২৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮

দ্বিতীয় ভিয়েতনাম হচ্ছে আফগানিস্তান?

দ্বিতীয় ভিয়েতনাম হচ্ছে আফগানিস্তান? - ছবি : সংগৃহীত

আফগানিস্তানজুড়ে তালিবান দখলদারিত্বের নাটকীয় এবং দৃশ্যত অপ্রতিরোধ্য অগ্রাভিযানে মনে হচ্ছে যে, ‘সাম্রাজ্যবাদীদের কবরস্থান’ নামে পরিচিত দেশটিতে দ্রুততম গতিতে ব্যর্থ হওয়ার সর্বশেষ বিদেশী শক্তি হয়ে উঠছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত সপ্তাহে রাজধানী কাবুল থেকে মাত্র ১৫০ কিলোমিটার দক্ষিণের কৌশলগত শহর গজনি কয়েক দিনের জন্য তালেবানরা দখল করে রেখেছিল। তারা কয়েক দিন থাকার পর সেখান থেকে আশপাশের এলাকায় সরে যায়। পরে কাবুলে তালেবানরা একটি সামরিক-গোয়েন্দা প্রশিক্ষণ ঘাঁটির ওপর হামলা চালায়। এতে মনে হয়েছে, তারা মার্কিনসমর্থিত নিরাপত্তা বাহিনীর অকার্যকারিতাকে তুলে ধরেছে। সামরিক গোয়েন্দা ঘাঁটি আকস্মিক আক্রমণের শিকার হওয়ার মতো বিস্ময়কর ঘটনাই সেখানে ঘটছে।

এর আরো উত্তরে ফারিয়াব প্রদেশে, আফগান ন্যাশনাল আর্মির এক ঘাঁটিতে তালেবানরা হামলা চালিয়ে ৩০ জনকে হত্যা এবং ৭০ জনকে বন্দী করেছে। প্রাদেশিক প্রবীণরা জানিয়েছেন, ঘাঁটিটিকে সহজেই তালেবানরা দখল করে নিতে সক্ষম হয় এ কারণে যে, সেখানে গোলাবারুদ এবং খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছিল।

তালেবান হামলার তাৎপর্য
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান, গজনিতে তালেবান হামলা পরিস্থিতির ওপর নাটকীয় প্রভাব ফেলেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘যুদ্ধ জয় করা’র নতুন কৌশল ঘোষণার প্রায় এক বছর পর গজনির রক্তাক্ত এ সংঘর্ষ একটি সুস্পষ্ট মুহূর্ত হতে পারে আমেরিকার আফগান কৌশলের জন্য। ট্রাম্প এখন আফগানিস্তান নিয়ে নতুন কিছু ভাবতে বাধ্য হতে পারেন।

তালেবানদের এই হামলা যতটা সামরিক, ঠিক ততটাই প্রতীকী। গোপনীয় ও অপ্রকাশিত শান্তি আলোচনার কারণে এই ধারণা জন্মেছে যে, ১৭ বছরের দীর্ঘ যুদ্ধের হয়তো ইতি ঘটতে চলেছে। তালেবানরা এখানে সফলভাবে মার্কিন সব ধরনের সামরিক আগ্রাসনকে প্রতিহত এবং স্থানীয় ও বিদেশী সেনাদের হামলার মোকাবেলা করেছে।

আফগান সরকার এবং মার্কিন বাহিনী এখনো ব্যাপকভাবে আক্রমণাত্মক অবস্থানে রয়েছে। আফগান সামরিক বাহিনীকে অতি সম্প্রতি নতুন বিদেশী প্রশিক্ষক এবং সরঞ্জাম দিয়ে সুসজ্জিত করা হয়েছে। সর্বোপরি দোহা আলোচনার আগ দিয়ে এবং আলোচনা চলাকালে বিভিন্ন অভিযানে ২২০ তালেবান যোদ্ধাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গজনির হামলা শুধু প্রতিশোধমূলকই নয়, এটা চলমান যুদ্ধের একটা ধারাবাহিকতা। আগের হামলাগুলোর মতোই শহর দখলের জন্য এই হামলা করা হয়নি। এটা তালিবানের শক্তি প্রদর্শনীর একটা হামলা যাতে এটা মনে করা না হয় যে, তাদের শান্তি আলোচনায় অংশ নেয়ার অর্থ হলোÑ তাদের শক্তি কমে গেছে এবং ট্রাম্প প্রশাসন শক্তি প্রয়োগে তাদের আলোচনার টেবিলে বসানোর ব্যাপারে সফল হয়েছে। এই হামলা এটাও দেখিয়ে দিয়েছে যে, আফগান বাহিনী আসলেই কতটা দুর্বল। কাবুলের কাছাকাছি কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ একটা শহরে টিকে থাকার মতো শক্তিও তাদের নেই।

