১৬ অক্টোবর ২০১৯

বিশ্বাসভাজন ও বিশ্বাসঘাতক

বিশ্বাসভাজন ও বিশ্বাসঘাতক - ছবি : নয়া দিগন্ত

আমরা ইতিহাসের মহানায়কদের জানি না
ঢাকা মহানগরের মহাখালী এলাকায় একটি কলেজ আছে, যার নাম তিতুমীর কলেজ। যেহেতু মহাখালী এলাকায় থাকি এবং এলাকার চতুর্দিকে বিভিন্ন কারণে যাতায়াত করতে হয়, সেহেতু এই কলেজের সামনে দিয়ে শতবার গেছি এবং নিশ্চয়ই আরো যাবো। সরকারি কলেজ, বড় কলেজ এবং হাজার হাজার ছাত্র। অনেক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করেছি কথাচ্ছলে, যার নামে এই কলেজ সেই তিতুমীরের পরিচয়; বেশির ভাগ ছাত্রই সঠিক উত্তর দিতে পারেনি। ঢাকা মহানগরের পুরনো আর নতুন অংশের সীমানায় অনেক পরিচিত প্রতিষ্ঠান আছে; একটির নাম শেখ বোরহানউদ্দীন কলেজ। চার-পাঁচ বছর আগে রাজনৈতিক কারণে ওই কলেজের কাছাকাছি একটি কমিউনিটি সেন্টারে ইফতার মাহফিলে গিয়েছিলাম।

শেখ বোরহানউদ্দীন কলেজের ছাত্র তথা অনেক তরুণ উপস্থিত ছিল। তাদের জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যার নামে কলেজ সেই শেখ বোরহানউদ্দীন কে ছিলেন? বেশির ভাগ ছাত্র সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সাথে দেখাসাক্ষাৎ হয়; হওয়াটাই স্বাভাবিক। কেউ হাজী মুহসিন হলের ছাত্র, কেউ সলীমুল্লাহ হলের ছাত্র, কেউ সূর্যসেন হলের ছাত্র, কেউ জহুরুল হক হলের ছাত্র। আমিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম এবং সূর্যসেন হলে থাকতাম; তখন নাম ছিল জিন্নাহ হল। ছাত্রদের জিজ্ঞেস করি, হলের নামকরণের মাহাত্ম্য কী এবং তার পরিচয় সম্পর্কে দু-একটি বাক্য বলো। বেশির ভাগ ছাত্রই সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারে না। রাজনীতিমনস্ক ছাত্ররা বিভিন্ন দলের অঙ্গসংগঠনের সাথে জড়িত, যেমনÑ ছাত্রদল, ছাত্রলীগ ইত্যাদি। ছাত্রলীগের ছাত্ররা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে আবেগাপ্লুত এবং মুহুর্মুহু স্লোগান দিতে অভ্যস্ত; যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়, সেটি হলো মুজিব। ছাত্রদলের ছাত্ররা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তমকে নিয়ে আবেগাপ্লুত এবং মুহুর্মুহু স্লোগান দিতে অভ্যস্ত; যে শব্দটি সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় সেটি হলো, জিয়া। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসে এমন তরুণ এবং শহীদ জিয়াকে ভালোবাসে এমন তরুণ অনেক আছে, যারা তাদের জীবনী পড়েনি এবং আট-দশটি বাক্যের বেশি জানেও না তাদের সম্পর্কে। এটা খুবই দুঃখজনক। একটা জাতির গৌরবের যেসব বিষয় থাকে, একটা জাতির গর্বের যেসব বিষয় থাকে, তার মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো নেতৃত্ব বা ঐতিহাসিক নেতৃত্ব বা ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা ও প্রধান স্থপতি।

তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান একজন সাহসী বাঙালি সেনাকর্মকর্তা, যিনি জীবন তুচ্ছ করে দেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন এবং অতঃপর একজন সেনানায়ক হিসেবে যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু এ দেশের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং জিয়াউর রহমানও প্রেসিডেন্ট ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন (ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি) সৈয়দ নজরুল ইসলাম এবং প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ; অন্য যেকোনো সময় তথা শান্তির সময়ে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধকালীন নেতাদের দায়িত্বের আকাশ-পাতাল পার্থক্য আছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশ ফোর্সেস-এর কমান্ডার ইন চিফ বা প্রধান সেনাপতি ছিলেন কর্নেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী; তার ওই সেনাপতিত্ব এবং শান্তিকালীন সেনাপতিত্বে আকাশ-পাতাল তফাত। কিন্তু আজকের প্রজন্ম আমাদের সে মহানায়কদের সম্বন্ধে কতটুকু জানে?

এমনকি সামরিক বাহিনীর কয়জন অফিসারই বা জেনারেল ওসমানী অথবা সেক্টর কমান্ডারদের সম্বন্ধে জানেন? রাজনীতির মহীরুহ এবং বঙ্গবন্ধুর গুরুজন মওলানা ভাসানী বা শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হকের কথা তো অবশ্যই প্রণিধানযোগ্য। মহানায়কদের কথা যদি কেউ না জানেন, তার জন্য গুনাহ হবে না। তাহলে অবশ্যই প্রশ্ন ওঠে, জানলে কী লাভ? জানলে উৎসাহ, উদ্দীপনা, মনোবল, আত্মবিশ্বাস এবং দলবদ্ধভাবে বা একতাবদ্ধ থাকার প্রেরণা বাড়ে। যেসব কারণে মহানায়কেরা মহানায়ক হয়েছেন যথা- সত্যের পথে সংগ্রাম বা অন্যায় এবং অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ, এসব কথা জানলে ভালো কিছু করার, উন্নততর কিছু করার প্রেরণা পাওয়া যায়। তাই আবেদন জানাই, আমরা যেন নিজেদের জাতীয় ইতিহাসের মহানায়কদের সম্বন্ধে জানতে চেষ্টা করি এবং অন্যকে জানতেও সাহায্য করি।

শহীদ জিয়া ও চট্টগ্রাম বিএনপির জন্য একটি প্রস্তাব
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সম্পর্কে দু’টি কথা অতিরিক্ত বলছি। জিয়া পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশন পেয়েছিলেন ১৯৫৫ সালে। চাকরির একটা পর্যায়ে তিনি প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অন্যতম কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে পশ্চিম পাকিস্তানের লাহোর মহানগরীর নিকটবর্তী সীমান্তে গৌরবোজ্জ্বলভাবে লড়াই করেছিলেন ১৯৬৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসের যুদ্ধে। চাকরির একটা পর্যায়ে তিনি পাকিস্তান মিলিটারি অ্যাকাডেমি কাকুলে অন্যতম প্রশিক্ষক ছিলেন; আরেকটি পর্যায়ে তিনি তৎকালীন ঢাকা জেলার জয়দেবপুর থানার জয়দেবপুরে (বর্তমান গাজীপুর) অবস্থানকারী দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক নিযুক্ত হয়েছিলেন। ১৯৭০ সালের সেপ্টেম্বরের শেষাংশে তার বদলির আদেশ আসে এবং অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে সেই আদেশ কার্যকর হয়। সেই বদলির আদেশ মোতাবেক, দ্বিতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক মেজর জিয়াউর রহমানকে বদলি করে, চট্টগ্রাম মহানগরে (গঠনের পর্যায়ে ছিল) অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের উপ-অধিনায়ক নিযুক্ত করা হয়। এই র‌্যাংকে (অর্থাৎ মেজর) ও এই দায়িত্বে (উপ-অধিনায়ক) থাকাকালে চট্টগ্রাম মহানগর থেকেই তিনি তার ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছিলেন।

