১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮

উই ওয়ান্ট জাস্টিস

উই ওয়ান্ট জাস্টিস - ছবি : সংগ্রহ

চকচক করলেই সোনা হয় না
বাংলা ভাষার একটি জনপ্রিয় তির্যক বাক্য ওপরে উদ্ধৃত করেছি এই অনুচ্ছেদের শিরোনাম হিসেবে। এই কলামের শিরোনাম দিয়েছি, এবারে বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের মৌলিক দাবির নাম দিয়ে। ঘটনাক্রমে, এই আন্দোলন হয়েছে আগস্ট মাসে। ছাত্রদের বেদনার সাথে আমরাও বেদনাহত। ততোধিক, আগস্ট মাস শোকের মাস। অতএব কলাম শুরু করছি ১৯৭৫-এর আগস্টে নিহত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট; আমি ছিলাম রণাঙ্গনের একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধা।

চকচক করলেই সোনা হয় না কেন বললাম, সেটা ব্যাখ্যা করার আগে কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি সমাজ-সংসারের প্রাত্যহিক জীবন থেকে। এক. বাসায় মেহমান এসেছে। মেহমানের বিছানায় বালিশের কাভারটি খুব সুন্দর; মাত্রই ধুয়ে ইস্ত্রি করে এনে লাগানো হয়েছে। বিছানাটাও পরিপাটি; চাদরও খুব সুন্দর। কিন্তু এর মানে এই নয় যে, পুরো বালিশ বা বিছানার তোষকের ভেতরে-বাইরে সব কিছু সুন্দর হবেই। রাতে শোয়ার সময় বালিশের ওপর মাথা রাখার পর বোঝা গেল, ভেতরে যে তুলা সেগুলো নিম্নমানের এবং টুকরো টুকরো শক্ত হয়ে গেছে; সন্দেহ হয়, তুলার সাথে দলা দলা ন্যাকড়া মেশানো আছে। মাথায় দিয়ে আরাম নেই। বিছানার ওপর চাদরটি ছিল কুমিল্লার খাদি ঘরের; এখনো ব্যবহার করা হয়নি, মেহমানের জন্য মাত্রই আলমারি থেকে এনে দেয়া হলো। চাদরটি তোলার পর দেখা গেল, তোষকটি অনেক দিনের পুরনো এবং ময়লা, ছারপোকায় ভরা।

দুই. একজন ভদ্রলোক সব সময় সুন্দর প্যান্ট-শার্ট পরে অফিস করেন; পায়ে খুব সুন্দর দামি স্যান্ডেল থাকে। একদিন অফিসে ভদ্রলোক হঠাৎ অসুস্থবোধ করলেন, বললেন, মাথা ঘোরাচ্ছে। সহকর্মীরা দৌড়ে এলেন এবং শুইয়ে দিলেন। সবাই মিলে পরিচর্যা করলেন। পরিচর্যার সুবিধার্থে গায়ের জামাটা খুলে ফেললেন। খোলার পর সহকর্মীরা একটু বিব্রত হলেন; দেখলেন গেঞ্জিটা খুবই ময়লা, মনে হলো চার-পাঁচ দিন খোলা হয় না, ধোয়া হয় না। একজন সহকর্মী ফোড়ন কাটলেন; বললেন, ভাগ্যিস মাথা ঘুরিয়ে ছিল, না হলে টেরই পাওয়া যেত না ভেতরে-বাইরে কত তফাৎ। তিন. ভদ্রলোক সব সময় দান-খয়রাত করেন। কোনো মিটিংয়ে গেলে বা কোনো কাজে ঘরের বাইরে থাকলে, আলাপ-আলোচনার সময় সব সময় দান-খয়রাতের পক্ষে বলেন এবং আশপাশের বয়-বেয়ারা, পিয়ন-আরদালি সবাইকে উদার মনে বখশিশ দেন।

