১৪ নভেম্বর ২০১৮
বহমান এই সময়ে

অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের স্বপ্ন

-

দেশে একটি গণতান্ত্রিক শাসন সবাই চায়। গণতান্ত্রিক শাসনের অনুষঙ্গ অনেক। এর মধ্যে অন্যতম অনুষঙ্গ হচ্ছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের সংজ্ঞা বোঝার জন্য রাজনীতি বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন হয় না। এটি এমন একটি নির্বাচন, যেখানে ভোটের মালিকেরা তাদের ইচ্ছামতো অবাধে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারবে, নির্বাচিত করতে পারবে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে, এতে কেউ কোনো বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের পছন্দের প্রার্থীরা নির্বাচিত হয়ে দেশ পরিচালনা করবেন, প্রতিটি নির্বচনে থাকবে জনমতের প্রতিফলন, জনপ্রতিনিধিরা থাকবেন জবাবদিহিতার আওতায়। আর নির্বাচনোত্তর সময়ে দেশী-বিদেশী সব মহলের কাছে এমন বিশ্বাস জন্ম নেবে, নির্বাচনে জনমতের প্রতিফলন ঘটেছে। এর ব্যত্যয় ঘটলে গণতান্ত্রিক শাসন নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। কার্যত আমরা এমন একটি প্রশ্নবোধক পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই দীর্ঘ দিন ধরে চলছি। এটি দেশের সাধারণ মানুষ যেমন বোঝে, তেমনি বোঝে দেশের বাইরের বিভিন্ন মহল। আর ক্ষমতাসীনেরা বুঝেও না বোঝার ভান করে। সে জন্যই আজ দেশের সাধারণ মানুষ একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের খোঁজ করছে অতি আগ্রহের সাথে।

বাংলাদেশে এখন রয়েছে শতাধিক রাজনৈতিক দল। তা সত্তে¡ও দু’টি প্রধান রাজনৈতিক জোট, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীর ২০ দলীয় জোট বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রাধান্য বিস্তার করে অনেকটা পালাক্রমে দেশ শাসন করে আসছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট বহু বিতর্কে বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটসহ দেশের বেশির ভাগ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল এই নির্বাচন বয়কট করে। এ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৪টি আসনে আওয়ামী লীগ বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে। ফলে নির্বাচনের আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়, কোন দল সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অথচ বিতর্কিত এই নির্বাচনের মধ্য দিয়েই আওয়ামী লীগ আবার ক্ষমতায় আসে। গণমাধ্যমসহ বেশির ভাগ জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নির্বাচনী পর্যবেক্ষক এই নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বলে স্বীকৃতি জানায়নি। নির্বাচনের পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে আন্দোলন কর্মসূচি দেয়। এই আন্দোলনের মধ্যে ধর্মঘট, সড়ক অবরোধ ও সমাবেশ কমসূচিও অন্তর্ভুক্ত ছিল। এই আন্দোলন কোথাও কোথাও সহিংস আকার নেয়।

প্রথম দিকে সরকার পক্ষ ২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচনকে নিয়ম রক্ষার নির্বাচন আখ্যায়িত করে শিগগিরই নতুন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন আয়োজনের কথা বললেও, শেষ পর্যন্ত সে অবস্থান থেকে সরে গিয়ে পাঁচ বছর মেয়াদ পূরণে কঠোর অবস্থান নেয়। অপর দিকে আন্দোলন দমাতে সরকার পক্ষ কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে ওঠে। অভিযোগ ওঠে বিরোধী নেতাকর্মীদের ব্যাপক দমনপীড়নের। সেই সাথে সরকারের বিরুদ্ধে একদলীয় পুলিশি শাসনের অভিযোগ ওঠে। এরপর থেকে এ সরকারের বিরুদ্ধে দেশী-বিদেশী মহল ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ করে আসছে, এ সরকার গণতান্ত্রিকভাবে আচরণ না করেই দেশ পরিচালনা করছে। সেই সাথে দেশে একটি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের দাবি উচ্চারিত হচ্ছে।

