরফে ছাপা এই পত্রিকায় সাংবাদিক হিসেবে দায়িত্ব আঞ্জাম দিতেন, তা আজকের প্রজন্মের মাথায় ঢোকার কথা নয়।

ভারতসহ এই উপমহাদেশ ছাড়িয়ে, যার কলামের সাথে পৃথিবীর বহু দেশের পাঠক দীর্ঘ দিন পরিচিত, সেই কুলদীপ নায়ার (৯৫) গত ২২ আগস্ট (অর্থাৎ এবার যে দিন আমরা কোরবানির ঈদ পালন করলাম) রাতে দিল্লির হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হলে এই নবতিপর সংবাদব্যক্তিত্বকে হাসপাতালে নেয়া হয় মৃত্যুর পাঁচ দিন আগে। রেখে গেছেন স্ত্রী ও দুই ছেলের সাথে অসংখ্য ভক্ত-অনুরক্ত। কুলদীপের মৃত্যুতে ভারতের ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল, উভয় তরফের রাজনৈতিক নেতারা শোক জ্ঞাপন করেছেন। কুলদীপ বিজেপিসহ সংঘ পরিবারের হিন্দুত্ববাদী দর্শন এবং তাদের নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বরাবর কঠোর সমালোচক ছিলেন। তবে মোদি শোকবাণী দিয়েছেন এবং বলেছেন, ‘তার জনসেবা এবং দেশের প্রতি অঙ্গীকার সর্বদাই স্মরণীয়।’ প্রসঙ্গক্রমে বলা দরকার, বাংলাদেশে কোনো সাংবাদিক, লেখক বা বুদ্ধিজীবী যত প্রতিভাবান ও খ্যাতনামা হোন না কেন, তিনি যদি সরকারের তীব্র সমালোচক হন, তার মৃত্যুতে সাধারণত ক্ষমতাসীন মহল নীরব থাকে। যা হোক, নয়া দিল্লির লোধী শ্মশানে কুলদীপ নায়ারের শেষকৃত্যের সময় কংগ্রেস আমলের উপরাষ্ট্রপতি হামিদ আনসারী, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী ও একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ছাড়াও প্রখ্যাত আলোকচিত্রশিল্পী রঘু রাইসহ মিডিয়ার অনেকে ছিলেন উপস্থিত।

বাংলাদেশে একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিকে অনেক বছর যাবৎ কুলদীপের কলাম নিয়মিত প্রকাশিত হয়ে আসছিল। তিনি প্রধানত ইংরেজিতে লিখতেন, যা ১৪টি ভাষায় অনূদিত হয়ে বিভিন্ন দেশের ৮০টি পত্রিকায় গুরুত্ব দিয়ে ছাপা হতো। তার মতো এত দীর্ঘ দিন নিয়মিত কলাম লেখক ও এত বহুল পঠিত সিন্ডিকেটেড কলামিস্ট ভারতে আর নেই। খুশবন্ত সিংয়ের মতো কুলদীপ নায়ারও ছিলেন অত্যন্ত জনপ্রিয় কলাম লেখক, যদিও দু’জনের লেখার ধরন ও স্বাদে পার্থক্য ছিল। মৃত্যুর সপ্তাহখানেক আগে ১৪ আগস্টও কুলদীপ কলাম লিখেছেন ঢাকার ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা স্টার-এ।

মহাকবি আল্লামা ইকবালের জন্মস্থান শিয়ালকোটে ১৯২৩ সালে কুলদীপ জন্মগ্রহণ করেন। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের শহরটি বিশ্বসেরা ক্রীড়াসামগ্রী তৈরির জন্যও বিখ্যাত। উর্দু সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা মুহম্মদ ইকবালের শহরে জন্ম নেয়া কুলদীপের ওপর অন্তত তার প্রথম জীবনে উর্দু ভাষার প্রভাব ছিল ব্যাপক। তরুণ বয়সেই তিনি পেশা হিসেবে সাংবাদিকতা এবং এর মাধ্যমরূপে উর্দু ভাষা বেছে নিয়েছিলেন। বেতন বেশি না হলেও কুলদীপ উর্দু পত্রিকা ‘আঞ্জাম’-এর কর্মী হিসেবে অবদান রেখেছেন। উল্লেখ্য, তৎকালীন অবিভক্ত পাঞ্জাবে উর্দু ভাষা ও সাহিত্যের মান ছিল উন্নত। তবে সেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানেরা উর্দুর দিকে বেশি আকৃষ্ট হলেও হিন্দুরা দেবনাগরী হরফের হিন্দি এবং শিখরা গুরুমুখী হরফে লেখা পাঞ্জাবি ভাষার সাথে নৈকট্য বোধ করতেন। অবশ্য উর্দু ভাষায় লিখে নাম করেছেন, এমন অমুসলিম লেখক ছিলেন বেশ কয়েকজন। যেমন- কিষেণ চন্দর (প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক), খুশবন্ত সিং, পণ্ডিত রতন নাথ সারসার, ড. যোগিন্দর সিং বেদী (উর্দু সাহিত্যের ইতিহাস প্রণেতা) প্রমুখ।

