২১ আগস্ট ২০১৮

আসাম নিয়ে আমরা ভাবিত

শঙ্কায় আসামের লাখ লাখ মুসলিম - ছবি : সংগ্রহ

আসাম প্রদেশটি ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রশাসন গঠন করে ১৮৭৪ সালে। এর আগে ঠিক আসাম বলে কোনো রাজ্য ছিল কি না আমরা তা জানি না। এখন কামরূপ বলতে আসামের একটি জেলাকে বোঝায়। কিন্তু প্রাচীন যুগে কামরূপ বলতে বোঝাত একটি বিস্তীর্ণ ভূ-ভাগকে। যার পূর্ব-দিক ত্রয়োদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে দখল করে উত্তর বার্মা (মিয়ানমার) থেকে শান জাতির আহোম নামক একটি বিশিষ্ট শাখা এসে। ভাষাতাত্ত্বিকদের মতে, ‘শান’ নাম অথবা আহোম বা অসম থেকে উদ্ভব হতে পেরেছে আসাম নামের। তাই আসাম নামটি যে খুব পুরনো তা বলা যায় না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন আমলেই বিশেষভাবে এই নামটি হতে পেরেছে প্রচলিত।

কিন্তু এর আগে এই নামের এবংবিধ প্রচার ছিল বলে অনুমান করা যায় না। কামরূপ নামটাই ছিল প্রচলিত। কামরূপের একটি অংশকে একসময় বলা হতো প্রাগজ্যোতিষ। কামরূপ অঞ্চলে যে ভাষা চলত তা ছিল প্রকৃত প্রস্তাবে বাংলা ভাষারই একটি রূপ; যাকে বলা যেতে পারত বাংলা ভাষার কামরূপী রূপ। আহোম রাজা চক্রংফা ১৬৯৫-১৭১৪ সালের মধ্যে হিন্দু ধর্মে দীক্ষা নেন। নাম গ্রহণ করেন রুদ্র সিংহ। তার সময় থেকে আসামের শান ভাষা আর থাকে না। শান ভাষার স্থান অধিকার করে বর্তমান অসমীয়া ভাষা। যাকে বলা চলে প্রাচীন কামরূপী ভাষারই একটি বিশেষ রূপান্তরিত রূপ। যে অঞ্চল নিয়ে আসাম প্রদেশ গঠন করা হয় তার জনসংখ্যা ছিল খুব কম। এর সাথে তদানীন্তন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে বাংলাভাষী কয়েকটি জেলা আলাদা করে নিয়ে তখন যোগ করা হয় নতুন গঠিত আসাম প্রদেশের সাথে।

এগুলো হলো ধুবরি, গোয়ালপাড়া, শ্রীহট্ট (সিলেট) এবং কাছাড়। শ্রীহট্ট যোগ করা হয় ১৮৭৪ সালের ১২ সেপ্টেম্বর। আসাম প্রদেশের প্রথম চিফ কমিশনার নিযুক্ত হন কর্নেল কিটিঞ্জ। লেফটেন্যান্ট গভর্নর ও চিফ কমিশনারের মধ্যে ক্ষমতার কিছু পার্থক্য ছিল। আসাম সরকারের ছিল না কোনো হাইকোর্ট। আসামের বিচারালয়গুলো নিয়ন্ত্রিত হতো কলকাতার হাইকোর্ট দিয়ে। আসামের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। আসামের শিক্ষাব্যবস্থা ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ন্ত্রণে। আসামের ছিল না কোনো সমুদ্রবন্দর। কলকাতা বন্দর দিয়েই বিদেশে রফতানি হতো তার বিখ্যাত চা। ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড জর্জ ন্যাথিনিয়েল কার্জন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে পনেরোটি বাংলা ভাষাভাষী জেলা ও আসাম প্রদেশকে একত্র করে গঠন করেন একটি নতুন প্রদেশ। যার নামকরণ করা হয় Eastern Bengal and Assam Province. এই নতুন প্রদেশের রাজধানী করা হয় ঢাকা।

