২৩ এপ্রিল ২০১৯
সংবিধান ও রাজনীতি

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা

মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা - সংগৃহীত

আমি বঙ্গবন্ধুর কমান্ডে যুদ্ধ করেছি
বুধবার ১৫ আগস্ট। যেহেতু আমার সাপ্তাহিক কলামটি প্রতি বুধবার বের হয় এবং ঘটনাক্রমে আজ বুধবার বঙ্গবন্ধুর শাহাদাতবার্ষিকী; অতএব আজকের বিষয়বস্তু অবশ্যই হবে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে। এরকম ঘটনাক্রম বা তারিখ ও ঘটনার মিল মাঝেমধ্যেই হঠাৎ হঠাৎ হয় যেমন ২০১৮ সালের মে মাসের ৩০ তারিখও ছিল বুধবার এবং ওই দিনটি ছিল প্রেসিডেন্ট বীর উত্তম জিয়াউর রহমানের শাহাদাতবার্র্ষিকী; অতএই ওই দিনও নয়াদিগন্ত পত্রিকায় শহীদ জিয়াকে নিয়ে কলাম লিখেছিলাম। আমার অনেক পরিচয়ের একটি হলো- আমি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধা এবং ১৯৭৩ সালে মার্চ মাসে বঙ্গবন্ধু সরকার যেসব মুক্তিযোদ্ধাকে বীরত্বসূচক খেতাব দেন, তাদের মধ্যে আমি একজন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমার উপরে তাৎক্ষণিক বা ইমিডেয়েট সিনিয়র ছিলেন, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক ও যুগপৎ ৩ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর সফিউল্লাহ। অতঃপর সিনিয়র হন পুনর্গঠিত দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক মেজর মইনুল হোসেন চৌধুরী। তার উপরোস্থ ছিলেন এস ফোর্সের অধিনায়ক কর্নেল সফিউল্লাহ।

তার উপরোস্থ ছিলেন বাংলাদেশ ফোর্সেসের কমান্ডার ইন চিফ কর্নেল ওসমানী। তার উপরোস্থ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, তার উপরোস্থ ছিলেন ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম। স্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং রাষ্ট্রপতিই ছিলেন সর্বাধিনায়ক বা সুপ্রিম কমান্ডার। অতএব রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা তরুণ ইবরাহিমের উপরে চূড়ান্ত অধিনায়ক তথা সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় সর্বাধিনায়কের প্রতি সম্মান জানানোর নিমিত্তে কয়েকটি অনুচ্ছেদ এই কলামে লিখলাম। উলেøখ করে রাখছি যে, ২৭ মার্চ ১৯৭১, তৎকালীন চট্টগ্রাম মহানগরী থেকে অল্প দূরে অবস্থিত কালুরঘাট রেডিও স্টেশন থেকে, তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। তিনি প্রথমে নিজের নামে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং দ্বিতীয়বারে, আরো বর্ধিত ও সুসংহত ভাষ্যে, ‘আমাদের মহান নেতা’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে স্বাধীনতার ঘোষণা করেছিলেন। ওই অর্থে, সেদিনই তিনি সর্বাধিনায়ক হয়েছিলেন।