এদিকে বর্তমান সরকারের অধীনে বেশ কিছু স্থানীয় নির্বাচন, উপনির্বাচন ও গুরুত্বপূর্ণ সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এগুলোতে সরকার পক্ষের বিরুদ্ধে নানা নির্র্বাচনী অনিয়ম, ভোটকেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপার ছিনতাই, ইচ্ছেমতো ব্যালট পেপারে সিল মেরে বাক্সবন্দী করা, বিরোধী প্রার্থীর এজেন্টদের বের করে দেয়া, পুলিশ ও প্রশাসনকে সরকার দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করার ব্যাপক অভিযোগ রয়েছে এবং এসব অভিযোগের সত্যতার নানা প্রমাণ গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হয়েছে। এর ফলে জনমনে এমন ধারণা জন্মেছে- এই দলীয় সরকারের অধীনে আর যা-ই হোক অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে না। কিন্তু সরকার পক্ষ বলছে, এ সরকারের অধীনেই আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং তা হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। কিন্তু সরকারের এ কথায় কেউই আস্থা রাখতে পারছে না। এ পেক্ষাপটেই দাবি উঠেছে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকারের প্রভাবমুক্ত একটি নির্বচনীব্যবস্থা উদ্ভাবনের।

১৯৯০-এর দশকের শুরুতে এরশাদ সরকারের পতনের পর মোটামুটি সব দলের সম্মতিতে এ দেশে কার্যকর করা হয়েছিল নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা। এই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় সংসদের তিনিটি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় যথাক্রমে ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে। এই তিনটি নির্বাচনই দেশে-বিদেশে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য বলেই বিবেচিত হয়। কিন্তু এর পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রশ্নে নানামাত্রিক মতভেদ দেখা দেয়। সেই সূত্রেই অনেকটা অনাকাক্ষিত ও অলিখিতভাবে হলেও পরবর্তী নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় সেনাসমর্থিত সরকারের হাতে। সেনাসমর্থিত সে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হন ফখরুদ্দীন আহমদ। কোনো গ্রহণযোগ্য সাংবিধানিক ব্যাখ্যা ছাড়াই নির্বাচন পিছিয়ে যায় আরো দুই বছর। সে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে।

এতে বিজয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট সরকার গঠন করে ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে। বিএনপি জোট এ নির্বাচনকে মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের নীলনকশার নির্বাচন বলে অভিহিত করে। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করে আদালতের দোহাই দিয়ে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে, যদিও আদালতের পর্যবেক্ষণ ছিল আরো দুই মেয়াদে জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সেদিকে না গিয়ে তড়িঘড়ি করে সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুবাদে জাতীয় সংসদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। সেই থেকে দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন নয়, এমন দাবি তোলে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ও বিভিন্ন মহল।

আওয়ামী লীগ তাতে রাজি না হলে সে নির্বাচন ব্যাপক বয়কটের মুখে পড়ে। কিন্তু ব্যাপক বয়কটের মধ্যেও ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন করে ১৫৪ জন বিনা ভোটের এমপি নিয়ে আবার সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট। সেই থেকে সরকারবিরোধী মহল ও সুশীলসমাজ দেশের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে দলীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রেখে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের উপায় উদ্ভাবনের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে আওয়ামী লীগ অব্যাহতভাবে বলে আসছে, শেখ হাসিনার দলীয় সরকারের অধীনেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। সংবিধানে এই ব্যবস্থাই রয়েছে। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

বাস্তবতা হচ্ছে- তাত্ত্বিক একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন সম্পর্কিত কোনো মডেল এখন বাংলাদেশে কার্যকর নেই। তা সত্ত্বেও, বেশ কিছু লেখালেখি ও অভিজ্ঞজনের সে সম্পর্কিত অভিমত রয়েছে সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে থেকে সবার জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন আয়োজনের ব্যাপারে। বেশ কয়েকজন অভিজ্ঞজন ভোটের আচরণ বিশেøষণ করেছেন যৌক্তিক অভিমত ও জনমতের ওপর ভিত্তি করে। এগুলো অর্থনৈতিক তত্ত¡ভিত্তিক। এগুলো মূলত প্রায় ৫০ বছর আগে ব্যবহার করা হয়েছে গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায়। আমেরিকান অর্থনীতিবিদ স্টিগলারের মতে, একজন যৌক্তিক মানুষ অবশ্যই পরিচালিত হতে হবে সেই প্রণোদনা ব্যবস্থা দিয়ে, যে ব্যবস্থার আওতায় সে চলে।