জানা যায়, যে শিয়ালকোটে কুলদীপ নায়ারের জন্ম, সেটা ইসলামপন্থী ইকবালের মতো বামপন্থী ফয়েজ আহমদ ফয়েজ- এই দু’কবির জন্মভূমি। হয়তো এই পটভূমি কুলদীপের অসাম্প্রদায়িক মানস গঠনে প্রভাব ফেলেছে। তরুণ বয়সে তিনি লাহোর থেকে দিল্লি এসে এক দিকে মুসলমানের মালিকনাধীন উর্দু পত্রিকায় কাজ শুরু করেন; অন্য দিকে বামপন্থী কোনো কোনো নেতার সংস্পর্শে আসেন। তবে তিনি কার্যত কোনো ‘পন্থী’ হননি। আরো জানা গেছে, কুলদীপ দিল্লিতে মাওলানা হাসরাত মোহানির সাথে পরিচয়ের পর তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। এই কবি ও বিপ্লবী আলেম ১৯২৫ সালেই ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি উত্থাপন করেছিলেন।

কুলদীপ নায়ার রিপোর্টার, এডিটর ও কলামিস্ট হিসেবে প্রায় সাত দশক সাংবাদিকতায় জড়িত ছিলেন। আরো ছিলেন কূটনীতিক ও পার্লামেন্টারিয়ান। তিনি অভিহিত হয়েছেন ‘ভারতীয় সাংবাদিকতার মহীরুহ’ হিসেবে। একসময় বিশেষত রাজনৈতিক বিষয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের জন্য তিনি ছিলেন খ্যাতিমান। এ কারণে তাকে বলা হতো The Scoopman. তিনি ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক দেশ বিভাগের ঘটনার মনোযোগী দর্শক ও পর্যবেক্ষক। সে সময়ের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-হাঙ্গামার অন্যতম শিকার ও সাক্ষী তিনি। এসব কিছু তার লেখনী ও কণ্ঠকে আমৃত্যু প্রভাবিত করেছে। এ ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণ ও দৃষ্টিকোণের সাথে হয়তো সব সময় সবাই একমত হবেন না, তবে তার মানবতাবোধ, উদার দৃষ্টিভঙ্গি, ভাষাশৈলী ও উপস্থাপনভঙ্গি নিঃসন্দেহে ছিল প্রশংসার্হ্য ও আকর্ষণীয়। কুলদীপকে তাই আখ্যা দেয়া হয়েছে A Partition storyteller par excellence (দেশ বিভাগের চমৎকার গল্পকথক)। তাকে ‘তরুণ মেধাবী সাংবাদিকদের মডেল’ মনে করতেন অনেকে। অভিহিত হয়েছেন ‘স্থিতধী সাংবাদিক’ এবং ‘আপসহীন ভাষ্যকার’রূপেও।

কুলদীপ নায়ার সব সময় বলতেন, ভারতের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল বিজেপি হচ্ছে অতীতের সাম্প্রদায়িক জনসংঘের উত্তরসূরি এবং হিন্দুত্ববাদী সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক ফ্রন্ট। তাদের মূল মন্ত্রণাদাতা ও আদর্শিক সংগঠন হলো হেডগেওয়ার ও গোলওয়ালকার কর্তৃক ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত আরএসএস, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। এরা ভারতের সংবিধান ও জাতীয় পতাকার প্রতি শ্রদ্ধাশীল নয় এবং ব্রিটিশ উপনিবেশবাদবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে এদের অবদান নেই বলে কুলদীপ বিশ্বাস করতেন।

