১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮
সুশাসন

পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও শিল্পের সক্ষমতা

পোশাক শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি ও শিল্পের সক্ষমতা - সংগৃহীত

তৈরী পোশাক শিল্প (আরএমজি) বাংলাদেশের একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প সেক্টর। যেকোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের মজুরি নিম্নতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক নির্ধারিত হয়ে থাকে। ব্যক্তিমালিকানাধীন পোশাক শিল্প দু’টি ভাগে বিভক্ত। এর একটিকে বলা হয় ওভেন এবং অপরটি নিট। শার্ট, প্যান্ট, কোট, ট্রাউজার, গাউন, স্কার্ট প্রভৃতি ওভেনের অন্তর্ভুক্ত। অপর দিকে বিভিন্ন ধরনের ফুল ও হাফস্লিভ গেঞ্জি, সোয়েটার, আন্ডারওয়্যার, অন্তর্বাস প্রভৃতি নিটের অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের সামগ্রিক রফতানি আয়ের প্রায় ৮৩ শতাংশ তৈরী পোশাক রফতানির মাধ্যমে আসে। এ শিল্প খাতে ৪০ লক্ষাধিক শ্রমিক কর্মরত রয়েছেন। এদের ৮০ শতাংশের অধিক নারী। এ শিল্প এক দিকে যেমন দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা আহরণ করছে, অপর দিকে এ শিল্পের মাধ্যমে বেকার সমস্যা বহুলাংশে লাঘব ঘটেছে। নারীর কর্মসংস্থান ও ক্ষমতায়নে এ খাতটির অশেষ অবদান রয়েছে।

শ্রম আইন অনুযায়ী, নিম্নতম মজুরি বোর্ড কর্তৃক যেকোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প সেক্টরের মজুরি নির্ধারিত হলে এর কার্যকারিতা পাঁচ বছর; যদিও নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হওয়ার আগে অথবা পরে বোর্ড কর্তৃক মজুরি পুনঃনির্ধারিত না হওয়া পর্যন্ত আগেকার নির্ধারিত মজুরি বহাল থাকে। এমন অনেক ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প সেক্টর রয়েছে, যেগুলোর শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর অনেক সময় অতিবাহিত হলেও পুনঃনির্ধারণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয় না। পোশাক শিল্পের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি।

পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মজুরি সর্বপ্রথম নির্ধারিত হয়েছিল ১৯৮৫ সালে। এটি পোশাক শিল্পবিষয়ক প্রথম মজুরি বোর্ড। এ বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ছিল ৬২৭ টাকা। পোশাক শ্রমিকদের জন্য দ্বিতীয় মজুরি বোর্ড গঠিত হয় নির্ধারিত পাঁচ বছরের পরিবর্তে ৯ বছর পর, ১৯৯৪ সালে। দ্বিতীয় মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত নি¤œতম মজুরি ছিল ৯৩০ টাকা, যা প্রথম মজুরি বোর্ডের ঘোষিত মজুরির ৪৮ শতাংশের অধিক। পোশাক শ্রমিকদের জন্য তৃতীয় মজুরি বোর্ড গঠিত হয় নির্ধারিত পাঁচ বছরের পরিবর্তে ১২ বছর পর, ২০০৬ সালে। তৃতীয় মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত নি¤œতম মজুরি ছিল ১৬৬২.৫০ টাকা, যা দ্বিতীয় মজুরি বোর্ডের ঘোষিত মজুরির চেয়ে ৭৮ শতাংশের অধিক। চতুর্থ মজুরি বোর্ডটি নির্ধারিত পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগে চার বছরের মাথায় ২০১০ সালে গঠিত হয়। চতুর্থ মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত সর্বনিম্ন মজুরি ছিল ৩০০০ টাকা, যা তৃতীয় মজুরি বোর্ডের ঘোষিত মজুরির ৮০ শতাংশের অধিক। চতুর্থ মজুরি বোর্ডের মতো পঞ্চম মজুরি বোর্ডটিও পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার আগে তিন বছরের মাথায় ২০১৩ সালে গঠিত হয়েছে। পঞ্চম মজুরি বোর্ড কর্তৃক ঘোষিত নিম্নতম মজুরি ছিল ৫৩০০ টাকা, যা চতুর্থ মজুরি বোর্ডের ঘোষিত মজুরির তুলনায় ৭৬ শতাংশের অধিক।
নি¤œতম মজুরি বোর্ড শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন আইন দ্বারা সৃষ্ট একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। নি¤œতম মজুরি বোর্ড একজন চেয়ারম্যান ও পাঁচজন সদস্য সমন্বয়ে গঠিত। মজুরি বোর্ডের সৃষ্টিলগ্ন থেকে বিচার বিভাগের সিনিয়র জেলা জজ পদমর্যাদার কর্মকর্তারা প্রেষণে এর চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পেয়ে আসছেন। পাঁচজন সদস্যের মধ্যে একজন ‘নিরপেক্ষ সদস্য’। সব সময় নিরপেক্ষ সদস্য হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের অর্থনীতি ও ব্যবসায় প্রশাসন বিষয়ে বিশেষ জ্ঞানসম্পন্ন, অধ্যাপক পদমর্যাদার শিক্ষককে নিয়োগ দেয়া হয়ে থাকে। অপর চারজন সদস্যের দু’জন মালিকপক্ষের সদস্য এবং দু’জন শ্রমিকপক্ষের সদস্য।