তার প্রত্যাশা কী, সেটা কোনো ব্যাপার নয়। তাকে অবশ্যই এমন সব কর্মকাণ্ডে নিরুৎসাহিত করতে হবে, যেগুলো ক্ষতি  বয়ে আনে। মুলোর ঝুঁটি যেমন গাধাকে পরিচালিত করে, তেমনি পরিচালিত করে বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদদেরকেও। অতএব ধরেই নেয়া যায়- ভোটার, রাজনীতিবিদ, নীতিনির্ধারক ও সরকারি কর্মকর্তারা কাজ করবেন তাদের স্বার্থের অনুক‚লে। অ্যান্থনি ডাউনসের মতে, ভোটারদের মনোযোগ যাবে সেখানে যেখানে ভোটগুলো খুবই দামি, যাতে ভোট তার স্বার্থ বয়ে আনে। রিকার এবং ওরডেশুক ডাউনসের এ ধারণা আরো বিস্তৃত করেন ভোটের সিদ্ধান্ত সম্পর্কিত একটি মডেলের মাধ্যমে। এই মডেলের শুরুটা হচ্ছে যৌক্তিকতার ওপর।

এই মডেল মতে, ভোটারেরা তখনই ভোট দেবে যদি ভোট দিলে তার প্রত্যাশিত উপযোগিতা ভোট না দেয়ার উপযোগিতা থেকে বেশি হয়। অপর দিকে নোরিস পিপ্পা তার ‘ইলেকটোরাল ইন্টিগ্রিটি প্রজেক্ট’-এ একটি মডেল স্থাপন করে একটি এজেন্ডা দাঁড় করিয়েছেন। এতে চিহ্নিত করা হয়- জালিয়াতি ও অনিয়মের নির্বাচন ইলেকটোরাল ইন্টিগ্রিটির আন্তর্জাতিক মান রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়, নিচে নামিয়ে আনে রাজনৈতিক বৈধতার মাত্রা, কমিয়ে আনে ভোটদানের মাত্রা এবং উৎসাহিত করে প্রতিবাদের রাজনীতিকে। আমরা যদি এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের দিকে ফিরে তাকাই, তবে সে নির্বাচনে এমন অনেক উল্লেখযোগ্য ঘটনা দেখতে পাবো, যা প্রমাণ করবে এই নির্বাচনে যথেষ্ট অনিয়ম চলেছে।

নির্বাচনটি মোটেও  প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ছিল না। এটি কোনো সংজ্ঞায়ই সুষ্ঠু নির্বাচনের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে না। এর ফলে নির্বাচনের আগে ও পরে অনেক অনাকা অনাকাঙ্খিত  ঘটনা ঘটেছে প্রতিবাদের রাজনীতির সূত্র ধরে। সেই সূত্রে অনেক প্রাণহানি ঘটেছে, অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধিত হয়েছে এবং বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের রাজনীতি জোরদার হয়েছে।

একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনই পারে আসছে দিনে আমাদের এসব উপসর্গ থেকে বাঁচাতে। আমাদের মনে রাখতে হবে, গণতন্ত্র নিশ্চিত করার একটি মুখ্য উপাদান হচ্ছে নির্বাচন। কারণ- নির্বাচন জোরালো করে তোলে সরকারে অংশগ্রহণ, নিশ্চিত করে সরকারের জবাবদিহিতা এবং উৎসাহিত করে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। আর একটি গণতান্ত্রিক সরকার ও শাসনের মৌলিক গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত হচ্ছে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। নির্বাচন তখনই বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য হবে, যখন নির্বাচনী প্রক্রিয়ার আইনকানুন, বিধিবিধান ও নিয়মনীতি যথাযথভাবে অনুসৃত হয়। তখন দেখা যাবে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের জনপ্রত্যাশা পূরণ হচ্ছে।

ডায়মন্ডের মতে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের উপাদান চারটি : ০১. নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অবাধে প্রতিযোগিতা করার মতো কয়েকটি স্বাধীন রাজনৈতিক দল, ০২. ব্যক্তিসাধারণের নিজের পছন্দ মতো রাজনীতি করার ও নির্বাচন প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়ার অবাধ সুযোগ, ০৩. নির্বাচন প্রক্রিয়া হবে অবাধ ও সুষ্ঠু, যাতে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি সমান সুযোগ নিয়ে তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারে এবং ০৪. নির্বাচনী ফলাফল হবে যথাযথ ও বৈধ। যখন কোনো নির্বাচনে এই চারটি উপাদানের পরিপূর্ণ উপস্থিতি থাকবে কেবল তখনই আমরা সে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন বলে বিবেচনা করতে পারি। অতএব এ ধরনের অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের অর্থ হচ্ছে, প্রতিটি রাজনৈতিক দল সমান সুযোগ ভোগ করবে জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেয়ার ক্ষেত্রে।

