২১ নভেম্বর ২০১৮
বহমান এই সময়ে

ভারতে মাদরাসাগুলোর দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা

ভারতে মাদরাসাগুলোর দেশপ্রেমের অগ্নিপরীক্ষা - সংগৃহীত

ভারতের ৭১তম স্বধীনতা দিবসের প্রাক্কালে হিন্দু মহাসভা এবং আরএসএসের সিনিয়র নেতা মোহান্ত আদিত্যনাথ যোগীর নেতৃত্বাধীন ইউপি সরকার মাদরাসাগুলোর ওপর এক অবাক করা আদেশ জারি করে। এই আদেশে বলা হয়, মাদরাসাগুলোকে বাধ্যতামূলকভাবে ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস পালন করতে হবে এবং তাদের এই উদযাপনের প্রমাণ হিসেবে এর ভিডিওচিত্র প্রশাসনের কাছে পাঠাতে হবে।

এই আদেশ জারি করা হয় ইউপি মাদরাসা শিক্ষা পরিষদের রেজিস্ট্রার রাহুল গুপ্তের অফিস থেকে। সার্কুলারে সব মাদরাসাকে নির্দেশ দেয়া হয়, ভারতের প্রত্যেক মাদরাসায় ত্রিরঙ্গা জাতীয় পতাকা উত্তোলন করতে হবে এবং মাদরাসা-ছাত্রদেরকে জাতীয়সঙ্গীত গাইতে হবে। পতাকা উত্তোলনের পর স্বাধীনতা সংগ্রামের গুরুত্ব ও মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মদানের কথা তুলে ধরতে হবে। আর মাদরাসা-ছাত্রদেরকে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতেও বলা হয়।

এই আদেশের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে : কেন সব ধরনের নিয়মকানুন ভঙ্গ করে শুধু মাদরাসাগুলোকে এ ধরনের একটি আদেশ দেয়া হলো, কেন এই আদেশ সরকারি স্কুলগুলোর ওপর প্রযোজ্য করা হলো না? কেন এ ধরনের অযৌক্তিক একটি আদেশের মাধ্যমে মাদরাসা-ছাত্রদের প্রতি এই অন্যায় বৈষম্য সৃষ্টি করা হলো? বেসিক এডুকেশন বোর্ড সেক্রেটারি সঞ্জয় সিনহা এ প্রেক্ষাপটে বলেন, ‘আমরা আমাদের স্কুলগুলোর প্রতি আস্থাশীল। এরা আমাদের শিক্ষক, আমাদের ছাত্র। অতএব, আমরা কেন তাদের কাছে প্রমাণ চাইব।’

অতএব, এটি প্রমাণ করে- মাদরাসা শিক্ষক ও ছাত্ররা ‘ভিন্ন’ একটি গোষ্ঠী, যাদের দেশের প্রতি আনুগত্য ভারতীয়রা সন্দেহের চোখে দেখে। এই আদেশ শুধু মাদরাসার সাথে সংশ্লিষ্ট মুসলমানদের আনুগত্যকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে না, এর মাধ্যমে একই সাথে দেশটির সবচেয়ে বড় সংখ্যালঘু মুসলমান জনগোষ্ঠীর প্রতি ইউপি সরকার একটি ঘৃণার আবহ সৃষ্টি করল। ইউপি সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তার এ ধরনের আচরণ সাধারণভাবে ওই রাজ্যে মুসলমানবিরোধী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডকে উসকে দিতে পারে।

আদিত্যনাথ যোগী হয়তো জানেন না, আজ ইউপির যেসব মাদরাসা সা¤প্রদায়িক হামলার মুখে, সেসব মাদরাসাসহ ভারতের অন্যান্য রাজ্যের মাদরাসাগুলোর মতো গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখেছে ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে। সুপরিচিত আরসি মজুমদার সেলুলার জেল সম্পর্কে ব্যাপক গবেষণাভিত্তিক কিছু কাজ করে গেছেন। তিনি তার গবেষণায় জানতে পেরেছেন, প্রথম যে ব্যাচটি সেলুলার জেলে আটকে রাখা হয়েছিল, তাদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা ফজলুল হক খয়েরাবাদী, মাওলানা লিয়াকত আলী ও মাওলানা জাফর আলী থানেশ্বরীর মতো ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের নেতারা।