স্বাধীন বাংলাদেশে মিলিটারি একাডেমি ও প্রথম ব্যাচ অফিসার
বাংলাদেশ যখন স্বাধীন হয়, তখন আমাদের কোনো মিলিটারি একাডেমি ছিল না। আমাদের কোনো ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড ছিল না। ১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীনই, ৬১ জন তরুণ, তিন মাস প্রশিÿণ শেষে, তৎকালীন বাংলাদেশ ফোসের্সে অফিসার হিসেবে কমিশন পান। আরো একটি দল বা ব্যাচ নির্বাচিত হয়ে প্রশিÿণ শুরু করেছিল কিন্তু প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়ে যায়; এই ব্যাচ পরে ঢাকা সেনানিবাসে অস্থায়ীভাবে গঠিত ব্যাটেল স্কুল থেকে কমিশন পায় ১৯৭২ সালের আগস্ট মাসে। স্বাধীন বাংলাদেশে, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় ১৯৭৩ সালের শুরুতেই। একাডেমির জন্য ক্যাডেট নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন হলো ইন্টার সার্ভিসেস সিলেকশন বোর্ড বা আইএসএসবি বা আন্তঃবাহিনী নির্বাচন পর্ষদ। এই আইএসএসবি গঠনের জন্য আমিসহ পাঁচজন বাংলাদেশী অফিসার ভারতে প্রশিক্ষণের জন্য গিয়েছিলাম, ১৯৭৩ সালের মার্চ-এপ্রিল ৯ সপ্তাহ। অতঃপর এই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত ব্যক্তিরাই সিলেকশন বোর্ড প্রতিষ্ঠা করেন। এই বোর্ডের সাথে স্থানীয়ভাবে প্রশিক্ষণ দেয়া ৯ জন জ্যেষ্ঠ লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও কর্নেল যুক্ত হন।

সুপ্রতিষ্ঠিত এই বোর্ড, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির জন্য ক্যাডেট নির্বাচন করে। বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমির প্রথম ব্যাচ এবং দ্বিতীয় ব্যাচ যাদের যথাক্রমে এসএসসি-১ ও এসএসসি-২ বলা হয়, তাদের নির্বাচনের সময় আমিও ওই সিলেকশন বোর্ডের একজন সদস্য ছিলাম। এটা আমার জন্য আনন্দের ও গৌরবের বিষয়। প্রথম কোর্স তথা এসএসসি-১ এর নির্বাচন বা মনোনয়ন ১৯৭৩-এর ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হয় এবং তারা ১৯৭৪ সালের জানুয়ারি মাসে, কুমিল্লা সেনানিবাসে অস্থায়ীভাবে গঠিত বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমিতে প্রশিক্ষণের জন্য যোগদান করেন। ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসের ১১ তারিখ এই ব্যাচ বা দলের বা কোর্সের পাসিং আউট প্যারেড তথা কমিশন প্যারেড তথা প্রেসিডেন্টস প্যারেড অনুষ্ঠিত হয়, অস্থায়ী বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি প্রাঙ্গণে, কুমিল্লা সেনানিবাসে। সেই প্যারেডে প্রধান অতিথি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি সুধীমণ্ডলীর উপস্থিতিতে, নবীন অফিসারদের উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, আমি সেই ভাষণ শুনে শুনে লিখে, নিচের অনুচ্ছেদে উদ্ধৃত করলাম। ফেসবুক বন্ধুদের মাধ্যমে সেটি আমি ফেসবুক-মেসেঞ্জারে পেয়েছি। যতটুকু মেসেঞ্জারে পেয়েছি, ততটুকুই উদ্ধৃত করলাম; আগে-পরে কিছু থাকতেও পারে।

বঙ্গন্ধুর ভাষণ ১১ জানুয়ারি ১৯৭৫ (বিএমএ)
‘মনে রেখো, শাসন করা তারই সাজে সোহাগ করে যে। তুমি যখন শাসন করবা সোহাগ করতে শেখো। তাদের দুঃখের দিনে পাশে দাঁড়িও। তাদের ভালোবেসো। কারণ, তোমার হুকুমে সে জীবন দেবে। তোমাকে শ্রদ্ধা অর্জন করতে হবে। সে শ্রদ্ধা অর্জন করতে হলে তোমাকে শৃঙ্খলা শিখতে হবে। নিজকে সৎ হতে হবে, নিজকে দেশকে ভালোবাসতে হবে, মানুষকে ভালোবাসতে হবে এবং চরিত্র ঠিক রাখতে হবে। তা না হলে কোনো ভালো কাজ করা যায় না। আমার মুখ কালা করো না, কারণ দেশের মুখ কালা করো না। সাঁ সাঁ করে মানুষের মুখ কালা করো না।

