১৫ নভেম্বর ২০১৮

ইতিহাস কি উল্টো পথে পা বাড়াবে?

ইতিহাস কি উল্টো পথে পা বাড়াবে? - ছবি : নয়া দিগন্ত

২১ জুলাই ২০১৮, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাংলাদেশের কল্পনাতীত উন্নয়ন করে বিদেশে আকাশচুম্বী ভাবমূর্তি সৃষ্টি এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ডক্টরেট ডিগ্রি লাভসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন থেকে পাওয়া সম্মানী উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীকে জমকালো সংবর্ধনা দেয়া হয়। ওই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য ছিল পূর্বাপরের মতোই, যা শুধু একপেশে নয় বরং জাতির সামনে নিজের সাফাই গাওয়ার একটি কৌশল, যেমনটি তিনি বলেছেন, সংবর্ধনার প্রয়োজন ছিল না, জনগণ চাইলে থাকব, না চাইলে থাকব না।

তবে সংবর্ধনার বক্তব্য ছিল নির্বাচনকেন্দ্রিক এবং একটি ক্ষমতাসীন দলের সভাপতি হিসেবে তিনি সচরাচর সে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন, নির্বাচনপূর্ব বা প্রধানমন্ত্রীর শাসন আমলে যা করার অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের সুযোগ একেবারেই নেই এবং ছিল না। কিন্তু এখন প্রশ্ন আসে, এত উন্নয়নের মাঝে যদি জনগণের (সাংবিধানিক অধিকার) নিরাপত্তা হারিয়ে যায় এবং যারা শেখ হাসিনার সমর্থক নয়, তাদের জানমাল যদি নিরাপত্তাহীন থাকে তবে এটাই বলতে হবে যে, এ উন্নয়ন একপেশে এবং প্রধানমন্ত্রী দেশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ তথা তার সমর্থকদের তিনি শুভাকাক্সক্ষী, প্রতিপক্ষের নয়। যারা তার শাসনামলের সমালোচক তাদের প্রধানমন্ত্রী তিনি নন। কারণ, পরের দিনই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নেট পত্রিকা, বিভিন্ন মিডিয়াতে দেখা গেল মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও এ দেশের একজন প্রতিবাদী সম্পাদকের আদালত প্রাঙ্গণে রক্তমাখা শরীর।

ছিনতাই-ডাকাতির কারণে তিনি রক্তাক্ত হননি। তাকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছে প্রধানমন্ত্রীর সোনার ছেলেরা কুষ্টিয়ার আদালত প্রাঙ্গণে। সেখানে মাহমুদুর রহমান গিয়ে ছিলেন আদালতের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে নিজেকে জামিন লাভের জন্য আত্মসমর্পণ করার জন্য। তাকে ছাত্রলীগ হামলা করবে এ অবস্থা তিনি টের পেয়ে ম্যাজিস্ট্রেটকে আশঙ্কার কথা বলাসহ তার যোগাযোগমাধ্যম থেকে নিরাপত্তা চেয়ে আগাম বার্তা দিয়েছিলেন। ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমানকে নিরাপত্তা দেয়ার জন্য স্থানীয় ওসিকে বলা সত্ত্বেও পুলিশ কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেনি বরং হামলার দৃশ্য ‘তামাশার’ মতো উপভোগ করেছে। মাহমুদুর রহমানের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা পরিকল্পিতভাবে তার ওপর হামলা করেছে। তিনি আরো বলেছেন, ‘বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকলেও তারা নীরব ছিলেন।’

