১৪ নভেম্বর ২০১৮

বিএনপির নির্বাচনী যাত্রাপথে সরকারের ব্যারিকেড

বিএনপির নির্বাচনী যাত্রাপথে সরকারের ব্যারিকেড - ছবি : নয়া দিগন্ত

বিএনপিকে জাতীয় নির্বাচনে আসার আহ্বান সরকারের মায়াকান্না আজ জাতির সামনে অত্যন্ত স্পষ্ট। সরকারের অনেক মন্ত্রীর মুখে শোনা গেছে, বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে না এলে মুসলিম লীগ হয়ে যাবে, মায়াবতী কণ্ঠে বলছেন ন্যাপ হয়ে যাবে ইত্যাদি, ইত্যাদি। বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে আহ্বান জানিয়ে বলা হতো বিভিন্ন মুখরোচক বক্তব্য। প্রধানমন্ত্রী ২০১৬ সালে দলীয় সম্মেলনে এমনটিই বলেছিলেন যে, তিনি আর প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন দেখতে চান না। ৫ জানুয়ারির ভোট ও ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ওই নির্বাচন ছিল নিয়ম রক্ষার নির্বাচন মাত্র। অন্য দিকে, বিদেশীদের কাছেও তিনি অভিমত প্রকাশ করেছিলেন, সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের ব্যাপারেও তিনি আশাবাদী। কিন্তু সম্প্রতি সরকারি ইন্ধনে ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা ও বিচারের রায় সংক্রান্ত কিছু অগ্রিম কথাবার্তায় দৃশ্যত এটাই মনে হচ্ছে, সরকার বিএনপিকে বাদ দিয়ে একটি জাতীয় নির্বাচনের দিকে জোর দিয়েই এগোচ্ছে, জোর দিয়েই বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখার সব চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং এটাকেই তারা নিরাপদ মনে করছে। বিএনপির চেয়ারপারসনকে কারাবন্দী ও বিভিন্ন মামলায় জামিনের বিষয়টি দীর্ঘায়িত করার পেছনে সরকারের হস্তক্ষেপ এখন দৃশ্যমান।

সরকারপ্রধান ও তার পরিষদ অনেক কথাই বলেন যার সাথে বাস্তবতার কোনো সামঞ্জস্য নেই বরং সাংঘর্ষিক। যে বাঘ রক্তের স্বাদ পেয়েছে সে শিকারের ঝুঁকি নেবেই। এ সরকার স্পষ্টই বুঝতে পেরেছে, বিনা ভোটের নির্বাচন করেও একটি গণতান্ত্রিক (সংবিধান মতে) রাষ্ট্র শাসন করা যায়। ফলে আর একটি একতরফা নির্বাচন যদি করা যায় তবে সরকার একদলীয় শাসন ছাড়াও স্থায়ীভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে (যদি ব্যতিক্রম কিছু না ঘটে) এবং এটাই যদি হয় তবে ভবিষ্যতে আর নির্বাচনের প্রয়োজন হবে না, বংশানুক্রমে চললেই হবে। পৃথিবীর বেশির ভাগ মানুষ বিবেক দিয়ে চলে না, তারা ক্ষমতাসীনদের পাশে থেকে নিরাপদ অবস্থানে থাকতে চায়। মানুষ যদি ‘বিবেক’ দিয়ে চলত তবে অনেক অনাচার-অবিচারের প্রতিরোধ হতো। কিন্তু প্রতিরোধ গড়ে তোলার যে অবস্থান সৃষ্টি হওয়ার কথা ছিল তা এখনো দৃশ্যমান নহে। গ্যাসের দাম দফায় দফায় বৃদ্ধি পাচ্ছে, মোবাইল কলরেট রেড়েছে, গণমানুষের ভোটাধিকার ছিনতাই হচ্ছে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাড়ছে, কিন্তু গণমানুষের কোনো রা নেই বরং বুদ্ধিজীবীরা সরকারের ডামাঢোল বাজিয়ে সরকারি সুবিধা আদায় করছে। চ্যানেলগুলোও সরকারের নিয়ন্ত্রণে, ব্যতিক্রম হলেই একুশে টিভির মতো অবস্থায় পড়তে হবে মনে করে পুরোপুরি সত্যের পথে চলতে তারা বাধাগ্রস্ত।

