২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভিআইপিদের জন্য আলাদা লেন নয়

ভিআইপিদের জন্য আলাদা কি জরুরী? - ছবি : সংগ্রহ

বাংলাদেশের রাজধানী শহর ঢাকার যানজট সমস্যার মাত্রা বর্তমানে অসহনীয়পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে। ঢাকায় এখন যানবাহনের গড় গতিবেগ ঘণ্টায় ৬ কিলোমিটারের নিচে। পৃথিবীর কোনো রাজধানী শহরে যানবাহনের এত নিম্ন গড় গতিবেগ নেই। যানজটের কারণে সময়ক্ষেপণ ও অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয়ে আর্থিক ক্ষতি বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, বার্ষিক এক লাখ হাজার কোটি টাকার অধিক। এ সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, যানজটের কারণে দৈনিক ৩২ লাখ কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়।

যানজটের কারণে ঢাকাবাসী যখন নাকাল, তখন আকস্মিক সংবাদমাধ্যমে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিবের বরাত দিয়ে তথ্য প্রকাশিত হয় যে, ওই বিভাগ থেকে সড়ক ও জনপথ বিভাগকে ভিআইপিদের চলাচলের জন্য পরীক্ষামূলক আলাদা লেন চালুর প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। তথ্য প্রকাশকালে মন্ত্রিপরিষদ সচিব দাবি করেন বিদেশে ভিআইপিদের জন্য অনুরূপ সুবিধা চালু রয়েছে। তিনি আরো দাবি করেন, ভিআইপিদের জন্য অনুরূপ সুবিধা চালু হলে জরুরি প্রয়োজনে রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশের গাড়ি সুবিধাদি গ্রহণ করতে পারবে।

বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল দেশ এবং পৃথিবীর রাজধানী শহরগুলোর মধ্যে ঢাকা সর্বাধিক জনবহুল। ঢাকায় সড়ক নির্মাণের জন্য ভূমির প্রাপ্যতা পৃথিবীর অপরাপর শহরের সাথে তুলনীয় নয়। ঢাকা শহরের মতো পৃথিবীর অন্য কোনো দেশের রাজধানী শহরে যন্ত্রচালিত যানের সাথে হস্তচালিত যান পাশাপাশি চলাচল করে না। পৃথিবীর বেশির ভাগ দেশের রাজধানী শহরের মধ্য দিয়ে ট্রাক, লরি, কাভার্ডভ্যান প্রভৃতি চলতে দেয়া হয় না। কিন্তু আমাদের রাজধানী শহরের মধ্য দিয়ে এগুলো যথারীতি চলাচল করে যদিও চলাচলে নির্ধারিত সময় বেঁধে দেয়া আছে।

পৃথিবীর উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের অন্যতম যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, জাপান, কানাডা, চীন, রাশিয়া প্রভৃতি দেশের রাজধানী শহরে ভিআইপিদের চলাচলের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা নেই; তবে এসব দেশে অ্যাম্বুলেন্স, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি এবং স্কুলবাস ভিআইপিদের ওপরে প্রাধান্য পায়। যুক্তরাজ্যে একাধিক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষেত্রে দেখা গেছে যানজটের কবলে পড়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদে তার নির্ধারিত মোটরগাড়ি ত্যাগ করে গণপরিবহনের আকাশ রেল বা পাতাল রেলযোগে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রয়াস নিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছানোর তাগিদে যদি কখনো ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেন সে ক্ষেত্রে তাকে পার্লামেন্টে জবাবদিহির মুখোমুখি হতে হবে এবং এ ধরনের কাজ করলে যে প্রধানমন্ত্রিত্ব পদ হারাতে হবে এ বিষয়ে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে আসীন ব্যক্তিরা ওয়াকিবহাল।

আমাদের দেশে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ভিভিআইপি মর্যাদাধারী। সরকারের যুগ্ম সচিব এবং তদূর্ধ্ব ও সমমর্যাদার কর্মকর্তারা ভিআইপি মর্যাদাধারী। তা ছাড়া ক্ষমতাসীন দল ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতারা অলিখিতভাবে ভিআইপি মর্যাদা ভোগের প্রয়াস নেন। আমাদের ভিভিআইপিরা সড়কপথে চলাচলের সময় সে পথে অপর সবার চলাচল রোধ করা হয়। আমাদের ভিভিআইপিদের যেকোনো একজন ঢাকা শহরের প্রধান সড়ক দিয়ে যেদিন যাতায়াত করেন সেদিন যানজট অন্য যেকোনো দিনের চেয়ে তীব্রতর হয় এবং এর রেশ রাত অবধি গড়ায়। তিন যুগ ধরে বিভিন্ন সরকারের সময় যারা ভিভিআইপি মর্যাদা ভোগ করেছেন বা করে চলেছেন তাদের চলাচলের সময় মুমূর্ষু রোগীবাহী অ্যাম্বুলেন্স, বিদেশগামী যাত্রী, বিভিন্নপর্যায়ের পরীক্ষার্থীদের কোনো ধরনের ছাড় দেয়ার ঘটনা পরিলক্ষিত হয়নি।