যার ফলে এই প্রদেশে সৃষ্টি হতে পারে বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম প্রাধান্য। কিন্তু এ জন্য আসামের অধিবাসীরা কোনো প্রতিবাদ উত্থাপন করেন না; তারা মেনে নেন এই প্রশাসনিক কাঠামোকেই। কিন্তু বাংলাভাষী হিন্দুরা শুরু করেন প্রবল আন্দোলন। যার ফলে ১৯১১ সালে এই তথাকথিত বঙ্গভঙ্গ রদ হয়ে যায়। গঠিত হয় নতুন Bengal province. উদ্ভব হয় নতুন Bihar-Orissa province. আসামকে আবার আগের মতোই একটা চিফ কমিশনারের শাসনাধীন প্রদেশে পরিণত করা হয়। ১৯১২ সালে কলকাতা থেকে ভারতের রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লিতে। এর একটি বড় কারণ ছিল এশিয়াতে জাপান হয়ে উঠছিল তখন খুবই শক্তিশালী। জাপান নৌযুদ্ধে হারিয়ে দেয় রাশিয়াকে, পোর্ট আর্থার নামে পরিচিত বন্দরে। ব্রিটেন তাই ভাবে কলকাতার মতো একটি বন্দরনগরীতে ভারতের রাজধানী রাখা আর নিরাপদ নয়। সেটাই ভূমিঘেরা দিল্লিতে রাজধানী সরিয়ে নিয়ে যাওয়া সমীচীন মনে করে। এ ছাড়া দিল্লির আছে একটা সুপ্রাচীন ঐতিহ্য। ব্রিটেনের জাপান সম্বন্ধে ধারণা যে যথার্থ ছিল, পরবর্তীকালের ইতিহাস থেকে তা প্রমাণিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঘটেছিল তদানীন্তন ভারতের সীমান্তে। যার মধ্যে আসাম সীমান্তে যুদ্ধ হয়েছিল প্রচণ্ড।

১৯৪৭ সালে হয় পাকিস্তান। তদানীন্তন সিলেট জেলা ছিল মুসলিমপ্রধান এবং পূর্ববঙ্গের সাথে লাগোয়া। তাই ঠিক হয় গণভোটের মাধ্যমে সিলেট জেলার মানচিত্রকে ঠিক করবেন তারা; পাকিস্তানে যোগ দেবেন না থাকবেন আসাম প্রদেশের সাথেই যুক্ত। সিলেট জেলার মানুষ, এক করিমগঞ্জ থানা ছাড়া, গণভোটের মাধ্যমে নেন পাকিস্তানে যোগ দেয়ার সিদ্ধান্ত। কাছাড় জেলা যেহেতু ছিল হিন্দুপ্রধান তাই তার ক্ষেত্রে ওঠেনি পাকিস্তানে যোগ দেয়ার প্রশ্ন। সে থাকে আসামের সাথে যুক্ত। ধুবড়ি ও গোয়ালপাড়া জেলা ছিল মুসলিমপ্রধান। কিন্তু সেখানে গণভোট হয়নি। যদিও উচিত ছিল হওয়া। আসামে এখন জেলার সংখ্যা হচ্ছে ৩২টি; এর মধ্যে ৯টি হচ্ছে মুসলিমপ্রধান। এগুলো হলো ধুবড়ি, গোয়ালপাড়া, বড়পেটা, মরিগাঁও, নওগাঁও, করিমগঞ্জ, হাইলাকান্দি, দরঙ্গ ও বঙ্গাইগাঁও। এসব জেলার মানুষ মোটামুটি সবাই বাংলা ভাষাভাষী। কিন্তু এখন এরা সবাই শিখছেন অসমীয়া।

