২১ আগস্ট ২০১৮

তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র্র সঙ্ঘাত : বরুনসন-গুলেন ইস্যু

তুরস্ক-যুক্তরাষ্ট্র্র সঙ্ঘাত : বরুনসন-গুলেন ইস্যু - ছবি : নয়া দিগন্ত

তুরস্কের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের শীতল সম্পর্কের আরো এক ধাপ অবনতি হয়েছে। তুরস্কের পুলিশ আমেরিকান পাদ্রি এডরু বরুনসনকে দুই বছর ধরে কারারুদ্ধ করে রেখেছে। তুর্কি ইন্টেলিজেন্সের মতে (ক) বরুনসন তুরস্কের অভ্যন্তরে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়েছেন, যেমন পিকেক ও ফেটো দলের সাথে যোগাযোগ করে তুরস্ক ও সরকারের বিরুদ্ধে কার্যক্রম চালিয়েছেন এবং (খ) তুরস্কের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন। অভিযোগ গুরুতর। ছদ্মবেশে ভিন দেশে গুপ্তচরবৃত্তি করা আন্তর্জাতিক আইনে অপরাধ হিসেবে বর্ণিত রয়েছে। বিশ্ব সভ্যতা এখন জানে যে, মিশনারি সংগঠনগুলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এবং এর পর থেকে আজ পর্যন্ত গুপ্তচরবৃত্তি করছে। ১৯৪৭ সালে সিআইএ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর মিশনারিরা চীনের ইউনান প্রদেশে নজরদারির দায়িত্ব পালন করত। ফলে কমিউনিস্ট শাসন প্রতিরোধের উপায় উপকরণ সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্ব সহজে অঙ্ক কষতে পারত। চীনারা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর প্রতি অসহিষ্ণু হওয়ার এটাও এক কারণ। কিছু বাছাই করা চার্চে গুপ্তচরবৃত্তির জন্য প্রশিক্ষিত যাজককে প্রেরণ করা হয়েছিল। তাই বলা হয়, এদের এক হাতে বাইবেল অন্য হাতে রাইফেল। বরুনসন তুর্কি আইনে দোষী সাব্যস্ত হলে ৩৫ বছর পর্যন্ত জেল হতে পারে।

খোদ যুক্তরাষ্ট্র্রে গুপ্তচরবৃত্তি বড় ধরনের অপরাধ। এসপিওনেজ অ্যাক্ট ১৮১৭ শীর্ষক আইনে আমেরিকায় গুপ্তচরবৃত্তিকে ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিশ্বাসঘাতকতা, গুপ্তচরবৃত্তি ও গোয়েন্দাগিরি ভিন্ন ভিন্ন অপরাধ হিসেবে ওই আইনে উল্লেখ রয়েছে। আমরা অনেকেই জানি না যে, যুক্তরাষ্ট্রে ৪১ রকম অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধানও আছে। সেখানে গুপ্তচরবৃত্তিকে বড় অপরাধ বা ক্যাপিটাল অফেন্স ধরা হয়। এ অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাভোগেরও বিধান আছে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ১৯ জুলাই টুইটে বলেন, ‘এটা খুবই অসম্মানজনক যে, তুরস্ক একজন সম্মানিত প্যাস্টরকে জেলখানা থেকে মুক্তি দিচ্ছে না। অনেক দিন ধরে তাকে বন্দী করে রাখা হয়েছে। এরদোগানের কিছু একটা করা দরকার যাতে এই অতি-উত্তম একজন খ্রিষ্টান যিনি স্বামী ও বাবা, মুক্তি পান। তিনি খারাপ কিছু করেননি, পরিবারের সদস্যদের তাকে খুব প্রয়োজন, তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছেন।’