আমাদের ভিআইপি মর্যাদাধারীদের সবাই তাদের গাড়িতে ফ্ল্যাগ স্ট্যান্ড লাগিয়ে রাখেন যদিও ভিআইপিদের মধ্যে নির্দিষ্ট ফ্ল্যাগ ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত। কিছু কিছু ভিআইপি তাদের চলাচলের সময় নিরাপত্তা রক্ষীবাহী প্রটেকশন কারের সুবিধা ভোগ করেন। এদের অনেকে তাদের গাড়ির সামনে-পেছনে অনুরূপ প্রটেকশন কারের সুবিধা ভোগ করেন। কিছু কিছু ভিআইপিকে দেখা যায় গানম্যানদের ড্রাইভারের পাশে সিটে উপবেশন করিয়ে চলাচল করেন। এ সব ভিআইপিদের অনেকেই যানজটের কবলে পড়লে আইনের তোয়াক্কা না করে উল্টোপথে গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রয়াস নেন।

উল্টোপথে গাড়ি চলাচল রোধে একদা ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের পক্ষ হতে ঢাকা শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে বিদেশ থেকে আমদানি করা ব্যয়বহুল উল্টোপথে গাড়ি চলাচল প্রতিরোধ যন্ত্র (ভেহিক্যাল রিট্রাক্ট্যাবল স্পাইক) বসানো হয়েছিল। এ যন্ত্রটি বসানোর পর তা উল্টোপথে গাড়ি চলাচল প্রতিরোধে সহায়ক হয়ে জনজীবনে স্বস্তি বয়ে আনতে শুরু করলে আমাদের অশীতিপর অর্থমন্ত্রীর গাড়ি উল্টোপথে চলতে গিয়ে এর টায়ার ফুটো হয়ে গাড়িটি সেখানে আটকে পড়লে তিনি বিকল্প গাড়িতে গন্তব্যে পৌঁছার প্রয়াস নেন। পরে দিন তিনি তার কার্যালয়ে গিয়ে কার নির্দেশে এ প্রতিরোধ যন্ত্র বসানো হয়েছে- এমন প্রশ্ন তুলে এগুলো অপসারণের নির্দেশনা দেন। এরপর ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের সদর দফতর ছাড়া অপর সব সড়ক থেকে এ যন্ত্রটি তুলে নেয়া হয়। যন্ত্রটি যথাযথ মানসম্পন্ন না হওয়ায় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ সদর দফতরের সামনে সংস্থাপিতটিও বছর গড়ানোর আগেই বিকল হয়ে যায়।

যানজট সমস্যা নিরসনের জন্য ঢাকা শহরের অভ্যন্তরে বেশ কিছু উড়াল সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। এ সব উড়াল সড়ক চালু-পরবর্তী ধারণা করা গিয়েছিল এগুলো যানজট সমস্যা নিরসন করে যান চলাচলে স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু উদ্বোধন-পরবর্তী দেখা গেল, যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এগুলো নির্মাণ করা হয়েছে, তা কাক্সিক্ষত ফল দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। এমনকি শীর্ষ ঘণ্টায় (পিক আওয়ার) দেখা যায় খোদ উড়াল সড়কের ওপর এবং এর প্রবেশ ও নির্গমন মুখে দীর্ঘ যানজট। সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা থেকে উঠে এসেছে ব্যয়বহুল উড়াল সেতুর চেয়ে ঢাকা শহরের যানজট সমস্যা নিরসনে স্বল্প ব্যয়বহুল ইউলুপ অধিক ফলপ্রদ। কিন্তু আমাদের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই কোনো একজন অজানা কারণে ইউলুপের চেয়ে উড়াল সেতু নির্মাণের সপক্ষে অবস্থান ব্যক্ত করে আসছেন।

ক্ষমতাসীন দলের আশীর্বাদপুষ্ট কিছু ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ভিআইপি না হলেও তারা ভিআইপির আদলে গাড়ির সামনে বা পেছনে ব্যক্তিগত অস্ত্রধারী নিরাপত্তা রক্ষীবাহী প্রটেকশন গাড়ি ব্যবহার করেন। এরা চলাচলের সময় দেখা যায় তাদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষী ইলেকট্রনিক সিগন্যাল স্টিক ব্যবহার করে আশপাশের গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণ করে তথাকথিত ভিআইপির গাড়ি চলার পথ সুগম করছেন।