আসামের বাংলাভাষী মুসলমান অসমীয়া ভাষা শেখার বিপক্ষে কোনো প্রতিরোধ গড়তে চাননি। কিন্তু হিন্দুপ্রধান কাছাড় জেলার মানুষ আন্দোলন করেছেন। কাছাড় জেলার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যম হতে হবে বাংলা আর জেলার সরকারি কাজকর্ম চলতে হবে বাংলা ভাষার মাধ্যমে। তারা এ নিয়ে করেন বিশেষ আন্দোলন। কাছাড় জেলা সদর হলো শিলচর। এখানে ১৯৬১ সালের ১৯ মে বাংলাভাষার আন্দোলনকারীদের ওপর আসাম পুলিশ চালায় গুলি। যার ফলে মারা যান ১১ জন। কাছাড় বাংলাভাষী হিন্দুপ্রধান অঞ্চল। কিন্তু এখানে শতকরা ৩৯ জন হলেন মুসলমান। এরা প্রত্যক্ষভাবে ভাষা আন্দোলন না করলেও ভাষা আন্দোলনকে জানিয়ে ছিলেন নীরব সমর্থন। কিন্তু এখন আসামে যেন প্রমাণ করার চেষ্টা হচ্ছে বাংলা হলো কেবল মুসলমানের ভাষা। হিন্দুর ভাষা নয়। আসাম থেকে তাই তাড়াতে হবে বাংলাভাষী মুসলমানকেই, হিন্দুকে নয়। তাই আসাম নিয়ে আমরা বাংলাদেশের মানুষ হয়ে উঠেছি বিশেষভাবে ভাবিত। বলা হচ্ছে চল্লিশ লাখ বাংলাভাষী মুসলমানকে আসাম থেকে বিতাড়নের কথা।

এই বিপুল মুসলমানকেই আসাম থেকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হলে, তা হবে বাংলাদেশের জন্য মহাবিপর্যয়কর। এর ফল দাঁড়াবে, রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আসার চেয়েও আরো ভয়ঙ্কর। আজকের আসামে মোট জনসংখ্যার শতকরা ৩৪ ভাগের কিছু বেশি হলেন মুসলমান। আর আসামে বাংলা ভাষাভাষীর সংখ্যা হলো প্রায় ২৮ শতাংশ। তাই সমস্যাটি যে শেষ পর্যন্ত হয়ে উঠবে আমাদের জন্য খুবই জটিল। যেটা অনুমান করা আদৌ কঠিন নয়। যেটা আমাদের উপলব্ধিতে আসছে না, তা হলো ভারতের সংবিধানের পাঁচ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, ভারতের নাগরিকেরা সবাই হলেন কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিক; কোনো প্রাদেশিক সরকারের নাগরিক নন। আমরা জানি যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আছে দ্বিনাগরিক প্রথা। সেখানে যেমন সবাই হলেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের নাগরিক। তেমনি আবার প্রত্যেকে হলেন নিজ নিজ রাষ্ট্রের নাগরিক। কিন্তু ভারতে রাজ্য সরকারের পৃথক নাগরিকত্ব বলে কিছু নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গভর্নররা নির্বাচিত হন নিজ নিজ রাষ্ট্রের ভোটারদের ভোটের মাধ্যমে।

কিন্তু ভারতের প্রত্যেক রাজ্যের রাজ্যপালরা (গভর্নর) নিযুক্ত হন কেন্দ্রীয় সরকার কর্তৃক এবং রাজ্যপাল পারেন প্রাদেশিক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে। এ ছাড়া ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পারে প্রত্যেক রাজ্যের ভৌগোলিক সীমানা রদবদল করতেও। তাই কী করে আসাম সরকার ভারতের নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে বিধিবিধান রচনা করতে পারে? সেটা আমাদের বোধগম্য হতে পারছে না। আসামের সাথে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের আছে সাধারণ সীমান্ত। সেখান থেকে প্রচুর বাংলাভাষী মুসলমান ইচ্ছা করলেই যেতে পারেন আসামে। তাদের আসামে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাই আসাম সরকার কোনো আইন করতে পারে না। কিন্তু আসাম যে নাগরিকত্ব আইন করতে যাচ্ছে, যেটা ভারতীয় সংবিধানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাই এ নিয়ে আসাম সরকারের করছেন সমালোচনা। আসাম সরকার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে এ জন্য গ্রহণ করেছে ফৌজদারি মামলা। ভারতের একটি প্রাদেশিক সরকার কী করে আরেকটি প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা গ্রহণ করতে পারে, সেটাও আমাদের উপলব্ধিতে আসতে পারছে না। তাই নানা কারণেই আসাম হয়ে উঠছে আমাদের জন্য ভাবনার বিষয়।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট


আরো সংবাদ