এরা সেখানে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করার সময় সেখানে ইন্তেকাল করেন। কারাবন্দীদের দ্বিতীয় ব্যাচে ছিলেন ওয়াহাবী আন্দোলনের মাওলানারা। এরা অব্যাহতভাবে সংশিøষ্ট ছিলেন ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামেও। ভিডি সাভারকার গুরুত্বপূর্ণ হিন্দু বিচ্ছিন্নতাবাদী হয়ে ওঠার আগে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের ওপর লেখা তার গুরুত্বপূর্ণ বই The Indian War of Independence 1857-১৮৫৭-এ ভূয়সী প্রশংসা করেন আহমেদ শাহর মতো মৌলবীদের, যারা সুকৌশলে জিহাদের জাল বুনেছিলেন। দিলিøর সমসাময়িক ব্রিটিশ আর্কাইভের তথ্য মতে, ১৮৫৭ সালের সেপ্টেম্বরে ব্রিটিশ সেনারা এই নগরী দখলের পর মাদরাসার তিন হাজারেরও বেশি ছাত্র-শিক্ষককে ফাঁসি দেয়। ১৮৬৯ সালের আগে কোনো মুসলমানকে দিল্লিতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়নি।

সাম্রাজ্যবাদবিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় মাওলানা শিবলি নোমানি, মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা হিফজুর রহমান, মাওলানা হাসরত মোহানি, হাফিজ ইব্রাহিম, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা হাবিবুর রহমান লুদিয়ানভি ও মাওলানা মাদানীর মতো ব্যক্তিরা গান্ধী, নেহরু, সরদার প্যাটেলের সাথে স্বাধীনতা আন্দোলনের আঘাতের দাগ বয়ে বেরিয়েছেন। বেশ কয়েকজন মাওলানাকে আটক রাখা হয়েছিল মাল্টায়। এরা জীবনের অর্ধেকটা সময় কাটিয়েছেন ব্রিটিশ কারাগারে।

উল্লেখ্য, এসব মৌলবি ধর্মের ভিত্তিতে ভারত ভাগ করার বিরোধিতা করেছিলেন, যদিও কংগ্রেস তা মেনে নেয়। ভারতের স্বাধীনতার জন্য বহু মাওলানা প্রাণ দিয়েছেন। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মাদরাসাগুলোর এ ধরনের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও আজকে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে, তাদের আনুগত্যের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করে। ইউপি রাজ্যসরকার আজ উঠেপড়ে লেগেছে তথাকথিত ‘জাতিবিরোধী’ মুসলমানদের বিরুদ্ধে। সেখানে মুসলমানদের প্রতিদিন অগ্নিপরীক্ষা দিয়ে প্রমাণ করতে হচ্ছে তাদের দেশপ্রেমের।

মাদরাসাগুলোর ওপর ইউপি সরকারের উল্লিখিত আদেশ তারই একটি অংশ। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে এই পরীক্ষা নেয়া উচিত আরএসএস ও হিন্দু মহাসভার। মাদরাসার মৌলিক ভূমিকার সাথে আরএসএস এবং হিন্দু মহাসভার কর্মকাণ্ডের তুলনা করলে এ সত্যেরই প্রতিফলন মেলে।

আমরা জানি, আরএসএসের একটি চিরাচরিত ঘৃণা রয়েছে ভারতের ত্রিরঙ্গা জাতীয় পতাকার প্রতি, যে পতাকা উত্তোলন এখন বাধ্যতামূলক করতে চাইছে ইউপির বিজেপি সরকার মাদরাসাগুলোর জন্য। ১৯২৫ সালে গঠিত হয় আরএসএস। এর পর থেকেই ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে যখন কোনো সম্মিলিত প্রয়াস হয়েছে, তাতেই ঘৃণার সাথে আপত্তি জানিয়েছে আরএসএস। তা ছাড়া, ত্রিরঙ্গা পতাকার প্রতি ঘৃণা হচ্ছে আরএসএসের ঘৃণার সবচেয়ে প্রধান একটি বিষয়। ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে কংগ্রেস এর লাহোর অধিবেশনে ‘পূর্ণস্বরাজ’ তথা পুরোপুরি নিজস্ব শাসনের বিষয়টিকে গ্রহণ করে নেয় জাতীয় লক্ষ্য হিসেবে। এবং এ অধিবেশনেই জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয় ত্রিরঙ্গার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে ২৬ জানুয়ারি ১৯৩০-কে স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপন করতে।

ঐকমত্যের ভিত্তিতে ত্রিরঙ্গাকে বিবেচনা করা হয় সে সময়ের জাতীয় আন্দোলনের পতাকা হিসেবে। এর প্রতিবাদে আরএসএস প্রধান হিসেবে হেডগিয়ার সব আরএসএস শাখায় একটি সার্কুলার পাঠান। এতে তিনি সবার প্রতি আহ্বান জানান ত্রিরঙ্গা পতাকার বদলে জাফরানি রঙের ‘ভগওয়া ঝান্ডা’(স্যাফরন ফ্ল্যাগ)-কে জাতীয় পতাকা হিসেবে ব্যবহার করতে। সুপরিচিত আরএসএস আইডিওলগ ও আজকের দিনের অনেক আরএএসএস/বিজেপি নেতাদের গুরু গোলওয়ালকার ১৯৪৬ সালের ১৪ জুলাই নাগপুরের এক গুরুপূর্ণিমা সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় বলেছিলেন, স্যাফরন ফ্ল্যাগই তাদের সংস্কৃতির সার্বিকতার পরিচায়ক। এটি ঈশ্বরের মূর্ত প্রতীক। আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত পুরো জাতি এই স্যাফরন পতাকাতলে আসবে।