এই হামলা হয়তো আলোচনাকে সাময়িকভাবে স্থগিত করতে পারে, তবে তালেবানরা তাদের এই সাফল্যকে কাজে লাগিয়ে শুধু বাড়তি কিছু শহর ও গ্রামের নিয়ন্ত্রণই নেবে না, বরং পরবর্তী প্রতিটি আলোচনার টেবিলে এটাকে তারা দরকষাকষির জন্য কাজে লাগাবে। এই হামলা তাই শান্তি আলোচনাকে জটিল করবে না, আলোচনার টেবিলে এটা তালেবানদের বাড়তি শক্তি দেবে।

ইরানকে শত্রু বানানোর কৌশলগত ভুল
আফগানিস্তানে আমেরিকার বারবার ভুল করা এবং তার অপরাধমূলক কাজের মাধ্যমেই নিজের জন্য দুর্ভোগ নেমে এসেছে বলে মনে হচ্ছে। বিশেষ করে, প্রতিবেশী ইরানের সাথে মুখোমুখি সঙ্ঘাতে যাওয়া এবং তেহরানের শাসনব্যবস্থার পরিবর্তনের প্রচেষ্টা আফগানিস্তানে মার্কিন ভাগ্য বিপর্যয়ের কারণ হয়েছে। এটি হলো দেশটির কৌশলগত ভুলের এমন এক বিন্দু, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই নিজের জন্য সামরিক কবর খনন করছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্র তালেবানদের বিরুদ্ধে প্রথম অভিযান চালানোর সময় তার মিত্র নর্দার্ন এলায়েন্সকে সর্বতোভাবে সহায়তা করেছিল ইরান।
এখন প্রতিবেশী ইরানের প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের আগ্রাসী নীতিই একটি নির্ণায়ক ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরানকে পঙ্গু করার জন্য মার্কিন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আফগানিস্তানে নিরাপত্তার জন্য বুমেরাং হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত মে মাসে আন্তর্জাতিক পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে আসার পর ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর নিষেধাজ্ঞা পুনরায় আরোপের কারণে সৃষ্ট, ইরানের অর্থনীতির দুরবস্থা আফগানিস্তানে সরাসরি বিধ্বংসী প্রভাব ফেলছে। হাজার হাজার অভিবাসী আফগান কর্মী কর্মসংস্থানের জন্য ইরানের ওপর নির্ভরশীল। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স আফগানিস্তানে ফিরে যাওয়া পরিবারের একটি প্রধান অবলম্বন।

মার্কিন নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানি অর্থনীতি ইতোমধ্যে হুমকির মুখে পড়েছে। আফগানিস্তানের প্রবাসী কর্মীরা ইরান ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হতে পারে, যা আফগানিস্তানের অর্থনীতিতে বেশির ভাগ সময় ধরে টিকে থাকা রেমিট্যান্সকে আরো হ্রাস করবে।

ইরানের ওপর ওয়াশিংটনের নিষেধাজ্ঞার আরো একটি অর্থনৈতিক প্রভাব দেখা যাবে। তা হলো, ভূ-বেষ্টিত আফগানিস্তান আমদানি ও রফতানির জন্য ইরানি সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করতে পারবে না। ইরানের সাথে ব্যবসা করার অভিযোগে যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে ট্রাম্প প্রশাসন যে প্রচারাভিযান চালাচ্ছে, তা থেকে আফগানিস্তানকেও ছাড় দিচ্ছে না। এতে ইরানের সাথে দেশটির বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং ভারত মহাসাগরে তার বাণিজ্য পথ বন্ধ হয়ে যাবে।