এ ধরনের নির্বাচনে কোনো ধরনের ভয়ভীতি ছাড়াই জনগণের নিরঙ্কুশ অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। নির্বাচনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সব ধরনের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ও নির্বাচনী পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোকে অবাধ সুযোগ দিতে হয় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের জন্য। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশে কতটুকু বিদ্যমান? বাস্তবতাদৃষ্টে প্রশ্নের উত্তর নেতিবাচক হওয়াই স্বাভাবিক।

ওপরের আলোচনা থেকে এটুকু স্পষ্ট, নির্বাচনের সাথে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে একটি সরকারের গণতান্ত্রিক শাসনের বৈধতা ও জনগণের স্বাধীনতার বিষয়টি। নিছক ভোট গ্রহণই নির্বাচনের জন্য যথেষ্ট নয়। নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলাটাই অনেক দেশের গণতান্ত্রিক সমাজের চ্যালেঞ্জ হিসেবেই রয়ে গেছে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় মৌলিক প্রয়োজন হচ্ছে, একটি গণতান্ত্রিক শাসন নিশ্চিত করা। গণতান্ত্রিক শাসনই পারে একটি নির্বাচনকে অবাধ, অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিযোগিতামূলক করে তুলতে। তা করতে ব্যর্থ হলে একটি সরকার শাসন করার বৈধতা ও জনগণের আস্থা হারায়। এর ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ফলে দেশকে সুশৃঙ্খল গণতান্ত্রিক শাসনের আওতায় আনতে অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের বিকল্প নেই। সেই সাথে দেশে থাকা চাই সরকার ও বিরোধী দলের সক্রিয় অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে একটি কার্যকর পার্লামেন্ট। এ ধরনের পার্লমেন্টে প্রতিফলিত হয় জনমতের প্রতিফলন।

আমরা বিভিন্ন সমীক্ষাসূত্রে জানতে পেরেছি, বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত বেশির ভাগ নির্বাচন ছিল  ক্রুটিপূর্ণ। এসব নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও বিশ্বাসযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য ছিল না। যদিও উল্ল তত্ত্ববধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলো ছিল তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক ও অংশগ্রহণমূলক এবং এসব নির্বাচনের ফলাফল ছিল সব মহলের কাছেই গ্রহণযোগ্য। কিন্তু পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত¡াবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের পর আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন কোনো বিবেচনায়ই অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য ছিল না। কারণ, এ নির্বাচনে ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। তা ছাড়া এ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্য ১৫৪ জন এমপি নির্বাচিত হয়েছেন কোনো প্রতিদ্ব›িদ্বতা ছাড়াই। সুতরাং এ সংসদে জনমতের প্রতিফলন ঘটার কোনো সুযোগ নেই।

আগামী নির্বাচনে এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। কিন্তু বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অসহযোগিতার মনোভাব খুবই তীব্র। যেখানে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল সরকারি ও বিরোধী দলগুলোর মধ্যে সংলাপের তাগিদ দিয়ে আসছে বারবার, সেখানে সরকার পক্ষ এর প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করে আসছে জোরালোভাবে। মনে হচ্ছে, সরকার ২০১৪ সালের নির্বাচনের মতোই আরেকটি নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনেই বিদ্যমান ব্যবস্থায়ই সম্পন্ন করার ধনুকভাঙা পণ করেই বসে আছে। যদি সরকার তেমন অবস্থানেই শেষ পর্যন্ত থেকে যায়, তবে তা হবে গোটা জাতির জন্য একটি দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। জাতির জন্য তা বয়ে আনবে অপরিসীম দুর্ভোগ ও ক্ষতি। কারণ, এ ধরনের নির্বাচনে জনমতের কোনো প্রতিফলন থাকবে না। এ ধরনের প্রবণতা বাংলাদেশ থেকে সমঝোতা আর সহিষ্ণুতার রাজনীতিকে নিয়ে যাবে যোজন যোজন দূরে। 


আরো সংবাদ