২১ আগস্ট গেনেড হামলা একটি পৈশাচিক ঘটনা। এ ঘটনায় বিচার বিএনপি চেয়েছে এবং বিবেকবান সব মানুষেরই উচিত এ ঘটনার নিন্দা প্রকাশ ও বিচার চেয়ে প্রকৃত দোষী ব্যক্তির শাস্তি কামনা করা। বিএনপি সরকার এ ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের সন্ধানদাতাদের এক কোটি টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল এবং যতটুকু মনে পড়ে, প্রধান অভিযুক্ত মুফতি হান্নানকে বিএনপি সরকারই গ্রেফতার করে ছিল। এরপরও রায় ঘোষণার পূর্বমুহূর্তে তারেক রহমানকে ইঙ্গিত করে জিয়া পরিবারকে দায়ী করে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য আমাদের দেশের বর্তমান নিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থাকে প্রভাবান্বিত করবেই। পৈশাচিক ঘটনা যেমন পাপ, তেমনি প্রভাব খাটিয়ে নির্দোষ কাউকে দোষী সাব্যস্ত করাও সমভাবে দায়ী। প্রকৃত দোষী ব্যক্তির সাজা হোক, কিন্তু ক্ষমতার মসনদকে চ্যালেঞ্জমুক্ত রাখার জন্য কোনো কারণেই স্বচ্ছতা যেন কলঙ্কিত হয়ে না পড়ে। যদি হয়, তবে কেউ জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না, আজ বা কাল হোক।

বিএনপি চেয়ারপারসনের অংশগ্রহণ ছাড়া দলটি নির্বাচনে যাবে কি না তা আরো পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনার দাবি রাখে। চেয়ারপারসন জামিনে মুক্ত হলেই নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না, যদি না ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা মোতাবেক তার সাজা উচ্চ আদালত কর্তৃক স্থগিত না হয়। অথবা সরকারি কোনো সিদ্ধান্তে তার নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়(!)। বিষয়টি এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। চেয়ারপারসনকে ছাড়া জাতীয় নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেয়া যেমন হবে আত্মঘাতী অন্য দিকে বিকল্প গণতান্ত্রিক পন্থা বা পদ্ধতি নির্ধারণ করাও অত্যন্ত জরুরি। এ দু’টি বিষয় নিয়ে বিএনপিকে একটি স্থির ও সাবলীল সিদ্ধান্তে অবশ্যই পৌঁছাতে হবে।

২৮ আগস্ট ২০১৮ জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একটি সভা ড. কামাল হোসেনের বাসভবনে অনুষ্ঠিত হয়েছে। জনসমর্থনের দিক দিয়ে তাদের দল অনেক পিছিয়ে থাকলেও রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ, যারা বিভিন্ন সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার মুখ্য দায়িত্বে ছিলেন। বদরুদ্দোজা চৌধুরী বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন মহাসচিব, পরে মন্ত্রিত্ব, সর্বশেষ রাষ্ট্রপতি। চূড়ান্ত পর্বে রাষ্ট্রপতি থেকে পদত্যাগ পক্ষান্তরে অপসারণ, বর্তমানে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে শেখ হাসিনা সরকারের মুখোমুখি অবস্থান করছেন। ড. কামাল হোসেন সংবিধান প্রণেতা, আওয়ামী লীগ মনোনীত রাষ্ট্রপতি প্রার্থী, মুক্তিযুদ্ধের সময়ে পাকিস্তানি সামরিকজান্তাদের বন্দিশালায় আটক, প্রধানমন্ত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে অধিষ্ঠিত করা, শেষ অব্দি বিগত ১/১১ সরকারের প্রতি সমর্থন প্রভৃতি মিলিয়ে জাতীয় পর্যায়ে তার একটি অবস্থান রয়েছে।

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী একজন সম্মুখযোদ্ধা ছাড়াও ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর তিনিই একমাত্র ব্যক্তি যিনি প্রতিবাদ করে দেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। আ স ম আ. রব মুক্তিযুদ্ধের আন্দোলনে সম্মুখসারির ছাত্র নেতৃত্ব দিয়েছেন, যিনি স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। মাহমুদুর রহমান মান্না ঐতিহ্যবাহী ডাকসুর ভিপি, জিএস ছাড়াও তৃতীয় ধারার রাজনীতি চালু করার জন্য দীর্ঘ দিন ধরে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে অনড় রয়েছেন। তৃণমূলপর্যায়ে তাদের সাংগঠনিক তৎপরতা না থাকলেও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড আছে যাদের প্রতি জনগণ আস্থা আনতে পারে।

এতদিন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তথা বিএনপি নির্র্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার দাবি তুলেছিল, এখন বর্ণিত ব্যক্তিদের আকণ্ঠ সমর্থন আরো জোরদারসহ জনগণের আস্থা অর্জনে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। এ ঐক্যে সরকারের গা-জ্বালা ধরেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সরকারি দলের মুখপাত্র এমনটিও বলেছেন, বিএনপি-জামায়াতের চেয়ে আওয়ামী লীগে ঘাপটি মেরে থাকা শত্রুরা সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে বেশি তৎপর হয়েছে। মনে হচ্ছে, গুটিকয়েক ব্যক্তির বেইলি রোডের মিটিং বেশ নাড়া দিয়েছে। কারণ, গণমানুষের ভোটাধিকার আদায়ের দাবি যুক্তিসঙ্গত এবং বর্তমানে এটা গণদাবি। ইসলামপন্থী বড় দলগুলো এ বিষয়ে অনড় রয়েছে।