ওয়াশিংটন নভেম্বরে ইরানের ওপর সর্বাত্মক তেল নিষেধাজ্ঞা চায়, যার অনিবার্য পরিণতিতে আফগানিস্তানে সামাজিক অবস্থার অবনতি ঘটবে। এটি আফগানিস্তানে তালেবানের সমর্থন আরো চাঙ্গা করবে এবং মার্কিনসমর্থিত আফগান বাহিনীকে আরো বেশি ভঙ্গুর করে তুলবে।

ইরান তালেবানকে গোপনভাবে সামরিক সহায়তা দেয়ার মাধ্যমে পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আরো বিপজ্জনক করতে পারে। ইরান উন্নত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি করায়ত্ত করেছে। এই সপ্তাহে তেহরান একটি নতুন রাডার-সমৃদ্ধ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন করেছে। আমেরিকার সরকার অর্থনৈতিক পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানকে ধ্বংস করার চেষ্টা করছে, এর বিপরীতে তেহরান যদি তালেবান যোদ্ধাদের এসব অস্ত্রশস্ত্র সরবরাহ করে আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনীকে আঘাত করার চেষ্টা করে তা মোটেই বিস্ময়কর কিছু হবে না।

এইভাবে, ইরানের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের যে আকাক্সক্ষা, ওয়াশিংটনের তা আফগানিস্তানে তার সামরিক ক্ষেত্রে গুরুতর বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে। আর আমেরিকার দীর্ঘতম বিদেশ যুদ্ধটি তার জন্য সবচেয়ে লজ্জাজনক ও বেদনাদায়ক হতে পারে।

আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশ
আগস্টের প্রথম সপ্তাহে প্রথমবারের মতো প্রতিবেশী দেশে সফরে যায় তালেবানদের একটি প্রতিনিধিদল। প্রতিপক্ষের কাছে তালেবানরা পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে যে, তাদের আঞ্চলিক গ্রহণযোগ্যতাই শুধু বাড়ছে না; বরং রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও তাদের স্বীকৃতি মিলেছে।

আরো তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তাসখন্দের সাথে কাবুল ও ওয়াশিংটনের সম্পর্ক উষ্ণ ও সহযোগিতামূলক হওয়ার পরও তালেবানরা উজবেকিস্তান সফর করেছে। আঞ্চলিক হিসাব-নিকাশের কথা বিবেচনা করলেÑ যেখানে তালেবানরা শুধু একটা রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেই আত্মপ্রকাশ করছে না, বরং আইএস-এর বিরুদ্ধে একটি শক্তি হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে ধরে নেয়া যায় যে, উজবেকিস্তান শুধু বাহ্যিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র আর আফগান সরকারের সাথে সম্পর্ক নিয়েই ব্যস্ত নেই। তাদের নিজস্ব প্রয়োজনও আছে। উজবেকিস্তান তাই হিসাব-নিকাশ করেই রাশিয়ার সাথেও তাদের সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তালেবানদের আগমনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে উজবেকিস্তানের সরকার তালেবানদের সম্ভাব্য আগমন নিয়ে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভের সাথে আলোচনা এবং দ্বিপক্ষীয় স্বার্থ ও সহযোগিতা নিয়েও কথা বলেছে।

যদি চলমান আলোচনা এবং গজনিতে সাম্প্রতিক হামলা থেকে কোনো কিছু বোঝার থাকে, তাহলে সেটা হলোÑ তালেবানদের কূটনৈতিক বা সামরিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে অক্ষম যুক্তরাষ্ট্র। তালেবানরা এই দুর্বলতাটাকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহারের চেষ্টা করে যাবে। আফগান বাহিনীর ওপর চাপ বাড়িয়েই যাবে তারা। কার্যত তারা আলোচনা চালিয়ে যাবে এবং চালিয়ে যাবে গেরিলা যুদ্ধও। আঞ্চলিক দেশগুলো তালেবানদের বৈধ শক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দিলে এর মাধ্যমে তাদের শক্তি শুধু বাড়বেই। প্রতিবেশী দুই বড় শক্তি, চীন ও রাশিয়ার এ ব্যাপারে বিশেষ আগ্রহ রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র কী করবে?