এই ভূমিকার তিনটি আঙ্গিক আছে; প্রথম আঙ্গিক হচ্ছে- ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ দিন শেষে রাত ১২টার পর তথা ২৬ মার্চ শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই চট্টগ্রাম মহানগরের ষোলোশহরে অস্থায়ী অবস্থানে, অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার ও সৈনিকদের একত্রিত করে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, ‘উই রিভোল্ট। আমি এবং আমরা পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলাম, দেশ স্বাধীন করার জন্য মুক্তিযুদ্ধ শুরু করলাম।’ ভূমিকার দ্বিতীয় আঙ্গিক হচ্ছেÑ ২৭ মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রাম মহানগরের নিকটবর্তী কালুরঘাট বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে প্রথমে নিজের নামে এবং কয়েক ঘণ্টা পরই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে- এরূপ ঘোষণা দেন; তিনি দেশবাসীকে আহ্বান জানান যুদ্ধে শরিক হওয়ার জন্য। বিশ্বকে আহ্বান জানান মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করার জন্য। ভূমিকার তৃতীয় আঙ্গিক হচ্ছেÑ অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করেন এবং ক্রমান্বয়ে অন্যদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে সুসংহত করেন। এই চট্টগ্রামেই ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজের দোতলায়, বিদ্রোহী সেনা অফিসারদের গুলিতে তিনি নিহত হন তথা শাহাদত বরণ করেন।

এই মহানগরের ষোলোশহরে ২৬ মার্চ ১৯৭১ অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দেশাত্মবোধক কর্মের স্মৃতিতে এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মরণে, ‘বিপ্লব উদ্যান’ নামে একটি পার্ক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বীর উত্তম জিয়াউর রহমান যেখানে নিহত হয়েছিলেন, সেই অঙ্গনেই স্থাপন করা হয়েছে তার নামে জাদুঘর। জাতীয়তাবাদী ঘরানার তরুণ রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যে, তারা জিয়াউর রহমানের জীবনী জানেন, জিয়াউর রহমানের কর্ম জানেন এবং অতঃপর তাকে ভালোবাসেন। আনুমানিক আট সপ্তাহ আগে, ৩০ মে ২০১৮ বিকেলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডাক্তার শাহাদাত হোসেনের কাছে একটি প্রস্তাব তুলে ধরেছি। প্রস্তাবটি হলো- চট্টগ্রাম বিএনপি স্বাগতিক হবে, প্রশিক্ষণ প্রদানকারী হবে এবং বাকি পুরো বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলা থেকে বিএনপি বা স্বেচ্ছাসেবক দল বা ছাত্রদল ইত্যাদির ছোট ছোট প্রতিনিধিদল মেহমান হবে, প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী হবে; সারা বছর ধরে পর্যায়ক্রমে। চট্টগ্রাম বিএনপির উদ্যোগ ও আয়োজনে মেহমানরা চট্টগ্রাম সফর করবেন, জিয়াউর রহমান সম্বন্ধে জানবেন, জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত স্থানগুলো সফর করবেন। প্রস্তাবটি আজকে এই কলামের মাধ্যমে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরলাম।

বঙ্গবন্ধু ও তার ভাষণগুলো
ওপরের অনুচ্ছেদে জিয়াউর রহমান সম্বন্ধে লিখেছি, মূলত জাতীয়তাবাদী ঘরানার রাজনীতির কর্মীদের জন্য, কিন্তু সম্পূরকভাবে দেশবাসীর জন্য। একই রকম আগ্রহ ও আবেদন পুরো দেশবাসীর প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ প্রমুখের বেলায়ও প্রযোজ্য। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের ৭ মার্চের ভাষণ জগদ্বিখ্যাত; ১০ জানুয়ারি ১৯৭২-এর ভাষণ দেশবিখ্যাত। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি মাসে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে অস্থায়ীভাবে স্থাপিত তৎকালীন বাংলাদেশ মিলিটারি অ্যাকাডেমির প্রথম শর্ট কোর্সের পাসিং আউট প্যারেড (কমিশনপ্রাপ্তি প্যারেড) বা প্রেসিডেন্টস প্যারেডে নবীন অফিসার ও উপস্থিত সুধীমণ্ডলীর উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটাও একটি ঐতিহাসিক ভাষণ; কিন্তু এটি বহুলপ্রচারিত নয়। সামরিক নেতাদের জন্য তো বটেই, রাজনৈতিক নেতাদের জন্যও (জানুয়ারি ১৯৭৪) ভাষণটি অত্যন্ত দিকনির্দেশনামূলক। ভিডিওটি সাদা-কালোতে, ইউটিউবে গিয়ে সার্চ করে ভাষণটি যেকোনো আগ্রহী ব্যক্তি শুনতে পারেন অথবা আমার নিজের ফেসবুক পেইজে গেলেও তা দেখতে ও শুনতে পাবেন; শনিবার ২৮ জুলাই ২০১৮ রাত ৮টা ৪৭ মিনিটে আমার পেইজে শেয়ার করেছি। পেইজের নাম ‘মেজর জেনারেল অব: সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, বীর প্রতীক’। বাংলাদেশে বিভিন্ন সেনানিবাসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আছে। সেখানে মুক্তিযুদ্ধের বিবরণ আছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন রণাঙ্গনের নেতাদের সম্বন্ধেও জানা প্রয়োজন।