সবাই তাকে সমীহ করে চলে। হঠাৎ একদিন পত্রিকায় এলো, তার বাড়িতে দুর্ঘটনা ঘটেছে। ভদ্রলোকের বাড়ির দরজার সামনে একজন ভিক্ষুক গিয়েছিল, একবারের জায়গায় দুইবার ভিক্ষা চাইতেই, দারোয়ান ভিক্ষুককে মেরে গেট থেকে দূরে ফেলে দিয়েছে। ইট-পাথরের ওপর পড়ে ভিক্ষুকের মাথা ফেটে যায়, রাস্তার লোকেরা ধরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। ভদ্রলোকের বাড়ির সবাই প্রচার করল, মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিল। চার. আমাদের দেশে টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার বা প্রাডো ধরনের বড় গাড়িগুলো একনামেই পরিচিত। নতুন সুন্দর গাড়ি, ড্রাইভার খুব যতœ নিয়ে চালায়, ভদ্রলোক গাড়িতে ওঠার আগে একবার এবং নামার সময় আরেকবার ড্রাইভারকে তাগাদা দেন, গাড়ির গায়ে যেন কোনো আঁচড় না পড়ে। ড্রাইভার একদিন বলল, হাতে চোট পেয়েছি, স্টিয়ারিং ঘোরাতে কষ্ট হচ্ছে। দু’দিন বিশ্রাম দরকার। ভদ্রলোক বকা দিলেন, গালি দিলেন। বললেন, ওইসব ব্যথাট্যথা বুঝি না, ঠিকমতো গাড়ি চালাইবা। গাড়ি চলল, হালকা দুর্ঘটনা ঘটল এবং ভদ্রলোক রেগে গেলেন; ড্রাইভারকে একটা মোক্কা মারলেন।

বাইরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট
চারটি উদাহরণ ওপরে দিলাম, তার সাথে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের কিছু কিছু অঙ্গনের, কিছু বাস্তবতার মিলটা তুলে ধরার জন্য। বিভিন্ন জায়গায় ছোট ছোট কনস্ট্রাকশন বা নির্মাণকাজে রডের বদলে বাঁশ দেয়া হচ্ছে এটা সবাই দেখছেন। পরীক্ষায় খাতায় কলম দিয়ে কোনো কিছু আঁকাজোঁকা দেখলেই, পরীক্ষক তাকে অন্তত পাস নম্বর দিয়ে দিচ্ছিলেন দুই তিন বছর আগেও। কাস্টমস বা শুল্ক বিভাগ, চোরাচালানিদের কাছ থেকে জব্দ করল সোনা এবং সেগুলো নিয়মমত জমা হলো বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে। কিছু দিন পর দেখা গেলো, সোনা তামা হয়ে গেছে! বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে কয়লা ‘উড়ে গেছে’। আন্দোলনের সময় বাস্তবতা টের পাওয়া গেল; হাজার হাজার গাড়ি রাস্তায় চলছে অথচ বিআরটিএ থেকে ফিটনেস না করিয়ে। টের পাওয়া গেল, গাড়ির চালকদের সংখ্যা যত, প্রায় তিন ভাগের এক ভাগেরই ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই এবং বাস্তবতা হলো, ড্রাইভিং লাইসেন্স যাদের আছে তাদের মধ্যেও সবাই যে পাস করে লাইসেন্স পেয়েছেন এমন কোনো গ্যারান্টি নেই।