কারো কারো আশঙ্কা, ট্রাম্প সহজেই আফগানিস্তানে মার্কিন প্রতিশ্রুতির রাশ টেনে ধরবেন। অন্যরা আশা করেন, তালেবান এবং তার সমর্থকদের পরাজিত করার জন্য ট্রাম্প অপ্রচলিত কৌশলগুলো বিবেচনা করবেন। তিনি যে কৌশল নেবেন, তার প্রভাব দেখা যেতে পারে আগামী সপ্তাহগুলোতে। যুক্তরাষ্ট্রের পছন্দের কেন্দ্রে থাকবে পাকিস্তান। ভারতকে সাথে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে শান্তিপূর্ণ প্রস্থান করতে পারবে- এমন কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। ফলে ওয়াশিংটনকে মনোযোগী হতে হবে পাকিস্তানের প্রতি। ইমরান খানের নতুন সরকার এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে অনুকূল হতে পারে। ওয়াশিংটন আশা করছে, পাকিস্তান সেনাবাহিনী একটি যুক্তিসঙ্গত রাজনৈতিক নিষ্পত্তির দিকে তালেবানকে নিয়ে আসতে সাহায্য করবে। তবে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, তালেবানরা তাদের অবস্থানে কোনো আপস করবে।

এক বিবৃতিতে, তালেবান প্রধান মোল্লা আখুন্দজাদা মার্কিন কর্মকর্তাদের সাথে সাম্প্রতিক যোগাযোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে ‘অবাস্তব’ প্রস্তাব দেয়ার জন্য ওয়াশিংটনের সমালোচনা করে বলেছেন, এটি কেবল যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করবে।

আফগান তালেবানদের অন্যতম প্রধান দাবি হলো, আফগানিস্তান থেকে বিদেশী সেনাদের প্রত্যাহার করে নেয়া। সেই সাথে, তালেবানরা এটাও বলে এসেছে যে, তারা শান্তি আলোচনায় বসতে প্রস্তুত, কিন্তু সেটা হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে, আফগান সরকারের সাথে নয়।
কার্যত, গত ২৩ জুলাইয়ের মার্কিন-তালেবান দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের মধ্য দিয়ে তালেবানদের মর্যাদা যুক্তরাষ্ট্রের পর্যায়ে উন্নীত হয়েছে। তালেবানরা বহুদিন ধরে এটাই কামনা করে এসেছে। তালেবানরা নিজেদের ‘অপেক্ষমাণ সরকার’ হিসেবে বিবেচনা করে, শুধু একটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নয়। তালেবানরা স্পষ্টতই একটা শক্তির জায়গা থেকে কাজ করছে এবং কৌশলের সাথে দরকষাকষি করছে।

কাবুলের জন্য বিকল্প
আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গানি আবারো যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন। এই সময় এটি করা হয়েছে এবারের ঈদুল আজহা থেকে তিন মাস সময়ের জন্য। এর মধ্যে কাবুল এবং তালেবান উভয়ই আটক কিছু বন্দীকে মুক্তি দিতে সম্মত হয়েছে। গত জুন মাসে রোজার ঈদের ছুটির সময় তিন দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল তালেবান। যুদ্ধবিরতির পর থেকেই, আফগানিস্তানে সরকারি ও বেসামরিক লক্ষ্যমাত্রাগুলোর ওপর তালেবান হামলার ঘটনা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আফগান প্রেসিডেন্ট তালেবানদের শর্তহীন আলোচনায় বসার আহ্বান জানানোর মাত্র কয়েক মাস পরে জুলাইয়ে দোহা বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। নিজের দিক থেকে প্রেসিডেন্ট গানি যথেষ্ট ছাড় দিয়েছেন। তিনি এমনকি, সংবিধান সংশোধনের কথাও বলেছেন। নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েও তিনি আফগানিস্তানের শান্তির জন্য তালেবানদের আলোচনায় আনতে চেয়েছেন।

তালেবানদের ‘আলাপ ও যুদ্ধ’ পদ্ধতিটি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নয়-এগারো’র হামলার পর তালেবানকে হটিয়ে ক্ষমতা গ্রহণকারী রাজনৈতিক জোটকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে শুরু করেছে। জোটের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করে তালেবানদের সাথে আলোচনা হবে ‘রাজনৈতিক আত্মসমর্পণের নামান্তর’।