তোমরা আদর্শবান হও, সৎ পথে থেকো। মনে রেখো, মুখে হাসি বুকে বল তেজে ভরা মন মানুষ হইতে হবে মানুষ যখন। মাঝেমাঝে আমরা অমানুষ হয়ে যাই। এত রক্ত দেওয়ার পরে যে স্বাধীনতা এনেছি, চরিত্রের পরিবর্তন অনেকের হয় নাই। এখনও ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, চোরকারবারি, মুনাফাখোরী বাংলার দুঃখী মানুষের জীবনকে অতিষ্ঠ করে দিয়েছে। দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত আমি এদের অনুরোধ করেছি, আবেদন করেছি, হুমকি দিয়েছি, চোরা নাহি শোনে ধর্মের কাহিনী। কিন্তু আর না। বাংলার মানুষের জন্য জীবনের যৌবন আমি কারাগারে কাটিয়ে দিয়েছি। এ মানুষের দুঃখ দেখলে আমি পাগল হয়ে যাই। কাল যখন আমি আসতেছিলাম ঢাকা থেকে, এত দুঃখের মধ্যে না খেয়ে কষ্ট পেয়েছে, গায়ে কাপড় নাই, কত অসুবিধার মধ্যে বাস করতেছে, হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ লোক দু’পাশে দাঁড়িয়ে আছে আমাকে দেখবার জন্য। আমি মাঝে মাঝে প্রশ্ন করি, তোমরা আমাকে এত ভালোবাসো কেন? কিন্তু যেই দুঃখী মানুষ দিনভরে পরিশ্রম করে, তাদের গায়ে কাপড় নাই, পেটে খাবার নাই, তাদের বাসস্থানের বন্দোবস্ত নাই, লক্ষ্য লক্ষ্য বেকার, পাকিস্তানিরা সর্বস্ব লুট করে নিয়ে গেছে, কাগজ ছাড়া আমার কাছে কিছু রেখে যায় নাই।

বিদেশ থেকে ভিক্ষা করে আমাকে আনতে হয়, আর এই চোরের দল আমার দুঃখী মানুষের সর্বনাশ করে এভাবে লুটতরাজ করে খায়। আমি শুধু এমার্জেন্সি দিই নাই, এবারে প্রতিজ্ঞা করেছি, যদি ২৫ বছর এই পাকিস্তানি জালেমদের বিরুদ্ধে জিন্নাহ থেকে আরম্ভ করে গোলাম মোহম্মদ, চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে বুকের পাটা টান করে সংগ্রাম করে থাকতে পারি, আর আমার ৩০ লক্ষ্য লোকের জীবন দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি, তাহলে পারব না? নিশ্চয়ই ইনশাআল্লাহ পারব।

এই বাংলার মাটি থেকে এই দুর্নীতিবাজ, এই ঘুষখোর, এই মুনাফাখোরী এই চোরাচালানকারীদের নির্মূল করতে হবে। আমিও প্রতিজ্ঞা নিয়েছি, তোমরাও প্রতিজ্ঞা নাও, বাংলার জনগণও প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করো। আর না, অধৈর্য, সীমা হারিয়ে ফেলেছি। এইজন্য জীবনের যৌবন নষ্ট করি নাই। এই জন্য শহীদরা রক্ত দিয়ে যায় নাই। কয়েকটি চোরাকারবারি, মুনাফাখোর ঘুষখোর দেশের সম্পদ বাইরে বাইর করে দিয়ে আসে, জিনিসের দাম গুদাম করে মানুষকে না খাইয়া মারে। উৎখাত করতে হবে বাংলার বুকের থেকে এদের। দেখি কতদূর তারা টিকতে পারে। চোরের শক্তি বেশি না ঈমানদারের শক্তি বেশি, সেটাই আজ প্রমাণ হয়ে যাবে।’ উদ্ধৃতি শেষ। এই ভাষণের কথাগুলো বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ের বেদনার প্রতিফলন; এতে আমার কোনো সন্দেহ নেই। একজন সর্বাধিনায়ক হিসেবে, তিনি তরুণতম অফিসারদের যুগোপযোগী উপদেশই দিয়েছিলেন।