পত্রিকান্তরে প্রকাশ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্বীকার করে মিডিয়াতে বলেছেন, ‘বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আমাকে ফোন করে জানিয়ে ছিলেন মাহমুদুর রহমান কুষ্টিয়ার আদালতে যাচ্ছেন, তাকে যেন নিরাপত্তা দেয়া হয়। এরই মধ্যে শুনতে পাই তাকে ঘেরাও করা হয়েছে। তখনই আমি কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার এস এম মেহেদী হাসানকে জানাই, কুষ্টিয়ার একটি মানহানি মামলায় মাহমুদুর রহমান জামিন নিতে গেছেন, তাকে যেন নিরাপত্তা দিয়ে গাড়িতে উঠিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু এরপরও এই হামলার ঘটনা ঘটল’। পত্রিকায় প্রকাশিত স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথায় মনে হলো, ছাত্রলীগ বা সরকারি মাসলম্যানদের কাছে তিনি অসহায় হয়ে পড়েছেন, যেমনটি শিক্ষামন্ত্রী তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের কাছে অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেছিলেন, ঘুষকে সহনীয় পর্যায়ে নিয়ে আনতে। অর্থমন্ত্রী ঘুষ নেয়াকে বৈধতা দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘এ টাকা নেয়াকে আমি ঘুষ বলব না।’ তথ্যমন্ত্রী (স্বঘোষিত বিএনপি বিদ্বেষীমন্ত্রী) বলেই দিয়েছেন, যেকোনো ছোটখাটো চাকরির জন্য ন্যূনতম ১০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে সোয়া লাখ টন কয়লা লোপাটে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ, রাষ্ট্রীয় ভল্ট (বাংলাদেশ ব্যাংক) থেকে সোনা-হীরা পাচারের খবর, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের টাকা লোপাট প্রভৃতি মিলিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সংবর্ধনাকালের সাক্ষী হয়ে থাকবে নিশ্চয় (!), যার মূল্যায়ন ‘সময়ই’ যথানিয়মে বলে দেবে।

লুটপাট হচ্ছে না কোথায়? ফসলি জমিকে সতর্কতার সাথে ব্যবহার করতে হবে এবং সংবিধানের ১৮(ক) অনুচ্ছেদ মোতাবেক পরিবেশ রক্ষার সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়ার জন্য সরকার কেবিনেট মিটিংয়ে নীতিগত কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও রাজধানীর আশপাশের এলাকা বিশেষ করে রূপগঞ্জে পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্র ছাড়া খাল-বিল, নদী-নালা, ফসলি জমি, পুকুর প্রভৃতি অবৈধভাবে ভরাট করে ভূমিদস্যুরা আবাসন প্রকল্পের নামে এক দিকে গ্রাহকদের করছে প্রতারণা, অন্য দিকে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে সরকারি নীতিমালা। পরিবেশ অধিদফতরসহ সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে ফসলি জমি দখল করা হচ্ছে। এ মর্মে সরকার নির্বাক কেন? কারণ প্রচার রয়েছে যে, সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট লোকদের এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ রয়েছে।

মাহমুদুর রহমানের রক্তমাখা শরীর শুধু জাতি এখন দেখছে না, বিএনপি মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রক্তমাখা উদোম শরীরও দেখেছে, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময়ও বিএনপি চেয়ারপারসনের ওপর হামলা হয়েছে, গেল ঈদুল ফিতরে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদকে নিরাপত্তার অজুহাতে বাড়ি থেকে বের হতে দেয়া হয়নি। এ ধরনের অনেক উদাহরণ দেয়া যাবে।
এ কথাও বলা যাবে যে, এর আগেও এ ধরনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। সরকার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিএনপি আমলে অনেক অরাজকতা হয়েছে। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তো গণতন্ত্রের মানসকন্যা ও মানবতার মা হিসেবে নিজ দল-কর্তৃক সংবর্ধিত হয়েছেন। ফলে তার প্রতিপক্ষরা তার পোশাকি বাহিনী ও মাসলম্যানদের দিয়ে যদি এমনিভাবে প্রকাশ্যে হেনস্থা হন তবে প্রধানমন্ত্রীকে দেয়া বর্ণিত উপাধিগুলো কি মর্যাদাসম্পন্ন হবে? না, ইতিহাস কি উল্টো পথে পা বাড়াবে?