দ্বিতীয় ভিয়েতনাম হওয়ার হাতছানি?
এত কিছুর পরও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য স্বস্তির কোনো পথ দেখা যাচ্ছে না। ১৭ বছর ধরে মার্কিন সামরিক বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের করদাতাদের কোটি কোটি ডলার খরচ করার পরও তালেবান বিদ্রোহীরা কাবুলের ওয়াশিংটনসমর্থিত সরকারকে আঘাত করতে সক্ষম বলে মনে হচ্ছে। শুধু আফগানিস্তানে নয়, এটি যেকোনো পরিমাপে ওয়াশিংটনের সাম্রাজ্যবাদী উচ্চাকাক্সক্ষার জন্য একটি ঐতিহাসিক পরাজয়।

এই আফগানিস্তান একসময় ‘সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিয়েতনাম’ হয়ে উঠেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিজিজিনস্কিদের মতো পরিকল্পনাকারীরা আফগানিস্তানকে এভাবে উল্লেখ করে আনন্দ পেতেন। এর কয়েক বছর আগেই ভিয়েতনামের ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ধরনের অবস্থায় পড়েছিল। আর ১৯৭৯ সালে কাবুলের সহযোগী সরকারের পক্ষে সোভিয়েত বাহিনী আফগানিস্তানে ঢুকে পড়েছিল।

এর এক শতাব্দী আগে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদী সৈন্যদের মতো রুশরা আফগানিস্তানের দুর্গম পাহাড়ে নির্ভীক প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হাতে পরাজিত হয়েছিল। অবশ্যই সোভিয়েত বা রুশরা শুধু আফগানদের হাতে পরাজিত হয়নি। সিআইএ তাদের বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র এবং অন্যান্য অত্যাধুনিক অস্ত্রশস্ত্র দিয়েছিল। এখন পরিস্থিতি যেন ঠিক উল্টো। আগে যারা সরকারকে সহায়তা করেছিল, তারা এখন বিরোধী পক্ষে। বিরোধীদের মদদদাতারা এখন সরকারকে টিকিয়ে রাখার ভূমিকায়।

তবে কঠিন বাস্তবতা হলো, সেই ‘সোভিয়েত ভিয়েতনাম’ এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দ্বিতীয় ভিয়েতনামের মতো আরেক মারণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। ২০০১ সালে ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার পর জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন আফগানিস্তানে আলকায়েদাকে প্রতিশোধের একটি লক্ষ্যে পরিণত করে, যে সংগঠনটিকে আগে তারাই সাহায্য করেছিল।

প্রায় ১৭ বছর পর, আফগানিস্তানে মার্কিন বাহিনী এখন দৃশ্যমান প্রস্থান পরিকল্পনা ছাড়াই নতজানু হয়ে পড়েছে। যুদ্ধটি ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়কালকে অতিক্রম করে (১৯৬৪-৭৫) আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘতম যুদ্ধে পরিণত হয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ভিয়েতনামের তুলনায় আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের হতাহতের সংখ্যা কম হলেও দেশটিতে মার্কিন আর্থিক ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট জাতীয় ঋণ ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের এক-চতুর্থাংশের মতো।

ওবামা প্রশাসনের সময় ২০১৪ সালে আফগানিস্তানে মার্কিন সামরিক অভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ করার কথা বলা হয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রচার শুরু করেন, তখন তার ভোটারদের অঙ্গীকার করেছিলেন- আফগান যুদ্ধ থেকে তিনি সৈন্যদের প্রত্যাহার করবেন। তবে গত বছর, ট্রাম্প আফগানিস্তানে সামরিক সম্পৃক্ততা পুনর্বিন্যস্ত করার জন্য পেন্টাগনের পরামর্শে সম্মতি জানালেন।

গত সপ্তাহে তালেবানের দুঃসাহসিক হামলায় মনে হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থিত সরকারি বাহিনী একটি হেরে যাওয়া যুদ্ধে লড়াই করছে। এ দেশের বেশির ভাগ এলাকা তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এমনকি রাজধানী কাবুল ভারী আক্রমণ অভিযানের মুখে ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে।

আফগানিস্তানে প্রায় দুই দশকব্যাপী এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে পড়েছে এর ব্যাপক বিরূপ প্রভাব। সবশেষে কথিত ‘সর্বশক্তিমান’ মার্কিন শক্তি এখানে নিজের অপরাধ, মূঢ়তা ও অহঙ্কার দ্বারা পরাজয়ের চূড়ান্ত কবরস্থানই তৈরি করবে বলে মনে হচ্ছে।

mrkmmb@gmail.com

 


আরো সংবাদ