২০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

আসাম নিয়ে ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমের রিপোর্ট

আতঙ্কে রয়েছে আসামের মুসলিমরা - ছবি : সংগ্রহ

‘ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট হেইট’-এর একটি ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম সম্প্রতি আসামের ‘ডাউটফুল সিটিজেন’ সম্পর্কে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। উত্তর প্রদেশের সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশ এসআর দারাপুরি এই টিমের নেতৃত্ব দেন। এই টিমের অন্য সদস্যরা হচ্ছেন- সাংবাদিক অমিত সেনগুপ্ত, মনীষা ভাল্লা, শাকিল আহমেদ, তারিক আনোয়ার ও হাসানুল বান্না; ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট হেইট-এর সক্রিয়বাদী নাদিম খান, খালিদ সাইফি, লায়েক আহমেদ খান ও মজিদ মাজহারি; সক্রিয়বাদী বজলুল বাসিত চৌধুরী এবং ভিডিও সাংবাদিক অবিনাশ সৌরভ।

এ রিপোর্টের প্রারম্ভিকায় এসআর দারাপুরি লিখেছেন : ‘এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমের অংশ হিসেবে এবং এর সরেজমিন তদন্ত থেকে শুরু করে রিপোর্ট তৈরির কাজ পর্যন্ত এর প্রতিদিনের কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার সূত্রে নিশ্চিত বলতে পারি, আসাম এখন আগ্নেয়গিরির ওপর অবস্থান করছে। যেকোনো সময় এর উদগীরণ ঘটতে পারে, যদি আসামের বাংলা ভাষাভাষী মুসলমান ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর ভাষা ও ধর্মের ভিত্তিতে ন্যায়বিচার করা না হয়। যদি ন্যাশনাল রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেনসের (এনআরসি) হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া সময়মতো বন্ধ করা না হয়, তবে এমনটি ঘটার আশঙ্কা। অভিযোগ রয়েছে-

লোকগুলোকে এমন সুযোগও দেয়া হচ্ছে না, যাতে এরা ফরেনারস ট্রাইব্যুনালে প্রমাণ করতে পারে, এরা ভারতেরই নাগরিক। এমনকি তাদের কাছে যথাযথভাবে নোটিশও পৌঁছানো হয়নি। নোটিশ পাঠানো হয়েছে তাদের অস্থায়ী ঠিকানায় কিংবা এমন স্থানে তা পাঠানো হয়েছে, যা ব্রহ্মপুত্রের নদীভাঙনে ভেসে গেছে। এসব ঠিকানাই শুধু সরকারিভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তা ছাড়া, উ-ঠড়ঃবৎ তথা ‘ডাউটফুল’ ভোটারের ধারণা সম্পূর্ণ অবৈধ। সংবিধানে এর কোনো স্থান নেই। কেউ হতে পারেন নাগরিক কিংবা বা অনাগরিক। হতে পারেন না ‘ডাউটফুল সিটিজেন’। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে, মানুষকে বিদেশী ঘোষণা করা হচ্ছে একটি পক্ষের স্বার্থে। এর ফলে ওদেরকে ডিটেনশন ক্যাম্পে আটক থেকে ক্রমেই দুর্বল হয়ে মরতে হবে। আমরা আরো লক্ষ করেছি, যেসব লোককে ‘বিদেশী’ ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের রায়ের কপিও দেয়া হচ্ছে না। এই কপি না পাওয়ায় তারা উচ্চতর আদালতে এ ব্যাপারে চ্যালেঞ্জও করতে পারছেন না।