শুধু বরুনসন নন, শেরকান গোলকি নামে আরেক আমেরিকান বিজ্ঞানীরও মুক্তি চেয়েছে আমেরিকা। তিনি নাসার বিজ্ঞানী। সন্ত্রাসের অভিযোগে তুরস্কে তার সাড়ে সাত বছরের সাজা চলছে। এদিকে মার্কিন কর্মকর্তা পেন্স ও বরুনসন উভয়েই ইভানজালিক্যাল খ্রিষ্টান। ট্রাম্পের ভোট ব্যাংকের একটি বড় অংশ এই জনগোষ্ঠী। এদের তরফ থেকে ট্রাম্প চাপে রয়েছেন। তুর্কি কর্তৃপক্ষ জেলখানা থেকে তাকে ‘হাউজ অ্যারেস্ট’ অবস্থানে রেখেছে। এই পদক্ষেপেও সন্তুষ্ট নয় ট্রাম্প প্রশাসন।

ট্রাম্পের আচরণ হঠাৎ বদলে যায়, যেকোনো সময় তিনি প্রচণ্ড রেগে যেতে পারেন। ট্রাম্প চুল পড়া বন্ধ করার জন্য পিল গ্রহণ করেন বলে যানা যায়। ওষুধটি প্রোস্টেট গ্লান্ডের আকার কমিয়ে চুল বৃদ্ধি পেতে সহায়তা করে। তৃতীয় লিঙ্গের নারীদের কাছে ওষুধটি খুব জনপ্রিয়। এই ওষুধের মারাত্মক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে, যেমন- হঠাৎ রেগে যাওয়া, বিষন্নতা, মানসিক ক্ষতি, প্রজনন সক্ষমতার ক্ষতি ইত্যাদি।
অনেক সময় ট্রাম্প কারো তোয়াক্কা না করে কথা বলেন। গত বৃহস্পতিবার, ২৬ জুলাই বলেছেন, বরুনসনকে ফেরত না দিলে তিনি তুরস্কের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক বা বড় ধরনের অবরোধ দেবেন। তুরস্কের বিরুদ্ধে এ ধরনের কথা বলা যুক্তিহীন। কেননা তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য দেশ। একটি সদস্য দেশের বিরুদ্ধে অবরোধ করতে ন্যাটোর নীতিমালা উৎসাহ জোগায় না।

ট্রাম্পের এই গর্জনে তিনি একা নন। যুক্তরাষ্ট্রের সিনেটও সম্পৃক্ত। তারা একটি বিল এনেছেন তুর্কি ইন্টারন্যাশনাল ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন অ্য্যাক্ট নামে। এ আইন পাস হলে বৈদেশিক ঋণ, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা- এসব ক্ষেত্রে তুরস্ক অবরোধ ও সমস্যার সম্মুখীন হবে। যুক্তরাষ্ট্র আইএমএফকেও অনুরূপ ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানিয়েছে। আইএমএফ থেকে তুরস্ক বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা পেয়ে থাকে। পাঁচ বছর ধরে তুর্কিরা চেষ্টা করছেন লিরার অবমূল্যায়ন ঠেকানোর জন্য। ডলারের কাছে লিরা তারপরও অবমূল্যায়িত হচ্ছে। এরদোগান বলেছেন, এটা আমেরিকানদের কারসাজি।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এখন তুরস্কের মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং তার বৈদেশিক নীতির ব্যাপারে তুষ্ট নয়। সিনেটের আমর্ড সার্ভিসেস কমিটি একটি বিল উত্থাপন করেছে এফ-৩৫ ফাইটার সরবরাহ না করার জন্য। তুরস্ক যদি একই সাথে এফ-৩৫ এবং রাশিয়ার এস-৪০০ মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেমের অধিকারী হয়, তা আমেরিকার জন্য উদ্বেগের। আমেরিকার সমরবিদেরা ভয় করেন যে, রাশিয়া স্পর্শকাতর ও গোয়েন্দা তথ্য হাতিয়ে নিতে সক্ষম। এখন রাশিয়ার এই পারঙ্গমতা ভর করেছে তুরস্কের ওপর। তুরস্ক রাশিয়ার দিকে ঝুঁকলে তাদের মাধ্যমে আমেরিকার কিছু সামরিক গোপন বিষয় রাশিয়ার হস্তগত হবে। সেন্ট পিটার্সবার্গে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের অধিবেশনে দেয়া ভাষণে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ‘রাশিয়া থেকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৪০০ কেনার ব্যাপারে তুরস্ককে বাধা দিচ্ছে আমেরিকা। কিন্তু এতে কোনো লাভ হবে না।