শহীদের নামের মর্যাদা রেখেছে তারা
যে দিন শহীদ রমিজ উদ্দিন কলেজের দু’জন শিক্ষার্থী বাস চাপায় নিহত হয়, সে দিন থেকে প্রতিবাদ জানিয়ে আসছি, সহমর্মিতা জানিয়ে আসছি। ৩১ জুলাই রাত সাড়ে ১১ থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত, এসএ টিভির লাইভ টকশোতে উপস্থিত ছিলাম। বক্তব্যের প্রথম ৭ মিনিটই ছিল কিশোর-কিশোরী শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি নির্যাতনের তথা রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতিবাদ। রোববার ৫ আগস্ট নিহত অন্যতম শিক্ষার্থী, হাতিয়ার সন্তান রাজীবের মায়ের সাথে দেখা করলাম, সম্মান ও সমবেদনা জানালাম। এটুকু বলার পর বলতে বাধ্য হচ্ছি যে, দুর্ঘটনায় নিহত শিক্ষার্থী তথা শহীদ রাজীব এবং শহীদ দিয়া খানম মিম নিজেদের জীবন দিয়ে বাংলাদেশের ছাত্রসমাজকে পথে নামতে বাধ্য করল, আন্দোলনে যেতে উৎসাহিত করল। রাজীব এবং মিম যে কলেজের শিক্ষার্থী সেটা একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামে; কলেজটি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের উত্তরাংশে অবস্থিত, এয়ারপোর্ট রোডের লাগোয়া। ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার নামের ইজ্জত রেখেছে; আন্দোলনের সূচনা তারাই করেছে।

আন্দোলনকারীরা লাগাতার আট দিন রাস্তায় থেকে, বাংলাদেশের ‘সচেতন’ বলে দাবিদার নাগরিকদের চোখ খুলে দিয়েছে; অসচেতন নাগরিকদের ঘুম থেকে জাগিয়ে সচেতন করেছে। এই আন্দোলনের কারণেই আমরা বুঝতে পেরেছি আমাদের সমাজ এবং প্রশাসন কত মেকি, কত ছদ্মবেশ পরা। সীমাহীন আসমানের দিকে স্যাটেলাইট যাচ্ছে; ইন্টারনেট সেবা ফোর-জি থেকে ফাইভ-জিতে যাচ্ছে; নি¤œ আয়ের দেশ থেকে প্রমোশন পাচ্ছি আমরা। কিন্তু আমাদের ভেতরে যে এত ফাঁক-ফোকর, এত শুভঙ্করের ফাঁকি সেটা কেউ জানত না। আন্দোলনের কারণেই আমরা টের পেলাম, আন্দোলনের ষষ্ঠ-সপ্তম-অষ্টম দিনে, পুলিশ দিয়ে প্রত্যক্ষভাবে না করিয়ে, পুলিশের ছত্রছায়ায় সরকারদলীয় রাজনৈতিক সংগঠনের লোকজনকে দিয়ে নিরীহ ছাত্রছাত্রীদের ওপর কিভাবে হামলা করানো হয়; আমরা টের পেলাম ক্ষমতার মোহে মানুষ কত নিষ্ঠুর হতে পারে।

আত্মোপলব্ধি
আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য অহরহ আহ্বান জানাচ্ছেন দেশের জ্ঞানীজন, গুণীজন। আইনের শাসন কায়েমের জন্য দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। নৈতিকতার পক্ষে বয়ান করছেন সব ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। কিন্তু বাংলাদেশের অভ্যন্তরে নৈতিকতার চর্চা, আইনের প্রতি সম্মান ইত্যাদি কী রকম এবং কতটুকু, সেটা বোঝানোর জন্য এই কলামের শুরুর দিকেই কয়েকটি উদাহরণ দিয়েছি। আজ পাঠক যখন এই কলাম পড়ছেন; গত সপ্তাহের ছয় দিন এবং এই সপ্তাহের দু’দিন ঢাকা চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন বড় শহরে কোমলমতি ছাত্রদের আন্দোলন সম্বন্ধে অবগত আছেন। পাঠকের জানার আংশিক উৎস হলো টেলিভিশনের নিউজ, আংশিক উৎস পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ এবং যারা অভ্যস্ত তাদের জন্য বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ উৎস হলো সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুক ও টুইটার। কত বড় বড় মানুষের গাড়ির কাগজপত্র ঠিক নেই, সেটা বাংলাদেশের মানুষ আবিষ্কার করল। কত বড় বড় মানুষের নিজের অথবা তার মালিকানাধীন গাড়ির ড্রাইভারের ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই বা মেয়াদোত্তীর্ণ, সেটাও মানুষ আবিষ্কার করল।