তিনি জোর দিয়ে লিখে গেছেন- আরএসএসই ভারতের ‘জাতির পিতা’ বাপুজি, তথা মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে ’৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে রাজধানীতে প্রকাশ্যে হত্যা করেছিল। স্মর্তব্য, ভয়াবহ দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে ও চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে গান্ধীজী দিল্লিতে যখন অনশনরত, তখন আরএসএস ক্যাডার নাথুরাম গডসে তাকে হত্যা করে। উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের দৃষ্টিতে গান্ধী তখন মুসলমানদের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে বিরাট অন্যায় করেছিলেন। স্মর্তব্য, অবিলম্বে মুসলিম নিধনসহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা থামানো, এ জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং নবজাত রাষ্ট্র পাকিস্তানকে ন্যায্য হিস্যা দেয়ার দাবিতে মহাত্মা গান্ধী অনশন করছিলেন। ঠিক সে সময় আরএসএস কর্মী নাথুরাম তাকে খুন করেছিল সবার সামনে। সে আজো সংঘ পরিবারের কাছে খুবই সম্মানিত ব্যক্তি এবং হিন্দুত্ববাদীরা কখনো স্বীকার করেনি যে, গান্ধী হত্যার মতো জঘন্য ঘটনা একটি মারাত্মক অপরাধ।

১৯৭৫ সালে একদলীয় শাসন বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক শাসনে ব্যত্যয় ঘটিয়েছিল। এ দেশে সেই নতুন শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের ছয় মাস পরই পাশের দেশ ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো জরুরি আইন প্রবর্তন অগণতান্ত্রিক শাসনের সূচনা করে। বিশ্বের সর্বাধিক জনবহুল গণতন্ত্রী রাষ্ট্রে এবং দেশটির স্বাধীনতা আনয়নে অগ্রণী দলটির শাসনামলেই জরুরি আইন জারির ঘটনা কেবল বিস্ময়কর নয়, কংগ্রেস দল ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জন্য দুরপনেয় কলঙ্ক হয়ে আছে। সাংবাদিক কুলদীপ নায়ার একজন গণতন্ত্রী হিসেবে তার দায়িত্ব পালনে তখন সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। ‘জরুরি’ আমলের (১৯৭৫-৭৭) আগে যেমন, পরেও তেমনি কংগ্রেস ও ইন্দিরার যা ভালো দিক মনে করেছেন, তিনি তার প্রশংসা ও সমর্থন করেছেন। তবে যত বড় নেতানেত্রী হোন, নিছক দলীয় সংকীর্ণ স্বার্থে গণতন্ত্রের পরিপন্থী পদক্ষেপ নেয়ার অধিকার তার নেই বলেই কুলদীপ দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন। এ কারণে তিনি কংগ্রেসের মতো পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী দল এবং ইন্দিরার মতো প্রতাপশালী রাজনীতিকের অন্ধ সমর্থক ও স্তাবক হতে পারেননি। আজীবন তিনি বলেছেন ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি শাসনকাল ভারতের গণতন্ত্রের প্রতি এক ভয়াবহ আঘাত। উল্লেখ্য, কুলদীপের একটি বইয়ের নাম Emergency Retold.

ভারতীয় সাংবাদিক ও সম্পাদক বাহার উদ্দিন ঢাকার ইত্তেফাকে লিখেছেন, “জরুরি অবস্থার আগে-পরে ব্যক্তি ইন্দিরার গুণমুগ্ধ হয়েও রেহাই দিলেন না তাকে। ভেতরের খবর পরপর ফাঁস করেছেন, অকপটে। শ্রীমতি গান্ধীর অন্দরমহলে বন্ধুদের অভাব নেই। তাদের সূত্রেই জানিয়ে দিলেন, ‘অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা সামনে’ এবং তাই ঘটল। দেশজুড়ে ধরপাকড় আরম্ভ হলো, শুরু হলো সংবাদপত্রের ‘প্রি-সেন্সরশিপ’। বাকস্বাধীনতা ও যাবতীয় কণ্ঠরোধের বিরুদ্ধে লড়াই তার যৌক্তিক আর নির্মেদ। ভাষা তথ্য ও প্রমাণে ঠাসা। ‘মিসা’ আইনে আটক করল প্রশাসন। তবু অকুতোভয়। প্রশ্নমুখর। কর্মযজ্ঞ থেমে নেই। তারপর ফাঁস করলেন, ‘জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে আশু নির্বাচনের ডাক দেবেন ইন্দিরা’। প্রমাণিত হলো এই খবর।”