ইতিহাসের কয়েকজন নেতা
বাংলাদেশ হওয়ার আগে আমরা ছিলাম তদানীন্তন পাকিস্তানের অংশ। তার আগে আমরা ছিলাম ব্রিটিশ ভারতের অংশ। ব্রিটিশদের হাত থেকে দেশ স্বাধীন করার জন্য যারা সংগ্রাম করেছেন, তাদের মধ্যে যাদের নাম আমরা সবচেয়ে বেশি জানি, তারা হলেন দু-তিনটি রাজনৈতিক দলের নেতা, যেমনÑ সর্বভারতীয় কংগ্রেস বা সর্বভারতীয় মুসলিম লীগ। কিন্তু ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে আমাদের স্বাধীনতা হারিয়ে যাওয়ার পর ১৯৪০ সাল পর্যন্ত সুদীর্ঘ সময়ে ব্রিটিশ ভারতের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন অঞ্চলে অনেকেই সশস্ত্র সংগ্রাম করেছেন ব্রিটিশদের হাত থেকে উপমহাদেশ স্বাধীন করার জন্য। কিন্তু আমরা তথা বর্তমান প্রজন্ম তাদের নাম জানি না। এই কলামের মাধ্যমে আবেদন করব, আমরা যেন তাদের সম্পর্কে জানি। একজনের পুরো নাম সৈয়দ মীর নেসার আলী, কিন্তু সুপরিচিত নাম তিতুমীর (জন্ম ২৭ জানুয়ারি ১৭৮২, মৃত্যু ১৯ নভেম্বর ১৮৩১)। তার জন্ম হয়েছিল ভারতের বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে চব্বিশপরগনা জেলার বাদুড়িয়া থানার হায়দারপুর গ্রামে। তিতুমীর স্থানীয় জমিদার ও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ এবং এরই অংশ হিসেবে তিনি বাঁশের কেল্লা গড়ে তুলেছিলেন। ১৪ নভেম্বর ১৮৩১ ব্রিটিশ বাহিনী সেই কেল্লা আক্রমণ করেছিল এবং সংক্ষিপ্ত যুদ্ধের পর তারা সেটা দখল করে। সেই ঐতিহাসিক যুদ্ধে তিতুমীর এবং তার ৪০ জন সহচর প্রাণ দিয়েছিলেন তথা শহীদ হয়েছিলেন।