ব্যস্ত মহানগরের রাস্তায় উল্টো দিক থেকে গাড়ি চালানোর প্রবণতা বিশেষ করে ক্ষমতাসীন মানুষদের, সেটা মানুষ আবিষ্কার করছিল বহু দিন ধরে; কিন্তু নতুন করে আবিষ্কার করল এই আন্দোলনের সময়। পরিবহন অঙ্গনে এত ধরনের জঞ্জাল জমা হয়েছিল যে, সেটা ছাত্রদের আন্দোলন না হলে মানুষ সম্যকভাবে উপলব্ধিই করতে পারত না। এই পরিপ্রেক্ষিতেই মানুষ বলল, ওপরে ফিটফাট ভেতরে সদরঘাট; তথা ওপরে সব সুন্দর, ভেতরে সব ময়লা। ঘরের বাইরে অনেক বাতি জ্বলছে কিন্তু ঘরের ভেতরে সব বাল্ব ফিউজ। একই সাথে উপলব্ধি হয়েছে, পরিবহন সেক্টরের লাখ লাখ ড্রাইভার আর হেলপার, তারাও তো এই বাংলাদেশেরই নাগরিক, এই সমাজেরই মানুষ। বেদনাদায়ক ঘটনা হলো, দুর্ঘনায় নিহত ছাত্রী মিমের পিতাও গাড়ির ড্রাইভার; ৩০ বছর ধরে সুনামের সাথে, দক্ষতার সাথে গাড়ি চালাচ্ছেন। এই আন্দোলনের ফলেই নাগরিক সমাজের সচেতন অংশের মধ্যে এই উপলব্ধি এসেছে যে, পরিবহন সেক্টরের কর্মীদের বিপথে যাওয়া থেকে ফিরিয়ে আনতে হবে।

নাগরিক সমাজের করণীয়
নাগরিক সমাজ শিশু-কিশোরদের এই আন্দোলনকে নৈতিক সমর্থন দিয়েছে। কোনো জায়গায় পিতা কোনো জায়গায় মাতা, কোনো জায়গায় দাদা-দাদী বা নানা-নানী শিশু-কিশোরদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। আমার অন্তর ছিল শিশু-কিশোরদের পাশে; সশরীরে তাদের আন্দোলনের ধারেকাছে যাইনি, সশরীরে কারো সাথে কথা বলিনি যেন কেউ অপবাদ দিতে না পারে যে, রাজনৈতিক ব্যক্তি ইবরাহিম উসকানি দিচ্ছে। টিভিতে বলেছি, ফেসবুকে লিখেছি, পেপারে লিখছি। দেশব্যাপী নাগরিক সমাজ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এ রকম একটি আলোচনা সভা ছিল সোমবার ৬ আগস্ট বেলা ১১টা থেকে ১:৩০ মিনিট পর্যন্ত; জাতীয় প্রেস ক্লাবে। ‘উদ্বিগ্ন নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী এবং সঞ্চালনা করেছিলেন প্রফেসর আসিফ নজরুল। কোনো প্রধান অতিথি ছিলেন না।

মঞ্চে এবং মঞ্চের সামনে বসেছিলেন প্রফেসর এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ড. কামাল হোসেন, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, সাবেক আমলা ও সংসদ সসদ্য এস এম আকরাম, মাহমুদুর রহমান মান্না, মেজর জেনারেল (অব:) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীর প্রতীক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমদ, সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমদ, অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, অব: মেজর আবদুল মান্নান, সাবেক রাষ্ট্রদূত সিরাজুল ইসলাম, মোস্তফা আমিন, ফায়জুল হাকিম লালা, আবদুল মালেক রতন, একাত্তরের ঢাকার ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম এবং আরো অনেকেই। সেখানে আলোচনা হয় অনেক কিছুই, যেটা স্থানাভাবে আজ তুলে ধরছি না; আগামী সপ্তাহে তুলে ধরব। আজ শুধু যে প্রস্তাব আলোচনা সভার শেষে গৃহীত হয়েছিল, সেগুলো তুলে ধরছি।