এমনকি ভারত স্বাধীন হওয়ার পর যখন এই ত্রিরঙ্গা পতাকা ভারতের জাতীয় পতাকার মর্যাদা পেল, আরএসএস এই পতাকাকে জাতীয় পতাকা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করল। আরএসএস থেকে প্রকাশিত Bunch of Thoughts eB‡qi Drifting and Drifting শীর্ষক রচনায় গোলওয়ারকার জাতীয় পতাকা সম্পর্কে এক আলোচনায় গোলওয়ালকার প্রকাশ্যে ত্রিরঙ্গার সমালোচনা করে লেখেন : Our leaders have set up a new flag for our country. Why did they do so? It is just a case of drifting and imitating... Ours is an ancient and great nation with a glorious past. Then, had we no flag of our own? Had we no national emblem at all these thousands of years? Undoubtedly, we had. Then why this utter void, this utter vacuum in our minds.

ভারতের জাতীয় পতাকা সম্পর্কে আরএসএসের পক্ষ থেকে সবচেয়ে প্রবল সমালোচনাটি আসে ভারতের স্বাধীনতা লাভের প্রাক্কালে। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট আরএসএসের ইংরেজি মুখপত্র ‘অর্গানাইজার’ দিলিøর লালকেল্লায় স্যাফরন পতাকা উত্তোলনের আহ্বান জানিয়ে খোলাখুলিভাবে জাতীয় ত্রিরঙ্গা পতাকার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন করে। অর্গানাইজারের সে দিনের বক্তব্যটি ছিল এরূপ : ‘the people who have come to power by the kick of fate may give in our hands the Tricolour but it never be respected and owned by Hindus. The word three is in itself an evil, and a flag having three colors will certainly produce a very bad psychological effect and is injurious to a country.’

অথচ আজ সেই বিজেপি/আরএসএস নেতারা দেশটির স্বাধীনতা উদযাপনের অংশ হিসেবে ইউপির মাদরাসাগুলোকে বাধ্য করছে সেই ত্রিরঙ্গা পতাকা উত্তোলনে। আসলে এর মাধ্যমে বিজেপি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের অবদানকেই ঢাকতে চাইছে। মুসলমানরা স্বাধীনতা আন্দোলনে সার্বিকভাবে অংশ নিয়েছিল, এটি ঐতিহাসিকভাবে সত্য। সেখানে আরএসএস কখনোই ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশ নেয়নি। সে কথা তাদের গুরু গোলওয়ালকার নিজেই স্বীকার করে গেছেন, যিনি ১৯৪০ সালের পর থেকে এ সংগঠনটি পরিচালনা করে গেছেন। অসহযোগ আন্দোলন এবং ‘ভারত ছাড়’ ছিল ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের বড় ধরনের দু’টি মাইলফলক। তখন সেই আন্দোলনের সমালোচনা করে গোলওয়ালকার বলেছিলেন: ‘Definitely there are bound to be bad results of struggle. The boys became unruly after the 1920-21 movement. It is not an attempt to throw mud at the leaders. But these are inevitable products after the struggle. The matter is that we could not properly control these results. After 1942, people often started thinking that there was no need to think of the law.’

এ বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট, ওয়ালকার চেয়েছিলেন, ভারতবাসী ব্রিটিশ শাসকদের ড্রাকোনিয়ান নিপীড়নমূলক অমানবিক আইন মেনে চলুক। গুরুজি গোলওয়ালকার আরো স্বীকার করেছেন, কী করে আরএসএস স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে আরএসএস দূরে থেকেছে। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘১৯৪২ সালে সবার হৃদয়ে এক ধরনের জোরালো সেন্টিমেন্ট কাজ করছিল। সে সময়ে সঙ্ঘের নিয়মিত কর্মকাণ্ডও অব্যাহত ছিল। সঙ্ঘ সরাসরি কোনো কিছুতে জড়িত ছিল না। তা সত্তে¡ও উথালপাথাল সঙ্ঘের স্বেচ্ছাসেবকদের মনে কাজ করছিল। সঙ্ঘ হচ্ছে নিষ্ক্রিয় ব্যক্তিদের একটি সংগঠন। তাদের কথা কাজে আসে না, বাইরের অনেকের এবং আমাদের কিছু স্বেচ্ছাসেবকদের অনেকেই এমনটি বলেন। এরা ব্যাপকভাবে বিরক্তও ছিল।’

আজ সময় এসেছে মাদরাসাগুলোকে আরএসএসের অতীত ইতিহাস তুলে ধরা এবং মুসলমানদের ওপর চলমান নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধভাবে কথা বলার। 


আরো সংবাদ