ঢাকা শহরের সড়কগুলোর আয়তন বিবেচনায় নেয়া হলে এগুলোয় শুধু ভিআইপিদের চলাচলের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা হলে এগুলো সঙ্কুচিত হয়ে পড়বে এবং এর ফলে বিদ্যমান যানজটের তীব্রতা বহুলাংশে বাড়বে। ঢাকা শহরে ভূমির প্রাপ্যতা সহজতর না হওয়ায় সড়কগুলোর পাশে ভূমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে এগুলোর প্রশস্তকরণ খুবই জটিল ও ব্যয়বহুল। সুতরাং প্রশস্তকরণের অবকাশ খুবই সীমিত।

পৃথিবীর বেশির ভাগ উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্র ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন ও আধুনিকায়নের মাধ্যমে তাদের রাজধানী শহরসহ গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর যানজট সমস্যা সমাধানে সফলতা পেয়েছেন। পৃথিবীর উন্নত ও সমৃদ্ধ রাষ্ট্রগুলোয় দেখা যায় একই দিন শহরের রাস্তায় জোড় ও বিজোড় নম্বরধারী গাড়ি চলাচল করে না। এ ব্যবস্থাটি নেয়ার ফলে সে সব দেশে প্রতিদিন গাড়ি চলাচলের সংখ্যা অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ সব দেশে স্কুলগামী শিশুরা ব্যক্তিগত গাড়িতে কখনো স্কুলে যাওয়া-আসা করে না।

এদের স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য স্কুল কর্র্তৃপক্ষের নির্ধারিত বাস রয়েছে। এ সব দেশের সবপর্যায়ের সরকারি ও বেসরকারি কর্মকর্তাদের বেশি গণপরিবহন ব্যবহার করে কর্মক্ষেত্রে আসা-যাওয়া করেন। এমনকি এসব দেশের প্রতিমন্ত্রী বা উপমন্ত্রীপর্যায়ের ব্যক্তিদেরও গণপরিবহনে কর্মস্থলে আসা-যাওয়া লক্ষণীয়। পৃথিবীর এমন অনেক উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ রয়েছে যেখানে প্রধান সড়কগুলোয় শীর্ষ ঘণ্টায় যান চলাচল করতে হলে নির্ধারিত হারে অর্থ দিতে হয়। আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে গাড়িতে সংস্থাপিত যন্ত্রের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে নির্ধারিত কার্ড থেকে এ অর্থ পরিশোধিত হয়। উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশগুলোয় ভিভিআইপিদের চলাচলের সময় অপরাপরের চলাচল রোধ করা হয় না। এমনকি উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশে অপর কোনো দেশের ভিভিআইপির রাষ্ট্রীয় সফরে আগমন ঘটলে তার জন্য অপরাপরের চলাচল রোধ করা হয় না।

আমরা উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশের মতো উপরোল্লিখিত অনুচ্ছেদে উল্লিখিত ব্যবস্থাদি নিতে পারলে আমাদের যানজট সমস্যা নিরসনে বহুলাংশে সফল হবো। আমাদের দেশের ভিআইপিদের দ্রুত চলাচল নিশ্চিতের জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা হলে তা অপরিপক্ব, অবিবেচনাপ্রসূত এবং বাস্তবতাবিবর্জিত সিদ্ধান্ত হবে। এরূপ সিদ্ধান্ত দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পরিপন্থী। এ কথাটি নির্দ্বিধায় বলা যায়, ভিআইপিদের চলাচল নির্বিঘœ করার জন্য পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা হলে তা জনদুর্ভোগ বাড়িয়ে যানজট নিরসনের পরিবর্তে এটিকে স্থায়ী রূপ দেয়ার পথ প্রশস্ত করবে।

আমাদের সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের মালিক জনগণ। এ প্রজাতন্ত্রটি সৃষ্টিতে সর্বাধিক অবদান যাদের তারা হলো ছাত্র, শ্রমিক, কৃষক জনতা অথচ এরা কোথাও তাদের অবদানের স্বীকৃতি অনুযায়ী মর্যাদা পান না। আইনের দৃষ্টিতে সমতা বাংলাদেশের সংবিধানের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশের সব নাগরিক চলাফেরায় সম-অধিকার ভোগ করে থাকেন। ভিআইপিদের চলাচলে পৃথক লেনের ব্যবস্থা করা হলে তা সংবিধানের অনুচ্ছেদ নম্বর ৭(১), ২৭ ও ৩৬ এর পরিপন্থী হবে।
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com


আরো সংবাদ