১৬ নভেম্বর ২০১৮

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনিয়মে জনদুর্ভোগ বাড়ছে

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনিয়মে জনদুর্ভোগ বাড়ছে - ছবি : সংগ্রহ

সম্প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যা হচ্ছে- গ্রাহকসেবার নামে তাকে সেবা না বলে ভোগান্তি শব্দ ব্যবহার যথোপযুক্ত বলে মনে হয়। জুলাইয়ের প্রথম সপ্তাহে এসে যা দেখলাম- তাতে মনে হয় টাকাপয়সা রাখার ভরসাস্থল একমাত্র কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঞ্চয় বিভাগ হলেও গ্রাহক বা বিনিয়োগকারীদের মুখ থেকে শোনা বক্তব্যে আমি হতভম্ব হলাম। কাজে শৃঙ্খলা নেই। বিনিয়োগকারীরা নানা অভিযোগ নিয়ে নিত্যদিন ব্যাংকে ভিড় করছেন। অনলাইন ব্যাংকিংয়ের কথা বলা হলেও নানা সমস্যায় জর্জরিত ব্যাংকিং সিস্টেমে। সঞ্চয়পত্র কেনা এবং ভাঙানো নিয়ে যে জটিলতা দেখলাম তা ব্যাংকে কর্মরত কর্মচারীদের গাফিলতি অনেকাংশে দায়ী বলে ভুক্তভোগীরা বলছেন।

প্রথম সমস্যাটি হলো- কেন্দ্রীয় ব্যাংকে পাঁচ ধরনের সঞ্চয়পত্র প্রতিদিন কেনাবেচা হচ্ছে। ০১. পরিবার সঞ্চয়পত্র, পাঁচ বছর মেয়াদি প্রতি লাখে প্রতি মাসে লভাংশ ৯১২ টাকা; ০২. তিন বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র প্রতি তিন মাস পর পর লভ্যাংশ প্রতি লাখে দুই হাজার ৬২২ টাকা; ০৩. পেনশনার সঞ্চয়পত্র, সুযোগ শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য। রেটও ভালো। অর্থাৎ পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র, প্রতি লাখে তিন মাস পর পর মুনাফা দেয়া হয় দুই হাজার ৭৯৩ টাকা; ০৪. পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র, সবার জন্য উন্মুক্ত, তা পাঁচ বছর পর ভাঙানো যাবে। প্রতি লাখে পাঁচ বছর পর মুনাফা ৫৩ হাজার ৫৮০ টাকা; ০৫. এ ছাড়া নানা ধরনের বন্ড কেনাবেচা হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। সেহেতু কেন্দ্রীয় ব্যাংকে প্রতিদিন মানুষের ভিড় লেগেই আছে। নিরাপদ আয় রোজগার এবং ঝুঁকিবিহীন আর কোথাও নেই বিধায় মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, নি¤œমধ্যবিত্ত তথা সব শ্রেণীর মানুষ এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে ঝুঁকছেন।

২০১৮-১৯ অর্থবছরে সুদের ও মুনাফার হার বাড়ানো বা কমানো হয়নি বলেই মানুষ এখন সঞ্চয়পত্রকে জীবন বাঁচানোর একমাত্র হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। নির্বাচনের বছর হওয়ায় সরকার সরকারি ও বেসরকারি সব ব্যাংকে সুদের আমানত ও ঋণের হার এক ডিজিটে নামিয়ে আনার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে জুন মাসে একটি সার্কুলার জাতীয় দৈনিকগুলোতে প্রচার করে। এরই সূত্র ধরে সব ব্যাংকে এক শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ছয় শতাংশ সুদের আমানতের হার নির্ধারণ করে। সব চেয়ে হতবাক হওয়ার বিষয়টি হলো- সরকার ক্ষুদ্র আমানতকারীদের আমানতের ওপর সুদের হার বার্ষিক তিন থেকে ছয় শতাংশ নির্ধারণ করে দিলেও ব্যাংক থেকে ঋণপ্রাপ্তিদের ওপর যা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়- এ ক্ষেত্রে ঋণের সুদের হার ১৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৯ শতাংশ নির্ধারণ করেছে। জনগণের আমানতের টাকা থেকেই বেসরকারি ও সরকারি প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেয়া হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয়, মুনাফা বা সুদের হার আমানতকারীদের ব্যাংক হিসাব খাতে কমিয়ে তিন শতাংশ থেকে ছয় শতাংশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ করে দিয়ে জনগণকে ঠকিয়েছে।