রাশিয়া থেকে উন্নত মানের এস-৪০০ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা কেনার জন্য ন্যাটো জোটের সদস্য তুরস্ক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখানে অপরাধটা কী? আঙ্কারার বিরুদ্ধে এ ধরনের চাপ সৃষ্টি করা অন্যায়। এরদোগানকে এ ধরনের চাপ দিয়ে সুফল পাওয়া কঠিন। উল্টো এমন চাপ তাকে এস-৪০০ কেনার ব্যাপারে আরো উৎসাহিত করবে। জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় তিনি কোনো আপস করবেন না।’ ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ক্রয়ের জন্য ২.৫ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করেছে তুরস্ক। এটি রাশিয়ার তৈরি বতর্মানে সর্বাধুনিক অন্যতম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। ন্যাটো দেশগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম তুরস্কই এই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পেতে যাচ্ছে। ২০১৯ সালেই এ ক্ষেপণাস্ত্র তুরস্কে মোতায়েন করা হবে। তুরস্কের দুই সীমান্তবর্তী দেশ ইরাক ও সিরিয়ার যুদ্ধাবস্থা এবং পিকেকে ও দায়েশের সাথে বিভিন্ন সংঘর্ষ থেকে দেশকে সুরক্ষার জন্য তুরস্ক সর্বাধুনিক এই ব্যবস্থা নিচ্ছে।

২০১৬ সালে তুরস্কের ব্যর্থ অভ্যুত্থানের জন্য তুর্কিরা ব্যাপকভাবে আমেরিকার পেনসিলভানিয়ায় রাজনৈতিক আশ্রয়প্রাপ্ত ও নির্বাসনে থাকা ফতেউল্লেহ গুলেনকে দায়ী করে থাকে। তিনি তুরস্কের ভবিষ্যৎ ও ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ধারণার চেয়ে ভিন্ন ধারণা পোষণ করেন বলে অভিযোগ। তিনি কোনো সুফি তরিকার সমর্থক নন। তবে তিনি ইসলামের আধ্যাত্মিকতা অবিশ্বাস করেন না। গুলেনের এই দর্শনে বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে কুর্দি কুরআনবিশারদ সৈয়দ নুরসির সুফিতত্ত্ব। নুরসি মুসলমানদের আধুনিক শিক্ষা ও বিজ্ঞান শেখার অনন্য ইসলামি প্রবক্তা।

গুলেন ‘মধ্যপন্থী’ ইসলামের প্রবক্তা। জানা যায়, তার সংগঠনের কমপক্ষে ৩০ লাখ সমর্থক রয়েছে। সেনা, পুলিশ ও সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যেও তার অনুগত অনেকে রয়েছেন। তাদের ‘গুলেনিস্ট’ বলা হয়। তুরস্ক সরকার এ সংগঠনকে ফতেউল্লেহ গুলেনিস্ট টেরর অর্গানাইজেশন বা ফেটো বলে ডাকে। তুরস্কের আদালতে তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা আছে। তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে ‘ফেটো’ সক্রিয়। তুরস্কের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় গুলেন এক নম্বরে। সদ্যসমাপ্ত নির্বাচনে গুলেনপন্থীদের সাড়া পাওয়া যায়নি।

বৈধ সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য গুলেনকে তুরস্ক দায়ী করেছে। দেশের মাটিতে বিচারের জন্য গুলেনকে ফেরত চেয়েছে। আমেরিকা তুরস্কের কাছে তার ব্যাপারে প্রমাণ চাইলে, ছয় ট্রাংক কাগজপত্র আমেরিকায় পাঠানো হয়। কিন্তু অদ্যাবধি গুলেনকে ফেরত দেয়া হয়নি। এরদোগান বলেছেন, ‘গুলেনকে দিন, বরুনসনকে নিন।’ কিন্তু গুলেনকে আমেরিকা ফেরত দিতে নারাজ। তার মাধ্যমে তুরস্কে ‘আরো কিছু’ করা যায় কি না, সে বিষয় নিয়ে সিআইএ ব্যস্ত।

যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের মধ্যকার আরো অনেক বিরোধ দুই দেশকে পরস্পর থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে। তুরস্ক ও আমেরিকার মধ্যে পরস্পর নাগরিকদের বিরুদ্ধে আইনগত মামলা ও পাসপোর্ট সমস্যা এখনো সঠিকভাবে সুরাহা করা হয়নি। সম্প্রতি ট্রাম্প ইরানকে ঠেকানোর জন্য ‘আরব ন্যাটো’ সামরিক জোট করতে বলছেন। অর্থাৎ এক মুসলমান দেশ দিয়ে আরেক মুসলিম দেশকে শেষ করা। তখন যুদ্ধের খরচ আরব দেশ থেকে উঠে আসবে। এরপর রয়েছে ইসরাইল ফ্যাক্টর। জেরুসালেমে ইসরাইলি রাজধানী স্থানান্তরের পর এরদোগান ঘোষণা দেন ‘ইসলামি সেনাবাহিনী’ গঠনের। তিনি দুইবার বিশেষ সম্মেলন ডেকে বিষয়টি মুসলিম বিশ্বকে বোঝাতে চেয়েছেন। ২০১৭ সালে ইনসারলিক বন্দর ব্যবহার ন্যাটোর জন্য বন্ধ করে দেয় তুরস্ক।

তুরস্ক কী ন্যাটো ছাড়বে না ন্যাটো তুরস্ককে ছাড়বে- এমন অবস্থা বিরাজমান এখন। তুরস্ক কুর্দি পিকেকে দলকে ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়েছে। আমেরিকা পিকেকে-কে নগদ অর্থ ও সামরিক সরঞ্জাম দিয়ে আসছে বহুদিন ধরে। এখন ইরাকে কুর্দিদের জন্য আমেরিকা সবচেয়ে বড় ঘাঁটি তৈরি করছে। তুরস্ক প্রতিবাদ করে কূল পাচ্ছে না। বরুনসন তুরস্কে গিয়ে এখানেই হাত দিয়েছেন। আসলে পশ্চিমা বিশ্ব মধ্যপ্রাচ্যের ম্যাপ নতুন করে আঁকতে চায়, যেখানে কুর্দিদের জন্যও পৃথক রাষ্ট্র থাকবে। সে দিকেই এগোচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। অপর দিকে, তুরস্ক কুর্দিদের পিকেক এবং পিওয়াইডিকে সন্ত্রাসী বলেছে ও তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। তুরস্কের এ যুদ্ধ সহজে থামছে না। যেভাবেই হোক, যুক্তরাষ্ট্র চেষ্টা করবে কুর্দি স্টেট বানিয়ে সেখানে একটি পুতুল সরকার বানাতে। তাহলে হয়তো মধ্যপ্রাচ্য থেকে সোনা ও তেল আমদানি বা পাচার করতে কারো দ্বারস্থ হতে হবে না। সিরিয়ার মানবিজে তুর্কি ও আমেরিকান স্বর্ণ মুখোমুখি অবস্থানে। দুই প্রেসিডেন্টের আলাপ-আলোচনার ফলে কুর্দিদের শহর থেকে বের করে দিয়ে পরিস্থিতির সামাল দেয়া হয়। মার্কিন সমরবিদেরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এমন অবস্থার সম্মুখীন হননি এবং বিষয়টি আমেরিকানেরা ভালো চোখে দেখছেন না। এরদোগানের সাফ কথা- ‘কুর্দিরা থাকবে না, নতুবা সম্মুখ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হোন।’ তুর্কি সাংবাদিক হুসেইন হারিদি এটাকে বলেছেন, ‘ওসমানি থাপ্পড়’।