বিপুলসংখ্যক লোক আমাদের জানিয়েছেন, উজ্জ্বল ভূঁইয়া নামের যে বিচারক গৌহাটি হাইকোর্টের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তিনি পক্ষপাত দোষে দুষ্ট। ফরেনারস ট্রাইব্যুনালের পরই কেবল অভিযুক্ত বিদেশী নাগরিক সম্পর্কিত সব মামলা তার আদালতে যায় এবং ডিভিশন বেঞ্চের রোস্টার পর্যন্ত রিভাইজ করে দেখা হয় না। যে সময়ে সঙ্কট বড় হয়ে উঠছে, তখন আদালতের দায়িত্ব হচ্ছে অভিযোগগুলোর প্রতি নজর দিয়ে বিচারিক জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠা করা। চূড়ান্ত খসড়া প্রকাশের পর লাখ লাখ মানুষ হবে রাষ্ট্রহীন। এদের কী করা হবে, আপাতত তার কোনো পরিকল্পনা সরকারের হাতে নেই। এত বিপুলসংখ্যক লোককে দেশ থেকে বের করে দেয়া বাস্তবে অসম্ভব বলেই মনে হয়। যদি তা ঘটে, তবে তা নৈরাজ্য সৃষ্টির চেয়ে বরং সঙ্কটেরই জন্ম দেবে। অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন এটাই নির্দেশ করে, সামনে অপেক্ষা করছে একটি গোলমেলে পরিস্থিতি। সরকার, কর্তৃপক্ষ ও অন্য অংশীজনেরা তেমনটি ঘটার আগেই আর দেরি না করে তা থামাতে হবে।

ইউনাইটেড অ্যাগেইনস্ট হেইটের এই ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং রিপোর্টে বলা হয়েছে- সঙ্কটটি কেন্দ্রীভূত দু’টি বিষয়ে : ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস (এনআরসি) এবং নাগরিকত্ব সংশোধন বিল। এই বিল পার্লামেন্টে প্রথম তোলা হয় ২০১৬ সালের ১৫ জুলাই। এটি বিজেপি সমর্থিত একটি বিল। অল আসাম স্টুডেন্টস ইউনিয়ন (এএএসইউ) এবং এর রাজনৈতিক ফ্রন্ট অসম গণপরিষদ (এজিপি) এই বিলের প্রবল বিরোধী। তবে এজিপি আবার আসাম রাজ্যে বিজেপি জোট সরকারের শরিক দল। এনআরসির প্রতি সমর্থন রয়েছে বিজেপি এবং এজিপির। এএএসইউ-এর প্রতিষ্ঠাতা ও আসাম রাজ্যের দুইবারের মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল মহান্ত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিমকে গত ২৯ জুন গৌহাটিতে বলেছেন, বিজেপি যদি সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট বিল থেকে সরে না আসে, তবে এজিপি জোট ভেঙে সরকার থেকে বেরিয়ে আসবে।

এই সংশোধনী বিলের লক্ষ্য হচ্ছে ‘অবৈধ অভিবাসীদের’ শ্রেণিবিভাজন পরিবর্তন করা। এই বিলের মাধ্যমে সংশোধন করা হবে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন। এই সংশোধনীর ফলে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের অবৈধ অভিবাসীরা আসামের কিছু নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ পাবেÑ যারা শিখ, পার্সি, বৌদ্ধ, জৈন ও খ্রিষ্টান বংশোদ্ভূত। মুসলমান ও এর বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীকে এই বিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। এদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে শিয়া ও আহমদিয়ারা, যারা পাকিস্তানে হয়রানির শিকার। ২০১৬ সালে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরপরই দ্রুত এনআরসি ইস্যুটি সামনে নিয়ে আসে। এটি এখন কাজ করে সুপ্রিম কোর্টের তত্ত্বাবধানে। এনআরসির প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করা হয় ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এতে তিন কোটি ২৯ লাখ আবেদনকারীর মধ্যে এক কোটি ৯০ লাখকে ‘ভারতীয় নাগরিক’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। দ্বিতীয় ও চূড়ান্ত রিপোর্ট (অভিযোগ পর্যালোচনা করে আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে প্রকাশ করার কথা ছিল ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে) পিছিয়ে নেয়া হয়েছে ৩০ জুন। তবে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য অনুসারে, বন্যার কারণে তা বাতিল করা হয়েছে ৩০ জুলাই পর্যন্ত।