আরেকজনের নাম হাজী শরীয়তুল্লাহ (জন্ম ১৭৮১, মৃত্যু ১৮৪০); বাংলাদেশের বর্তমান মাদারীপুর জেলার চরশামাইল-বাহাদুরপুর গ্রামের তালুকদার পরিবারে। তার নাম অনুসারেই বর্তমান বাংলাদেশের শরীয়তপুর জেলা। তিনি শুধু একজন ধর্মীয় সংস্কারক ছিলেন না, বরং কৃষক, তাঁতি ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষকে শোষণ থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে সংস্কার আন্দোলন পরিচালনা করেছিলেন। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত চট্টগ্রাম জেলার রাউজান উপজেলা বা থানার অন্যতম প্রসিদ্ধ একটি স্থানের নাম নোয়াপাড়া। এখানে বিখ্যাত প্রাইমারি ও হাইস্কুল আছে। এখানেই শিক্ষকতা করতেন সূর্যসেন। তিনি ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন ১৯৩০ সালে। যেহেতু তিনি একজন শিক্ষক ছিলেন, স্থানীয়ভাবে তিনি ‘মাস্টারদা’ সূর্যসেন নামে পরিচিত। বিদ্রোহের আগে তিনি নিজের সমমনাদের নিয়ে দল গড়ে তোলেন, তাদের প্রশিক্ষণ দেন, মোটিভেশন করেন এবং স্বাধীনতার দীক্ষায় দীক্ষিত করেন। তিনি ও তার দল ১৯৩১ সালে চট্টগ্রাম শহরে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন, ব্রিটিশদের অস্ত্রাগার দখল এবং স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। বিদ্রোহের পরবর্তী কয়েক দিন শক্তিশালী ব্রিটিশদের সাথে ক্ষুদ্র বিদ্রোহী দলের যুদ্ধ হয়েছিল; তবে বিদ্রোহীরা পরাজিত হয়ে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। জনৈক আস্থাভাজন ব্যক্তির বিশ্বাসঘাতকতার কারণে মাস্টারদা ব্রিটিশদের হাতে ধরা পড়েন এবং তাকে পরে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। মাস্টারদা সূর্যসেনের মতো আরো বহু ঐতিহাসিক মহানায়ক ও নায়ক আস্থাভাজনদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে বিপদগ্রস্ত হয়েছিলেন।

কয়েকজন বিশ্বাসঘাতক
বাংলা বিহার উড়িষ্যা মিলিতভাবে শাসন করা হতো একজন নবাবের অধীনে। সে নবাবরা ছিলেন দিল্লির মোগল সম্রাটের অধীনস্থ বা নামকাওয়াস্তে হলেও করদাতা। দিল্লির মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে প্রথমে ইউরোপীয়রা তৎকালীন ভারত ভূখণ্ডে ব্যবসা শুরু করে অতি ক্ষুদ্র আকারে। কালক্রমে ইউরোপীয়ানদের অন্যতম গোষ্ঠী ব্রিটিশরা তৎকালীন মাদ্রাজ, বোম্বে ও কলকাতা শহরে ব্যবসায়িক ঘাঁটি স্থাপন করে। ব্যবসায়ের সাফল্যের কারণে তাদের রাজনৈতিক লিপ্সা বৃদ্ধি পায় এবং তারা তৎকালীন বঙ্গপ্রদেশ দখল করার পরিকল্পনা করে। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশী নামক স্থানে তৎকালীন বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীর সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি ক্লাইভের বাহিনীর যুদ্ধ হয়। ব্রিটিশদের যত সংখ্যা ও যত অস্ত্র ছিল, তার থেকে অনেক গুণ বেশি ছিল নবাব সিরাজউদ্দৌলার বাহিনীতে। কিন্তু নবাবের প্রধান সেনাপতি বা প্রধান আমলা মীর জাফর আলী খান বিশ্বাসঘাতকতা করেন। প্রচুর সম্পদের বিনিময়ে ব্রিটিশরা মীর জাফরের আনুগত্য ক্রয় করে এবং ওয়াদা করে যে, সিরাজউদ্দৌলাকে অপসারণ করতে পারলে, মীর জাফর পরবর্তী নবাব হবেন। নিজে নবাব হওয়ার লোভে তিনি দেশের বিরুদ্ধে, জনগণের বিরুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। তার নাম মীর জাফর কথাটার অর্থ এখন বিশ্বাসঘাতক।