বিএনপি একটি উদারপন্থী দল, যাকে বলা যায় অতি উদারপন্থী। এখানে পুরস্কার ও তিরস্কারের অনেক ভাটা রয়েছে। ‘আপন’-‘পর’ চেনার অনেক ঘাটতি রয়েছে। যারা দলের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং যারা দলের জন্য জানজীবন দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দলের জন্য কাজ করে তাদের সবাইকে একই পাল্লায় মূল্যায়ন করা হয়। অর্থাৎ, ধান ও চিটা (মরা ধান) একই দরে বিক্রি হয়। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া অতি উদারপন্থী দলের চেয়ারপারসন না হয়ে যদি কোনো কট্টরপন্থী দলের নেতা হতেন, তবে নিশ্চয় তার মুক্তির আন্দোলনের দিনক্ষণ ঠিক করার জন্য ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে থাকতে হতো না।

অতি উদারতার কারণে ১/১১ সংস্কারপন্থীদের বিরুদ্ধে দলে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিএনপি আইনজীবী সহযোগী সংগঠন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম নেত্রীর সাজা হওয়ার পর একদিনের জন্যও রাজপথে নামেনি এবং এ জন্য কোনো জবাবদিহিতাও নেই। এটাই ভাগ্যের নির্মম পরিহাস। তবে এ অবস্থান থাকবে না, অবশ্যই এর অবসান হতে হবে, তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ক্ষমতাসীন সরকার। কারণ শত প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও বিএনপি মাঠে নামার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে এবং এত জেল-জুলুম অত্যাচার করেও সরকার বিএনপিকে ভাঙতে পারেনি। মহিলা নেত্রীরাও জেল খাটছেন। তৃণমূল এখনো দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার একক নেতৃত্বের প্রতি সম্পূর্ণ আস্থাশীল। এতে এটাই প্রতীয়মান হয়, সরকার শত সহস্র অত্যাচার-নির্যাতন করেও বিএনপির মাথা নোয়াতে পারেনি। তবে সরকার একতরফা নির্বাচনের পথ সুগম করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে এবং এ জন্যই ইউনিয়ন ওয়ার্ডপর্যায়ের নেতাকর্মী ছাড়াও সমর্থকদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে পুলিশি হয়রানি করছে। সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নাৎসি বাহিনী বানিয়ে জনগণের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়ে আইনকে ব্যবহার করে নির্যাতন করছে। তবে তৃণমূল মনে করে, একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য খালেদা জিয়ার মুক্তিই শেষ কথা।

একটি ঘটনার প্রতি দৃষ্টিপাত করলেই জাতীয় নির্বাচন সম্পর্কে সরকারের পরিকল্পনা স্পষ্ট ফুটে ওঠে। সোনারগাঁও উপজেলা বিএনপি সভাপতি খোন্দকার আবু জাফরসহ অনেকেই হজে থাকাবস্থায় তাদের বিরুদ্ধে নাশকতার মামলা দিয়েছে। ২৯ আগস্ট ২০১৮ বিএনপি চেয়ারপারসনের মুক্তির দাবিতে রূপগঞ্জ উপজেলাধীন যাত্রামুড়া এলাকায় নারায়ণগঞ্জ জেলা ওলামা দল আয়োজিত একটি সভায় লেখক যোগদান করার জন্য উপস্থিত হলে পুলিশ সভা শুরু হওয়ার আগেই ছত্রভঙ্গ করে দেয় এবং জেলা ওলামা দলের সভাপতি শামছুর রহমান খান বেনু, ওলামা দল নেতা আলাউদ্দিন, আমির হোসেন এবং নাছির মেম্বারকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় এবং ২৮ জনকে আসামি করে পুলিশ কাল্পনিক মামলা রুজু করে। প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের টপ টু বটম নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছে, অন্য দিকে মামলা এবং গ্রেফতার এড়াতে বিএনপি ঘর থেকেই বের হতে পারছে না। সরকারের দৃষ্টিতে সরকারের মন্ত্রীরা আগে থেকেই বলছেন এটাই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (!)। আরো বলে আসছেন, আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় না গেলে রোহিঙ্গা হয়ে যাবে। এমনো বলা হয়েছে, বিএনপি যদি ক্ষমতায় আসে তবে সরকারদলীয় নেতারা টাকা পয়সা যা কামাই করেছেন, তা ফেলে রেখে দেশ ছেড়ে পালাতে হবে।

ফলে এটাই প্রতীয়মান হয়, নিজেদের জনসমর্থন সম্পর্কে সরকারের উপলব্ধি হয়েছে। যার জন্য পুনরায় ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জনসমর্থন নয় বরং পুলিশের কাল্পনিক মামলা ও নিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থাকে পুঁজি করেই বিএনপির নির্বাচনী যাত্রাপথে সরকার নিজেই ব্যারিকেড সৃষ্টি করছে। যার নীরব ও সরকার অনুগত দর্শক হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন, যারা নিজেরাই একটি স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের নিশ্চয়তা জাতির সামনে দিতে পারেনি।
লেখক : কলাম লেখক ও সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের আইনজীবী
taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