৮ দফা প্রস্তাব
এক. সড়কপথে নৈরাজ্য বন্ধে ছাত্রদের শান্তিপূর্ণ আন্দোলনে পুলিশ ও ক্ষমতাসীনদের বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীদের হামলার তীব্র নিন্দা জানাই এবং এর বিচার দাবি করছি। দুই. সড়ক পরিবহনে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে এর মালিকানার সাথে এবং সড়ক শ্রমিক সংগঠনগুলোর সাথে জড়িত নৌমন্ত্রীসহ সব মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করছি। আমরা মনে করি, দরকষাকষি শক্তির (শ্রমিক সংগঠন) নেতা এবং বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ (মন্ত্রী) একই ব্যক্তি হলে এতে স্বার্থের সঙ্ঘাত হয়, এমনকি তা মন্ত্রীর শপথের লঙ্ঘনও বলে এই পদত্যাগ জরুরি হয়ে পড়েছে। তিন. বিদ্যমান আইনগুলোর সংস্কার করে সড়ক পরিবহনে আইন লঙ্ঘনের শাস্তি কঠোরতর করতে হবে। বিশেষ করে লাইসেন্স ছাড়া, ফিটনেস ছাড়া রাজপথে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যা করার জন্য ন্যূনতম সাত বছরের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ফিটনেসহীন গাড়ি, লাইসেন্সহীন বা অপ্রাপ্ত বয়স্ক ড্রাইভারদের চালাতে দিলে সড়ক শ্রমিকের পাশাপাশি যানবাহনের মালিকদেরও সড়কপথে মৃত্যুর দায় নিতে হবে এবং এ জন্য আইন মোতাবেক অপরাধে সহযোগীর শাস্তি পেতে হবে।

চার. সড়কপথে বেপরোয়া দুর্ঘটনাজনিত বা মৃত্যু বা আহত হওয়ার ঘটনায় মালিকপক্ষ থেকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণের বিধান আইনে থাকতে হবে। পাঁচ. অবিলম্বে স্কুল-কলেজগুলোর সামনে ফুট ওভারব্রিজ, জেব্রা ক্রসিং এবং স্পিড ব্রেকার নির্মাণ করতে হবে। ছয়. অবিলম্বে পর্যায়ক্রমে স্কুল বাস চালুর ব্যবস্থা করে সড়কপথে চাপ কমিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে হবে। সাত. উল্টোপথে গাড়ি চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে এবং এ জন্য তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। আট. সড়ক পরিবহনে নৈরাজ্য বন্ধ তদারকিতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের একটি কমিশন গঠন করে প্রতি এক মাস অন্তর এর অগ্রগতি জনগণকে জানাতে হবে।

কিঞ্চিৎ রাজনৈতিক স্মৃতি
নয়া দিগন্ত পত্রিকায় কলাম লিখছি আট-দশ বছর হয়ে গেল। প্রথম দিকে প্রতি মঙ্গলবার আমার কলামটি বের হতো। গত তিন-চার বছর ধরে এটা প্রতি বুধবার বের হচ্ছে। মাঝে মধ্যেই সিরিজ কলাম লিখি; অর্থাৎ কোনো একটি বিষয়ে বা কোনো একটি মূল থিমকে ভিত্তি করে একাধিক কলাম লিখি; উদাহরণস্বরূপ পার্বত্য চট্টগ্রাম বা জাতীয় নিরাপত্তা বা রাজনীতিতে পরিবর্তন ইত্যাদি বিষয়ে। এরূপ একটি সিরিজ লিখেছিলাম ৪ নভেম্বর ২০১৫ থেকে শুরু করে ২ ডিসেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত পাঁচ কিস্তিতে। প্রথম কিস্তির শিরোনাম ছিল ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেই হবে’; দ্বিতীয় কিস্তির শিরোনাম ছিল ‘চল্লিশ বছর আগে-পরে নভেম্বর : কিছু মূল্যায়ন’; তৃতীয় কিস্তির শিরোনাম ছিল ‘পরিবর্তন নিয়ে চিন্তা’; চতুর্থ কিস্তি ‘পরিবর্তন নিয়ে আরো কিছু চিন্তা’ এবং পঞ্চম কিস্তির শিরোনাম ‘পরিবর্তন নিয়ে চিন্তা আপাতত উপসংহার’। অর্থাৎ, একজন কলাম লেখক হিসেবে, চিন্তাশীল রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমার বক্তব্য উপস্থাপন করেই যাচ্ছি। কলামের মাধ্যমে সরেজমিন পরিবর্তন আনা প্রায় অসম্ভব।