১৯৮৫ সালে রাজীব গান্ধীর নেতৃত্বাধীন তৎকালীন কংগ্রেস সরকার, রাজ্যসরকার এবং এএএসইউর মধ্যে ত্রিপক্ষীয় একটি চুক্তি হয়েছিল। সে চুক্তি অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের ২৪ আগস্টের মধ্যরাত হচ্ছে শেষ সময়সীমা। এই সময়সীমার আগে যারা ভারতে নাগরিকত্ব নিবন্ধন করেছেন, তারা ভারতের বৈধ নাগরিক বলে বিবেচিত হবেন। যারা এই শেষ তারিখের পর আসামে প্রবেশ করেছেন, তাদেরকে বৈধভাবে ‘বিদেশী’ বলে ঘোষণা করা হবে।

এটি একটি ব্যাপক, জটিল, স্পর্শকাতর ও কঠিন কাজ। বেসরকারি ও অসমর্থিত অনুমিত হিসাব মতে দাবি করা হয়, এর সাথে প্রত্যক্ষ বা অপ্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট হতে পারে ৩৫ লাখ লোক। ইতোমধ্যেই সরকারের প্রাক্কলন মতে, এক লাখ ২৫ হাজার জনকে ধরে নেয়া হচ্ছে ‘ডাউটফুল ভোটার’ হিসেবে। তারাই এখন ডি-ভোটার নামে পরিচিত। এ ছাড়া, আরো হাজার হাজার মানুষ ফরেনারস ট্রাইব্যুনাল আর আসাম পুলিশের স্ক্যানারের আওতায় রয়েছে। আসামে এ ধরনের ট্রাইব্যুনাল ১০০টি। এএনআরসি সংশোধন প্রক্রিয়ার ফলে ভুক্তভোগীদের ভারতীয় পরিচয় প্রমাণের জন্য ১৬টি বৈধ কাগজপত্র দাখিল করতে হয়েছে। কেউ যদি আপিল করতে চান, তবে তাকে যেতে হবে গৌহাটি হাইকোর্টের জাজ ডিভিশনাল বেঞ্চে। এই বেঞ্চের প্রধান হচ্ছেন উজ্জ্বল ভূঁইয়া। ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই গরিব। এদের বসবাস প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে। হাইকোর্ট বেঞ্চ তাদের আবেদন বাতিল করে দিলে তাদেরকে ট্রাইব্যুনালে ফিরে যেতে হবে। এত সব ঝক্কিঝামেলা পোহানোর সক্ষমতা তাদের নেই।

চূড়ান্ত পর্যায়ে যদি তাদের আপিল প্রত্যাখ্যান করা হয়, তখন তাদের ‘ডি-ভোটার’ ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনী তালিকায় তাদের নামের শেষে ‘ডি’ অক্ষরটি লেখা থাকে। তাদেরকে ‘ফরেনার’ হিসেবে চিহ্নিত করে কারাগারে পাঠানো হয়। এই কারাগার তাদের জন্য ডিটেনশন সেন্টার। বন্দীদেরও একটা অধিকার আছে। আসামের ছয়টি ডিটেনশন ক্যাম্পে কোনো বন্দীর সে অধিকারটুকুও নেই। আর এদের সাথে আচরণ করা হয় ‘বিচারাধীন ব্যক্তি’ হিসেবে। এ ছয়টি ডিটেনশন ক্যাম্প আলাদা কোনো ক্যাম্প নয়। এগুলো জেলা কারাগারগুলোরই অংশ। তেজপুর, শিলচর, জোড়হাট, গোয়ালপাড়া ও ডিব্রুগড় ডিটেনশন ক্যাম্পে রয়েছে মোটামুটি এক হাজার করে বন্দী। কোঁকড়াঝর ক্যাম্পে রাখা হয় শুধু মহিলাদের। ‘বিচারাধীন’ বিবেচনা করায় এদের একজন বন্দীরও স্বীকৃত অধিকার নেই। স্থানীয় সূত্র মতে, গোয়ালপাড়া জেলা কারাগারে রয়েছে ২৩৯ জন বিদেশী বন্দী। এদের মধ্যে ১৯৫ জন ডি-ভোটার। স্থানীয় আইনজীবীরা মনে করেন, ডি-ভোটারদেরও বিদেশী বিবেচনা করা অবৈধ। কারণ, এখনো তাদের নাগরিকত্ব পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রক্রিয়াধীন। এ কারণে, তাদের ডিটেনশন ক্যাম্পে রাখা অসাংবিধানিক।