১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের হাত থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীন করার জন্য মহাবিদ্রোহ ও যুদ্ধ হয়েছিল। কেউ বলেন এটি সিপাহি বিদ্রোহ, কেউ বলেন স্বাধীনতার প্রথম যুদ্ধ। সেই সময় বহু দেশীয় রাজ্যের, শাসনকর্তা ছিলেন মহারাজা বা রাজা বা নবাব, এদের কেউ কেউ ব্রিটিশদের পক্ষ নেন, কেউ স্বাধীনতা যুদ্ধের পক্ষ নেন। যুদ্ধে অংশ নিয়ে ছিলেন এমন একজনের নাম লক্ষ্মীবাঈ; তিনি ছিলেন ঝাঁসির রানী। তার বয়স ছিল মাত্র ২৩ বছর। তিনি শুধু ঝাঁসি মুক্ত করার জন্য নয়, সব এলাকার বিদ্রোহী সৈন্যদের সমর্থন দেন। কিন্তু তিনি একজন মহারাজার বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে পরাজিত হয়েছিলেন। ওই বিশ্বাসঘাতক ছিলেন তৎকালীন গোয়ালিয়রের মহারাজা যার নাম ছিল জয়াজিরাও সিন্ধিয়া। প্রায় একই সময় নারওয়ারের রাজা (মানসিং) বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন একজন স্বাধীনতা যোদ্ধাকে ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয়ার জন্য। সেই স্বাধীনতা যোদ্ধার নাম রামচন্দ্র পান্ডুরাং তোপে। কিন্তু তিনি সুপরিচিত তাঁতিয়া তোপে নামে। ১৯৩৯-৪০ সালের কথা। হিটলারের জার্মানি চার পাশের দেশগুলো আক্রমণ ও দখল করে। এই প্রক্রিয়াতেই নরওয়ে নামের ইউরোপীয় শান্তিপ্রিয় দেশটিও দখল করা হয়েছিল। জার্মানির শাসক তার পক্ষে নরওয়ে শাসন করার জন্য নিযুক্ত করেছিলেন এক ব্যক্তিকে, যার নাম কুইসলিং। তিনি জার্মানদের পক্ষ নিয়ে বহু স্বদেশী ও ইহুদিকে হত্যা করেছিলেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে নরওয়ের অভ্যন্তরে স্বাধীনতা যোদ্ধাদের হত্যার জন্যও দায়ী ছিলেন। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশেও এরূপ ঘটনা ঘটেছে, যেরূপ ঘটেছিল নরওয়েতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে।

পৃথিবীতে যুদ্ধ অন্যতম প্রাচীন একটি কর্ম। এক দেশ কর্তৃক অন্য দেশ দখল, এক জাতি কর্তৃক অন্য জাতিকে দমন ইত্যাদি বহুল সুপরিচিত কর্ম। তবে যুগে যুগে কারিগরি দক্ষতার ওপর নির্ভর করে, শক্তিমত্তা, পরিবেশ এবং সুদূরপ্রসারী ইচ্ছার ওপর নির্ভর করে এরূপ কর্মগুলো একেক কৌশলে বাস্তবায়ন হতো এবং বর্তমানেও হচ্ছে। যেকোনো একটি দেশে স্বাধীনতা বিপন্ন হওয়ার জন্য অনেক কারণ দায়ী থাকে। এগুলোর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে দেশের নাগরিকদের অসচেতনতা; বিশেষ করে তরুণ সম্প্রদায়ের অসচেতনতা। বর্তমান ডিজিটাল যুগে, কম্পিউটারের যুগে, বর্তমান মোবাইল ফোনের যুগে এবং ইউটিউবের যুগে তরুণ সম্প্রদায় দেশ ও জাতি নিয়ে চিন্তা করা থেকে বিরত থাকার জন্য অনেক পথ বিদ্যমান। তাই আধুনিককালের মীর জাফর বা কুইসলিংয়েরা নীরবে-নিভৃতে কাজ করে যায়। এদের অপকর্মের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে জাতীয় বীরদের বীরত্বকাহিনী থেকে সাহস ও প্রত্যয় আহরণ করতে হবে। এ উদ্দেশ্যে আজকের কলাম লেখা।
লেখক : মেজর জেনারেল (অব:); চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.generalibrahim.com


আরো সংবাদ




astropay bozdurmak istiyorum