কুলদীপ নায়ার ভারতের জাতীয় রাজনীতির ক্ষেত্রে সঙ্গতভাবেই হিন্দুত্ববাদী বিজেপির বিরোধিতা করেছেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা ও অসাম্প্রদায়িকতার প্রবক্তা কংগ্রেস দলকে তুলনামূলকভাবে উত্তম মনে করতেন। তা বলে তিনি কংগ্রেসের ব্যর্থতা এবং তাদের আইকন নেত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও তার পুত্র রাজীবের ভুল ও অন্যায়গুলোর যুক্তিপূর্ণ সমালোচনা করতে দ্বিধা করতেন না। একইভাবে সাম্প্রদায়িক বিজেপি এবং এর মন্ত্রণাদাতা আরএসএস, সেই সাথে বিজেপির পূর্বসূরি জনসংঘের তীব্র নিন্দা করতে পিছপা হতেন না। তবে বিজেপির মধ্যে অপেক্ষাকৃত ‘নমনীয় ও উদার’ হিসেবে পরিচিত নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ীর যতটা প্রশংসা প্রাপ্য, তা করেছেন কুলদীপ। বাজপেয়ী কয়েক দিন আগে মারা গেছেন এবং তিনি বয়সে কুলদীপের কিছুটা কনিষ্ঠ ছিলেন।

একজন কলামিস্ট লিখেছেন, ‘কুলদীপ ছিলেন খাঁটি গণতন্ত্রী। এ কারণে সব ধরনের কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরোধিতা করতেন। কেননা কর্তৃত্ববাদী শাসন গণতন্ত্র ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জন্য মারাত্মক চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা কেড়ে নেয়।’ এ জন্যই কুলদীপ ইন্দিরা গান্ধীর মতো দোর্দণ্ড প্রতাপশালী শাসকের জারি করা জরুরি আইন, তথা এই কালাকানুনের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত স্বেচ্ছাচারী শাসনের প্রতিবাদে সাহসী ভূমিকা রেখেছিলেন। তখন অবস্থা এমন প্রতিকূল ছিল যে, সাংবাদিকদেরও অল্প ক’জন মাত্র জরুরি শাসনের প্রকাশ্য বিরোধী ছিলেন। তাদের অনেকেই নতজানু ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। জরুরি আইনের বিরুদ্ধে সরব হওয়াকে জরুরি মনে করার ‘শাস্তি’ হিসেবে তখন কুলদীপ জেলও খেটেছিলেন। কুলদীপ নায়ার বর্তমান পাকিস্তানে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং সেখানে লেখাপড়া করে অনার্সসহ আইনে ডিগ্রি নিয়েছেন।

সারা জীবন পাক-ভারত শান্তি আলোচনার ছিলেন প্রবক্তা। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, সঙ্ঘাত নয়, সংলাপ ও সমঝোতার পথেই এই উপমহাদেশে শান্তি আসতে পারে। তিনি চাইতেন যেন দক্ষিণ এশিয়ার বড় দু’দেশ ভারত ও পাকিস্তান পরস্পর যুদ্ধংদেহী শত্রুতা অব্যাহত না রেখে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করে নিজেদের কল্যাণার্থেই। এ জন্য প্রতি বছর দেশ দু’টির স্বাধীনতা দিবস, অর্থাৎ ১৪ ও ১৫ আগস্ট পাঞ্জাবের ওয়াগাহ- আত্তারি সীমান্তে মোমবাতি প্রজ্বালন কর্মসূচি পালন করতেন (এবার ঠিক এ সময়েই তিনি শেষবারের মতো অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং ২২ আগস্ট পরলোক গমন করেন।) কুলদীপ দেশ বিভাগের সময় উপমহাদেশের সবচেয়ে ভয়াবহ দাঙ্গার প্রত্যক্ষদর্শী এবং সেই চরম পরিস্থিতিতে তাদের পরিবার পরিজন স্থায়ীভাবে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হন। কুলদীপ কিন্তু বাস্তবতাকে অস্বীকার করেননি। তিনি দেশবিভাগের অনিবার্যতা মেনে নিয়ে বর্তমান ভারতের একজন নাগরিক হিসেবেই জীবন কাটিয়ে গেছেন। ভারত রাষ্ট্রের এবং এ দেশের মানুষের স্বার্থই ছিল তার কাছে মুখ্য। তিনি উপলব্ধি করতেন, অতীতের জন্য আহাজারি করা যায়; কিন্তু তা ফিরিয়ে আনা যায় না। মানুষ ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে বর্তমানের বুকে কাল অতিবাহিত করতে বাধ্য।