একটি ফুলকে বাঁচানোর যুদ্ধ
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে, অনেক দেশাত্মবোধক জনপ্রিয় গান, রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধাদের এবং সমগ্র দেশের মানুষকে উদ্বেলিত করত, তাদের মনোবলকে সর্বদাই উজ্জীবিত রাখত। এরকম একটি গানের শিরোনাম বা প্রথম লাইনটি হলো ‘মোরা একটি ফুলকে বাঁচাব বলে যুদ্ধ করি’। গানটির রচয়িতা ছিলেন গোবিন্দ হালদার এবং মুক্তিযুদ্ধকালে প্রথম এই গানটি গেয়েছিলেন ওই আমলের প্রখ্যাত তরুণ সঙ্গীতশিল্পী আপেল মাহমুদ। আমি ওই গানের কথাগুলো এখানে হুবহু উদ্ধৃত করছি।


মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি \
যে মাটির চির মমতা আমার অঙ্গে মাখা
যার নদী জল ফুলে ফুলে মোর স্বপ্ন আঁকা।
যে দেশের নীল অম্বরে মন মেলছে পাখা
সারাটি জনম সে মাটির টানে অস্ত্র ধরি \
মোরা নতুন একটি কবিতা লিখতে যুদ্ধ করি
মোরা নতুন একটি গানের জন্য যুদ্ধ করি
মোরা একখানা ভালো ছবির জন্য যুদ্ধ করি
মোরা সারা বিশ্বের শান্তি বাঁচাতে আজকে লড়ি \
যে নারীর মধু প্রেমেতে আমার রক্ত দোলে
যে শিশুর মায়া হাসিতে আমার বিশ্ব ভোলে
যে গৃহ কপোত সুখ স্বর্গের দুয়ার খোলে
সেই শান্তির শিবির বাঁচাতে শপথ করি \
মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি
মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি।

গানের কথাগুলোর তাৎপর্য
সেই ফুল কী ছিল? সেই ফুল ছিল বাংলার মেহনতি মানুষ, সেই ফুল ছিল স্বাধীনতা, সেই ফুল ছিল স্বাধীনতার জন্য রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ, সেই ফুল ছিল গণতন্ত্র, সেই ফুল ছিল বঙ্গবন্ধু। ১৯৭১ সালের রণাঙ্গনে, মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করছিল একটি ফুলকে বাঁচানোর জন্য এবং সেই সময় স্বাধীনতা এবং বঙ্গবন্ধু, বঙ্গবন্ধু এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রায় সমার্থক ছিল। আজ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যু দিবসে, আমরা মনে করি নতুন ফুলকে বাঁচানোর জন্য সংগ্রাম করতে হবে। নতুন ফুল কী? নতুন ফুল গণমানুষের সার্বিক অধিকার, দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা, নতুন ফুল গণতন্ত্র এবং নতুন ফুল মুক্তিযুদ্ধের আদি ও অকৃত্রিম চেতনা।