মালিক ও শ্রমিকপক্ষের দু’জন সদস্যের একজন স্থায়ী সদস্য এবং অপরজন যখন যে শিল্প সেক্টরের মজুরি নির্ধারণবিষয়ক কাজ হয় সে সেক্টরের সদস্য। এ দু’জন সদস্য অস্থায়ী। মজুরি বোর্ড কর্র্তৃক ঘোষিত মজুরি সরকার কর্তৃক গৃহীত হলে এ দু’জন সদস্যের কার্যকারিতা না থাকলেও পুনঃমজুরি বোর্ড গঠিত না হওয়া পর্যন্ত ধরে নেয়া হয় তারা সদস্য পদে বহাল রয়েছেন। বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্যগণ সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত। মালিক ও শ্রমিকপক্ষের স্থায়ী ও অস্থায়ী প্রতিনিধি মালিক ও শ্রমিক হওয়া বাঞ্ছনীয় হলেও দীর্ঘ দিন ধরে লক্ষ করা যাচ্ছে, মালিকপক্ষের স্থায়ী প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত সদস্য মালিকপক্ষের কার্যালয়ের একজন বেতনভুক কর্মকর্তা। শ্রমিকপক্ষের স্থায়ী প্রতিনিধির ক্ষেত্রে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন দলের শ্রমিক সংগঠনের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতার এ পদে আগমন ঘটে। অস্থায়ী সদস্যদের ক্ষেত্রেও দেখা যায় উভয়ে ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত।

যেকোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের সময় শ্রম আইন নির্দেশিত যেসব বিষয় মজুরি বোর্ড বিবেচনায় নেয় সেগুলো হলো- জীবনযাপন ব্যয়, জীবনযাপন মান, উৎপাদন খরচ, উৎপাদনশীলতা, উৎপাদিত দ্রব্যের মূল্য, মুদ্রাস্ফীতি, কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান, ব্যবসায়িক সামর্থ্য, দেশের ও সংশ্লিষ্ট এলাকার আর্থসামাজিক অবস্থা এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়। তা ছাড়া মজুরি নির্ধারণসংক্রান্ত কার্যক্রম গৃহীত হওয়ার পর মজুরি বোর্ড বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, ভোক্তা অধিকার সংস্থা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, গবেষণা সংস্থা সিপিডি, পিআরআই প্রভৃতির কাছ থেকে জীবনযাপন ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতিবিষয়ক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে থাকে। এর অতিরিক্ত মজুরি নির্ধারণী কার্যক্রম চলাকালে মজুরি বোর্ড স্বীয় কার্যালয়ে এবং শ্রমিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের কার্যালয়ে মতবিনিময়ের মাধ্যমে জীবনযাপন ব্যয়ের আলোকে শ্রমিকদের চাহিদাবিষয়ক তথ্য সংগ্রহে উদ্যোগী হয়। মজুরি নির্ধারণের সময় মজুরি বোর্ড সরেজমিনে বিভিন্ন পোশাক শিল্পকারখানা পরিদর্শন করে শ্রমিকদের কাজের ধরন, ঝুঁকি ও মান এবং কর্মপরিবেশের বিষয়ে ধারণা লাভে সচেষ্ট হয়।

বাংলাদেশে যে পোশাক পণ্য উৎপাদন হয়, তা দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারে বাজারজাত হয় না। বাংলাদেশে উৎপাদিত পোশাক পণ্যের শতভাগই রফতানির মাধ্যমে ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া প্রভৃতি মহাদেশে প্রেরণ করা হয়। পোশাক পণ্য রফতানিতে চীনের পরই বিশ্বে বাংলাদেশের স্থান। তবে পরিমাণগত দিক থেকে চীনের সাথে বাংলাদেশের ফারাক ব্যাপক। এই পণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, কম্বোডিয়া প্রভৃতি। বিদেশী ক্রেতারা যেকোনো দেশের পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে ক্রয়াদেশ দেয়ার সময় সাশ্রয়ী মূল্যের বিষয়টি বিবেচনায় নেন। বিদেশী ক্রেতা ধরে রাখার জন্য অনেক সময় দেখা যায়, পোশাক শিল্পকারখানার মালিকেরা উৎপাদন খরচের কাছাকাছি মূল্যে রফতানি আদেশ গ্রহণ করতে বাধ্য হন।