কুলদীপ কাশ্মির ইস্যুতে ভারতের রাজনীতি ও মিডিয়া জগতের প্রেক্ষাপটে অনেক উদার ও মধ্যপন্থী মনোভাব প্রকাশ করতেন। তিনি কাশ্মিরের বর্তমান সঙ্কটের জন্য ভারত সরকারের প্রথম যুগের ওয়াদা ভঙ্গ এবং পরে ধারাবাহিকভাবে বলপ্রয়োগ নীতিকে দায়ী করতেন। ‘শেরে কাশ্মির’ শেখ মোহাম্মদ আবদুল্লাহকে তদানীন্তন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ও কংগ্রেস নেতা পণ্ডিত নেহরু (ইন্দিরা গান্ধীর পিতা) যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা দিল্লি সরকার রক্ষা বা পালন করেনি বলেই পরিস্থিতির ক্রমাগত অবনতি বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছেছে বলে কুলদীপের অভিমত। স্মর্তব্য, ১৯৪৭ সালের অব্যবহিত কয়েক বছরে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিল, সংবিধানের বিশেষ ধারা মোতাবেক দেশীয় রাজ্য কাশ্মির বিশেষ মর্যাদা পাবে এবং কাশ্মিরের প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ ব্যতিরেকে যাবতীয় বিষয় কাশ্মির সরকারের আওতাভুক্ত থাকবে। এমনকি, প্রধানমন্ত্রী জওয়াহের লাল নেহরু প্রস্তাব করেন, ‘আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে সুষ্ঠু গণভোটে নির্ধারিত হবে- কাশ্মির ভারত না পাকিস্তানে যোগ দেবে, নাকি স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে নিজ অস্তিত্ব বজায় রাখবে।’

১৯৫০ সালে ভারতের উদ্যোগেই জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে এই গণভোটের লক্ষ্যে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। তবে সেই ভারত গত ৬৮ বছরেও গণভোটের বিন্দুমাত্র উদ্যোগ নেয়নি। বরং কাশ্মিরকে সম্পূর্ণ কুক্ষিগত করে সেখানে চরম রাষ্ট্রীয় সহিংসতা কায়েম রাখা হয়েছে। এ দিকে, ক্ষমতাসীন বিজেপির মোদি সরকার সংবিধানের সংশ্লিষ্ট বিশেষ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরে দখলদারি পোক্ত করার পাঁয়তারা চালিয়ে যাচ্ছে।

কুলদীপ নায়ার কাশ্মির ইস্যুতে ‘উদার দৃষ্টিভঙ্গি’র অধিকারী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তবে সেখানে ভারত যতই দমন-পীড়ন, নির্যাতন করুক না কেন, তিনি শেষবিচারে কাশ্মিরকে ভারতের অন্তর্ভুক্ত এবং অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই দেখেছেন। ভারতের গরিষ্ঠ সম্প্রদায় এবং সমাজ ও সরকারে কর্তৃত্বশীলেরা কাশ্মিরের ‘স্বাধীনতাকামী’দের নিছক ‘সন্ত্রাসী’ ও ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ হিসেবেই গণ্য করে থাকেন। কুলদীপ নায়ারও মূলত অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। এ জন্য তার লেখাতে তিনি কাশ্মিরি জনগণের তিনটি আদর্শ- জমহুরিয়াত (গণতন্ত্র), ইনসানিয়াত (মানবতা) আর কাশ্মিরিয়াত (কাশ্মিরের নিজস্ব ঐতিহ্য)-এর কথা বললেও সুকৌশলে হুররিয়াত বা স্বাধীনতার বিষয় এড়িয়ে গেছেন। অথচ এ দাবিই সেখানকার অব্যাহত অগ্নিগর্ভ অবস্থার কারণ। অবশ্য আরেকটি বাস্তবতা তিনি অস্বীকার করেননি। কাশ্মিরে নিজের সফর অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কুলদীপ জানিয়েছেন, সেখানকার যুবসমাজ ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ কায়েমের চেতনায় ক্রমবর্ধমানহারে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে। ‘জঙ্গি’ হিসেবে আখ্যায়িত সশস্ত্র বিদ্রোহীদের আর পাকিস্তান থেকে আসার দরকার পড়ে না এবং তারা যে, এখন মূলত কাশ্মিরিদের মধ্য থেকেই তৈরি হচ্ছে, তা তুলে ধরতেও কুলদীপ ভোলেননি।