সর্বাধিনায়ক তথা বাহিনী প্রধান : মুক্তিযুদ্ধকালে ও বর্তমানে
সুপ্রিম কমান্ডার বা সর্বাধিনায়ক এবং কমান্ডার ইন চিফ বা প্রধান সেনাপতি এই পদবিগুলোর তাৎপর্য নিয়ে প্রায়ই বিতর্ক হয়। বিতর্কের কারণ, সঠিক সচেতনতার অভাব। তাই এই অনুচ্ছেদে ওই সম্পর্কে কিছু কথা তুলে ধরছি। বাংলাদেশের সংবিধানের আর্টিক্যাল ৬১ মোতাবেক, ১৯৭২ থেকেই, বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টই হলেন সব বাহিনীর চূড়ান্ত অধিনায়ক এবং তাকে বলা হয় সর্বাধিনায়ক বা সুপ্রিম কমান্ডার। ব্যাখ্যা দিচ্ছি। প্রত্যেক দেশেই সশস্ত্র বাহিনী থাকে। সশস্ত্র বাহিনীগুলো সেনা বা নৌ বা বিমান ইত্যাদি নামে পরিচিত। প্রত্যেকটি বাহিনীর পেশাগত প্রধান (ইংরেজি পরিভাষায় : প্রফেশনাল হেড) থাকে। ভারতবর্ষ যখন ব্রিটিশদের অধীনে ছিল তখন পেশাগত প্রধানকে কমান্ডার ইন চিফ বলা হতো। কমান্ডার ইন চিফের বাংলা অনুবাদ প্রধান সেনাপতি। ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান স্বাধীন হয় এবং ১৫ আগস্ট ভারত স্বাধীন হয়। জন্মলগ্নে, এই উভয় দেশের সংবিধান ছিল না। তাই ব্রিটিশ আমলে যেই পদ্ধতি বা যেই রেওয়াজ বা যেই আইন মোতাবেক দেশ চলছিল, সেগুলোই বহাল বা চলমান থাকল। উদাহরণস্বরূপ ভারতীয় সেনাবাহিনী প্রধানকে অভিহিত করা হলো কমান্ডার ইন চিফ ইন্ডিয়ান আর্মি, এই পরিচয়ে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধানকে অভিহিত করা হলো কমান্ডার ইন চিফ পাকিস্তান আর্মি, এই পরিচয়ে।

২৬ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে স্বাধীন ভারতে যখন নিজেদের সংবিধান গৃহীত হলো, তখন তারা বাহিনী প্রধানের পদবিকে অভিহিত করল ‘চিফ অফ স্টাফ ইন্ডিয়ার আর্মি’, ইন্ডিয়ান এয়ারফোর্স, ইন্ডিয়ান নেভি- এরূপ। এই রেওয়াজ আজ অবধি চলছে। ১৯৫৬ সালের ২৩ মার্চ স্বাধীন পাকিস্তানে যখন নিজেদের সংবিধান গৃহীত হলো, তারা কিন্তু বাহিনী প্রধানদের পদবি পরিবর্তন করল না। পাকিস্তানে এই পদবি পরিবর্তিত হলো, ১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের ২০ তারিখের পর, যখন জেনারেল ইয়াহিয়া খান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করল এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট এর দায়িত্ব নিল এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল গুল হাসান পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রধানের দায়িত্ব নিলেন।

বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক জন্ম তথা অভ্যুদয় তথা স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ ১৯৭১। ১৯৭১ সালের এপ্রিল মাসের শুরুতে (১০ এপ্রিল) যখন মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার গঠিত হয় এবং যখন সেই সরকার শপথ গ্রহণ করে (১৭ এপ্রিল), তখন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের রাষ্টপতি বা প্রেসিডেন্ট হিসেবে মনোনীত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান; এবং তিনি সরকার প্রধানও হলেন। কিন্তু বাস্তবতা ছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ পাকিস্তানিদের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন, অতএব তিনি অনুপস্থিত। বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে মনোনীত হন এবং দায়িত্ব গ্রহণ করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম।ক্ষুদ্র কেবিনেটে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। অন্য তিনজন মন্ত্রী ছিলেন কামরুজ্জামান, মনসুর আলী এবং খোন্দকার মোশতাক আহমদ। ওই সরকার, বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধরত বাহিনীর পেশাগত প্রধান হিসেবে মনোনীত করেন, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীকে।