দেখা গেছে, ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগই বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান। ধরেই নেয়া যায়, এনআরসি প্রক্রিয়া নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে রাজ্যের ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের ওপর। স্থানীয় সক্রিয়বাদীদের মতে, ভারতের বাকি অংশে নাগরিকত্ব নির্ণীত হয় সিটিজেনশিপ রুলের ৪ নম্বর রুল দিয়ে। সে জন্য এনআরসি স্টাফদের দুয়ারে দুয়ারে যেতে হয় সিটিজেনশিপ ডকুমেন্ট পরীক্ষা করে দেখার জন্য। ৪এ নম্বর রুলটি সুনির্দিষ্ট আসামের জন্য। এ রুলের আওতায় প্রতিটি এলাকায় (গ্রাম পঞ্চায়েত) এনআরসি সেবাকেন্দ্র স্থাপন করা হয়। সেখান থেকে লোকজন ফরম এনে তা পূরণ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযোজন করে দাখিল করতে হয়। যিনি ডাউটফুল, তার দায়ভার হচ্ছে তার নিজের নাগরিকত্ব প্রমাণ করা। ফরেনার ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করতে বলেছে ওই ব্যক্তির ফ্যামিলি ট্রির ইতিহাসও। আগে ১৬টি ডকুমেন্ট আবেদনের সাথে দিতে বলা হতো। এখন এর সাথে ফ্যামিলি ট্রির ইতিহাস বাড়তি দিতে হচ্ছে। ১৯৪৬ সালের ফরেনার আইন অনুযায়ী, ফরেনার চিহ্নিত করার কাজটি করে ফরেনার ট্রাইব্যুনাল।

এনআরসি সেবা কেন্দ্র (এনএসকে) হচ্ছে প্রতি জেলায় স্থাপিত হেল্প ডেস্ক। প্রতিটি হেল্প ডেস্কের আওতায় রয়েছে আড়াই হাজার বাড়ি। আসামে রয়েছে এমন আড়াই হাজার এনএসকে। এগুলো জনসাধারণকে লেগাসি ডাটা এবং এনআরসি আবেদন ফরম পেতে সহায়তা করে। যে কেউ যেকোনো এনএসকে-তে গিয়ে তার লেগাসি সার্চ করতে পারেন। পুরো রাজ্যের ডাটাবেজ রয়েছে এসব এনএসকে-তে। তা সত্ত্বেও আবেদন দাখিল করতে একজনকে তার বর্তমান বসবাসের এলাকার এনএসকে-তেই যেতে বলা হয়েছে।

আসাম বর্ডার পুলিশ কাজ করছে ১৯৬২ সাল থেকে। আর ফরেনার ট্রাইব্যুনালগুলো গঠিত হয় ১৯৬৪ সালে। বর্ডার পুলিশ যদি কাউকে ‘ডাউটফুল’ সিটিজেন হিসেবে পায়, তবে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি করে তা পাঠিয়ে দেয় সংশ্লিষ্ট বর্ডার পুলিশের এসপির কাছে। এসপি কেসটি রেফার করেন ফরেনার ট্রাইব্যুনালে। ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল সমন জারি করে তার নাগরিকত্ব প্রমাণ করার জন্য। অভিযোগ আছে, তারা এলোপাতাড়ি নাম ধরে কোনো তদন্ত ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই ডাউটফুল সিটিজেন ঘোষণা করছেন। নির্বাচন কমিশন ১৯৯৭ সালে নির্বাচনী বিধান পর্যালোচনার সময় সূচনা করেছে ‘ডি-ভোটার’ ক্যাটাগরি। কমিশন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ করে এলভিও (লোকাল ভেরিফিকেশন অফিসার), যিনি একজনকে ‘ডাউটফুল’ ব্যক্তি ঘোষণা করতে পারেন। তাদের রিপোর্ট যায় ইআরো-এর (ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার) কাছে, যিনি তা পাঠান সংশ্লিষ্ট বর্ডার পুলিশের এসপির কাছে, তিনি তা রেফার করেন ট্রাইব্যুনালে। ট্রাইব্যুনাল নোটিশ দেয় ডাউটফুল সিটিজেনকে। শত শত মানুষের অভিযোগ, তাদের কোনো নোটিশ না দিয়েই ডাউটফুল সিটিজেন করা হয়েছে। আর তারা পল্লী এলাকায় ইন্টারনেটে প্রবেশের সুযোগও পান না।