কুলদীপ নায়ার তার নিজস্ব ভাষাশৈলী ও যুক্তিজালের মাধ্যমে যা লিখতেন, তা কোনো দল, দেশ, ধর্ম বা সম্প্রদায়ের ভক্ত হিসেবে নয়, ভারতের একজন অনুগত নাগরিকরূপেই উপস্থাপন করেছেন। কাশ্মির প্রসঙ্গে তার একটি বক্তব্য প্রসঙ্গক্রমে প্রণিধানযোগ্য। কয়েক বছর আগে কাশ্মিরে ভারতীয় শাসনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র তৎপরতা ও গণআন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন তিনি দিল্লির সম্ভাব্য ভাবনা ও কৌশলের দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মন্তব্য ছিল, কাশ্মির উপত্যকায় পরিস্থিতি দিল্লির নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে থাকলে ভবিষ্যতে গোটা জম্মু ও কাশ্মির রাজ্যকে ধর্মের ভিত্তিতে তিন ভাগ করে দেয়া অসম্ভব নয়। তখন ‘স্বাধীনতাকামী’রা বেকায়দায় পড়বে বলে তিনি মনে করতেন। কাশ্মিরের ওই সম্ভাব্য বিভাজনে হিন্দু অধ্যুষিত জম্মু, মুসলিম অধ্যুষিত কাশ্মির ও বৌদ্ধ অধ্যুষিত লাদাখ গঠন করা হতে পারে বলে তার ধারণা।

বিশ্ব পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিমাত্রেরই মনে পড়ছে ইরাক ও সিরিয়াকে সাম্প্রতিককালে কয়েক ভাগ করার সম্ভাব্য মার্কিন কৌশলের কথা। যখন কোনো দেশে নিজেদের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কিংবা প্রতিষ্ঠা করা দুরূহ বলে মনে করা হয়, তখন আধিপত্যকামী শক্তি শান্তি ও স্থিতিশীলতার নামে সে দেশকে বিভাজন করাই ‘সমাধান’ হিসেবে দেখাতে চায়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে বিভেদ সৃষ্টির পাঁয়তারা চলে। এসব কিছুর পেছনে সেই পুরনো উদ্দেশ্য- Divide and Rule থাকে কার্যকর।

কুলদীপের স্মরণে প্রকাশিত একটি লেখায় তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমি দেশ ভাগের বিপক্ষে। তার পরও আমার আকাক্সক্ষা, সেটা লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে হওয়া উচিত ছিল।’ তিনি আরো বলেছিলেন, ‘যদিও ধর্মের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হয়েছিল, তবু ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আমরা হিন্দু-মুসলিম বিভেদের আগুনে পানি ঢেলে পরিস্থিতি শান্ত করতে পেরেছিলাম। কিন্তু (নরেন্দ্র) মোদি আবার সেই নিভু নিভু আগুনে হাওয়া দিয়ে তা কিছুটা হলেও জ্বালিয়ে দিতে পেরেছেন। যেকোনো বিচারেই, তার বক্তব্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে ঘৃণাকে উসকে দিচ্ছে।’

His life's experience and attachment to historic figures such as Gandhi, Nehru, Jinnah, Sardar Patel, Abul Kalam Azad, Subhas Bose and others gave us a picture of what the Indian subcontinent was once and what it is now- how we lived then and are living now.

সে আমলের রাজনীতি ও আদর্শের অভিজ্ঞতায় কুলদীপ নায়ার যে উদার দৃষ্টিভঙ্গী অর্জন করেছেন, তা বর্তমান ভারতের উগ্র, মতান্ধ, অসহিষ্ণু ও বিদ্বেষপ্রবণ সমাজের চোখে ‘আপত্তিকর’ ঠেকতে পারে। জাতীয়তাবাদের নামে সাম্প্রদায়িক ও মিথ্যাচারী মহল চিন্তা, কথা ও কাজের যে সীমারেখায় সবাইকে আবদ্ধ রাখতে চায়, কুলদীপ তার বাইরে থেকেছেন বরাবর। তার আত্মজীবনীর 'ইবুড়হফ ঃযব খরহবং' নামটি সে বিবেচনায় সবিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।


আরো সংবাদ