এরপর আছে সাইপ্রাস সমস্যা। সাইপ্রাসে ৩৬ হাজার তুর্কি সেনা মোতায়েন রয়েছে। আমেরিকা গ্রিক সাইপ্রাস বিষয়ে গ্রিসকে সহায়তা দিয়েছে এবং প্রয়োজনে যেকোনো সময় সাইপ্রাসে নতুন সামরিক ফ্রন্ট খোলার জন্য নৌবাহিনীর বহরকে অবস্থানে রেখেছে।
এর মধ্যে আবার যুক্ত হয়েছে ‘ওজকান ইস্যু’। ইসরাইলি এক কর্মকর্তা জানান, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনুরোধে তারা এবরু ওজকান নামে এক ফিলিস্তিনি মহিলাকে ছেড়ে দিয়েছেন। ওয়াশিংটন পোস্ট জানায়, এটি আঙ্কারার সাথে একটি গোপন চুক্তি। সে অনুসারে এখন বরুনসনের পালা। কিন্তু আঙ্কারা গোপন চুক্তির বিষয় অস্বীকার করেছে। তুর্কিরা বলছে, এটি পশ্চিমা গণমাধ্যমের ভাঁওতাবাজি।

আমেরিকা ও ইসরাইল মধ্যপ্রাচ্যে সবসময় কোনো না কোনোভাবে বিশৃঙ্খলা লাগিয়ে রাখতে চায়। দুই হাজার সালেই আমেরিকা-ইসরাইল গোপন গোয়েন্দা আঁতাতে মধ্যপ্রাচ্যে যেকোনো বিষয় নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা একটি রুটিনওয়ার্ক বলে মনে করা হয়েছে। সেন্টার ফর মিডেল ইস্টের গবেষক আয়তুন ওরহান বিষয়টি প্রকাশ করেছেন। মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে যারা পড়ালেখা বা রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে চান তাদের জন্য এটি একটি মৌলিক তথ্য।

তুরস্কের বিরুদ্ধে যদি কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় তাহলে কূটনীতিকেরা মনে করেন- ট্রাম্প ন্যাটোর অবকাঠামোয় হাত দেবেন। যদি সে সময় ঘনিয়ে আসে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য সাঙ্ঘাতিকভাবে পরিবর্তিত হবে। সেটি আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থকে আঘাত করবে। এরদোগান বলেছেন- ‘যদি এমন হয়, তবে আমেরিকা একজন বিশ্বস্ত অংশীদারকে হারাবে।’

এত কিছুর পরও ট্রাম্প অবরোধ দিয়েছেন। হোয়াইট হাউজের মুখপাত্র সারা স্যান্ডার্স জানান, তুর্কি জাস্টিস মিনিস্টার আবদুল হামিত গুল এবং ইন্টিরিয়র মিনিস্টার সুলেমান সুইলু উভয়েই বরুনসনের গ্রেফতার ও ডিটেনশনে বড় ভূমিকা রেখেছেন। সে জন্য তাদের বিরুদ্ধে অবরোধ দেয়া হয়েছে। উভয়ের সহায়-সম্পত্তি অবরোধের আওতায় পড়বে। সংবাদমাধ্যমে গুল ও সুইলু বলেন, তুরস্কের বাইরের কোনো দেশে তাদের কোনো সহায়সম্পদ নেই। তাই সম্পত্তি ‘ব্লক’ করায় তাদের কারো কোনো ক্ষতি হচ্ছে না। ট্রাম্পের এ পদক্ষেপের পর ৪ আগস্ট, এরদোগান টেলিভিশন ভাষণে তুরস্কে আমেরিকার জাস্টিস ও ইন্টিরিয়র মিনিস্টারদের সম্পদের ওপরও অবরোধ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প যে গেম খেলছেন তিনি তার জবাব পেয়েছেন।

মুসলিম বিশ্বে বিবিধ ভূমিকার কারণে এরদোগান যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের শত্রু হয়ে উঠছেন। উভয় পক্ষ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের বিষয়গুলো একে একে সুরাহা না করলে তুরস্ক ও মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির মারাত্মক পরিণতি ঘটবে।
লেখক : অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব, বাংলাদেশ সরকার ও গ্রন্থকার


আরো সংবাদ