কলামের মাধ্যমে মানুষের চিন্তার জগতে পরিবর্তন আনা যায়। পরিবর্তিত মানসিকতায় মানুষ সৎ কাজ করতে বা সাহসী কাজ করতে উৎসাহী হতে পারে। কিন্তু পরিবর্তনের জন্য সবচেয়ে বড় ও বাস্তবসম্মত মাধ্যম হচ্ছে জনগণের মতামত; তথা সেই মতামতের প্রকাশ। শুধু প্রকাশ করলে হবে না, মতামতকে গ্রাহ্য না করলে কী হতে পারে, সেটারও একটি ধারণা মতামত প্রকাশের সাথে সাথেই উপস্থাপন করতে হয়, তাহলেই পরিবর্তন সম্ভব। ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রধান লেফটেনেন্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে বা সামরিক শক্তির ভীতি প্রদর্শন করে, তৎকালীন নির্বাচিত বিএনপি সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিলেন। তিনি শুরুতে অনেক ওয়াদা দিয়েছিলেন সংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের। সাড়ে তিন থেকে চার বছরের মাথায় দেখা গেল, কিছু ওয়াদা পালিত হয়েছে, কিছু ওয়াদা পালন করা হয়নি; হয়তো বা এটাই স্বাভাবিক। যত ভালো কাজই তিনি করে থাকুন না কেন, ‘জোরপূর্বক ক্ষমতা দখলকারী’ হিসেবে তার বদনাম কোনো অবস্থাতেই মুছে যায়নি; বরং বলা হতো, তিনি একজন ‘স্বৈরাচারী’। এরশাদ সরকারকে হটানোর জন্য, বলতে গেলে ১৯৮৪ সাল থেকেই আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন ক্রমান্বয়ে বেগ পায়।

আন্দোলনকে দমন বা নমনীয় করার জন্য ১৯৮৬ এবং ১৯৮৮ সালে পার্লামেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করা হয়েছিল; কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। ১৯৯০ সালের দ্বিতীয় অর্ধে আন্দোলন জমে ওঠে; ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মারাত্মক রূপ নেয় এবং ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ প্রেসিডেন্ট এরশাদ পদত্যাগ করেন। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ আন্দোলনকারীদের দাবির সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন এই মর্মে যে, তার প্রস্থানের মাধ্যমে যদি বাংলাদেশের ও বাংলাদেশের জনগণের উপকার হয়, তাহলে সেটাই স্বাগত। বাংলাদেশের ও এ দেশের জনগণের যে উপকারের অঙ্গীকার এরশাদবিরোধী শক্তি জনগণের সামনে উপস্থাপন করেছিলেন, তার কতটুকু পূরণ হয়েছে বা হয়নি, সেটা বাংলাদেশের সচেতন নাগরিকেরা বিচার করতে পারেন; তবে বর্তমান সময়ে ওই বিচারকারী নাগরিকের বয়স কমপক্ষে ৪০ বছর হওয়া বাঞ্ছনীয়, কারণ ১৯৯০ সালে কারো বয়স যদি ১৩-১৪ বছরের কম থেকে থাকে, তাহলে সে ওই সময় ছিল আসলেই একজন বালক এবং একজন বালকের পক্ষে ওই সময়ের পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা ও বিগত ২৮ বছর মনে রাখা একটু কঠিন বৈকি। আজকের কলামের বর্ধিতাংশ, তথা আজকের চিন্তার বর্ধিতাংশ ইনশাআল্লাহ আগামী সপ্তাহে উপস্থাপন করব।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com


আরো সংবাদ