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অভিনব নির্বাচনবিহীন সরকার প্রধানমন্ত্রীকে বিতর্কিত করেছে, গণতন্ত্রের ওপর লেপন করেছে কালিমা, এ জেনেও বর্ণিত ঘটনাগুলো স্মরণ করিয়ে দেয় যে, আরেকটি একতরফা নির্বাচনের দিকেই প্রধানমন্ত্রী এগোচ্ছেন। কারণ সাংবিধানিকভাবেই রাষ্ট্রের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং। প্রতিটি নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা তার সাংবিধানিক দায়িত্ব ও কর্তব্য এবং এ মর্মে তিনি শপথবাক্য পাঠ করেছেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ যারা বিভিন্নভাবে হেনস্থা হয়েছেন, সে অভিযুক্তদের কোনো ধরনের বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছে কি না লেখকের জানা নেই। তবে বিষয়টির সত্যতা সম্পর্কে বিবেচনায় নেবেন সম্মানিত পাঠকসমাজ। প্রধানমন্ত্রী ও শাসক দলের প্রধান এক ব্যক্তি হলে দায়িত্ব পালনে তাদের ঘধঃঁৎব ধহফ ঈযধৎধপঃবৎ এক হওয়া সাংবিধানিক নয়। শাসক দলের প্রধান তার দলকে ক্ষমতায় আনার জন্য প্রতিপক্ষের জানমালের নিরাপত্তাহীনসহ ভয় আতঙ্কের পদক্ষেপ নিলে বেআইনি হবে, কিন্তু শপথ ভঙ্গ হবে না।

কিন্তু প্রতিপক্ষ বা সমালোচকদের জানমাল ও নিরাপত্তার বিঘœ করে প্রধানমন্ত্রী শপথ ভঙ্গের মাধ্যমে তার স্বৈরাচারী চেহারার উন্মেষ ঘটালেন, যা তিনি এখনো হয়তো বুঝতে না পেরে থাকেন, তবে যখন বুঝবেন তখন হয়তো সংশোধনের সময় নাও থাকতে পারে। এ ধরনের নজির দেখার জন্য বেশি দূর যাওয়ার দরকার নেই, হাতের কাছেই তা রয়েছে। দলীয় প্রধান রাজনৈতিক নেতাকর্মীভিত্তিক এবং প্রধানমন্ত্রী রয়েছেন আমলাভিত্তিক। আমলারা বিশেষ করে বর্তমান ব্রুকেটরা ঘড়হ-চড়ষরঃরপধষ চড়ষরঃরপরধহ অর্থাৎ রূপ বদলানোর দরজা তাদের জন্য সবসময়ই খোলা রাখে। প্রধানমন্ত্রী এখন আমলাদের ব্যবহার করছেন, না আমলাদের হাতে ব্যবহৃত হচ্ছেন, তা সময়ই বলে দেবে। এ কথাগুলো আলোচনায় আনলাম এ জন্য যে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টেলিফোনিক নির্দেশ দেয়ার পরও কুষ্টিয়া পুলিশ সুপার মাহমুদুর রহমানের নিরাপত্তা দিলেন না কেন? তবে কি পুলিশ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের অপেক্ষায় ছিল? না কি ভিন্ন কিছু (!)

বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ২৪ জুলাই ২০১৮ বলেছেন, মাহমুদুর রহমানের বিষয়টি তিনি দেখবেন। দেখা যাক তিনি কতটুকু দেখেন? বা দেখতে পারেন? এ জন্য জাতি নিশ্চয় অধীর আগ্রহে থাকবে। তবে বিষয়টি ‘দেখার’ এখতিয়ার ও ক্ষমতা তার রয়েছে, যদি না প্রধানমন্ত্রীর মনমর্জির দিকে প্রধান বিচারপতিকে তাকাতে না হয় (!)
লেখক : কলামিস্ট ও আইনজীবী (আপিল বিভাগ)
taimuralamkhandaker@gmail.com


আরো সংবাদ