লেগাসি ডাটা হচ্ছে, ১৯৫১ সালের এনআরসি এবং ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ পর্যন্ত সব ইলেক্টোরাল রুল। এগুলো ডিজিটাইজড অবস্থায় পাওয়া যায়। কেউ যদি আজ নাগরিকত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চায়, তাকে তাদের পূর্বপুরুষদের খুঁজে বের করতে হবে এই লেগাসি ডাটায়। যদি তা পাওয়া যায়, তবে তাকে চিহ্নিত করা হবে ১১ ডিজিটের অনন্য লেগাসি ডাটা কোডের মাধ্যমে, যেটি পিএনআর নাম্বারের মতো (অনেকটা রেল অথবা বিমানের টিকিট বুকিংয়ের মতো)। লেগাসি ডাটায় একজন লোকের যাবতীয় তথ্য থাকে। কারো পূর্বপুরুষের নামের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া গেলে আবেদনকারীকে দেয়া হয় একটি লেগাসি ডাটা স্লিপ। আবেদনে এটি উল্লেখ করতে হয়। অভিযোগ আছে, ডাটার মধ্যে গোঁজামিল রয়েছে। যেমন দু’টি পরিবার দাবি করতে পারে একই ডাটা কোড।

উল্লিখিত ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং টিম চলতি বছরের ২৬ জুন থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত সময়ে সাক্ষাৎ করেছে সুশীলসমাজের বিভিন্ন গোষ্ঠী, গ্রামবাসী, আইনজীবী, নাগরিক অধিকারবিষয়ক সক্রিয়বাদী, বুদ্ধিজীবী ও অন্যদের সাথে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তারা বেশ কিছু সমস্যা চিহ্নিত করতে পেরেছন। তারা জানতে পেরেছেন, ডি-ভোটারের ধারণা শুধু আসামেই আছে। আগে প্রমাণের দায়িত্ব ছিল অভিযোগকারীর ওপর, এখন সে দায় চাপানো হয়েছে অভিযুক্তের ওপর। তা ছাড়া, তথ্যের নানা গোঁজামিলও লক্ষ করা গেছে। একজন লোকের বৈধ কাগজপত্র নানা কারণে না-ও থাকতে পারে। নদীভাঙন, বন্যায় গ্রাম বিলীন হওয়ার কারণে স্থান পরিবর্তন ইত্যাদি নানা কারণে কাগজপত্র হারিয়ে যেতে পারে। অনেকে বিয়ের পর এলাকা পরিবর্তন করে থাকেন। অনেকে কর্মস্থলের কারণেও স্থান পরিবর্তন করেন। অতএব, তাদের নির্ভর করতে হয় পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেটের ওপর।

যেমন- একজন বাবা দাবি করতে পারেন, একজন মহিলা তার কন্যা। এটি নিশ্চিত হতে পারে প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য থেকে, পঞ্চায়েতের সাক্ষ্য থেকে। কিন্তু অভিযোগ আছে, এ ক্ষেত্রে পঞ্চায়েতের সার্টিফিকেটও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ১০০-১৫০ বছরের জমির দলিলও প্রত্যাখ্যাত হয়েছে খাজনা ও অন্য কাগজপত্র দেখাতে না পারার কারণে। এ ধরনের নানা ঠুনকো অজুহাতে আসামে অনেকে তাদের নাগরিকত্ব হারিয়ে রাষ্ট্রহীন হওয়ার পথে। রিপোর্টটিতে অনেকের কেসস্টাডি তুলে ধরা হয়েছে। এতে তাদের অমানবিক ভোগান্তির করুণ কাহিনী রয়েছে। ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং টিম তাই অবিলম্বে এই এনআরসি সংশোধন প্রক্রিয়া বতিল করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত করেছে।


আরো সংবাদ