কিন্তু যেহেতু যুদ্ধ চলছে, সেহেতু তিনি আর অবসরপ্রাপ্ত থাকলেন না। তিনি একজন চাকরিরত তথা যুদ্ধরত সৈনিক বা অফিসার হয়ে গেলেন। তাকে অভিহিত করা হয় : ‘কমান্ডার ইন-চিফ বাংলাদেশ ফোর্সেস’। উলেøখ্য, কর্নেল ওসমানী ১৯৬৭ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে স্বাভাবিক নিয়মে অবসর গ্রহণ করেছিলেন এবং অবসরের কিছু মাস পরই আওয়ামী লীগে যোগদান করেছিলেন। ১৯৭০-এর নির্বাচনে, তৎকালীন অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ওসমানী, পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের একজন সদস্য তথা এমএনএ নির্বাচিত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন পূর্ণ নয় মাস, কর্নেল ওসমানী এই পরিচয়েই দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের অব্যবহিত পরেই, বঙ্গবন্ধু প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পরপরই, অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল ওসমানীকে ‘জেনারেল’ র‌্যাংকে পদোন্নতি দিয়ে বাংলাদেশের চাকরি থেকে পুনরায় অবসর দেয়া হয়। তিনি বঙ্গবন্ধুর কেবিনেটে একজন মন্ত্রী হয়ে যান। মুক্তিযুদ্ধকালে এবং ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী একটিই ছিল; নাম : বাংলাদেশ ফোর্সেস। এর অধীনেই ছিল সব সেক্টর, সব ফোর্স এবং সকল সেক্টরের গেরিলা যোদ্ধাগণ।

প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ করে রাখছি যে, যেই বাহিনীটির আনুষ্ঠানিক নাম বিএলএফ বা বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স ছিল, তথা অনানুষ্ঠানিক নাম মুজিব বাহিনী ছিল, সেই বাহিনীটি বাংলাদেশ সরকারের অধীনে ছিল না এবং কমান্ডার ইন চিফ কর্নেল ওসমানীর অধীনে ছিল না; তারা ছিল সরাসরি ভারতীয় কমান্ডের অধীনে। ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে, জেনারেল ওসমানীর প্রস্থানের পর, বাংলাদেশে তিনটি বাহিনী আলাদা পরিচয়ে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। যথা- বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনী এবং বাংলাদেশ নৌবাহিনী। এপ্রিল ১৯৭২-এ এই তিনটি বাহিনীর জন্য, আলাদাভাবে পেশাগত প্রধান বা বাহিনী প্রধান নিয়োগ করা হয় এবং ওই পদটিকে অভিহিত করা হয় চিফ অফ স্টাফ নামে। যথা : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য চিফ অফ আর্মি স্টাফ, বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্য চিফ অফ নেভাল স্টাফ এবং বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জন্য চিফ অফ এয়ার স্টাফ।

তাদের উপরে হলেন প্রতিরক্ষা মন্ত্রী। প্রতিরক্ষা মন্ত্রীর উপরে হলেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর উপরে হলেন রাষ্ট্রপতি বা প্রেসিডেন্ট। ১৯৭২ সালে এপ্রিল মাসে, প্রতিরক্ষা মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পাকিস্তান থেকে পাওয়া সাংবিধানিক ধারাবাহিকতায়, রাষ্ট্রপতি ছিলেন সর্বাধিনায়ক।

মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনের মধ্য দিয়ে গঠিত গৌরবোজ্জ্বল সেনাবাহিনীর প্রথম চিফ অফ আর্মি স্টাফ ছিলেন মেজর জেনারেল কেএম সফিউল্লাহ বীর উত্তম, দ্বিতীয় ছিলেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, তৃতীয় ছিলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং বর্তমানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫তম প্রধান বা চীফ অফ আর্মি স্টাফ হচ্ছেন জেনারেল আজিজ আহমদ। বর্তমান সেনাপ্রধান এবং বর্তমান সেনাবাহিনীকে আজকের দিনে আমার শ্রদ্ধা ও অভিনন্দন।হ
লেখক : মেজর জেনারেল (অব.); চেয়ারম্যান,
বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
ই-মেইল : [email protected]


আরো সংবাদ

iptv al Epoksi boya epoksi zemin kaplama Daftar Situs Agen Judi Bola Net Online Terpercaya Resmi

Hacklink

Bursa evden eve nakliyat
arsa fiyatları tesettür giyim
Canlı Radyo Dinle hd film izle instagram takipçi satın al ofis taşıma Instagram Web Viewer

canli radyo dinle

Yabanci Dil Seslendirme

instagram takipçi satın al
hd film izle
gebze evden eve nakliyat