আমাদের দেশের পোশাক শিল্পমালিকেরা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে তাদের ব্যবসায়িক সামর্থ্য ও সক্ষমতা যেন ধরে রাখতে পারেন, সে ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সরকার পোশাক শিল্প মালিকদের নগদ প্রণোদনা, স্বল্প সুদে ব্যাংক ঋণ এবং শুল্ক হ্রাসের মাধ্যমে তাদের সামর্থ্য ও সক্ষমতা অটুট রাখার ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রাখতে পারে।

নিকট অতীতে ব্যক্তিমালিকানাধীন যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের শ্রমিকদের মজুরি পুনঃনির্ধারিত হয়ে সরকার কর্তৃক গেজেট প্রকাশিত হয়েছে, তা পর্যালোচনায় দেখা যায় ২০০৮ সালে টি প্যাকেজিং শিল্প শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ছিল ২১৬০ টাকা। ২০১৭ সালে এই শিল্প শ্রমিকদের মজুরি পুনঃনির্ধারণকালে নি¤œতম মজুরি দাঁড়ায় ৭৮৮০ টাকা। মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ২২৭ শতাংশ। ২০০৯ সালে জাহাজ ভাঙা শিল্প শ্রমিকদের নি¤œতম মজুরি ছিল ৪৬২৫ টাকা, যা ২০১৭ সালে পুনঃনির্ধারণের পর দাঁড়ায় ১৬০০০ টাকা। তাদের ক্ষেত্রে মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ২৪৬ শতাংশ। ২০১১ সালে কটন টেক্সটাইল শিল্প শ্রমিকদের নি¤œতম মজুরি নির্ধারণ করা হয় ৩৩০২.৫০ টাকা। ২০১৮ সালে কটন টেক্সটাইল শিল্প শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারিত হয় ৫৭১০ টাকা। অর্থাৎ বৃদ্ধির হার দেখা যায় ৭৫ শতাংশ। দর্জি কারখানা শিল্প শ্রমিকদের ২০০৮ সালে নি¤œতম মজুরি ছিল ২৩২৫ টাকা। ২০১৮ সালে এদের মজুরি নির্ধারিত হয় ৪৮৫০ টাকা। এদের ক্ষেত্রে বৃদ্ধির পরিমাণ ১০৯ শতাংশ। ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প সেক্টরের শ্রমিকদের নিম্নতম মজুরি ২০০৯ সালে ছিল ৩৬২৫ টাকা। ২০১৭ সালে এই মজুরি পুনঃনির্ধারিত হয় ৮০৫০ টাকা। এতে বৃদ্ধির পরিমাণ ১২২ শতাংশ।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, পোশাক শিল্প শ্রমিকদের জন্য ষষ্ঠ মজুরি বোর্ড ঘোষিত হওয়ার পর মালিক ও শ্রমিক পক্ষ থেকে যে মজুরি বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে, তা হলো যথাক্রমে ৬৩৬০ টাকা ও ১২০২০ টাকা। মালিক ও শ্রমিকদের এ প্রস্তাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৩ সালে ঘোষিত নিন্মতম  মজুরি ৫৩০০ টাকা থেকে প্রস্তাবিত বৃদ্ধি যথাক্রমে ২০ শতাংশ ও ১২৬ শতাংশ। উল্লেখ্য, ২০১৩ সালে পোশাক শিল্প শ্রমিকদের পঞ্চম মজুরি বোর্ড ঘোষণাকালে বলা হয়েছিল, প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে মূল মজুরির বৃদ্ধি ঘটবে। সে হিসাব মতে, দেখা যায় বর্তমানে পোশাক শিল্প শ্রমিকদের নি¤œতম মজুরি ৬৪৬০ টাকা, যা মালিকপক্ষ কর্তৃক প্রস্তাবিত মজুরির চেয়ে ১০০ টাকা বেশি।

বাংলাদেশের জাতীয় অর্থনীতিতে রফতানিমুখী তৈরী পোশাক শিল্পের ভূমিকা অপরাপর শিল্পের চেয়ে অনেক অধিক। তৈরী পোশাক শিল্পমালিকেরা তাদের সামর্থ্য ও সক্ষমতা হারিয়ে ফেললে তা এ শিল্পের জন্য বিপর্যয় ডেকে এনে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, বেকারত্ব হ্রাস, নারীর ক্ষমতায়ন ও কর্মসংস্থানে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। আর তাই মজুরি নির্ধারণকালে আমাদের পোশাক শিল্পমালিকেরা প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর সাথে প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে সামর্থ্য ও সক্ষমতা যেন ধরে রাখতে পারেন, সে দিকে নজর দেয়া খুবই জরুরি।


লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান,
রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