সরকারি ব্যাংকগুলো রাজনৈতিক বিবেচনায় সরকারের লোকদের ঋণ দিচ্ছে। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে মালিক-পরিচালকেরা। দুই তরফেই দেয় ঋণের বেশির ভাগই অনাদায়ে খেলাপি ঋণে পরিণত হচ্ছে। প্রতি বছরই খেলাপি ঋণের পাহাড় স্ফীত হচ্ছে। ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ব্যাংকিং চ্যানেলে সন্দেহজনক লেনদেনও ক্রমবর্ধমান। বিশেষজ্ঞ অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, ব্যাংক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং তাকে একটি নিয়মের মধ্যে আনা সম্ভব না হলে আগামীতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত শোচনীয় হয়ে উঠতে পারে।

সাধারণ গ্রাহক বা আমানতকারীদের চেয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারী এবং তাদের স্বজনদের সঞ্চয়পত্র লেনদেনের ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে। এরপর অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী ও তাদের রেফারেন্সে আসা ব্যক্তিদের সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে। একেবারে তৃতীয় শ্রেণী হিসেবে সেবা দেয়া হচ্ছে দেশের আমজনতার। তাদের ভোগান্তি একেবারে চরমে পৌঁছেছে। লোকজনদের সাথে আলাপ করে এ তথ্য সংগ্রহ করেছি। একজনের বক্তব্য হলো- সেই সকাল ১০টার সময় ব্যাংকে এসেছি লভ্যাংশ নেয়ার জন্য। এখন সাড়ে ৩টা বাজে, এখনো লভ্যাংশের টাকা হাতে পাইনি। আমার পরে এসেও অনেকে টাকা তুলে বাসায় চলে গেছেন। কিন্তু আমার মতো আরো অনেকে বসে আছেন। বিষয়টি আমি আগেই বলেছি, তা হলো- ব্যাংকের লোকজন ও সরকারি কর্মকর্তাদের কাজ প্রথমে, এরপর সময় থাকলে অন্যদের কাজ করবে, না হলে পরের দিন আবার আসতে হবে। এই ভোগান্তি নিত্যদিনের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্বিতীয় ভোগান্তিটি হলো ভুলভ্রান্তি, যা ব্যাংক কর্মকর্তাদের গাফিলতির কারণে ঘটছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে বিশেষ সঞ্চয়পত্র ডিপার্টমেন্টে ইদানীং প্রচুর অনভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। তাদের দিয়েই ভুলগুলো হচ্ছে। সঞ্চয়পত্রে রেজিস্ট্রেশন নম্বর থাকে না, অনেক সময় তারিখ ভুল থাকে। সঞ্চয়পত্র ইস্যুকারী অফিসের নাম এবং যার নামে সঞ্চয়পত্র ক্রয় করা হলো তার নামও ভুল অক্ষরে লেখা হয়। সঞ্চয়পত্র ক্রয়ের ফরমে গ্রাহক যেভাবে নাম ঠিকানা এবং নমিনির নাম ও সম্পর্ক এবং টাকার পরিমাণ, নমিনির এবং গ্রাহকের জন্ম তারিখ, আইডি নম্বর লেখা থাকে, সেটা দেখে পাওয়া রসিদ ও সঞ্চয়পত্রের মূল কপি শুদ্ধভাবে লেখার দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের। ৩০-০৪-২০১৮ ইএফটি ম্যানডেট ফরম (ঊঋঞ গঅঘউঅঞঊ ঋঙজগ) একজন গ্রাহকের প্রায় ১৪ লাখ টাকার পরিবার সঞ্চয়পত্রের রেজিস্ট্রেশন নম্বর না লিখে কর্মকর্তা লোকেশ রঞ্জন তালুকদার, ডেপুটি ম্যানেজার বাংলাদেশ ব্যাংক, মতিঝিল এই নামে সিল মেরে দস্তখত করে দেয়। পরবর্তী সময়ে ওই গ্রাহক ফরমটি নিয়ে অশোক কুমার রাহা জয়েন্ট ডাইরেক্টর সঞ্চয়পত্রের জেনারেল শাখায় কর্মরত ব্যক্তিকে বিষয়টি বলেন। তিনি বললেন, আপনার মোবাইল নম্বরে মেসেজ দেখুন। মেসেজ অপসনে গিয়ে দেখল ওই টাকার কোনো মেসেজ তার মোবাইল নম্বরে যায়নি।

কর্মকর্তা বললেন, আপনার মোবাইল নম্বর মনে হয় ভুল আছে। তিনি বললেন, দেখুন আমার ‘ইএফটি মেনডেট ফরম’। দেখা গেল ফরমে গ্রাহকের মোবাইল নম্বরে কোনো ভুল নেই। অশোক কুমার রাহা তখন বললেন, ভুল তো মানুষই করে। এটা কোনো ব্যাপার নয়। সংশোধনের ব্যবস্থা আছে। দুঃখজনক যে, ওই কর্মকর্তা তার অধীনস্থ লোকেশ রঞ্জন তালুকদারকে ডেকে একটিবারও বলেননি ভুলটি তো আপনার হয়েছে। ‘সই’ তো আপনার। সই করার পূর্বে বন্ড হোল্ডারের নাম, বন্ডের রেজিস্ট্রেশন নম্বর এসব চেক করে দেখবেন না? তা বলেননি। ওই তারিখের ‘ইএফটি ফরমে’ রেজিস্ট্রেশন নম্বর লেখা ছিল না। আরেকজন গ্রাহক বললেন, আমার টাকা যথাসময়ে ব্যাংকে যায় না। একজন বললেন, তিন মাস অন্তর মুনাফার প্রথম কিস্তির টাকা ব্যাংকে আসেনি। এসব ঘটনা নিত্যনৈতিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিযোগের পর অভিযোগ প্রতিদিনই আসছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের ৩০তলা ভবনের তৃতীয়তলায় হরেন্দ্রনাথ কর্মকার ডিজিএম সঞ্চয়পত্র (সাধারণ)। তার কাছে গিয়ে এসব অনিয়ম ও ভোগান্তি লিখিতভাবে জানানো হয়। কিন্তু সমস্যার সমাধান না হয়ে তা আরো ব্যাপকতা রূপ নিয়েছে।

আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের অতীতে রিজার্ভ চুরির ঘটনা পত্র-পত্রিকায় দেখেছি এবং একাধিক ই-মেইল হ্যাকার হওয়ার ঘটনাও পত্রিকায় দেখেছি। ইদানীং বাংলাদেশ ব্যাংকের ইস্যু করা ‘পে-অর্ডার’ উরংযড়হড়হৎ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তৃতীয়তলায় সঞ্চয়পত্র বিভাগে। এ রকম ঘটনা প্রায়ই ঘটছে- অযোগ্য লোক নিয়োগের কারণে। এ ছাড়া তো সময়ক্ষেপণ আছেই। এক ঘণ্টার কাজ তিন-চার ঘণ্টা লাগছে। পুরো দিনটি একজন মানুষের কী পরিমাণ ক্ষতি বয়ে আনে তা একজন ভুক্তভোগী ছাড়া আর কারো অনুধাবন করা সম্ভব নয়। ব্যাংকে বিরাজমান সব অনিয়মের পথ বন্ধ করে সুশৃঙ্খলতা ফিরিয়ে আনা হোক অতিসত্বর।
লেখক : গ্রন্থকার ও গবেষক

EM.harunrashid@gmail.com


আরো সংবাদ